img

বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন: এলডিসি উত্তরণের আগে যে তিনটি সংকট মোকাবিলা করা জরুরি

প্রকাশিত :  ১৮:২৬, ১৪ মে ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন: এলডিসি উত্তরণের আগে যে তিনটি সংকট মোকাবিলা করা জরুরি

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এক দশকের বেশি সময় ধরে ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর বর্তমানে জিডিপি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ শতাংশের কাছাকাছি। দারিদ্র্য আবার বেড়েছে, ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ছাড়িয়ে গেছে ছয় লাখ কোটি টাকা এবং নিত্যপণ্যের দামে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তীব্রভাবে কমেছে।

বর্তমান সরকার যেসব তিনটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে, সেগুলো হলো—ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, রাজস্ব আহরণের আমূল সংস্কার এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ের জন্য রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করা।

প্রবৃদ্ধি থমকে যাওয়া ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আইএমএফ-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৪.৭ শতাংশের মধ্যে থাকবে। এটি গত দুই দশকের তুলনায় অনেক কম। উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া ও কঠোর মুদ্রানীতির কারণে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে।

মুদ্রাস্ফীতি এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। আগামী বছরও তা ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পূর্বাভাস দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় পণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি বাড়েনি; বরং ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, যা বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২১.৪ শতাংশে। অর্থাৎ নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।

সরকার মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে বিনিয়োগ স্থবির হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু এখনো তা মাত্র চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো, যা যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে অপ্রতুল।

ব্যাংকিং খাত: খেলাপি ঋণের পাহাড় ও পুনর্গঠনের হাতিয়ার

ব্যাংকিং খাতের চরম অব্যবস্থাপনা আজ অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। ডিসেম্বর নাগাদ তা কিছুটা কমে ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়ালেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রায় রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের একটি বিশাল অংশ কেন্দ্রীভূত মাত্র কয়েক হাজার বড় ঋণগ্রহীতার কাছে। প্রায় ৩.০৪ লাখ কোটি টাকা খেলাপি রয়েছে ৫,৭৭৫ জনের বিরুদ্ধে, যাঁরা প্রত্যেকে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন। আর ৫০০ কোটি টাকার ওপরে ২,২৭৩ জন গ্রাহক আটকে রেখেছেন ১.৯২ লাখ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা এই চিত্রকে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা সুযোগসন্ধানী পুঁজিবাদ বলে চিহ্নিত করছেন। প্রভাবশালীরা নিয়মকানুন ডিঙিয়ে জনগণের জমানো টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ীদের নাম শীর্ষে। এসব ঋণের একটি অংশ বিদেশে পাচার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ব্যাংকিং খাত বাঁচাতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক পাঁচটি পদক্ষেপের পরামর্শ দিচ্ছে:

প্রথমত, সব রাষ্ট্রায়ত্ত ও বড় বেসরকারি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান নিরপেক্ষভাবে যাচাই বা ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ’ করতে হবে। অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রেখে কৃত্রিম মুনাফা দেখায়।

দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে।

তৃতীয়ত, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করতে হবে, তবে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

চতুর্থত, বাংলাদেশ ব্যাংককে নীতি নির্ধারণে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।

পঞ্চমত, বড় ঋণে ফরেনসিক অডিট ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করতে হবে।

রাজস্ব খাত: কম কর আদায় ও ডিজিটাল সংস্কারের পথে

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সর্বনিম্ন—মাত্র ৭.৭ থেকে ৮.৫ শতাংশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাতে এটি অপর্যাপ্ত। ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১,৪৭২ কোটি টাকা।

এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় হয়েছে মাত্র ২৫৪,৩৩০ কোটি টাকা। আয়কর ও আমদানিশুল্ক খাতেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি। ব্যবসায় মন্দা ও শুল্ক প্রশাসনে দুর্নীতির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে বিলাসদ্রব্য আমদানি কমে যাওয়াও এই ঘাটতির জন্য দায়ী।

রাজস্ব বাড়াতে এনবিআর ১০ বছর মেয়াদি একটি বিস্তৃত কর জরিপ শুরু করতে যাচ্ছে। শহরের বাইরেও করের আওতা বাড়াতে হবে। ইউটিলিটি বিলের সঙ্গে কর তথ্য একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা কর ফাঁকি কমাতে সহায়ক হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমান ১৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে ভারতের মতো বহুস্তরীয় জিএসটি মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। কর অব্যাহতি কমাতে হবে, বিশেষ করে যেসব শিল্প পূর্ণতা পেয়েছে। এনবিআরকে ভেঙে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা—এই দুটি পৃথক বিভাগ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।

এলডিসি উত্তরণ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮২-৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ সুবিধা হারিয়ে গেলে তৈরি পোশাকে ১০-১২ শতাংশ শুল্ক পড়তে পারে, যা রপ্তানি আয়ে বড় ধাক্কা হবে।

পোশাক ছাড়া চামড়া, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল ও ওষুধ শিল্পে সম্ভাবনা থাকলেও নীতিগত বৈষম্যের কারণে সেগুলো পিছিয়ে আছে। পোশাক খাত বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা পেলেও অন্য খাতগুলো তা পায় না। নতুন রপ্তানি নীতি (২০২৪-২০২৭) সব খাতে সমান সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চারটি কৌশল নেওয়া হচ্ছে: বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, আসিয়ান ও ভারত-চীনের মতো বাজারগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর এবং বন্দরে পণ্য খালাসের সময় কমিয়ে লজিস্টিকস খরচ কমানো।

রেমিট্যান্স: হুন্ডির চ্যালেঞ্জ ও দক্ষ কর্মী প্রেরণ

২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০.০৪ বিলিয়ন ডলার, যা রেকর্ড। তবে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা হুন্ডির মাধ্যমে চলে যায়। হুন্ডিতে দ্রুত সেবা ও ভালো বিনিময় হার পাওয়া যায়। সরকার ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিলেও হুন্ডি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

রেমিট্যান্স আরও বাড়াতে দক্ষ ও প্রত্যয়িত কর্মী পাঠানো জরুরি। পাঁচ বছরে রেমিট্যান্স ৪০-৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ডিজিটাল ফিনটেক সেবা সহজ করতে হবে, বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা আনতে হবে এবং প্রবাসীদের জন্য বিনিয়োগ সুবিধা বাড়াতে হবে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি

খাদ্যমূল্যের অস্থিরতা অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। উৎপাদন ভালো থাকলেও বাজার সিন্ডিকেট ও সরবরাহ চেইনের অদক্ষতায় ভোক্তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। পচনশীল পণ্যের ৩০-৪০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়।

সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করছে। ‘এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট’ সংশোধন করে মজুতদারিদের কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে। সৌরচালিত সেচ পাম্পের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমানো এবং পরিবারভিত্তিক কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য সহায়তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও জ্বালানি নিরাপত্তা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে পারে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি। জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সংকট ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জরুরি।

সুশাসন ছাড়া সংস্কার অসম্ভব

অর্থনৈতিক সংস্কার সফল করতে হলে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার (বিএফআইইউ) সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে চারটি মানদণ্ড—নির্ধারিত মুনাফা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব—কঠোরভাবে মানতে হবে। ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ব্যবসার বাধা দূর করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব ও রপ্তানি—এই তিন খাতে আমূল সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, বাড়বে বিনিয়োগ এবং মসৃণ হবে এলডিসি উত্তরণের পথ। ব্যর্থ হলে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। সাধারণ মানুষের ঘাম আর প্রবাসীদের পাঠানো টাকা যাতে ডুবিয়ে না দেওয়া হয়, সেই দায়িত্ব এখন নীতিনির্ধারকদের কাঁধে।

img

রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভা

প্রকাশিত :  ১৮:০৫, ১৪ মে ২০২৬

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক এবং কার্যকর করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহণ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রবি, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ও এমপি অ্যাডভোকেট শিমুল বিশ্বাস এই সভায় উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের থেকে জানানো হয়, ঢাকার যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এটি দ্বিতীয় সভা।

সভায় নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, গণপরিবহণ ব্যবস্থার সমন্বয়, ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়ন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয় বলেও জানা গেছে।