img

জুনের শেষ বিকেল, জুলাইয়ের নতুন প্রত্যাশা—পুঁজিবাজার কি ঘুরে দাঁড়ানোর পথে?

প্রকাশিত :  ১৩:৫৮, ২৭ জুন ২০২৬

জুনের শেষ বিকেল, জুলাইয়ের নতুন প্রত্যাশা—পুঁজিবাজার কি ঘুরে দাঁড়ানোর পথে?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

অর্থবছরের শেষ কয়েকটি দিন বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বরাবরই একটি বিশেষ সময়। এ সময় বাজারের পর্দায় যেমন ওঠানামার মাত্রা বাড়ে, তেমনি বিনিয়োগকারীদের মনেও জমে নানা প্রশ্ন। কেউ বছরের হিসাব মেলান, কেউ খোঁজেন নতুন অর্থবছরের সম্ভাবনা। তাই জুনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আগামীকালের লেনদেন নিয়ে কৌতূহল যেমন স্বাভাবিক, তেমনি জুলাই মাসকে ঘিরে নতুন আশার আলোচনাও অমূলক নয়।

গত কয়েক সপ্তাহে বাজার এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে গেছে। একদিকে ছিল তীব্র দরপতনের চাপ, অন্যদিকে টানা কয়েকটি ঊর্ধ্বমুখী সেশন আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—পুঁজিবাজার কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি প্রত্যাশা, আস্থা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির প্রতিফলন।

অর্থবছরের শেষ কার্যদিবসে সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাঁদের পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস করেন। অনেকেই বছরের মুনাফা বাস্তবায়ন করেন, আবার কেউ নতুন বিনিয়োগের জন্য নগদ অর্থ প্রস্তুত রাখেন। ফলে শেষ দিনে বিক্রির চাপ কিছুটা বাড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে একই সঙ্গে একটি বাস্তবতাও রয়েছে—সাম্প্রতিক দর-সংশোধনের ফলে অনেক মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারের দাম তুলনামূলক আকর্ষণীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে বাজারে নতুন ক্রেতাদের উপস্থিতিও বাড়তে পারে। এ কারণেই আগামীকালের বাজারে ওঠানামা থাকলেও তা আতঙ্কের কারণ নয়; বরং অর্থবছরের শেষ পর্যায়ের স্বাভাবিক সমন্বয় হিসেবেই দেখা উচিত।

কিন্তু আলোচনার বড় বিষয় আগামীকাল নয়; বরং আগামী মাস।

জুলাই মানেই নতুন অর্থবছরের শুরু। নতুন বাজেট, নতুন পরিকল্পনা, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন প্রত্যাশার সূচনা। পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। কারণ জুনের ক্লোজিং শেষ হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ওপর বছরের শেষের চাপ অনেকটাই কমে যায়। তখন তাঁদের নজর ঘুরে যায় ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কৌশলের দিকে। এই পরিবর্তন বাজারে তারল্য ও আস্থার পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারকে আরও আধুনিক ও গভীর করার যে নীতিগত দিকনির্দেশনা এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করা, নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালুর উদ্যোগ এবং বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা—এসব উদ্যোগ কেবল সূচক বাড়ানোর জন্য নয়; বরং বাজারের ভিত্তি আরও মজবুত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। স্বল্পমেয়াদে এ কঠোরতা কিছু অস্বস্তি তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে একটি সুশৃঙ্খল বাজার গড়ে তুলতে কার্যকর নজরদারির কোনো বিকল্প নেই। বিনিয়োগকারীরা যদি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন যে নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য কারসাজি রোধ করা, তাহলে এই আস্থাই ভবিষ্যতের বাজারকে আরও স্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে, সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও বাজারকে সহায়তা করতে পারে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা, আমদানি ব্যয়ের সম্ভাব্য ভারসাম্য এবং আর্থিক খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এলে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় ও মুনাফায় তার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোম্পানির আয়ই শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে আশার পাশাপাশি সতর্ক থাকারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কর নীতির কিছু পরিবর্তন, বিনিয়োগে কর-সুবিধা হ্রাস এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা বাজারের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকবে। তাই জুলাই এলেই বাজার শুধু ঊর্ধ্বমুখী হবে—এমন সরল সমীকরণ বাস্তবসম্মত নয়। পুঁজিবাজারের পথ কখনোই সরলরেখায় এগোয় না; সেখানে যেমন সংশোধন থাকবে, তেমনি পুনরুদ্ধারও থাকবে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন সাময়িক উচ্ছ্বাস নয়; প্রয়োজন টেকসই আস্থা। সেই আস্থা তৈরি হবে সুশাসন, স্বচ্ছতা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সূচকের কয়েক দিনের উত্থান বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; বরং ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক শক্তি এবং নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাসযোগ্যতা।

জুনের শেষ বিকেল তাই কেবল একটি অর্থবছরের সমাপ্তি নয়; এটি নতুন সম্ভাবনারও দুয়ার। আগামীকালের লেনদেনে হয়তো কিছু অস্থিরতা থাকবে। কিন্তু যদি সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে, তাহলে জুলাই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

পুঁজিবাজার শেষ পর্যন্ত গুজবের নয়, ধৈর্যের বাজার। যারা স্বল্পমেয়াদি আবেগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেন, তারাই সাধারণত এই বাজারের প্রকৃত সম্ভাবনার অংশীদার হন।

কমিউনিটি এর আরও খবর

img

ইতালিতে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

প্রকাশিত :  ০৬:৫০, ২৭ জুন ২০২৬

ইতালির রাজধানী রোমে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি নাগরিককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৯টার দিকে শহরের পশ্চিমাঞ্চলের কাসালোত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিলিও সড়কের একটি অ্যাপার্টমেন্টে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন নোয়াখালীর বসুরহাটের বাসিন্দা কামাল, তার স্ত্রী এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে। হামলায় তাদের ১৮ বছর বয়সী ছেলে গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, তার অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল এবং তিনি আশঙ্কামুক্ত।

স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র নিয়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালায়।

হামলায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে কামাল, তার স্ত্রী ও ছোট মেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ সময় প্রাণ বাঁচাতে বাসা থেকে বেরিয়ে আশপাশের লোকজনের কাছে সাহায্য চাইতে যান পরিবারের ১৮ বছর বয়সী ছেলে। কিন্তু হামলাকারী তাকেও ছুরিকাঘাত করে দ্রুত ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়। প্রতিবেশীরা বিষয়টি টের পেয়ে জরুরি সেবায় খবর দিলে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স এবং ইতালির কারাবিনিয়েরি বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান।

পরে নিহত তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আহত তরুণকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শরীরেও ছুরির আঘাত ছিল। তবে সেই আঘাত প্রাণঘাতী ছিল না। 

ঘটনার পর পুরো এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে রোম পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি ব্যক্তিগত বিরোধ, ডাকাতির চেষ্টা নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে- সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসা ও এজিআই জানিয়েছে, তিনজনই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ছিলেন। তাদের প্রত্যেকের শরীরে ছুরির আঘাত ছিল এবং সেই আঘাতেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো পুরোপুরি অজানা। এতে তদন্তকারীরা দ্বন্দ্বে পড়েছেন। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না।

এদিকে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছেন। তদন্তের স্বার্থে ফ্ল্যাটটি ঘিরে রাখা হয়েছে। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে হামলাকারীর পরিচয় শনাক্ত করা যায়।

রোম পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত নৃশংস। অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও অভিযান চালানো হচ্ছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ইল মেসাজ্জেরোর তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ প্রথমে সন্দেহ করছে যে ঘটনায় পরিবারের পরিচিত কেউ বা কোনো পারিবারিক বন্ধু জড়িত থাকতে পারেন। তবে কর্তৃপক্ষ বলেছে, এটি এখনো নিশ্চিত নয়, শুধু তদন্তের একটি সম্ভাব্য দিক। আর হত্যাকারী এখনো ধরা পড়েনি বলে তদন্তের বিস্তারিত তথ্য গোপন রাখা হচ্ছে।


কমিউনিটি এর আরও খবর