পুঁজিবাজারের প্রশাসনিক জাঁতাকল ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট: সুশাসিত কোম্পানিগুলো কেন আইপিওতে আসছে না
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
শিল্পায়ন, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো অর্থায়ন ও নতুন কর্মসংস্থানের প্রাথমিক মূলধনের জোগান আসে পুঁজিবাজার থেকে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সেই ভূমিকা কেবল প্রান্তিক নয়, ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও জাতীয় বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু মূলধন বাজারের পরিধি ও গভীরতা প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
আধুনিক অর্থনীতির স্বাস্থ্য মাপার অন্যতম সূচক বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত (মার্কেট ক্যাপ-টু-জিডিপি রেশিও)। ভারতে এই অনুপাত প্রায় ১৩১ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১০৬ শতাংশ, থাইল্যান্ডে প্রায় ৯৮ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৫৫ শতাংশ। বাংলাদেশে তা আটকে আছে মাত্র ৯ থেকে ১৪ শতাংশের সংকীর্ণ গণ্ডিতে।
এই চিত্র বলে দিচ্ছে, দেশের মূলধারার শিল্প ও কর্পোরেট অর্থায়নের সঙ্গে পুঁজিবাজারের দৃশ্যমান কোনো যোগসূত্র নেই। ইক্যুইটির বদলে ব্যাংকঋণের ওপর অতিনির্ভরতার ফলে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমেছে, বেড়েছে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি। ২০২২ সালের প্রথমার্ধ থেকে নতুন প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রায় থেমে আছে। অর্থনীতি বড় হলেও শীর্ষস্থানীয় সুশাসিত কর্পোরেট গ্রুপ ও ব্র্যান্ডেড বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী নয়।
উদ্যোক্তা ও বাজারসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে, এই আইপিওবিমুখতা আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর নেপথ্যে আছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রশাসনিক জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও নীতিগত অসংগতি। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিটি ধাপে গড়ে ওঠা অঘোষিত ঘুষ বা 'স্পিড মানি'র প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি।
দুই নিয়ন্ত্রকের ফাঁদে অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা
আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হতে চাইলে একটি নতুন কোম্পানিকে জটিল, সময়সাপেক্ষ ও ক্লান্তিকর আইনি প্রক্রিয়া পাড়ি দিতে হয়। বিএসইসি ও দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এখানে বড় সমস্যা। একই নথি দুই জায়গায় জমা দিতে হয়, একই প্রশ্নের জবাব আলাদাভাবে দিতে হয় দুই দপ্তরে।
উদীয়মান অন্যান্য বাজারে পরিপক্ক কোম্পানির আইপিও অনুমোদনের প্রাথমিক ধাপ শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে বড়জোর কয়েক মাস লাগে। বাংলাদেশে কোনো কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে সেই সময় গড়িয়ে আড়াই থেকে তিন বছরে ঠেকে। ফাইল পর্যালোচনার নামে বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জের বিভিন্ন বিভাগ থেকে যেসব খুঁটিনাটি ও কেরানিসুলভ প্রশ্ন আসে, তা সুশাসিত কোম্পানিগুলোর জন্য চরম বিরক্তির কারণ।
এতটা সময় অপেক্ষা করতে হলে কোম্পানির ব্যবসায়িক লক্ষ্য ও মূলধন ব্যবহারের সময়সূচি অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্ল্যান্ট সম্প্রসারণ, নতুন প্রযুক্তি আমদানি বা চড়া সুদের ব্যাংকঋণ শোধের জন্য ইক্যুইটি তোলার পরিকল্পনা করলে এই বিলম্ব পুরো হিসাব উল্টে দেয়। অনুমোদন যখন মেলে, তখন হয়তো পণ্যের চাহিদা কিংবা অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। তাতে উদ্যোক্তাকে লোকসানের মুখে পড়তে হয়। তাই অনেক ভালো উদ্যোক্তা এই আমলাতান্ত্রিক ফাঁদে পা না দিয়ে বাজারে না আসাকেই যুক্তিসংগত মনে করেন।
'স্পিড মানি'র রাজত্ব
আমলাতান্ত্রিক বিলম্বের চেয়েও বড় ব্যাধি দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বাজার বিশ্লেষক ও ভেতরের সূত্রগুলোর অভিযোগ, বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জের একশ্রেণির কর্মকর্তা এবং মধ্যস্থতাকারী ইস্যু ম্যানেজারদের নিয়ে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। প্রাথমিক তথ্য যাচাই থেকে কমিশন সভায় নথি উপস্থাপন এবং প্রিমিয়াম অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মোটা অঙ্কের 'গতি ফি' না দিলে ফাইল আটকে থাকে। এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সম্প্রতি বিএসইসির অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়েছে। কমিশন নিজেও অতীত অনিয়মের তদন্তে কমিটি গঠন করেছে। এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বাজারের সুশাসন ভেতরে ভেতরে কতটা ক্ষয়ে গেছে। এর ফলে উল্টো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যেসব বহুজাতিক কোম্পানি (এমএনসি) বা দেশীয় প্রতিষ্ঠিত গ্রুপ আইন মেনে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) অনুসরণ করে ও স্বচ্ছ কর্পোরেট গভর্নেন্স চর্চা করে চলে, তাদের অভ্যন্তরীণ কমপ্লায়েন্স নীতিতে ঘুষ বা গোপন লেনদেনের জায়গা নেই। ঘুষের এই অঘোষিত দাবি মেটাতে না পেরে ভালো কোম্পানিগুলো প্রক্রিয়া থেকেই সরে দাঁড়ায়।
লাভবান হয় তথাকথিত 'কাগুজে কোম্পানি' ও দুর্বল ভিত্তির প্রতিষ্ঠান। অসাধু উদ্যোক্তারা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের সঙ্গে যোগসাজশে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত আর্থিক বিবরণী তৈরি করেন। বিপুল অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে তাঁরা অন্যায্য প্রিমিয়াম-সহ আইপিও অনুমোদন বাগিয়ে নেন। পরে এসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে উধাও হয়ে যায়। ১৯৯৬ এবং ২০১০-১১ সালের শেয়ারবাজার ধসের স্মৃতি তাতে বারবার ফিরে আসে। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি অনুমোদিত ব্রোকারেজ হাউস সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রায় ২৭০ কোটি টাকার গ্রাহক হিসাব তছরুপ করেছে বলেও তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। বাজারের নৈতিক পতনের আরেকটি প্রমাণ এটি।
এনবিআরের নীতিগত বিরূপতা ও কর-হয়রানির আতঙ্ক
ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর কর ব্যবস্থা হওয়ার কথা ছিল ভালো কোম্পানিকে বাজারে টানার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বাস্তবে এনবিআরের বিদ্যমান নীতি ও তার প্রয়োগ তালিকাভুক্তির পথকে আরও দুর্গম করেছে। তত্ত্ব বলে, জনগণের মালিকানা নিশ্চিত করে শেয়ারবাজারে এলে কোম্পানির কর্পোরেট করহার অতালিকাভুক্ত কোম্পানির চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে সময়ের সঙ্গে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করের ব্যবধান এতটাই কমানো হয়েছে যে উদ্যোক্তাদের জন্য তা আর কার্যকর প্রণোদনা হয়ে থাকেনি। শর্ত মেনে ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন করা অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার এখন ২৫ শতাংশ। সাধারণ তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ, আর নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে তা ২০ শতাংশে নামতে পারে। অর্থাৎ তালিকাভুক্তির কর সুবিধা মাত্র আড়াই থেকে পাঁচ শতাংশ। অথচ বাজারে আসার পর বার্ষিক কমপ্লায়েন্স ব্যয়, নিরীক্ষা খরচ, লিস্টিং ফি ও অন্যান্য প্রশাসনিক খরচ এর চেয়ে অনেক বেশি।
উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক শেয়ারবাজারে ঢোকার পর এনবিআরের স্থানীয় কর সার্কেল থেকে অডিট ও প্রশাসনিক হয়রানির সম্ভাবনা। অতালিকাভুক্ত থাকলে একটি বেসরকারি কোম্পানি গোপনীয়তা বজায় রেখে কর ফাইল নিষ্পত্তি করতে পারে। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের পর তা আর সম্ভব হয় না। সব আর্থিক তথ্য, সম্পদ ও মুনাফার হিসাব প্রকাশ্যে আসে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওয়েবসাইটেও দিতে হয়। এই সুযোগে কর কর্মকর্তারা প্রায়ই অতিরিক্ত কর আদায়ের উদ্দেশ্যে ফাইল নতুন করে খোলেন এবং অযৌক্তিক দাবি তোলেন। তাই লাভজনক কোম্পানির মালিকেরা মনে করেন, সার্বক্ষণিক নজরদারি ও হয়রানির মুখে পড়ার চেয়ে চড়া সুদে ব্যাংকঋণ নিয়ে অতালিকাভুক্ত থাকাই বেশি নিরাপদ ও লাভজনক।
দর নির্ধারণের গোলকধাঁধা
সফল আইপিওর অন্যতম পূর্বশর্ত শেয়ারের ন্যায্য, বৈজ্ঞানিক ও বাজারবান্ধব মূল্য। বাংলাদেশে দর নির্ধারণের প্রধান দুটি পদ্ধতি হলো ফিক্সড প্রাইস ও বুক বিল্ডিং। নীতিগত অসংগতি ও বাস্তবায়নের ব্যর্থতায় দুটিই মুখ থুবড়ে পড়েছে।
ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে দীর্ঘকাল শেয়ার বিক্রি করতে হয়েছে ফেস ভ্যালু বা অভিহিত মূল্যে। ফলে শত শত কোটি টাকার পুঞ্জীভূত সঞ্চয় ও শক্তিশালী ব্র্যান্ড থাকা সত্ত্বেও ভালো কোম্পানিগুলো নিজেদের ইক্যুইটির যথাযথ দাম পায়নি। বৈজ্ঞানিক দর আবিষ্কারের উপায় হিসেবে পরে বুক বিল্ডিং চালু হলেও শুরু থেকেই তা যোগ্য বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (এলিজিবল ইনভেস্টর) সিন্ডিকেট কারসাজির শিকার হয়। তাঁরা ইস্যু ম্যানেজার ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে কৃত্রিমভাবে উচ্চ দর হেঁকে (বিড রিগিং) দুর্বল কোম্পানির কাট-অফ প্রাইস অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেন।
এই কারসাজি ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা একের পর এক তড়িঘড়ি ও অপরিপক্ক নিয়ম বদলাতে শুরু করলে পদ্ধতিটি নতুন সংকটে পড়ে। ফ্লোর প্রাইস চালু, বিডিংয়ের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া এবং মূল্যায়নে অপ্রয়োজনীয় ছাড় চাপানোর কারণে মৌলিক কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ড ও সম্পদের প্রকৃত মূল্য পাচ্ছে না। উদ্যোক্তাদের প্রশ্ন, বছরের পর বছর ধরে গড়া লাভজনক ব্যবসার মালিকানা শেয়ারবাজারে এসে বাজারদরের চেয়ে কম দামে বেচে দিতে কোন সুস্থ ব্যবসায়ী রাজি হবেন? দর নির্ধারণ নিয়ে এই জটিলতা তাঁদের আইপিও থেকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রধান অর্থনৈতিক কারণগুলোর একটি।
সহজ ব্যাংকঋণ ও জবাবদিহি এড়ানোর প্রবণতা
বাংলাদেশের কর্পোরেট অর্থায়নের মূল অসংগতি হলো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের জন্য পুঁজিবাজারের বদলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা। তত্ত্বগতভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংক স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি আমানত নিয়ে কাজ করে, যা চলতি মূলধনের জোগানের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের ঘনিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংকগুলোই বছরের পর বছর শিল্প স্থাপনের জন্য টার্ম লোন দিয়ে আসছে।
ব্যাংক থেকে সহজে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ মেলে বলে উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারে আসার তাগিদ তৈরি হয় না। শেয়ারবাজারে ঢোকার মানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি করা। স্বতন্ত্র পরিচালক (ইনডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর) নিয়োগ দিতে হয়, নিয়মিত ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়, বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) শেয়ারহোল্ডারদের কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হয়।
ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঋণ শোধ করতে না পারলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সুবিধা নিয়ে পার পাওয়া যায়। পুঁজিবাজারে সেই সুযোগ নেই। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এড়ানোর এই মানসিকতা অনেক স্বনামধন্য উদ্যোক্তাকেও আইপিওর পথ থেকে দূরে রাখে। ফলে অর্থনীতি একদিকে খেলাপি ঋণের ঝুঁকিতে জর্জরিত, অন্যদিকে পুঁজিবাজার মানসম্পন্ন সিকিউরিটিজের তীব্র সংকটে ভুগছে।
বহুজাতিক ও শীর্ষ গ্রুপের অনীহা, আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র হলো, দেশে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা ও মুনাফা করেও বহুজাতিক কোম্পানি (এমএনসি) ও প্রধান পারিবারিক কনগ্লোমারেটগুলো তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। বর্তমানে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, গ্রামীণফোন, লাফার্জহোলসিম ও ম্যারিকোর মতো হাতে গোনা কয়েকটি মানসম্পন্ন শেয়ার বাদ দিলে বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ বিকল্প প্রায় নেই।
নেস্লে বাংলাদেশ, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, মেটলাইফ, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রাণ-আরএফএল, আবুল খায়ের গ্রুপ, আকিজ রিসোর্সেস, বিকাশ ও নগদের মতো প্রতিষ্ঠান আইপিওতে না আসার পেছনে দুটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, এই কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা ও নগদ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) এতটাই শক্তিশালী যে নতুন প্রকল্পের জন্য জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূলধন তোলার প্রয়োজন পড়ে না। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ও সুশাসিত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো স্থানীয় নিয়ন্ত্রকদের অদক্ষতা, অনিয়ম, ঘন ঘন নিয়ম বদল ও প্রশাসনিক জটিলতায় নিজেদের জড়াতে চায় না।
তবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ না করা। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ২০এ ধারায় জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বড় ও লাভজনক কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত করার আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা বিএসইসিকে দেওয়া হয়েছে। অথচ বছরের পর বছর সংস্থাটি সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি। অতি সম্প্রতি বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানের নেতৃত্বে কমিশন ডাইরেক্ট লিস্টিং বা শেয়ার অফলোডের মাধ্যমে অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার উন্মুক্ত করে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে (পাবলিক ইন্টারেস্ট এনটিটি) বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে তা গতি পাচ্ছে না।
উত্তরণের পথ: সংস্কারের রূপরেখা
পুঁজিবাজারের এই জরাজীর্ণ দশা এবং মৌলিক ভিত্তির কোম্পানিগুলোর আইপিওবিমুখতার চক্র ভাঙতে আংশিক পদক্ষেপ বা সাময়িক আশ্বাস যথেষ্ট নয়। দরকার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, রাজস্ব প্রশাসন ও সরকারের রাজস্ব ও আর্থিক নীতির সমন্বিত ও আমূল সংস্কার।
প্রথমত, আইপিও অনুমোদনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পুরোপুরি দূর করতে হবে। বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জের দ্বৈত যাচাই বন্ধ করে চালু করতে হবে একক ডিজিটাল উইন্ডো, যেখানে আবেদনের অগ্রগতি ট্র্যাক করা যাবে। আবেদন জমার পর সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর থাকতে হবে। ফাইল ঝুলিয়ে কৃত্রিম বিলম্ব তৈরি করা কর্মকর্তাদের বরখাস্ত ও শাস্তির আওতায় আনলে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য থামানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, অনুমোদনের প্রতিটি স্তরে ঘুষ বা 'স্পিড মানি' বন্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি নিতে হবে। বিএসইসি, ডিএসই ও সিএসইর পর্যালোচকদের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা জরুরি। তদন্ত হতে হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে, আর অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তাতে কোনো কাগুজে কোম্পানি ঘুষ দিয়ে বাজারে ঢুকতে পারবে না, আর সুশাসিত কোম্পানিগুলো সম্মানজনকভাবে অনুমোদন পাবে।
তৃতীয়ত, এনবিআরকে পুঁজিবাজারের স্বার্থে কর্পোরেট কর কাঠামো নতুন করে সাজাতে হবে। তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান অন্তত ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ করা উচিত, যাতে বাজারে আসা কোম্পানির জন্য সুস্পষ্ট আর্থিক সুবিধা থাকে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্তির কারণে স্থানীয় কর সার্কেলের হাতে কর পুনর্নির্ধারণ বা ফাইল পুনরায় খোলার মাধ্যমে অন্যায্য হয়রানি ঠেকাতে স্থায়ী আইনি সুরক্ষা তৈরি করতে হবে।
চতুর্থত, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। যোগ্য বিনিয়োগকারীদের প্রাতিষ্ঠানিক বিডিং প্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, ইলেকট্রনিক ও কারসাজিমুক্ত। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী দুর্বল কোম্পানির দর কৃত্রিমভাবে বাড়াতে সহায়তা করলে তার লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর জরিমানার বিধান থাকতে হবে। লাভজনক ও সুপ্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের কোম্পানি যাতে সম্পদ ও প্রিমিয়ামের ন্যায্য দাম পায়, সেজন্য উপযুক্ত মূল্যায়ন কাঠামো চালু করতে হবে।
পঞ্চমত, নিরীক্ষা প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) ও ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশকে (আইসিএবি) কঠোর তদারকি করতে হবে। ভুয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরিকারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মকে স্থায়ীভাবে কালো তালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন। আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা ফিরলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটও অনেকটা কেটে যাবে।
ষষ্ঠত, দীর্ঘদিন ধরে দেশে ব্যবসা করা লাভজনক বহুজাতিক কোম্পানি ও বৃহৎ স্থানীয় কনগ্লোমারেটকে বাজারে আনতে কৌশলগত নীতি নিতে হবে। প্রয়োজনে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোডের সুবিধা চালু রাখতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েও যেসব জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোম্পানি স্বেচ্ছায় বাজারে আসতে চায় না, তাদের ওপর আইনের প্রাসঙ্গিক ধারা প্রয়োগ করে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির টেকসই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ ও গতিশীল পুঁজিবাজারের ওপর। ব্যাংক খাতের ওপর চেপে থাকা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা কমাতে এবং শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে পুঁজিবাজারকে সচল করতেই হবে। বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ ও এনবিআরের সমন্বিত সদিচ্ছা, আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন এবং দুর্নীতির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা গেলে তবেই ভালো কোম্পানিগুলো আবার পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহী হবে। তখনই গড়ে উঠবে একটি উন্নত, সুশাসিত ও বৈচিত্র্যময় মূলধন বাজার।



















