সুন্দরবন ঘেঁষে তৈরি ১৮ রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ
সুন্দরবন ঘেঁষে গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ১৮টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে ৩০ দিনের এবং আটটি প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিনের মধ্যে সব স্থাপনা সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত রোববার পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ রিসোর্ট মালিকদের লিখিতভাবে এ নির্দেশ দেন। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও বিধিমালা অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, নিয়মিত মামলাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
রিসোর্টগুলো হচ্ছে– অরণ্যছায়া, অরণ্যবাড়ী, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, সুন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর ‘রিসোর্ট ব্যবসার চাপে সুন্দরবন’ শিরোনামে গণমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। সংবাদে সুন্দরবনের চারপাশে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন একের পর এক রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনা, অবৈধভাবে বনে ও খালে পর্যটক চলাচল, ডলফিন অভয়ারণ্য ঘোষিত ঢাংমারী খাল দিয়ে পর্যটকবাহী ট্রলারের অবাধ যাতায়াত এবং সুন্দরবনের ওপর এসবের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় অনুমোদনহীন রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ দিল পরিবেশ অধিদপ্তর।
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ জানান, সুন্দরবনের ঢাংমারী, কৈলাসগঞ্জ ও বাণিশান্তা এলাকায় ১৮টি রিসোর্ট রয়েছে। এগুলো খুলনা জেলা কার্যালয়ের আওতাধীন এলাকায় হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চিলা, বৈদ্যমারী ও চাঁদপাই বাগেরহাটের মধ্যে পড়ায় ওই রিসোর্টের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তিনি বলেন, অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট নির্মাণ করায় এর আগে ১০টি রিসোর্টকে শোকজ করা হয়। তারা শোকজের জবাব এবং অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু আমাদের চাহিদামতো কোনো কাগজপত্র তারা দিতে পারেননি। এ জন্য গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাদের আবেদন বাতিল করা হয়। গতকাল সব প্রতিষ্ঠানকেই কার্যক্রম বন্ধ করতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।ভ্রমণ গাইড
এ ছাড়া নতুন তৈরি হওয়া আটটি রিসোর্ট সাত দিনের মধ্যে গ্রহণযোগ্য স্থানে স্থানান্তরের জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর চিঠি দেওয়া হয়। তবে তাদের পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হওয়ায় সাত দিনের মধ্যে ওই রিসোর্ট বন্ধ এবং ১৫ দিনের মধ্যে স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন (প্যারাবন) থেকে অবৈধ চিংড়ি ঘের উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর এখন উচ্ছেদ অভিযানের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে। ‘স্ট্রেনদেনিং ক্যাপাসিটি অব এমওইএফসিসি, ডিওই অ্যান্ড বিএফডি ফর ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইমপ্রুভড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের আওতায় এ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে দখল, প্যারাবন উজাড় ও খালে বাঁধ দিয়ে চিংড়ি চাষের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দ্বীপটিতে শুধু ঘের উচ্ছেদ করলেই যে আগের পরিবেশ ফিরবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে পরিবেশবিদদের। তাদের মতে, উচ্ছেদের পাশাপাশি কেটে ফেলা প্যারাবন পুনরুদ্ধার, জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং উচ্ছেদের পর নতুন করে দখল ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা না হলে পুরো উদ্যোগই ব্যর্থ হতে পারে।
নদীগবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে বড় আকারের অভিযান হলে তা আগের উদ্যোগগুলোর চেয়ে কার্যকর হতে পারে। তবে অভিযানের পর সেখানে নজরদারি ব্যবস্থা না থাকলে উচ্ছেদ করা ঘের আবারও দখল হয়ে যেতে পারে। তাই স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখতে বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন। এর আগে গত বুধবার ‘সোনাদিয়ার প্রাণ যায় যায়’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।
জানা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আট বছরে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সোনাদিয়ায় অন্তত ছয় হাজার একর প্যারাবন কেটে ৫০টি চিংড়ি ঘের গড়ে তোলা হয়েছে। ২০১৭ সালে ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সোনাদিয়ার প্রায় ৯ হাজার একর বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা) বরাদ্দ দেওয়ার পর প্যারাবন কাটার মহোৎসব শুরু হয়। ওই সময় সোনাদিয়ার প্যারাবন রক্ষার আইনি কর্তৃত্ব হারায় বন বিভাগ।
গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর মহেশখালীর প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ও সংরক্ষিত বনে চিংড়ি ঘের ও লবণ মাঠ তৈরিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের একজন সচিবসহ ১০ সরকারি কর্মকর্তাকে লিগ্যাল নোটিশ দেয় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)। বেলার আইনজীবী এস হাসানুল বান্নার পাঠানো লিগ্যাল নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ‘সোনাদিয়া দ্বীপে প্যারাবন ধ্বংস করে অন্তত ৫০টি চিংড়ি ঘের তৈরি করা হয়েছে। মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা ও বড় মহেশখালী মৌজায় তৈরি হয়েছে ১৫টি ঘের।’সরকারি সেবা
প্রকল্প পরিচালক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফাহমিদা হক জানান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তরফে সোনাদিয়ার অবৈধ দখল উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। গত ৩ আগস্ট সেই প্রস্তাবে অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সোনাদিয়ার অবৈধ চিংড়ি ঘের উচ্ছেদ অভিযানে নৌবাহিনীর প্রায় চার কোটি টাকা দরকার হবে। এখন এই কাজের জন্য বরাদ্দ রয়েছে দুই কোটি টাকা। এ বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, নৌবাহিনী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বৈঠকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সেক্রেটারি (বাপা) মো. আলমগীর কবির বলেন, সোনাদিয়াকে শুধু অবৈধ ঘেরমুক্ত করলেই হবে না; দ্বীপটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে কোন সংস্থা কীভাবে বনভূমি রক্ষা করবে, কোথায় পুনর্বনায়ন হবে, কোন কোন খাল পুনর্খনন বা বাঁধমুক্ত করা হবে এবং কীভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা হবে– এসব বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
মহেশখালীর ইউএনও ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, সোনাদিয়ায় যাওয়ার একমাত্র বাহন নৌযান। তাই অবৈধ দখল উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।



















