img

ভেনেজুয়েলা ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল হস্তান্তর করবে যুক্তরাষ্ট্রকে: ট্রাম্প

প্রকাশিত :  ০৫:৫২, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬

ভেনেজুয়েলা ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল হস্তান্তর করবে যুক্তরাষ্ট্রকে: ট্রাম্প

ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, বাজারদরে বিক্রি হওয়া এই তেল থেকে প্রাপ্ত অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। তবে ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য কি না, পাশাপাশি এর আইনি কাঠামো ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলা ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন বা ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবে। এই তেল দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের আরোপিত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে স্টোরেজে আটকে ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। ট্রাম্প বলেন, তেল বাজারমূল্যে বিক্রি করা হবে এবং সেই বিক্রির অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, তা তিনি নিজেই তদারক করবেন।

ঘোষণায় ট্রাম্প আরও জানান, পরিকল্পনাটি ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্টোরেজ জাহাজে করে তেল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের আনলোডিং ডকে আনা হবে।

এই ঘোষণার পেছনে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থানকেই মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ ‘পুনরুদ্ধার’ করার কথা বলেন এবং দেশটির জ্বালানি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার জীর্ণ অবকাঠামো সংস্কার ও তেল উত্তোলনে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে প্রস্তুত—যদিও আন্তর্জাতিক আইনে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর কোনো মালিকানা নেই।

বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের শাসনামলে তেল খাত জাতীয়করণ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কোম্পানির সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়। পরে আন্তর্জাতিক সালিশে এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপস যথাক্রমে ১.৬ বিলিয়ন ও ৮.৭ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ পেলেও ভেনেজুয়েলা সরকার সেই অর্থ পরিশোধ করেনি। বর্তমানে শেভরনই একমাত্র বড় মার্কিন তেল কোম্পানি, যা ভেনেজুয়েলায় সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে; তাদের দৈনিক উৎপাদন প্রায় দেড় লাখ ব্যারেল।

ট্রাম্পের ঘোষণার বাস্তব প্রভাব নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা। বিশ্ববাজারে প্রতিদিন তেলের ব্যবহার ১০ কোটির বেশি ব্যারেল, সেখানে ৩–৫ কোটি ব্যারেল একবারে বা স্বল্প সময়ে সরবরাহ হলেও এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে। হিউস্টনের বেকার ইনস্টিটিউটের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মার্ক ফিনলি বলেন, এই তেল কোন সময়সীমার মধ্যে সরবরাহ হবে—তা স্পষ্ট না হলে ঘোষণার গুরুত্ব নির্ধারণ করা কঠিন। তার মতে, এক মাসে হলে এটি ভেনেজুয়েলার প্রায় পুরো উৎপাদনের সমান, কিন্তু এক বছরে ছড়িয়ে পড়লে প্রভাব খুবই সামান্য।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশ্লেষক স্কট মন্টগোমেরির মতে, তেল বিক্রির অর্থ কে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে—এই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন নজির খুবই বিরল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনকে নব্বইয়ের দশকের তিন মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক সক্ষমতার কাছাকাছি নিতে গেলে বিপুল বিনিয়োগ ও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। নরওয়েভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির হিসাবে, উৎপাদন দুই মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিকে তুলতে অন্তত ১১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার।

একসময় বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাত আজ সংকুচিত। যদিও দেশটির হাতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে, বর্তমানে বৈশ্বিক উৎপাদনে এর অবদান এক শতাংশেরও কম। এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের ঘোষণাকে কেউ কেউ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার এটিকে জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন।


অর্থনীতি এর আরও খবর

img

আগামীকালের পুঁজিবাজার: শুরুতে চাপ, শেষভাগে ফিরতে পারে কিছুটা স্থিতিশীলতা

প্রকাশিত :  ১৭:৫৭, ২৬ জুলাই ২০২৬

টানা কয়েক কার্যদিবসের বিক্রিচাপ, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে আগামীকালও পুঁজিবাজারে সতর্ক পরিবেশে লেনদেন শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, দিনের প্রথম ভাগে সূচকের ওপর বিক্রির চাপ থাকলেও শেষার্ধে নির্বাচিত কিছু মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারে ক্রয়াদেশ বাড়লে বাজারে সীমিত পরিসরে কারিগরি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা দেখা যেতে পারে।

বাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দেশের নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্ক মনোভাব তৈরি করেছে। এর প্রভাবে লেনদেনের শুরুতে অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী লোকসান সীমিত রাখতে বিক্রিমুখী হতে পারেন। এতে সূচকের ওপর চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে টানা দরপতনের কারণে কয়েকটি বড় ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। এ সুযোগে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী নির্বাচিত শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়াতে পারেন। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে দিনের শেষ ভাগে সূচকের পতনের গতি কমে এসে বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।

খাতভিত্তিক লেনদেনেও ভিন্নধর্মী চিত্র দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সম্প্রতি ইতিবাচক আর্থিক ফল প্রকাশ করা কয়েকটি ব্যাংক এবং কিছু সাধারণ বীমা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে। অন্যদিকে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি–সংক্রান্ত চাপের কারণে টেক্সটাইল, সিমেন্ট ও ভারী প্রকৌশল খাতের শেয়ারগুলোর ওপর বিক্রির চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ড ও সিরামিক খাতেও সংশোধনের প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, আগামীকাল মোট লেনদেনের পরিমাণও কিছুটা কম থাকতে পারে। কারণ, বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির বিষয়ে আরও স্পষ্ট বার্তার অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে তারা আপাতত সংযত অবস্থান নিতে পারেন।

এ অবস্থায় বাজার বিশ্লেষকদের পরামর্শ, স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতায় আতঙ্কিত হয়ে মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ার কম দামে বিক্রি না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা উচিত। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি এড়িয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

তবে বাজারের গতিপথ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে লেনদেন চলাকালে বিনিয়োগকারীদের আচরণ, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং নতুন কোনো নীতিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সামনে আসে কি না, তার ওপর। তাই আগামীকালের লেনদেনেও সতর্কতা ও বাছাই করে বিনিয়োগের কৌশলই বাজারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠতে পারে।

অর্থনীতি এর আরও খবর