img

শ্রীমঙ্গলের একমাত্র জীবিত ভাষা সৈনিক, যিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত

প্রকাশিত :  ০৯:১৫, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের একমাত্র জীবিত ভাষা সৈনিক, যিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকা। ইতিহাসে এই অঞ্চল বহু রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাক্ষী। এখানকার মাটি, মানুষ ও রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন এক আদর্শবান রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মী—রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী। প্রায় সাত দশক ধরে রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে তাঁর অবদান সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রেরণাদায়ক।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৪০ সালের ১২ এপ্রিল ব্রিটিশ ভারতের আসামের শ্রীমঙ্গল থানার নোয়াগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জমিদার যতীন্দ্র মোহন দত্ত চৌধুরী, মাতা বিন্দুবাসিনী দত্ত চৌধুরী। পৈত্রিক নিবাস ছিল শ্রীহট্ট জেলার ঢাকাদক্ষিনের দত্তরাইল গ্রামে।

শিক্ষাজীবন শুরু শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল থেকে। পরে তিনি মৌলভীবাজার কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও বিকম পাস করেন  এবং পরে বি.এড সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক কর্মজীবনে শ্রীমঙ্গল ভৈরব বাজার হাই স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। কিন্তু রাজনীতির প্রতি প্রবল আগ্রহ এবং সমাজকল্যাণের উদ্দেশ্যে তিনি দ্রুত শিক্ষাজীবন ও চাকরি ত্যাগ করে জনসেবার জন্য বালিশিরা পাহাড় আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। দলীয় প্রধানের নির্দেশক্রমে তিনি চাকরি ত্যাগ করে সার্বক্ষণিক দলের সংগঠক হিসেবে মনোনিবেশ করেন। এই সময় গ্রাম-গঞ্জে দলের সংগঠনকে শক্তিশালী করে তোলেন এবং এটিকে স্থানীয় প্রধান বিরোধী শক্তিশালী দলের রূপ দেন।

এরপর তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা WHO-এর অধীনে হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার মহকুমার কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু রাজনীতির প্রতি নিবেদিত থাকার কারণে চাকরিটি ছেড়ে পুনরায় সার্বক্ষণিক সংগঠক হিসেবে রাজনৈতিক সংগঠনে মনোনিবেশ করেন। 

ভাষা আন্দোলন ও ছাত্রজীবন

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেন। শ্রীমঙ্গল টাউন কমিটির মাঠে ছাত্রদের বিশাল জনসভায় নেতৃত্বদান তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা। যদিও দেশে অসংখ্য ব্যক্তি ভাষা সৈনিক হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেয়েছেন, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত।

ছাত্রজীবনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫৭ সালে ন্যাপ (ভাসানী) গঠিত হলে তাতে যোগ দিয়ে বাম রাজনীতিকে অত্র অঞ্চলে শক্তিশালী করেন।

কমিউনিস্ট পার্টির গোপন সেল ও সহকর্মীরা

পাকিস্তান আমলে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির গোপন সেলের আহবায়ক ছিলেন। এই সেলের অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন যথাক্রমে মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া ও

সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান। এই সেলের মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন এবং শ্রমিক-কৃষক সংগঠনগুলোর সমন্বয় সাধন করা হত।

বালিশিয়া পাহাড় আন্দোলন ও ৬ দফা আন্দোলন

১৯৬৩ সালে শ্রীমঙ্গলে বালিশিয়া পাহাড় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। মোঃ শাহজাহান মিয়ার সঙ্গে তিনি আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। এই আন্দোলন প্রতি বছর শহীদ দিবস পালনের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়।

১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও তিনি পাকিস্তান সরকারের বিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।

১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল: গ্রেফতার ও রাজনৈতিক দমন

১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল, পাকিস্তান ভাঙা তথা “জয়বাংলা” মামলার প্রধান আসামি হিসেবে গ্রেফতার হন। একই সময় ন্যাপ নেতা মোঃ শাহজাহান মিয়া, ছাত্রলীগ নেতা এম এ রহিম ও এস এ মুজিবকেও আটক করা হয়। পাকিস্তান সরকার তাদেরকে মৌলভীবাজার জেলায় প্রেরণ করে।

পরদিন শ্রীমঙ্গলে ন্যাপের উদ্যোগে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন ন্যাপনেত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ও ডাকসুর সাবেক ভিপি ও ন্যাপ নেতা আহমেদুল কবির মুক্তির দাবিতে বক্তব্য রাখেন। হাজার হাজার ন্যাপ, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও সাধারণ মানুষের আন্দোলনের ফলে সরকার তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তান বিরোধী কার্যক্রম

১৯৭১ সালের ১ মার্চ, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের ভাষণ প্রচারিত হলে শ্রীমঙ্গল পৌরসভা থেকে ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, মোঃ শাহজাহান মিয়া ও সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান নেতৃত্বে স্লোগান মিছিল শুরু করেন।

২৪ মার্চ পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। পাকবাহিনী শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করলে তিনি অসংখ্য নেতাকর্মীর সঙ্গে ভারতে আশ্রয় নেন। ভারতের একটি ক্যাম্প পরিচালনা করে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তরুণ ছাত্র-যুবক এবং সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন।

১ এপ্রিল থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে শ্রীমঙ্গলে স্বাধীন বাংলার পতাকা রক্ষা করেন। ৩০ এপ্রিল পাকবাহিনী শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করলেও রাসেন্দ্র দত্ত ও অন্যান্য নেতারা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেন।

ভারত সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা রাখায়, এবং ভারত সরকারের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের কারণে তাকে সম্মানসূচক সার্টিফিকেট প্রদান করে।

চেয়ারম্যান পদকাল ও স্থানীয় উন্নয়ন

১৯৮৩ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনে কোন প্রচারণা বা ব্যক্তিগত খরচ ছাড়াই বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন।

চেয়ারম্যান থাকাকালীন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। স্থানীয়রা জানান, তাঁর তৈরি উন্নয়ন রেকর্ড এখনও কেউ ভাঙতে পারেনি।

সাংবাদিকতা ও প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা

স্বাধীনতার পর শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। কমলেশ ভট্টাচার্য, জহির উদ্দিন আহমেদ, রানা দেবরায়সহ বহু সাংবাদিক শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতায় স্বর্ণযুগের সূচনা করেন। প্রেসক্লাব হয়ে ওঠে সাংবাদিকদের ঐক্যের প্রতীক।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সোভিয়েত সফর

১৯৮০ সালে সোভিয়েত রাশিয়া সরকারের আমন্ত্রণে রাশিয়া সফর করেন। মস্কো, লেনিনগ্রাদ ও উজবেকিস্তানসহ বিভিন্ন প্রজাতন্ত্র ঘুরে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ, কৃষি উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন। দেশে ফিরে তরুণ রাজনীতিক ও কর্মীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি ও অন্যায় বঞ্চনা

উচ্চ রাজনৈতিক ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ অবদান ও পরবর্তী সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর বিশেষ অবদান সত্ত্বেও , ২০১৭ সালে সরকারের যাচাই-বাছাই কমিটিতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত হয়নি, যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ মোঃ আব্দুস শহীদ এমপি  ও কমিটির অন্যান্য কিছু সদস্যের সংকীর্ণ রাজনীতির কারণে।

স্বাস্থ্য ও বর্তমান জীবন

৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সালে মাইল্ড স্ট্রোক এবং ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর  সুস্থ হয়ে শ্রীমঙ্গল শহরের বাসভবনে বসবাস করছেন।

রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী শুধুমাত্র একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি সংগ্রামী, সাহসী সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা ও সংস্কৃতি কর্মী। 

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, সাংবাদিকতা ও সমাজকল্যাণ—সকল ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অম্লান। ভারত সরকারের সম্মানসূচক সার্টিফিকেট প্রাপ্তি, প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা ও স্থানীয় উন্নয়ন—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর দীর্ঘ জীবনকাহিনি মৌলভীবাজার এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অনন্য দলিল।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

উন্নয়নের প্রশ্নে সিলেটি সংসদ সদস্যদের প্রতি এক নাগরিক আহ্বান

প্রকাশিত :  ০৮:২৪, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

কবি ও মাওলানা আবদুল হামিদ মাহবুবের “সিলেটি সংসদ সদস্যদের কাছে খোলা চিঠি” মূলত একটি নাগরিক আবেদন। চিঠিতে ঢাকা-সিলেট সড়ক, রেলপথ, ভূমি অফিস, থানার জনসেবা এবং সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের দুর্ভোগের কথা উঠে এসেছে। জনমত ডটকমে প্রকাশিত লেখাটি সিলেটের জনজীবনের বাস্তব সমস্যাকে সরল ভাষায় সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেছে।

আবদুল হামিদ মাহবুবের চিঠির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এতে অভিযোগ আছে, কিন্তু বিদ্বেষ নেই; সমালোচনা আছে, কিন্তু অসম্মান নেই। তিনি সংসদ সদস্যদের আক্রমণ করেননি; বরং তাঁদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এই ভঙ্গি আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় খুব প্রয়োজন। কারণ উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক সময় আলোচনা দলীয় তর্কে হারিয়ে যায়। অথচ রাস্তা, রেল, বিমানবন্দর, ভূমি অফিস বা থানার সেবা কোনো দলের একক বিষয় নয়; এগুলো সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন।

চিঠির শুরুতেই তিনি সিলেটের সংসদ সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। এরপর অত্যন্ত বাস্তব একটি কথা বলেছেন: যাঁরা বিমানপথে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেন, তাঁরা হয়তো ঢাকা-সিলেট সড়কের প্রকৃত দুর্ভোগ কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন না। এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক শিক্ষা আছে। নীতিনির্ধারক যদি জনগণের ব্যবহৃত পথ ব্যবহার না করেন, তবে মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে কেবল ফাইলের তথ্য হয়ে থাকে। সড়কের গর্ত, ধুলা, যানজট, দীর্ঘ যাত্রা, রাতের ঝুঁকি, অসুস্থ রোগীর দুর্ভোগ, ব্যবসায়ীর সময় নষ্ট, প্রবাসীর বাড়ি ফেরার ক্লান্তি, এসব কাগজে বোঝা যায় না। এগুলো বুঝতে হলে পথে নামতে হয়।

ঢাকা-সিলেট সড়ক নিয়ে সিলেটবাসীর অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু লেখক এখানে কেবল অভিযোগ করেননি; তিনি সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত উদ্যোগের কথা বলেছেন। এটিই সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। সিলেটের উন্নয়ন কোনো এক সংসদ সদস্যের একক প্রচেষ্টায় হবে না। সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, পর্যটন, প্রবাসী সেবা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শিল্পায়ন, সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উন্নয়ন ভাবনা দরকার। সংসদ সদস্যরা যদি দলীয় অবস্থান, এলাকার সীমা ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার হিসাবের বাইরে গিয়ে একটি “সিলেট উন্নয়ন এজেন্ডা” তৈরি করেন, তবে এই চিঠির আহ্বান বাস্তব অর্থ পেতে পারে।

রেলপথ নিয়ে লেখকের উদ্বেগও যথার্থ। সড়ক উন্নয়ন যত জরুরি, রেলের উন্নয়নও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রেল শুধু যাত্রীর বাহন নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবেশ, পর্যটন ও আঞ্চলিক সংযোগের সঙ্গে যুক্ত। ঢাকা-সিলেট রেলপথে উন্নতমানের ট্রেন, নিরাপদ লাইন, নিয়মিত সময়সূচি এবং প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন হলে সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এখানে একটি বাস্তব প্রশ্নও আছে: রেলপথ উন্নয়ন শুধু সংসদ সদস্যদের ইচ্ছার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জাতীয় বাজেট, রেলওয়ে মন্ত্রণালয়, প্রকৌশল পরিকল্পনা, জমি, নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা জড়িত। তাই সংসদ সদস্যদের উচিত হবে শুধু দাবি তোলা নয়, একটি সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করা: কোন কাজ জরুরি, কোন কাজ স্বল্পমেয়াদি, কোনটি দীর্ঘমেয়াদি, কোন মন্ত্রণালয় দায়ী, কত বাজেট লাগবে এবং অগ্রগতি কীভাবে জনগণকে জানানো হবে।

চিঠির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভূমি অফিস ও থানার আচরণ নিয়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এটি অত্যন্ত সাহসী ও প্রয়োজনীয় কথা। উন্নয়ন শুধু বড় সড়ক, সেতু বা ভবন দিয়ে মাপা যায় না। একজন সাধারণ মানুষ জমির নামজারি করতে গিয়ে যদি মাসের পর মাস ঘোরেন, থানায় গিয়ে যদি অপমানিত হন, অফিসে গিয়ে যদি দালাল ছাড়া কাজ না হয়, তবে উন্নয়নের ভাষণ তাঁর কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। লেখক ঠিকই বলেছেন, সংসদ সদস্য হওয়ার আগে অনেকেই এসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। ক্ষমতার আসনে যাওয়ার পর সেই অভিজ্ঞতা ভুলে গেলে জনমানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।

তবে এই জায়গায় আরও একটি দিক যোগ করা দরকার। সংসদ সদস্যদের প্রশাসনের ওপর নৈতিক চাপ তৈরি করার সুযোগ আছে, কিন্তু প্রশাসনিক শুদ্ধি আনতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দরকার। ভূমি অফিসে ডিজিটাল সেবা, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা, সময়সীমা নির্ধারণ, নাগরিক চার্টার বাস্তবায়ন, থানায় আচরণবিধি, স্থানীয় পর্যায়ে সেবা পর্যবেক্ষণ কমিটি, নিয়মিত গণশুনানি, এগুলো ছাড়া শুধু অনুরোধে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তাই চিঠির আহ্বানকে যদি নীতিগত প্রস্তাবে রূপ দেওয়া যায়, তবে তা আরও কার্যকর হবে।

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিয়ে লেখকের পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সিলেটের সঙ্গে প্রবাসী সমাজের সম্পর্ক গভীর। বিমানবন্দর শুধু যাত্রী ওঠানামার জায়গা নয়; এটি আবেগ, অর্থনীতি, পরিবার, স্মৃতি ও প্রবাসী সংযোগের প্রবেশদ্বার। একজন প্রবাসী যখন দেশে ফেরেন, তাঁর সঙ্গে থাকে পরিবার, স্বজন, প্রতিবেশী, প্রত্যাশা ও আবেগ। আবার বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর হয়ে ওঠে বিদায়ের জায়গা। সেখানে যাত্রী হয়তো ভেতরে কিছু সুবিধা পান, কিন্তু যাঁরা বিদায় দিতে বা গ্রহণ করতে আসেন, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত ছাউনি, বসার জায়গা, পরিষ্কার টয়লেট, পানির ব্যবস্থা, বৃষ্টির সময় আশ্রয়, নিরাপদ হাঁটার পথ না থাকলে সেটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদার সঙ্গে যায় না।

লেখক নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে কথা বলেছেন, সেটি অনেক সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। তবে ইতিবাচক সমালোচনার জায়গা থেকে বলা যায়, এই বিষয়গুলো নিয়ে যদি একটি ছোট নাগরিক জরিপ, ছবি, ব্যবহারকারীর মতামত এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর তালিকা তৈরি করা যায়, তাহলে দাবিটি আরও শক্তিশালী হবে। যেমন, কতজন দর্শনার্থী প্রতিদিন বিমানবন্দরে আসেন, কোথায় ছাউনি দরকার, কতগুলো টয়লেট দরকার, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কী সুবিধা দরকার, এসব তথ্যসহ প্রস্তাব দেওয়া হলে কর্তৃপক্ষের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন হবে।

চিঠিটির ভাষা সহজ, সরাসরি এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতানির্ভর। এটি তার বড় গুণ। অনেক সময় উন্নয়ন আলোচনা এমন কারিগরি ভাষায় হয় যে সাধারণ মানুষ তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আবদুল হামিদ মাহবুব সেই পথে যাননি। তিনি এমনভাবে বলেছেন, যাতে একজন সাধারণ পাঠকও বুঝতে পারেন, সমস্যাটি তাঁর নিজের জীবনেরও অংশ। এই ধরনের লেখা জনমত গঠনে কার্যকর হতে পারে।

তবে একটি সীমাবদ্ধতা হলো, চিঠিটি সমস্যার তালিকা দিয়েছে, কিন্তু অগ্রাধিকারের ক্রম স্পষ্ট করেনি। সব সমস্যা জরুরি হলেও সব কাজ একসঙ্গে করা যায় না। সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, প্রশাসনিক সেবা, সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনটি তাৎক্ষণিক, কোনটি ছয় মাসের মধ্যে সম্ভব, কোনটি দুই বছরের পরিকল্পনা, আর কোনটি জাতীয় প্রকল্পের অংশ, এভাবে ভাগ করলে চিঠিটি আরও নীতিনির্ধারণী গুরুত্ব পেত। যেমন, বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের জন্য ছাউনি, বসার জায়গা ও টয়লেট দ্রুত করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু ঢাকা-সিলেট ডাবল রেললাইন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই পার্থক্য তুলে ধরলে দাবি আরও বাস্তবসম্মত হয়।

আরেকটি বিষয় হলো, সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, সড়ক বিভাগ, রেলওয়ে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী সংগঠন, ব্যবসায়ী সমাজ এবং নাগরিক প্রতিনিধিদেরও যুক্ত করা দরকার। উন্নয়ন তখনই স্থায়ী হয়, যখন তা ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হয়। সংসদ সদস্যরা উদ্যোগ নিতে পারেন, কিন্তু নাগরিক সমাজকে নজরদারি করতে হবে, গণমাধ্যমকে নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে, আর প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হবে।

এই চিঠির আরেকটি মূল্য হলো, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কেবল বড় ঘোষণার নাম নয়। উন্নয়ন মানে একজন বৃদ্ধ মানুষের বিমানবন্দরে বসার জায়গা পাওয়া। একজন নারী দর্শনার্থীর নিরাপদ ও পরিষ্কার টয়লেট পাওয়া। একজন রোগীর ঢাকা যেতে কম কষ্ট হওয়া। একজন সাধারণ মানুষের ভূমি অফিসে অপমানিত না হওয়া। একজন নাগরিকের থানায় গিয়ে ন্যায্য আচরণ পাওয়া। এগুলো ছোট বিষয় মনে হলেও আসলে এগুলোই রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক নির্ধারণ করে।

সিলেটের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে আবদুল হামিদ মাহবুবের খোলা চিঠি তাই কেবল একটি চিঠি নয়; এটি এক ধরনের নাগরিক স্মারক। এতে বলা হয়েছে, ক্ষমতা মানুষের সেবা করার সুযোগ, আরাম-আয়েশের লাইসেন্স নয়। এই কথাটি শুধু সিলেট নয়, বাংলাদেশের সব নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য প্রযোজ্য।

পরিশেষে বলা যায়, লেখাটি ইতিবাচক কারণ এটি হতাশা ছড়ায় না; বরং দায়িত্ববোধ জাগায়। এটি আক্রমণাত্মক নয়; বরং জাগরণমূলক। এটি দলীয় নয়; বরং জনস্বার্থকেন্দ্রিক। তবে এই আহ্বানকে আরও কার্যকর করতে হলে নাগরিকদেরও সংগঠিতভাবে তথ্য, প্রমাণ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক দাবি সামনে আনতে হবে। সংসদ সদস্যদের উচিত হবে এই চিঠিকে ব্যক্তিগত সমালোচনা হিসেবে না দেখে জনমতের একটি সৎ প্রতিধ্বনি হিসেবে গ্রহণ করা।

সিলেটবাসীর প্রত্যাশা খুব অস্বাভাবিক নয়। তাঁরা নিরাপদ সড়ক চান, আধুনিক রেল চান, সম্মানজনক বিমানবন্দর চান, জনবান্ধব অফিস চান, মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক সেবা চান। একজন কবি সেই কথাই সহজ ভাষায় বলেছেন। এখন দায়িত্ব তাঁদের, যাঁদের হাতে জনগণ কথা বলার ম্যান্ডেট তুলে দিয়েছে।

----------

এ এইচ এম. বজলুর রহমান, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, তথ্যের অখণ্ডতা ও ডিজিটাল গণতন্ত্রবিষয়ক নীতি-পরামর্শক,                                                                                  বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর


সিলেটের খবর এর আরও খবর