img

ভাষা আন্দোলনে শ্রীমঙ্গল: ইতিহাস, সংগ্রাম ও স্মৃতির আলেখ্য

প্রকাশিত :  ১১:২১, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভাষা আন্দোলনে শ্রীমঙ্গল: ইতিহাস, সংগ্রাম ও স্মৃতির আলেখ্য

সংগ্রাম দত্ত: পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম গণপরিষদের অধিবেশন বসেছিল - ১৯৪৮ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি। তাতে গণপরিষদে কার্যক্রমে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাও যেন ব্যবহৃত হতে পারে - এমন এক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

মি. দত্তের যুক্তি ছিল - পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষ লোকের মধ্যে ৪ কোটিরও বেশি লোকের ভাষা বাংলা - অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাই বাংলা। তাই বাংলাকে পাকিস্তানের একটি প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে দেখা উচিত নয়, বাংলারও হওয়া উচিত অন্যতম রাষ্ট্রভাষা।

কিন্তু মি. দত্তের এ সংশোধনীর প্রস্তাব গণপরিষদে টেকেনি। এমনকি গণপরিষদের বাঙালি সদস্যরাও সংসদীয় দলের আপত্তির কারণে তাকে সমর্থন করতে পারেননি।

এর প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্ররা ক্লাস বর্জন ও ধর্মঘট করে। ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলায় পালিত হয় \'ভাষা দিবস\'।

\'৪৮ সালের এপ্রিল ৮ সালের এপ্রিল মাসে পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক সভায় প্রাদেশিক সরকারের কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তী ৩ বছর পর, মার্চ মাসে সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দিবস পালিত হয়। আর এই দিবস পালনে শ্রীমঙ্গল থানার ভিক্টোরিয়া হাইস্কুলের ছাত্ররা শ্রীমঙ্গলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোকেরাও ছাত্রদের রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আয়েজিত মিছিল ও মিটিং-এ সাহায্য- সহযোগিতা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রদান করেন। ছাত্রদের মিছিল-মিটিং-এব নেতৃত্ব দেন যোগেন্দ্র দত্ত , রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, বিরাজ কুসুম চৌধুরী, অখিল চন্দ্র ধর, শ্যামল সেনগুপ্ত, অচ্যুত কুমার দেব, ডাঃ ফজলুল হক, মোঃ মছদ্দর আলী, সৈয়দ মতিউর রহমান প্রমুখ ছাত্র নেতা। তাদের সমর্থন জানান মুসলিম লীগের মোঃ ইছরাইল মিয়া, কমিউনিষ্ট পার্টি নেতা শ্রী সূর্য মনি দেব, অজিত চৌধুরী, কে বি দেব চৌধুরী (ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী), বিমল জ্যোতি চৌধুরী প্রমুখ।

\'৪৮-এর সেপ্টেম্বর-এ জিন্নাহর মৃত্যু হলে খাজা নাজিমউদ্দিন গভর্নর জেনারেল পদে অভিষিক্ত হলেও বাংলা ভাষা-ভাষী জনগণের স্বার্থে কোন কাজ করার প্রয়াসী ছিলেন না।

\'৪৯ সালের ২৭ নবেম্বর তৎকালীন ডাকসু নেতৃবৃন্দ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে স্মারকলিপি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের নিকট প্রদান করেন। কিন্তু এ দাবি বাস্তবায়িত না হলে বাংলার জনগণ বিশেষত ছাত্র সমাজ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যা পরবর্তীতে রক্তক্ষয়ী বৈপ্লবিক আকার নিয়ে \'৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতসহ নাম জানা-অজানা অনেকে প্রাণ হারান। ছাত্র সমাজের রক্তে রাঙা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও রাজপথ। এই ছাত্রদের উপর পাকিস্তানের শাসকচক্রের নির্দেশে পুলিশের গুলিতে নিহত- আহতদের স্মরণে সারাদেশের ছাত্র সমাজ জীবনপন মারমুখী সংগ্রামে নেমে পড়েন।

এ সংগ্রামে শ্রীমঙ্গলের ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ধানার ছাত্রছাত্রীদের সমবেত করে বিপ্লবী চেতনায় উদ্দীপিত নেতাকর্মীরা এর প্রতিবাদে সারা শ্রীমঙ্গল শহরে পোস্টারিং করে, মিছিলে মিছিলে শহর মুখরিত হয়ে ওঠে, মিছিলের ভাষা ছিল রফিক, জব্বার, বরকত, সালামের রক্ত মুছে ফেলা শক্ত, রক্তের বদলে রক্ত চাই, খুনের বদলে খুন চাই, বাংলার কুসন্তান নূরুল আমিনের ফাঁসি চাই, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি মানতে হবে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই নইলে এবার রক্ষা নাই, ছাত্রদের রক্তে রাজপথ রাঙা কেন জুলুম শাহী জবাব চাই ইত্যাদি। মিছিলকে সর্বতোভাবে সমর্থন করে এলাকার হিন্দু-মুসলিম-আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা ঘর থেকে রাস্তায় নেমে পড়ে। শ্রীমঙ্গল পৌরসভা মাঠে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার - উপস্থিতিতে একটি বিশাল জনসভা সৈয়দ মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র হত্যার বিরুদ্ধে ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বক্তব্য রাখেন রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, মোঃ শাহজাহান, অখিল চন্দ্র ধর, সাজ্জাদুর রহমান, বলাই ভট্টাচার্য প্রমুখ নেতা। সভায় বক্তারা নূরুল আমিনের ফাঁসি ও হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের মাতৃভাষা বাংলাকে অবিলম্বে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা দেবার জোর দাবি জানান।

১৯৫৪ সালে ভাষা সমস্যাকে অন্যতম ইস্যু কবে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে এবং ছাত্র হত্যা ও ভাষা আন্দোলন দাবিয়ে রাখার কারণে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ভবাডুবি ঘটে। পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার জনগণের আন্দোলনের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে পাক সরকার \'৫৬ সালে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দান করে।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে রফিক, জব্বার, বরকত, সালাম ও \'৬৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা কৃষক আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত গণু ও সালিকের স্মৃতিকে, স্মরণীয়-বরণীয় করে তুলতে \'৬৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারির ক\'দিন পূর্বে শহীদ সালিকের ফুফাত ভাই ন্যাপনেতা মোঃ শাহজাহান, সাইয়িদ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ মুয়ীজুর রহমান, ছাত্র ইউনিয়নের এককালীন প্রতিষ্ঠাতা জিএস পরে আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ ইলিয়াস, মোঃ আলতাফুর রহমান চৌধুরী, ছাত্রলীগ নেতা এম এ রহিম, মোঃ শামসুদ্দিন, বিশিষ্ট প্লেনটার মোখলেছুর রহমানের প্রচেষ্টায় শ্রীমঙ্গলে পৌর টাউন কমিটির মাঠে মুসলিম লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রথম শহীদ মিনার স্থাপিত হয়। এই শহীদ মিনারই শ্রীমঙ্গলের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসাবে পরিচিত এবং প্রতিবছরই ১৯ ফেব্রুয়ারি, শহীদ দিবস, জাতীয় দিবস, বুদ্ধিজীবী দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি পালন উপলক্ষে শ্রীমঙ্গল থানার সব ক\'টি সংগঠন এখানে শহীদী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে পুষ্পস্তবকে সাজিয়ে রাখে শহীদ মিনার বেদীটি।

ভাষা আন্দোলনের জাতীয় ইতিহাসে শ্রীমঙ্গলের অবদান তাই কেবল স্থানীয় স্মৃতির বিষয় নয়— এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক অধিকার ও স্বাধীনতার চেতনার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

উল্লেখ্য যে, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ছিলেন শ্রীমঙ্গলে ভাষা আন্দোলনের সময় আন্দোলন‑সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী একমাত্র ভাষাসৈনিক, যিনি এখনও জীবিত। তিনি সহ অন্যান্য অবদানশীল ব্যক্তিরা ভাষা আন্দোলনে কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেও সমাজ বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো প্রত্যাশিত স্বীকৃতি লাভ করেননি— যা ইতিহাসসচেতন মহলের জন্য গভীর ভাবনার বিষয় হয়ে রয়েছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

উন্নয়নের প্রশ্নে সিলেটি সংসদ সদস্যদের প্রতি এক নাগরিক আহ্বান

প্রকাশিত :  ০৮:২৪, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

কবি ও মাওলানা আবদুল হামিদ মাহবুবের “সিলেটি সংসদ সদস্যদের কাছে খোলা চিঠি” মূলত একটি নাগরিক আবেদন। চিঠিতে ঢাকা-সিলেট সড়ক, রেলপথ, ভূমি অফিস, থানার জনসেবা এবং সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের দুর্ভোগের কথা উঠে এসেছে। জনমত ডটকমে প্রকাশিত লেখাটি সিলেটের জনজীবনের বাস্তব সমস্যাকে সরল ভাষায় সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেছে।

আবদুল হামিদ মাহবুবের চিঠির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এতে অভিযোগ আছে, কিন্তু বিদ্বেষ নেই; সমালোচনা আছে, কিন্তু অসম্মান নেই। তিনি সংসদ সদস্যদের আক্রমণ করেননি; বরং তাঁদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এই ভঙ্গি আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় খুব প্রয়োজন। কারণ উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক সময় আলোচনা দলীয় তর্কে হারিয়ে যায়। অথচ রাস্তা, রেল, বিমানবন্দর, ভূমি অফিস বা থানার সেবা কোনো দলের একক বিষয় নয়; এগুলো সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন।

চিঠির শুরুতেই তিনি সিলেটের সংসদ সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। এরপর অত্যন্ত বাস্তব একটি কথা বলেছেন: যাঁরা বিমানপথে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেন, তাঁরা হয়তো ঢাকা-সিলেট সড়কের প্রকৃত দুর্ভোগ কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন না। এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক শিক্ষা আছে। নীতিনির্ধারক যদি জনগণের ব্যবহৃত পথ ব্যবহার না করেন, তবে মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে কেবল ফাইলের তথ্য হয়ে থাকে। সড়কের গর্ত, ধুলা, যানজট, দীর্ঘ যাত্রা, রাতের ঝুঁকি, অসুস্থ রোগীর দুর্ভোগ, ব্যবসায়ীর সময় নষ্ট, প্রবাসীর বাড়ি ফেরার ক্লান্তি, এসব কাগজে বোঝা যায় না। এগুলো বুঝতে হলে পথে নামতে হয়।

ঢাকা-সিলেট সড়ক নিয়ে সিলেটবাসীর অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু লেখক এখানে কেবল অভিযোগ করেননি; তিনি সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত উদ্যোগের কথা বলেছেন। এটিই সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। সিলেটের উন্নয়ন কোনো এক সংসদ সদস্যের একক প্রচেষ্টায় হবে না। সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, পর্যটন, প্রবাসী সেবা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শিল্পায়ন, সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উন্নয়ন ভাবনা দরকার। সংসদ সদস্যরা যদি দলীয় অবস্থান, এলাকার সীমা ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার হিসাবের বাইরে গিয়ে একটি “সিলেট উন্নয়ন এজেন্ডা” তৈরি করেন, তবে এই চিঠির আহ্বান বাস্তব অর্থ পেতে পারে।

রেলপথ নিয়ে লেখকের উদ্বেগও যথার্থ। সড়ক উন্নয়ন যত জরুরি, রেলের উন্নয়নও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রেল শুধু যাত্রীর বাহন নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবেশ, পর্যটন ও আঞ্চলিক সংযোগের সঙ্গে যুক্ত। ঢাকা-সিলেট রেলপথে উন্নতমানের ট্রেন, নিরাপদ লাইন, নিয়মিত সময়সূচি এবং প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন হলে সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এখানে একটি বাস্তব প্রশ্নও আছে: রেলপথ উন্নয়ন শুধু সংসদ সদস্যদের ইচ্ছার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জাতীয় বাজেট, রেলওয়ে মন্ত্রণালয়, প্রকৌশল পরিকল্পনা, জমি, নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা জড়িত। তাই সংসদ সদস্যদের উচিত হবে শুধু দাবি তোলা নয়, একটি সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করা: কোন কাজ জরুরি, কোন কাজ স্বল্পমেয়াদি, কোনটি দীর্ঘমেয়াদি, কোন মন্ত্রণালয় দায়ী, কত বাজেট লাগবে এবং অগ্রগতি কীভাবে জনগণকে জানানো হবে।

চিঠির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভূমি অফিস ও থানার আচরণ নিয়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এটি অত্যন্ত সাহসী ও প্রয়োজনীয় কথা। উন্নয়ন শুধু বড় সড়ক, সেতু বা ভবন দিয়ে মাপা যায় না। একজন সাধারণ মানুষ জমির নামজারি করতে গিয়ে যদি মাসের পর মাস ঘোরেন, থানায় গিয়ে যদি অপমানিত হন, অফিসে গিয়ে যদি দালাল ছাড়া কাজ না হয়, তবে উন্নয়নের ভাষণ তাঁর কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। লেখক ঠিকই বলেছেন, সংসদ সদস্য হওয়ার আগে অনেকেই এসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। ক্ষমতার আসনে যাওয়ার পর সেই অভিজ্ঞতা ভুলে গেলে জনমানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।

তবে এই জায়গায় আরও একটি দিক যোগ করা দরকার। সংসদ সদস্যদের প্রশাসনের ওপর নৈতিক চাপ তৈরি করার সুযোগ আছে, কিন্তু প্রশাসনিক শুদ্ধি আনতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দরকার। ভূমি অফিসে ডিজিটাল সেবা, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা, সময়সীমা নির্ধারণ, নাগরিক চার্টার বাস্তবায়ন, থানায় আচরণবিধি, স্থানীয় পর্যায়ে সেবা পর্যবেক্ষণ কমিটি, নিয়মিত গণশুনানি, এগুলো ছাড়া শুধু অনুরোধে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তাই চিঠির আহ্বানকে যদি নীতিগত প্রস্তাবে রূপ দেওয়া যায়, তবে তা আরও কার্যকর হবে।

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিয়ে লেখকের পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সিলেটের সঙ্গে প্রবাসী সমাজের সম্পর্ক গভীর। বিমানবন্দর শুধু যাত্রী ওঠানামার জায়গা নয়; এটি আবেগ, অর্থনীতি, পরিবার, স্মৃতি ও প্রবাসী সংযোগের প্রবেশদ্বার। একজন প্রবাসী যখন দেশে ফেরেন, তাঁর সঙ্গে থাকে পরিবার, স্বজন, প্রতিবেশী, প্রত্যাশা ও আবেগ। আবার বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর হয়ে ওঠে বিদায়ের জায়গা। সেখানে যাত্রী হয়তো ভেতরে কিছু সুবিধা পান, কিন্তু যাঁরা বিদায় দিতে বা গ্রহণ করতে আসেন, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত ছাউনি, বসার জায়গা, পরিষ্কার টয়লেট, পানির ব্যবস্থা, বৃষ্টির সময় আশ্রয়, নিরাপদ হাঁটার পথ না থাকলে সেটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদার সঙ্গে যায় না।

লেখক নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে কথা বলেছেন, সেটি অনেক সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। তবে ইতিবাচক সমালোচনার জায়গা থেকে বলা যায়, এই বিষয়গুলো নিয়ে যদি একটি ছোট নাগরিক জরিপ, ছবি, ব্যবহারকারীর মতামত এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর তালিকা তৈরি করা যায়, তাহলে দাবিটি আরও শক্তিশালী হবে। যেমন, কতজন দর্শনার্থী প্রতিদিন বিমানবন্দরে আসেন, কোথায় ছাউনি দরকার, কতগুলো টয়লেট দরকার, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কী সুবিধা দরকার, এসব তথ্যসহ প্রস্তাব দেওয়া হলে কর্তৃপক্ষের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন হবে।

চিঠিটির ভাষা সহজ, সরাসরি এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতানির্ভর। এটি তার বড় গুণ। অনেক সময় উন্নয়ন আলোচনা এমন কারিগরি ভাষায় হয় যে সাধারণ মানুষ তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আবদুল হামিদ মাহবুব সেই পথে যাননি। তিনি এমনভাবে বলেছেন, যাতে একজন সাধারণ পাঠকও বুঝতে পারেন, সমস্যাটি তাঁর নিজের জীবনেরও অংশ। এই ধরনের লেখা জনমত গঠনে কার্যকর হতে পারে।

তবে একটি সীমাবদ্ধতা হলো, চিঠিটি সমস্যার তালিকা দিয়েছে, কিন্তু অগ্রাধিকারের ক্রম স্পষ্ট করেনি। সব সমস্যা জরুরি হলেও সব কাজ একসঙ্গে করা যায় না। সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, প্রশাসনিক সেবা, সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনটি তাৎক্ষণিক, কোনটি ছয় মাসের মধ্যে সম্ভব, কোনটি দুই বছরের পরিকল্পনা, আর কোনটি জাতীয় প্রকল্পের অংশ, এভাবে ভাগ করলে চিঠিটি আরও নীতিনির্ধারণী গুরুত্ব পেত। যেমন, বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের জন্য ছাউনি, বসার জায়গা ও টয়লেট দ্রুত করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু ঢাকা-সিলেট ডাবল রেললাইন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই পার্থক্য তুলে ধরলে দাবি আরও বাস্তবসম্মত হয়।

আরেকটি বিষয় হলো, সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, সড়ক বিভাগ, রেলওয়ে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী সংগঠন, ব্যবসায়ী সমাজ এবং নাগরিক প্রতিনিধিদেরও যুক্ত করা দরকার। উন্নয়ন তখনই স্থায়ী হয়, যখন তা ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হয়। সংসদ সদস্যরা উদ্যোগ নিতে পারেন, কিন্তু নাগরিক সমাজকে নজরদারি করতে হবে, গণমাধ্যমকে নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে, আর প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হবে।

এই চিঠির আরেকটি মূল্য হলো, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কেবল বড় ঘোষণার নাম নয়। উন্নয়ন মানে একজন বৃদ্ধ মানুষের বিমানবন্দরে বসার জায়গা পাওয়া। একজন নারী দর্শনার্থীর নিরাপদ ও পরিষ্কার টয়লেট পাওয়া। একজন রোগীর ঢাকা যেতে কম কষ্ট হওয়া। একজন সাধারণ মানুষের ভূমি অফিসে অপমানিত না হওয়া। একজন নাগরিকের থানায় গিয়ে ন্যায্য আচরণ পাওয়া। এগুলো ছোট বিষয় মনে হলেও আসলে এগুলোই রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক নির্ধারণ করে।

সিলেটের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে আবদুল হামিদ মাহবুবের খোলা চিঠি তাই কেবল একটি চিঠি নয়; এটি এক ধরনের নাগরিক স্মারক। এতে বলা হয়েছে, ক্ষমতা মানুষের সেবা করার সুযোগ, আরাম-আয়েশের লাইসেন্স নয়। এই কথাটি শুধু সিলেট নয়, বাংলাদেশের সব নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য প্রযোজ্য।

পরিশেষে বলা যায়, লেখাটি ইতিবাচক কারণ এটি হতাশা ছড়ায় না; বরং দায়িত্ববোধ জাগায়। এটি আক্রমণাত্মক নয়; বরং জাগরণমূলক। এটি দলীয় নয়; বরং জনস্বার্থকেন্দ্রিক। তবে এই আহ্বানকে আরও কার্যকর করতে হলে নাগরিকদেরও সংগঠিতভাবে তথ্য, প্রমাণ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক দাবি সামনে আনতে হবে। সংসদ সদস্যদের উচিত হবে এই চিঠিকে ব্যক্তিগত সমালোচনা হিসেবে না দেখে জনমতের একটি সৎ প্রতিধ্বনি হিসেবে গ্রহণ করা।

সিলেটবাসীর প্রত্যাশা খুব অস্বাভাবিক নয়। তাঁরা নিরাপদ সড়ক চান, আধুনিক রেল চান, সম্মানজনক বিমানবন্দর চান, জনবান্ধব অফিস চান, মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক সেবা চান। একজন কবি সেই কথাই সহজ ভাষায় বলেছেন। এখন দায়িত্ব তাঁদের, যাঁদের হাতে জনগণ কথা বলার ম্যান্ডেট তুলে দিয়েছে।

----------

এ এইচ এম. বজলুর রহমান, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, তথ্যের অখণ্ডতা ও ডিজিটাল গণতন্ত্রবিষয়ক নীতি-পরামর্শক,                                                                                  বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর


সিলেটের খবর এর আরও খবর