img

শ্রীমঙ্গলে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অবিস্ফোরিত মর্টার শেল উদ্ধার

প্রকাশিত :  ০৫:২২, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অবিস্ফোরিত মর্টার শেল উদ্ধার
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের দুর্গানগর গ্রামে খাল খননের সময় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি অবিস্ফোরিত মর্টার শেল উদ্ধার করা হয়েছে। পরে বাংলাদেশ পুলিশ-এর বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট সেটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করে সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সক্ষম হয়।

সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে স্থানীয় কৃষক শহিদ মিয়া বাড়ির পাশের একটি ড্রেন (খাল) খননের সময় মাটির নিচে লোহার মতো একটি ভারী ধাতব বস্তু দেখতে পান। অস্বাভাবিক বস্তুটি দেখে সন্দেহ হলে তিনি আশপাশের লোকজনকে জানান। বস্তুটি বোমা, লঞ্চার কিংবা মাইন হতে পারে—এমন আশঙ্কায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যরা এলাকা ঘিরে ফেলেন এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে নির্দেশ দেন। নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

শ্রীমঙ্গল থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. আব্দুর রাজ্জাক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সংবাদ পাওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থল নিয়ন্ত্রণে নেয়। সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীমঙ্গল সার্কেল) ওয়াহিদুজ্জামান রাজু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করেন।

এ সময় স্থানীয় এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা বস্তুটি প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করে সেটিকে মর্টার শেলের অংশ হিসেবে শনাক্ত করেন এবং পুলিশকে অবহিত করেন। পরবর্তীতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর বোম ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়।

দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে রাত আটটার দিকে বিশেষজ্ঞ দলটি মর্টার শেলটি সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে।

সহকারী পুলিশ সুপার ওয়াহিদুজ্জামান রাজু বলেন, “খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করি। পরে বোম ডিসপোজাল ইউনিট পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রাত আটটার দিকে শেলটি নিষ্ক্রিয় করে।”

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধার হওয়া গোলাবারুদটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অবিস্ফোরিত মর্টার শেল। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর এমন বিপজ্জনক যুদ্ধাস্ত্রের সন্ধান মিললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও পেশাদার পদক্ষেপে পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে। ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দেয়—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কখনও কখনও মাটির গভীরেও লুকিয়ে থাকে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে তিলানাগ ঈগলের রাজকীয় সকালের ভোজ, ক্যামেরাবন্দি বিরল মুহূর্ত

প্রকাশিত :  ১৮:০০, ২৪ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:৫৯, ২৪ জুন ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: চৈত্রের কাঠফাটা রোদ। শ্রীমঙ্গলের সবুজে ঘেরা এক চা বাগান। হঠাৎ চা–গাছের আড়াল থেকে ডানা মেলে আকাশে উড়াল দেয় একটি তিলানাগ ঈগল। তার শক্ত পায়ের নখরে ধরা একটি দাঁড়াশ সাপ। সাপটির মাথা নেই, তবে লেজ তখনো কাঁপছে। কিছু দূরে একটি ছায়াঘেরা গাছে গিয়ে বসে পাখিটি। মিনিটখানেকের মধ্যেই শেষ হয় সকালের আহার। তারপর আবার ডানা মেলে মিলিয়ে যায় বনের গভীরে।

প্রকৃতির এই বিরল মুহূর্তের সাক্ষী হন হবিগঞ্জের ডেন্টাল সার্জন ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ডা. এসএস আল আমিন সুমন। সম্প্রতি অন্য একটি পাখির খোঁজে তিনি শ্রীমঙ্গলে গিয়েছিলেন। পথে একটি চা বাগানের কাছে গাড়ি থামাতেই চোখে পড়ে তিলানাগ ঈগলের শিকার ও আহারের দৃশ্য। সুযোগ হাতছাড়া না করে ক্যামেরাবন্দি করেন কয়েকটি ছবি।

ছবিটি তুলেছেন হবিগঞ্জের ডেন্টাল সার্জন ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ডা. এসএস আল আমিন সুমন।

ডা. সুমন গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “তিলানাগ ঈগল সাধারণত সাপ শিকার করার পর প্রথমেই ঘাড়ের কাছ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এতে পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকি থাকে না। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা দাঁড়াশ সাপের বিচ্ছিন্ন মাথাও দেখতে পাই।”

তিনি বলেন, “যে পাখির খোঁজে গিয়েছিলাম, সেটির দেখা পাইনি। তবে তিলানাগ ঈগলের এই অভিজাত সকালের আহার দেখা কম প্রাপ্তি নয়।”

প্রকৃতির দক্ষ শিকারি

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, তিলানাগ ঈগল (Spilornis cheela) প্রকৃতির অন্যতম দক্ষ শিকারি। দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে উঁচু ডালে বসে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। শিকার চোখে পড়লেই দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বিষধর চন্দ্রবোড়াসহ বিভিন্ন ধরনের সাপ এদের প্রধান শিকার। এ ছাড়া গিরগিটি, টিকটিকি, উভচর প্রাণী, ছোট স্তন্যপায়ী এবং সুযোগ পেলে মাছ ও ছোট পাখিও শিকার করে। এ কারণে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তিলানাগ ঈগল। অনেক বিশেষজ্ঞ একে বন–প্রকৃতির ‘নীরব প্রহরী’ বলেও উল্লেখ করেন।

বিস্তৃত আবাস, রাজকীয় উপস্থিতি

মধ্যম আকৃতির এই শিকারি পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Spilornis cheela। ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বনভূমিতে এর বিচরণ রয়েছে। বিভিন্ন দেশে এদের ২১টি উপপ্রজাতির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

বড় মাথা, খাড়া ঝুঁটি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, হলুদ ঠোঁট এবং শক্ত আঁশযুক্ত পা তিলানাগ ঈগলকে সহজেই আলাদা করে চেনায়। বিস্তৃত ডানা মেলে বনাঞ্চলের আকাশে এদের রাজকীয় উড়াউড়ি এবং কর্ণভেদী ডাক দূর থেকেই নজর কাড়ে।

তাইওয়ানে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের শুরুতে প্রায় ৯৮ শতাংশ সময় এরা গাছের ডালে বসে কাটায়। দীর্ঘ সময় চারপাশ পর্যবেক্ষণ করার পর সুযোগ বুঝে শিকার ধরে।

কমছে দেখা মেলার হার

একসময় দেশের বনাঞ্চলে তিলানাগ ঈগলের উপস্থিতি ছিল বেশ সাধারণ। তবে বন ধ্বংস ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় এখন এদের সংখ্যা কমছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডব্লিউসিএস বাংলাদেশের সাবেক সমন্বয়কারী সামিউল মোহসেনিন বলেন, “সিলেট অঞ্চলের বনগুলো দিন দিন অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে তিলানাগ ঈগলসহ অনেক বন্যপ্রাণী অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।”

শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের সেই সকালের দৃশ্য তাই শুধু একটি শিকারের গল্প নয়; এটি প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মেরও এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। এক প্রাণীর মৃত্যু আরেক প্রাণীর বেঁচে থাকার অবলম্বন। দাঁড়াশ সাপকে শিকার করে তিলানাগ ঈগলের সেই সকালের ভোজ যেন বনের নিঃশব্দ জীবনচক্রেরই এক জীবন্ত দলিল।



সিলেটের খবর এর আরও খবর