img

একই কায়দায় দিনদুপুরে বার বার ছিনতাই, সিলেট নগরজুড়ে আতঙ্ক

প্রকাশিত :  ১৯:৩৮, ০৬ মার্চ ২০২৬

একই কায়দায় দিনদুপুরে বার বার ছিনতাই, সিলেট নগরজুড়ে আতঙ্ক

মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে সিলেট নগরে চাঞ্চল্যকর দুটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। দুটি ঘটনাই ঘটেছে প্রকাশ্যে দিনদুপুরে। দুটরি সিটিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে। তবে এ দুটি ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সবশেষ বৃহস্পতিবার সকালে সাগরদিঘিরে পাড় এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। যদিও পুলিশ বলছে, ছিনতাই নয়, এটি ছিনতাই চেষ্টা ছিলো। ছিনতাইকারীরা কিছু নিয়ে যেতে পারেনি।

এরআগে ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এ ছিনতাইয়ের ঘটনারও সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়েছিলো। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। বৃহস্পতিবার সাগরদিঘির পাড়ের ঘটনায়ও শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ফলে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক মদদ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

যদিও শুক্রবার খোদ শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, যিনি সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্যও, তিনি এসব ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে নির্দেশ দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে মহানগর পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে এ দুটি ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

সাগরিদিঘির পাড়ের ছিনতাইয়ের ঘটনার ব্যাপারে শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টায় সিলেট কতোয়ালি থানার ওসি খান মোহাম্মদ মাঈনুল জাকির বলেন, সারিদিঘির পাড়ের ঘটনা শোনার পর থেকেই আমি পেছনে লেগে আছি। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। অবশ্যই তাদের ধরা পড়তে হবে।

তিনি বলেন, যে নারী আক্রান্ত হয়েছেন তার সাথে আমরা যোগাযোগ করেছি। তিনি জানিয়েছেন, ছিনতাইকারীরা কিছু নিতে পারেনি। তাই তিনি মামলা করবেন না। তবু আমরা ছিনতাইকারীদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছি।

নগরে ছিনতাই বাড়ছে কী না এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ছিনতাই এখন অনেক কমেছে। কারণ পুলিশ খুব কঠোর অবস্থানে। আমি এখানে যোগ দেওয়ার পর থেকে অনেকগুলো ছিনতাইকারী ধরেছি। সাগরদিঘির পাড়ের এগুলা যে কোথা থেকে এলা! তবে তারা ছাড় পাবে না। আমার থানা এলাকায় ছিনতাইকারী বলতে কিছু থাকবে না।

বৃহস্পতিবার এ ছিনতাইয়ের ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ শুক্রবার অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে।

ফুটেজে দেখা যায়, সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক নারীকে পালসার মোটরসাইকেল করে আসা দুই যুবক ঘেরাও করে। যুবকদের হাতে ছিলো দেশিয় অস্ত্র। তারা ওই নারীর মোবাইল ফোন, ব্যাগ ও স্বর্ণালঙ্কার ছিনতাই করার চেষ্টা করে তারা।

ফুটেজে আরও দেখা যায়, ওই নারী ব্যাগ-মোবাইল- অলংকার দিতে রাজী হচ্ছেন না। ছিনতাইকারীদের সাথে টানাটানি করছেন। এসময় ছিনতাইকারীরা নারীর হাতে অস্ত্র দিয়ে কয়েকবার আঘাতও করে। একপর্যায়ে মোবাইল ফোন, ব্যাগ ছিনিয়ে না নিলেও হাতঘড়ি নিয়ে দ্রুত বাইক নিয়ে চলে যায় ছিনতাইকারীরা।

ওই নারী সিলেটে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী বলে জানা গেছে।

এরআগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

ওই সিসিটিভি ফুটেজও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, হাউজিং এস্টেটের ভেতরের সড়ক দিয়ে একটি অটোরিকশা যাচ্ছিলো। তিনটি মোটর সাইকেলে এসে ৬ জন লোক ওই অটোরিকশার গতিরোধ করে। এরপর একজচন মোটরসাইকেল থেকে নেমে অটিরিকশার ভেতরে থাকা ব্যাগ ধরে টানাটানি করে। কিছুক্ষণ টানাহ্যাঁচড়ার পর ব্যাগটি নিজের আয়ত্তে নিয়ে মোটর সাইকেল আরোহীরা চলে যায়। এসময় অটোরিকশা থেকে নেমে এক নারী চৎিকার করতে দেখা যায়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হাউজিং এস্টেট এলাকার বাসিন্দা ওই নারী ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। ছিনতাইকারীরা ব্যাগে থাকা তার টাকা ও চেক বইয়ের কয়েকটি পাতা ছিনিয়ে নেয়।

দিন দুপুরে এমন ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ কি না জানতে চাইলে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, এই ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হবে। এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের টহল এবং নজরদারিও বৃদ্ধি করা হবে বলে জানান তিনি।

হাউজিং এস্টেটের ঘটনার ব্যাপারে সম্প্রতি মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী জানান, ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তারা নগরের বাইরে অবস্থান করছে। তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

ছিনতাইকালেদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ মন্ত্রীর : সিলেটে ছিনতাইয়ের ঘটনা রোধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর।

শুক্রবার দুপুরে দক্ষিণ সুরমায় খোজারখলা মারকাজ জামে মসজিদের অজুখানা ও টয়লেট নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ নির্দেশ দেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী ও খোজারখলা পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি আজমল আলী।

অনুষ্ঠানে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর বলেন, অল্প কয়েকদিনে সিলেটে দুঃখজনভাবে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনোটি দিনের বেলায়ও ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্টভাবে বলছি- জণগণের প্রত্যাশার বিপরীতে এ ধরনের ঘটনা রোধে যা যা করা দরকার তা করতে যাতে কোনো বিলম্ব করা না হয়। আমরা এ ধরনের আর একটা ঘটনারও পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না।

তিনি বলেন, সিলেটকে আমরা শান্তির জনপদে পরিণত করতে চাই। তাই এ ধরনের কোনো ঘটনা আমরা সহ্য করব না। আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলব যে বা যারাই এ ধরনের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।

এ ধরনের ঘটনা রোধে সচেতন হতে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খন্দকার মুক্তাদীর বলেন, প্রত্যেকটা পাড়ায় মানুষকে একটু সচেতন থাকতে হবে। সন্দেহজনক কাউকে দেখতে পেলে দ্রুত ৯৯৯ নম্বরে জানাবেন। তাহলে এ ধরনের ঘটনা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

উন্নয়নের প্রশ্নে সিলেটি সংসদ সদস্যদের প্রতি এক নাগরিক আহ্বান

প্রকাশিত :  ০৮:২৪, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

কবি ও মাওলানা আবদুল হামিদ মাহবুবের “সিলেটি সংসদ সদস্যদের কাছে খোলা চিঠি” মূলত একটি নাগরিক আবেদন। চিঠিতে ঢাকা-সিলেট সড়ক, রেলপথ, ভূমি অফিস, থানার জনসেবা এবং সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের দুর্ভোগের কথা উঠে এসেছে। জনমত ডটকমে প্রকাশিত লেখাটি সিলেটের জনজীবনের বাস্তব সমস্যাকে সরল ভাষায় সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেছে।

আবদুল হামিদ মাহবুবের চিঠির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এতে অভিযোগ আছে, কিন্তু বিদ্বেষ নেই; সমালোচনা আছে, কিন্তু অসম্মান নেই। তিনি সংসদ সদস্যদের আক্রমণ করেননি; বরং তাঁদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এই ভঙ্গি আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় খুব প্রয়োজন। কারণ উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক সময় আলোচনা দলীয় তর্কে হারিয়ে যায়। অথচ রাস্তা, রেল, বিমানবন্দর, ভূমি অফিস বা থানার সেবা কোনো দলের একক বিষয় নয়; এগুলো সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন।

চিঠির শুরুতেই তিনি সিলেটের সংসদ সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। এরপর অত্যন্ত বাস্তব একটি কথা বলেছেন: যাঁরা বিমানপথে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেন, তাঁরা হয়তো ঢাকা-সিলেট সড়কের প্রকৃত দুর্ভোগ কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন না। এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক শিক্ষা আছে। নীতিনির্ধারক যদি জনগণের ব্যবহৃত পথ ব্যবহার না করেন, তবে মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে কেবল ফাইলের তথ্য হয়ে থাকে। সড়কের গর্ত, ধুলা, যানজট, দীর্ঘ যাত্রা, রাতের ঝুঁকি, অসুস্থ রোগীর দুর্ভোগ, ব্যবসায়ীর সময় নষ্ট, প্রবাসীর বাড়ি ফেরার ক্লান্তি, এসব কাগজে বোঝা যায় না। এগুলো বুঝতে হলে পথে নামতে হয়।

ঢাকা-সিলেট সড়ক নিয়ে সিলেটবাসীর অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু লেখক এখানে কেবল অভিযোগ করেননি; তিনি সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত উদ্যোগের কথা বলেছেন। এটিই সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। সিলেটের উন্নয়ন কোনো এক সংসদ সদস্যের একক প্রচেষ্টায় হবে না। সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, পর্যটন, প্রবাসী সেবা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শিল্পায়ন, সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উন্নয়ন ভাবনা দরকার। সংসদ সদস্যরা যদি দলীয় অবস্থান, এলাকার সীমা ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার হিসাবের বাইরে গিয়ে একটি “সিলেট উন্নয়ন এজেন্ডা” তৈরি করেন, তবে এই চিঠির আহ্বান বাস্তব অর্থ পেতে পারে।

রেলপথ নিয়ে লেখকের উদ্বেগও যথার্থ। সড়ক উন্নয়ন যত জরুরি, রেলের উন্নয়নও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রেল শুধু যাত্রীর বাহন নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবেশ, পর্যটন ও আঞ্চলিক সংযোগের সঙ্গে যুক্ত। ঢাকা-সিলেট রেলপথে উন্নতমানের ট্রেন, নিরাপদ লাইন, নিয়মিত সময়সূচি এবং প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন হলে সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এখানে একটি বাস্তব প্রশ্নও আছে: রেলপথ উন্নয়ন শুধু সংসদ সদস্যদের ইচ্ছার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জাতীয় বাজেট, রেলওয়ে মন্ত্রণালয়, প্রকৌশল পরিকল্পনা, জমি, নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা জড়িত। তাই সংসদ সদস্যদের উচিত হবে শুধু দাবি তোলা নয়, একটি সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করা: কোন কাজ জরুরি, কোন কাজ স্বল্পমেয়াদি, কোনটি দীর্ঘমেয়াদি, কোন মন্ত্রণালয় দায়ী, কত বাজেট লাগবে এবং অগ্রগতি কীভাবে জনগণকে জানানো হবে।

চিঠির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভূমি অফিস ও থানার আচরণ নিয়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এটি অত্যন্ত সাহসী ও প্রয়োজনীয় কথা। উন্নয়ন শুধু বড় সড়ক, সেতু বা ভবন দিয়ে মাপা যায় না। একজন সাধারণ মানুষ জমির নামজারি করতে গিয়ে যদি মাসের পর মাস ঘোরেন, থানায় গিয়ে যদি অপমানিত হন, অফিসে গিয়ে যদি দালাল ছাড়া কাজ না হয়, তবে উন্নয়নের ভাষণ তাঁর কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। লেখক ঠিকই বলেছেন, সংসদ সদস্য হওয়ার আগে অনেকেই এসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। ক্ষমতার আসনে যাওয়ার পর সেই অভিজ্ঞতা ভুলে গেলে জনমানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।

তবে এই জায়গায় আরও একটি দিক যোগ করা দরকার। সংসদ সদস্যদের প্রশাসনের ওপর নৈতিক চাপ তৈরি করার সুযোগ আছে, কিন্তু প্রশাসনিক শুদ্ধি আনতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দরকার। ভূমি অফিসে ডিজিটাল সেবা, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা, সময়সীমা নির্ধারণ, নাগরিক চার্টার বাস্তবায়ন, থানায় আচরণবিধি, স্থানীয় পর্যায়ে সেবা পর্যবেক্ষণ কমিটি, নিয়মিত গণশুনানি, এগুলো ছাড়া শুধু অনুরোধে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তাই চিঠির আহ্বানকে যদি নীতিগত প্রস্তাবে রূপ দেওয়া যায়, তবে তা আরও কার্যকর হবে।

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিয়ে লেখকের পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সিলেটের সঙ্গে প্রবাসী সমাজের সম্পর্ক গভীর। বিমানবন্দর শুধু যাত্রী ওঠানামার জায়গা নয়; এটি আবেগ, অর্থনীতি, পরিবার, স্মৃতি ও প্রবাসী সংযোগের প্রবেশদ্বার। একজন প্রবাসী যখন দেশে ফেরেন, তাঁর সঙ্গে থাকে পরিবার, স্বজন, প্রতিবেশী, প্রত্যাশা ও আবেগ। আবার বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর হয়ে ওঠে বিদায়ের জায়গা। সেখানে যাত্রী হয়তো ভেতরে কিছু সুবিধা পান, কিন্তু যাঁরা বিদায় দিতে বা গ্রহণ করতে আসেন, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত ছাউনি, বসার জায়গা, পরিষ্কার টয়লেট, পানির ব্যবস্থা, বৃষ্টির সময় আশ্রয়, নিরাপদ হাঁটার পথ না থাকলে সেটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদার সঙ্গে যায় না।

লেখক নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে কথা বলেছেন, সেটি অনেক সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। তবে ইতিবাচক সমালোচনার জায়গা থেকে বলা যায়, এই বিষয়গুলো নিয়ে যদি একটি ছোট নাগরিক জরিপ, ছবি, ব্যবহারকারীর মতামত এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর তালিকা তৈরি করা যায়, তাহলে দাবিটি আরও শক্তিশালী হবে। যেমন, কতজন দর্শনার্থী প্রতিদিন বিমানবন্দরে আসেন, কোথায় ছাউনি দরকার, কতগুলো টয়লেট দরকার, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কী সুবিধা দরকার, এসব তথ্যসহ প্রস্তাব দেওয়া হলে কর্তৃপক্ষের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন হবে।

চিঠিটির ভাষা সহজ, সরাসরি এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতানির্ভর। এটি তার বড় গুণ। অনেক সময় উন্নয়ন আলোচনা এমন কারিগরি ভাষায় হয় যে সাধারণ মানুষ তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আবদুল হামিদ মাহবুব সেই পথে যাননি। তিনি এমনভাবে বলেছেন, যাতে একজন সাধারণ পাঠকও বুঝতে পারেন, সমস্যাটি তাঁর নিজের জীবনেরও অংশ। এই ধরনের লেখা জনমত গঠনে কার্যকর হতে পারে।

তবে একটি সীমাবদ্ধতা হলো, চিঠিটি সমস্যার তালিকা দিয়েছে, কিন্তু অগ্রাধিকারের ক্রম স্পষ্ট করেনি। সব সমস্যা জরুরি হলেও সব কাজ একসঙ্গে করা যায় না। সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, প্রশাসনিক সেবা, সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনটি তাৎক্ষণিক, কোনটি ছয় মাসের মধ্যে সম্ভব, কোনটি দুই বছরের পরিকল্পনা, আর কোনটি জাতীয় প্রকল্পের অংশ, এভাবে ভাগ করলে চিঠিটি আরও নীতিনির্ধারণী গুরুত্ব পেত। যেমন, বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের জন্য ছাউনি, বসার জায়গা ও টয়লেট দ্রুত করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু ঢাকা-সিলেট ডাবল রেললাইন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই পার্থক্য তুলে ধরলে দাবি আরও বাস্তবসম্মত হয়।

আরেকটি বিষয় হলো, সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, সড়ক বিভাগ, রেলওয়ে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী সংগঠন, ব্যবসায়ী সমাজ এবং নাগরিক প্রতিনিধিদেরও যুক্ত করা দরকার। উন্নয়ন তখনই স্থায়ী হয়, যখন তা ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হয়। সংসদ সদস্যরা উদ্যোগ নিতে পারেন, কিন্তু নাগরিক সমাজকে নজরদারি করতে হবে, গণমাধ্যমকে নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে, আর প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হবে।

এই চিঠির আরেকটি মূল্য হলো, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কেবল বড় ঘোষণার নাম নয়। উন্নয়ন মানে একজন বৃদ্ধ মানুষের বিমানবন্দরে বসার জায়গা পাওয়া। একজন নারী দর্শনার্থীর নিরাপদ ও পরিষ্কার টয়লেট পাওয়া। একজন রোগীর ঢাকা যেতে কম কষ্ট হওয়া। একজন সাধারণ মানুষের ভূমি অফিসে অপমানিত না হওয়া। একজন নাগরিকের থানায় গিয়ে ন্যায্য আচরণ পাওয়া। এগুলো ছোট বিষয় মনে হলেও আসলে এগুলোই রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক নির্ধারণ করে।

সিলেটের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে আবদুল হামিদ মাহবুবের খোলা চিঠি তাই কেবল একটি চিঠি নয়; এটি এক ধরনের নাগরিক স্মারক। এতে বলা হয়েছে, ক্ষমতা মানুষের সেবা করার সুযোগ, আরাম-আয়েশের লাইসেন্স নয়। এই কথাটি শুধু সিলেট নয়, বাংলাদেশের সব নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য প্রযোজ্য।

পরিশেষে বলা যায়, লেখাটি ইতিবাচক কারণ এটি হতাশা ছড়ায় না; বরং দায়িত্ববোধ জাগায়। এটি আক্রমণাত্মক নয়; বরং জাগরণমূলক। এটি দলীয় নয়; বরং জনস্বার্থকেন্দ্রিক। তবে এই আহ্বানকে আরও কার্যকর করতে হলে নাগরিকদেরও সংগঠিতভাবে তথ্য, প্রমাণ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক দাবি সামনে আনতে হবে। সংসদ সদস্যদের উচিত হবে এই চিঠিকে ব্যক্তিগত সমালোচনা হিসেবে না দেখে জনমতের একটি সৎ প্রতিধ্বনি হিসেবে গ্রহণ করা।

সিলেটবাসীর প্রত্যাশা খুব অস্বাভাবিক নয়। তাঁরা নিরাপদ সড়ক চান, আধুনিক রেল চান, সম্মানজনক বিমানবন্দর চান, জনবান্ধব অফিস চান, মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক সেবা চান। একজন কবি সেই কথাই সহজ ভাষায় বলেছেন। এখন দায়িত্ব তাঁদের, যাঁদের হাতে জনগণ কথা বলার ম্যান্ডেট তুলে দিয়েছে।

----------

এ এইচ এম. বজলুর রহমান, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, তথ্যের অখণ্ডতা ও ডিজিটাল গণতন্ত্রবিষয়ক নীতি-পরামর্শক,                                                                                  বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর


সিলেটের খবর এর আরও খবর