img

কঠোর অভিবাসন নীতির যুগে সিলেট-লন্ডন সম্পর্ক

প্রকাশিত :  ০৬:৫৬, ১১ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:২৫, ১১ মার্চ ২০২৬

কঠোর অভিবাসন নীতির যুগে সিলেট-লন্ডন সম্পর্ক

ইসমাইল আলী

সিলেট-লন্ডন সম্পর্ক গভীর। দেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এই মহানগরীকে প্রায়শই "বাংলাদেশের লন্ডন" বলা হয়। সম্প্রতি সিলেট সফরকালে, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সিলেটের সাথে তার দেশের বিদ্যমান বিশেষ সম্পর্ক পুনর্ব্যক্ত করে বলেন যে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী প্রায় ৯০% বাংলাদেশি সিলেটের বাসিন্দা। তিনি আরও বলেন ব্রিটেনের সাথে বাংলাদেশের দৃঢ় সম্পর্ক মূলত সিলেটের কারণে। এবং যুক্তরাজ্যে সিলেটীদের অবদানকে অসাধারণ বলে বর্ণনা করেছেন।

২০২১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ৬,৫২,৫৩৫ জন মানুষ যুক্তরাজ্যে বসবাস করছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে তাদের অনেকেই ব্রিটেনে আসেন এবং গত ৭৫ বছরে তারা কেবল তাদের জন্মভূমিকেই পরিবর্তন করেননি বরং পেশাদার, কূটনীতিক এবং সংসদ সদস্য হিসেবে ব্রিটিশ সমাজেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

তবে, সাম্প্রতিক কঠোর অভিবাসন নীতি সিলেট-লন্ডন সম্পর্ককে বিপন্ন করতে পারে। ব্রিটেনের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি ইমিগ্রেশন আইনকে কঠোর করার জন্য কার্যত প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তারা মনে করছে যে "অভিবাসনের ব্যাপারে কঠোর" হওয়াই ক্ষমতায়নের সবচেয়ে নিশ্চিত পথ।

ফলাফল স্পষ্ট। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান (২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) জানিয়েছে যে ব্রিটেনে প্রবেশের অনুমতিপ্রাপ্ত বিদেশী নার্স এবং সেবাকর্মীর সংখ্যা ২০২৩ সালে ১০৭,৮৪৭ জন থেকে ২০২৫ সালে মাত্র ৩,১৭৮ জনে নেমে এসেছে - যা দুই বছরে ৯৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। 

পড়াশোনা এবং কাজ করতে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কারণে ব্রিটিশ সরকার (৪ মার্চ ২০২৬) আফগানিস্তান, মায়ানমার, সুদান, এবং কেমারুনের ছাত্রদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ আশ্রয়প্রার্থীদের (Asylum Seekers) জন্য এক অভূতপূর্ব নতুন ব্যবস্থা চালু করেছেন, যা ২রা মার্চ ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। ডেনমার্ক-ধাঁচের মডেলের অধীনে, শরণার্থীদের যুক্তরাজ্যে আর স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ দেওয়া হবে না। অস্থায়ী ভাবে যারা বসবাসের অনুমতি পাবেন, তাদের দেশ নিরাপদ বলে বিবেচিত হলে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যেতে হবে। এবং প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলছেন যে "অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্র - কাজ, পরিবার এবং পড়াশোনা সহ - কঠোর করা হবে যাতে আমাদের আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং মোট অভিবাসীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়।”

এই নীতিগত পরিবর্তন বাংলাদেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় স্বাভাবিক ভাবেই সিলেটকে বেশি আঘাত করবে। ব্রিটিশ-বাংলাদেশীরা এখন চতুর্থ প্রজন্মের যুগে। নতুন এই প্রজন্ম তাদের দাদা-দাদির দেশের সাথে খুব কম মানসিক সংযোগ নিয়ে বেড়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষকরা লক্ষ্য করে থাকবেন যে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ ব্রিটিশ ছেলে-মেয়েদের সিলেটে বিয়ের জন্য ভ্রমণের প্রবণতা মূলত অদৃশ্য হয়ে গেছে দুটি প্রধান কারণে: সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং কঠোর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ।

আরেকটি স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে ছাত্র ভিসার (Student Visa) উপর। অভিবাসন ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করার পর, যুক্তরাজ্যের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি সীমিত বা স্থগিত করেছে। এর ফলে ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঘটনা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। 

কর্ম ভিসা (Work Permit) রুটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশ সহ বেশ কয়েকটি দেশ এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছে বলে অভিযুক্ত। যারা কেয়ার (Care Visa) ভিসায় যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন তাদের অনেকেই পরে আবিষ্কার করেন যে তাদের মুলত কোন নিয়োগকর্তাই (Employer) নেই। ব্যাপক অপব্যবহারের কারণেই আজকের এই বিধিনিষেধ, যেমনটি অনেকেই মনে করেন। 

উপরে উল্লিখিত রুটগুলিতে যারা ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যে আছেন - যাদের মধ্যে কয়েকজনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তারা এখন গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন: মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসা, আশ্রয় (Asylum) দাবি প্রত্যাখ্যান, বেকার অথবা শোষণমূলক কম বেতনের কাজ করছেন। পরিস্থিতি গভীর হতাশাজনক। এমনকি কেউ কেউ বাসস্থান নিশ্চিত করতেও লড়াই করছেন। কারণ অবৈধদের বাসা ভাড়া নিতে আইনি জটিলতা রয়েছে। 

যুক্তরাজ্যের এই কঠোর বিধিনিষেধের অর্থনৈতিক পরিণতি সিলেটে প্রতীয়মান হবে। বছরে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স প্রবাহ কেবল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সিলেটের অনেক পরিবারের জন্য একমাত্র ভরসা। দ্য ডেইলি স্টারে লেখার সময়, সৈয়দ জয়ন আল-মাহমুদ যুক্তি দেন যে, ব্রিটেনের রেমিট্যান্স সিলেটকে ঢাকার পরে বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী শহর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আশীর্বাদ হয়ে কাজ করেছে। তবে নতুন করে আসার সুযোগ এভাবে বন্ধ হয়ে গেলে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ থাকবে না। কারণ যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর প্রয়োজন মনে করেনা।  

লন্ডন নির্ভর সিলেটের আশেপাশের শহরগুলিতে – মৌলভীবাজার, বিয়ানী বাজার, বিশ্বনাথ, জগন্নাথপুর এবং গোয়ালাবাজার – এর প্রভাব বিশেষ ভাবে পরিলক্ষিত হবে। আমি ছাতকের একটি গ্রাম (কেওয়ালি পাড়া) থেকে এসেছি – যেখানে উপরে উল্লিখিত উপজেলাগুলির তুলনায় "লন্ডোনি" কম। তারপরও, উন্নয়নের বেশিরভাগ অংশ - রাস্তাঘাট, মসজিদ, ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণ - লন্ডনের অর্থায়নে হয়েছে। আমার এলাকায় জমির দামের উত্থান-পতন লন্ডনের সাথে গ্রামের সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। 

এখানে, একটি বিষয়ে আমি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সিলেটের অনেক এলাকায় কৃষি জমির বিশাল অংশ লন্ডনবাসীদের মালিকানাধীন। বাংলাদেশের কৃষকরা সাধারণত বছরে দুই বা তিনবার তাদের জমি চাষ করলেও, লন্ডনিদের মালিকানা ভুমিতে প্রায়শই কেবল একবারই চাষ করা হয়। হ্যাঁ, এখানে অবশ্যই প্রকৃতির/আবহাওয়ার ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু যখন জমির মালিকরা হাজার মাইল দূরে থাকেন, তখন এই মূল্যবান সম্পদ খুব কমই তার পূর্ণ সম্ভাবনার সাথে ব্যবহৃত হয়। আমার গ্রামও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই এর অপব্যবহার মোকাবেলায় সরকারের সহযোগিতামুলক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। 

এদিকে, যারা বিদেশে পড়াশোনা করতে আগ্রহী তাদের এ বিষয়ে পুর্ব প্রস্তুতি প্রয়োজন। যুক্তরাজ্য এখনও পড়াশোনার জন্য একটি সম্ভাবনাময় দেশ। বিশ্বের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এখানে অবস্থিত। তবে কেবল যদি আপনি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হন এবং প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য থাকে। সুইডেন, জার্মানির মতো দেশগুলিও বিবেচনা করতে পারেন, যেগুলি কিছু দিক থেকে ভালো সুযোগ প্রদান করছে। 

যারা বিদেশে কাজ খুঁজছেন তাদের জন্য বার্তাটি সহজ: দক্ষতা অর্জন করুন। যেকোনো দক্ষতাই কোনও দক্ষতা না থাকার চেয়ে ভালো। একজন দক্ষ নির্মান শ্রমিক (construction worker) অথবা পানির মিস্ত্রি (plumber) বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রিধাবির চেয়েও লন্ডনে বেশি আয় করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন - বিদেশে চলে যাওয়ার অর্থ কেবল আশাবাদী প্রত্যাশা নয়, বরং কঠিন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। 

লন্ডনে অবস্থানরত আমার ছেলে, যে সিলেটে ফিরে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যুক্তি দেয় যে, যুক্তরাজ্য আর স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য উত্তম দেশ নয়। তার ভাষায়, ব্রিটেন দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। উচ্চ কর, কম বিনিয়োগ, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং চাপযুক্ত কল্যাণ (Stressed Welfare System) ব্যবস্থার কারণে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, সে  মনে করে, বিদেশিদের প্রতি ক্রমবর্ধমান কঠোর মনোভাব। 

যদিও আমি তার সাথে সব বিষয়ে একমত নই, কিছু  বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না। যুক্তরাজ্যে এখন রাজনৈতিক ভূমিকম্প চলছে। লেবার পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টির ঐতিহ্যবাহী দুই-দলীয় আধিপত্য ভেঙে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে পাঁচ বা ছয়টি দলকে কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যেতে পারে। আশ্চর্যজনক ভাবে অভিবাসন বিরোধী দল – রিফর্ম ইউকে – সরকার গঠনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার সাথে সংঘর্ষের আশঙ্কায় ব্রিটেন প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করে চলেছে। অতিরিক্ত এই অর্থের বেশিরভাগই আসছে কল্যাণ বাজেট (Welfare Budget) এবং পেনশন ব্যবস্থা সঙ্কুচিত করে, এমনকি পাবলিক লাইব্রেরি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে। 

আমরা এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের প্রায় সব দেশেরই অভিবাসীদের (Immigrants) খুব বেশি প্রয়োজন। তবুও, ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষ এই বাস্তবতা প্রত্যাখ্যান করছে। তাদের কর্মক্ষম জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। জন্মহার এখন ঐতিহাসিকভাবে কম। যুক্তরাজ্যে, গড় প্রজনন হার (Fertility Rate) প্রতি মহিলা ১.৪১ শিশু। অভিবাসন ছাড়া জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে দরকার ২.১। প্রায় প্রতিটি ইউরোপীয় দেশের ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য। তবুও, মহাদেশ জুড়ে অভিবাসন বিরোধী মনোভাব বিরাজ করছে। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই যে, মাসে অন্তত একবার আমার সুযোগ হয় ইউরোপীয় বন্ধুদের সাথে সাম্প্রতিক বিষয়গুলি নিয়ে মতবিনিময় করার। ২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় এমনই একটি আলোচনায় আমি বাংলাদেশী সংবাদপত্রের কিছু অংশ তাদেরকে দেখিয়েছিলাম যেখানে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলকে পালিয়ে আসা সিরিয়ানদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য "নিঃস্বদের মা" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। আমার জার্মান বন্ধু এসব দেখে হেসে বলেছিলো যে আমাদের মিডিয়া আবেগপ্রবণ। তার মতে, এই উচ্চ শিক্ষিত তরুণরা জার্মানের জন্য আশীর্বাদ। মুলত কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই জার্মান অর্থনীতি প্রায় ১২ লাখ সিরিয়ান কর্মীবাহিনী পেয়েছিলো। 

লেখকঃ লন্ডন প্রবাসী কলামিস্ট 


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

উন্নয়নের প্রশ্নে সিলেটি সংসদ সদস্যদের প্রতি এক নাগরিক আহ্বান

প্রকাশিত :  ০৮:২৪, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

কবি ও মাওলানা আবদুল হামিদ মাহবুবের “সিলেটি সংসদ সদস্যদের কাছে খোলা চিঠি” মূলত একটি নাগরিক আবেদন। চিঠিতে ঢাকা-সিলেট সড়ক, রেলপথ, ভূমি অফিস, থানার জনসেবা এবং সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের দুর্ভোগের কথা উঠে এসেছে। জনমত ডটকমে প্রকাশিত লেখাটি সিলেটের জনজীবনের বাস্তব সমস্যাকে সরল ভাষায় সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেছে।

আবদুল হামিদ মাহবুবের চিঠির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এতে অভিযোগ আছে, কিন্তু বিদ্বেষ নেই; সমালোচনা আছে, কিন্তু অসম্মান নেই। তিনি সংসদ সদস্যদের আক্রমণ করেননি; বরং তাঁদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এই ভঙ্গি আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় খুব প্রয়োজন। কারণ উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক সময় আলোচনা দলীয় তর্কে হারিয়ে যায়। অথচ রাস্তা, রেল, বিমানবন্দর, ভূমি অফিস বা থানার সেবা কোনো দলের একক বিষয় নয়; এগুলো সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন।

চিঠির শুরুতেই তিনি সিলেটের সংসদ সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। এরপর অত্যন্ত বাস্তব একটি কথা বলেছেন: যাঁরা বিমানপথে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেন, তাঁরা হয়তো ঢাকা-সিলেট সড়কের প্রকৃত দুর্ভোগ কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন না। এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক শিক্ষা আছে। নীতিনির্ধারক যদি জনগণের ব্যবহৃত পথ ব্যবহার না করেন, তবে মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে কেবল ফাইলের তথ্য হয়ে থাকে। সড়কের গর্ত, ধুলা, যানজট, দীর্ঘ যাত্রা, রাতের ঝুঁকি, অসুস্থ রোগীর দুর্ভোগ, ব্যবসায়ীর সময় নষ্ট, প্রবাসীর বাড়ি ফেরার ক্লান্তি, এসব কাগজে বোঝা যায় না। এগুলো বুঝতে হলে পথে নামতে হয়।

ঢাকা-সিলেট সড়ক নিয়ে সিলেটবাসীর অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু লেখক এখানে কেবল অভিযোগ করেননি; তিনি সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত উদ্যোগের কথা বলেছেন। এটিই সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। সিলেটের উন্নয়ন কোনো এক সংসদ সদস্যের একক প্রচেষ্টায় হবে না। সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, পর্যটন, প্রবাসী সেবা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শিল্পায়ন, সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উন্নয়ন ভাবনা দরকার। সংসদ সদস্যরা যদি দলীয় অবস্থান, এলাকার সীমা ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার হিসাবের বাইরে গিয়ে একটি “সিলেট উন্নয়ন এজেন্ডা” তৈরি করেন, তবে এই চিঠির আহ্বান বাস্তব অর্থ পেতে পারে।

রেলপথ নিয়ে লেখকের উদ্বেগও যথার্থ। সড়ক উন্নয়ন যত জরুরি, রেলের উন্নয়নও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রেল শুধু যাত্রীর বাহন নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবেশ, পর্যটন ও আঞ্চলিক সংযোগের সঙ্গে যুক্ত। ঢাকা-সিলেট রেলপথে উন্নতমানের ট্রেন, নিরাপদ লাইন, নিয়মিত সময়সূচি এবং প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন হলে সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এখানে একটি বাস্তব প্রশ্নও আছে: রেলপথ উন্নয়ন শুধু সংসদ সদস্যদের ইচ্ছার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জাতীয় বাজেট, রেলওয়ে মন্ত্রণালয়, প্রকৌশল পরিকল্পনা, জমি, নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা জড়িত। তাই সংসদ সদস্যদের উচিত হবে শুধু দাবি তোলা নয়, একটি সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করা: কোন কাজ জরুরি, কোন কাজ স্বল্পমেয়াদি, কোনটি দীর্ঘমেয়াদি, কোন মন্ত্রণালয় দায়ী, কত বাজেট লাগবে এবং অগ্রগতি কীভাবে জনগণকে জানানো হবে।

চিঠির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভূমি অফিস ও থানার আচরণ নিয়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এটি অত্যন্ত সাহসী ও প্রয়োজনীয় কথা। উন্নয়ন শুধু বড় সড়ক, সেতু বা ভবন দিয়ে মাপা যায় না। একজন সাধারণ মানুষ জমির নামজারি করতে গিয়ে যদি মাসের পর মাস ঘোরেন, থানায় গিয়ে যদি অপমানিত হন, অফিসে গিয়ে যদি দালাল ছাড়া কাজ না হয়, তবে উন্নয়নের ভাষণ তাঁর কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। লেখক ঠিকই বলেছেন, সংসদ সদস্য হওয়ার আগে অনেকেই এসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। ক্ষমতার আসনে যাওয়ার পর সেই অভিজ্ঞতা ভুলে গেলে জনমানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।

তবে এই জায়গায় আরও একটি দিক যোগ করা দরকার। সংসদ সদস্যদের প্রশাসনের ওপর নৈতিক চাপ তৈরি করার সুযোগ আছে, কিন্তু প্রশাসনিক শুদ্ধি আনতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দরকার। ভূমি অফিসে ডিজিটাল সেবা, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা, সময়সীমা নির্ধারণ, নাগরিক চার্টার বাস্তবায়ন, থানায় আচরণবিধি, স্থানীয় পর্যায়ে সেবা পর্যবেক্ষণ কমিটি, নিয়মিত গণশুনানি, এগুলো ছাড়া শুধু অনুরোধে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তাই চিঠির আহ্বানকে যদি নীতিগত প্রস্তাবে রূপ দেওয়া যায়, তবে তা আরও কার্যকর হবে।

সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিয়ে লেখকের পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সিলেটের সঙ্গে প্রবাসী সমাজের সম্পর্ক গভীর। বিমানবন্দর শুধু যাত্রী ওঠানামার জায়গা নয়; এটি আবেগ, অর্থনীতি, পরিবার, স্মৃতি ও প্রবাসী সংযোগের প্রবেশদ্বার। একজন প্রবাসী যখন দেশে ফেরেন, তাঁর সঙ্গে থাকে পরিবার, স্বজন, প্রতিবেশী, প্রত্যাশা ও আবেগ। আবার বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর হয়ে ওঠে বিদায়ের জায়গা। সেখানে যাত্রী হয়তো ভেতরে কিছু সুবিধা পান, কিন্তু যাঁরা বিদায় দিতে বা গ্রহণ করতে আসেন, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত ছাউনি, বসার জায়গা, পরিষ্কার টয়লেট, পানির ব্যবস্থা, বৃষ্টির সময় আশ্রয়, নিরাপদ হাঁটার পথ না থাকলে সেটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদার সঙ্গে যায় না।

লেখক নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যে কথা বলেছেন, সেটি অনেক সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। তবে ইতিবাচক সমালোচনার জায়গা থেকে বলা যায়, এই বিষয়গুলো নিয়ে যদি একটি ছোট নাগরিক জরিপ, ছবি, ব্যবহারকারীর মতামত এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর তালিকা তৈরি করা যায়, তাহলে দাবিটি আরও শক্তিশালী হবে। যেমন, কতজন দর্শনার্থী প্রতিদিন বিমানবন্দরে আসেন, কোথায় ছাউনি দরকার, কতগুলো টয়লেট দরকার, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কী সুবিধা দরকার, এসব তথ্যসহ প্রস্তাব দেওয়া হলে কর্তৃপক্ষের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন হবে।

চিঠিটির ভাষা সহজ, সরাসরি এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতানির্ভর। এটি তার বড় গুণ। অনেক সময় উন্নয়ন আলোচনা এমন কারিগরি ভাষায় হয় যে সাধারণ মানুষ তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আবদুল হামিদ মাহবুব সেই পথে যাননি। তিনি এমনভাবে বলেছেন, যাতে একজন সাধারণ পাঠকও বুঝতে পারেন, সমস্যাটি তাঁর নিজের জীবনেরও অংশ। এই ধরনের লেখা জনমত গঠনে কার্যকর হতে পারে।

তবে একটি সীমাবদ্ধতা হলো, চিঠিটি সমস্যার তালিকা দিয়েছে, কিন্তু অগ্রাধিকারের ক্রম স্পষ্ট করেনি। সব সমস্যা জরুরি হলেও সব কাজ একসঙ্গে করা যায় না। সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, প্রশাসনিক সেবা, সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনটি তাৎক্ষণিক, কোনটি ছয় মাসের মধ্যে সম্ভব, কোনটি দুই বছরের পরিকল্পনা, আর কোনটি জাতীয় প্রকল্পের অংশ, এভাবে ভাগ করলে চিঠিটি আরও নীতিনির্ধারণী গুরুত্ব পেত। যেমন, বিমানবন্দরে দর্শনার্থীদের জন্য ছাউনি, বসার জায়গা ও টয়লেট দ্রুত করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু ঢাকা-সিলেট ডাবল রেললাইন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই পার্থক্য তুলে ধরলে দাবি আরও বাস্তবসম্মত হয়।

আরেকটি বিষয় হলো, সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, সড়ক বিভাগ, রেলওয়ে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী সংগঠন, ব্যবসায়ী সমাজ এবং নাগরিক প্রতিনিধিদেরও যুক্ত করা দরকার। উন্নয়ন তখনই স্থায়ী হয়, যখন তা ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হয়। সংসদ সদস্যরা উদ্যোগ নিতে পারেন, কিন্তু নাগরিক সমাজকে নজরদারি করতে হবে, গণমাধ্যমকে নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে, আর প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হবে।

এই চিঠির আরেকটি মূল্য হলো, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কেবল বড় ঘোষণার নাম নয়। উন্নয়ন মানে একজন বৃদ্ধ মানুষের বিমানবন্দরে বসার জায়গা পাওয়া। একজন নারী দর্শনার্থীর নিরাপদ ও পরিষ্কার টয়লেট পাওয়া। একজন রোগীর ঢাকা যেতে কম কষ্ট হওয়া। একজন সাধারণ মানুষের ভূমি অফিসে অপমানিত না হওয়া। একজন নাগরিকের থানায় গিয়ে ন্যায্য আচরণ পাওয়া। এগুলো ছোট বিষয় মনে হলেও আসলে এগুলোই রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক নির্ধারণ করে।

সিলেটের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে আবদুল হামিদ মাহবুবের খোলা চিঠি তাই কেবল একটি চিঠি নয়; এটি এক ধরনের নাগরিক স্মারক। এতে বলা হয়েছে, ক্ষমতা মানুষের সেবা করার সুযোগ, আরাম-আয়েশের লাইসেন্স নয়। এই কথাটি শুধু সিলেট নয়, বাংলাদেশের সব নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য প্রযোজ্য।

পরিশেষে বলা যায়, লেখাটি ইতিবাচক কারণ এটি হতাশা ছড়ায় না; বরং দায়িত্ববোধ জাগায়। এটি আক্রমণাত্মক নয়; বরং জাগরণমূলক। এটি দলীয় নয়; বরং জনস্বার্থকেন্দ্রিক। তবে এই আহ্বানকে আরও কার্যকর করতে হলে নাগরিকদেরও সংগঠিতভাবে তথ্য, প্রমাণ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক দাবি সামনে আনতে হবে। সংসদ সদস্যদের উচিত হবে এই চিঠিকে ব্যক্তিগত সমালোচনা হিসেবে না দেখে জনমতের একটি সৎ প্রতিধ্বনি হিসেবে গ্রহণ করা।

সিলেটবাসীর প্রত্যাশা খুব অস্বাভাবিক নয়। তাঁরা নিরাপদ সড়ক চান, আধুনিক রেল চান, সম্মানজনক বিমানবন্দর চান, জনবান্ধব অফিস চান, মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক সেবা চান। একজন কবি সেই কথাই সহজ ভাষায় বলেছেন। এখন দায়িত্ব তাঁদের, যাঁদের হাতে জনগণ কথা বলার ম্যান্ডেট তুলে দিয়েছে।

----------

এ এইচ এম. বজলুর রহমান, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, তথ্যের অখণ্ডতা ও ডিজিটাল গণতন্ত্রবিষয়ক নীতি-পরামর্শক,                                                                                  বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর


সিলেটের খবর এর আরও খবর