img

দুই শত বছরের ঐতিহ্যে চড়ক উৎসব: কমলগঞ্জে সম্প্রীতির মহামিলন

প্রকাশিত :  ১১:১০, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

দুই শত বছরের ঐতিহ্যে চড়ক উৎসব: কমলগঞ্জে সম্প্রীতির মহামিলন

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ১নং রহিমপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ছয়চিরি দিঘীর পাড়ে দুই শত বছরের প্রাচীন চড়ক পূজা ও গ্রামীণ মেলা বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত এ উৎসব ঘিরে কয়েকদিন ধরেই ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, যার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৫ এপ্রিল বিকেলে চড়কপূজার মধ্য দিয়ে।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল থেকেই ছয়চিরি দিঘীর চারপাশে মানুষের ঢল নামে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থী, পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের পদচারণায় পুরো এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে।

চড়ক উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল তান্ত্রিক রীতিনীতি ও রোমাঞ্চকর আচার-অনুষ্ঠান। প্রায় ১০-১২ দিন ব্রত পালন শেষে ৪০ থেকে ৫০ জন সন্ন্যাসী অংশ নেন নানা কৃচ্ছ্রসাধনে। জ্বলন্ত আগুনের ওপর ‘কালীনাচ’ এবং ধারালো দা’র ওপর ‘শিব শয্যা’র মতো রোমাঞ্চকর আচার উপস্থিত হাজারো দর্শককে মুগ্ধ করে।

ঐতিহ্যবাহী দিঘীর উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়ে স্থাপিত চারটি চড়ক গাছে সন্ন্যাসীদের পিঠে বড়শি গেঁথে ঘোরানোর দৃশ্য দেখতে ভিড় জমে দেশ-বিদেশের পর্যটক ও ভক্তদের। ভক্তরা ফুল, দুধ ও চিনি নিবেদন করে পূজা অর্চনা করেন।

পূজাকে কেন্দ্র করে দিঘীর চারপাশ জুড়ে বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। নাগরদোলা, মাটির তৈজসপত্র, বাঁশ-বেতের সামগ্রী এবং খৈ-বাতাসার দোকানে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

চড়ক পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অনিরুদ্ধ প্রসাদ রায় চৌধুরী বলেন, “এই উৎসব এখন আর শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।”

উৎসবটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মেলা প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পাশাপাশি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য দুরুদ আহমদ, সাবেক পৌর কাউন্সিলর স্বাগত কিশোর দাস চৌধুরী, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি শ্যামল চন্দ্র দাশ, সাধারণ সম্পাদক প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি শংকর লাল সাহাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা মেলা পরিদর্শন করে পূজারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, র‌্যাব ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী সক্রিয় ছিল।

এদিকে একই দিন কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী মাধবপুর ইউনিয়নের পাত্রখোলা চা বাগান মাঠেও অনুষ্ঠিত হয় চড়ক পূজা ও মেলা। উভয় স্থানে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

দুই দিনব্যাপী এই বর্ণিল আয়োজন আবারও প্রমাণ করেছে—গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন এখনো অটুট রয়েছে কমলগঞ্জের মাটিতে।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

দেওড়াছড়া চা বাগানে ৩ সপ্তাহ ধরে মজুরি বন্ধ, আন্দোলনে শ্রমিকরা

প্রকাশিত :  ১৩:২১, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলাস্থ রহিমপুর ইউনিয়নের বাংলাদেশ টি বোর্ডের নিয়ন্ত্রাধীন দেওড়াছড়া চা বাগানে ৩ সপ্তাহ ধরে চা শ্রমিকদের তলব বা মজুরী প্রদান না করায় বাগানের শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও আন্দোলন করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা অফিসের মেইন গেইটে তালা ঝুলিয়ে দেন।

এরপর বৃহস্পতিবার বিকেলে বকেয়া পাওয়া শুরু হলে শ্রমিকরা আন্দোলন থেকে সরে আসে।

জানা যায়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া চা বাগানে গত ৩ সপ্তাহ ধরে শ্রমিকদের মজুরী প্রদান করতে পারছেন না। এতে করে বিপাকে পড়েছেন কয়েক শতাধিক চা শ্রমিক। চা শ্রমিকরা মজুরী প্রদানের দাবি জানালেও বাগান কৃতর্পক্ষ নিশ্চুপ রয়েছে। দেওড়াছড়া চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির পক্ষ হতে গত ১২ এপ্রিল শ্রম অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বরাবর একটি লিখিত আবেদন জানিয়ে ছিল। কিন্তু ৪/৫ দিন অতিবাহিত হলেও কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে চা বাগানের বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা বাগানের অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে অফিসের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দেয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চা শ্রমিকরা অফিসের সামনে অবস্থান করছেন।

দেওড়াছড়া চা বাগান সূত্রে জানা যায়, এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে বাগানের একজন অনিয়মিত নারী শ্রমিক চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান। বাগানের পক্ষ থেকে ঐ নারীকে প্রায় ১১ হাজার টাকা চিকিৎসা বাবত দেওয়া হয়। এঘটনার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন শ্রমিক আন্দোলন করে। ভারপ্রাপ্ত বাগান ব্যবস্থাপকের অপসারণ চান। এঘটনার পর নিরাপত্তা জনিত কারণে ভারপ্রাপ্ত বাগান ব্যবস্থাপক কোম্পানী বরাবরে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে চলে যান। যেহেতু বাগানে ব্যবস্থাপক নেই এজন্য শ্রমিকদের মজুরি আটকা পড়েছে।

দেওড়াছড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সুবুধ কর্মী জানান, ৩ সপ্তাহ ধরে তলব বন্ধ। কয়েক শতাধিক চা শ্রমিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আমরা লিখিত আবেদন করেছে মজুরী দিতে, তারপরও দেয়া হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই চা শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমেছেন। বর্তমানে চা বাগান কাজ বন্ধ রেখেছে চা শ্রমিকরা।

রহিমপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিতাংশু কর্মকার দেওড়াছড়া চা বাগানের শ্রমিক আন্দোলনের কথা স্বীকার করে বলেন, মজুরীর দাবীতে অফিস তালা দিয়েছে বিক্ষুদ্ধ চা শ্রমিকরা। কিছু দিন পূর্বে এক চা শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার জের ধরে বাগান ম্যানেজমেন্ট ৩ সপ্তাহ ধরে তলব বন্ধ রেখেছে। অবশেষে কোম্পানীর নির্দেশে বৃহস্পতিবার বিকেলে পেমেন্ট দিলে শ্রমিকরা আন্দোলন থেকে সরে যায়।

এ ব্যাপারে দেওড়াছড়া চা বাগানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক জহিরুল ইসলাম বলেন, নারী চা শ্রমিক মারা যাওয়ার পর কয়েকজন মিলে ঘটনার দায় আমার উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে আমাকে শারিরীক লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করছে। এ ঘটনার পর আমি নিরাপত্তা নিরাপত্তাহীনতায় ছিলাম। এর পর ছুটি নিয়ে আমি চলে আসি। আগামী শনিবার পর্যন্ত আমার ছুটি আছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম সমকালকে জানান, নিরাপত্তার কারণে দেওড়াছড়া চা বাগানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক কিছুদিন পূর্বে পদত্যাগ পত্র কোম্পানীর কাছে জমা দিয়েছে। নতুন ব্যবস্থাপক দ্রুত সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রদানের চেষ্টা চলছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে দেওড়াছড়া চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরী প্রদান করা হচ্ছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর