img

সিলেট-সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যার আভাস

প্রকাশিত :  ১৮:০৩, ০২ মে ২০২৬

 সিলেট-সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যার আভাস

আগামী তিন দিনের অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও পূর্বাঞ্চলের আরও কয়েকটি জেলায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

আজ শনিবার (২ মে) পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত এক পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়।

পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে মাঝারি থেকে মাঝারি ভারি এবং দেশের অভ্যন্তরে হাওর অববাহিকায় ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন দিন সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে মাঝারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

এতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি আগামী তিন দিন বাড়তে পারে।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, তৃতীয় দিনে কুশিয়ারা নদীর কোথাও কোথাও পানি প্রাক-মৌসুমী বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এদিকে নেত্রকোনার ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীর পানি আগামী তিন দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে নেত্রকোনা জেলার ভুগাই-কংস অববাহিকার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র।

অন্যদিকে হবিগঞ্জের খোয়াই ও সুতাং নদী এবং মৌলভীবাজারের মনু ও জুড়ি নদীর পানিও আগামী তিন দিন বৃদ্ধি পেতে পারে।

পাউবো জানিয়েছে, খোয়াই ও জুড়ি নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় দ্রুত বেড়ে প্রাক-মৌসুমী বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। পাশাপাশি মনু নদীর পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে মৌলভীবাজার জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে এবং হবিগঞ্জ জেলার চলমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের ভেতরে সৃষ্ট মেঘমালার প্রভাবে আগামীকাল রোববার সিলেটসহ চারটি বিভাগে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি হতে পারে। এই বৃষ্টি টানা আরও চার দিন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে বৃষ্টির প্রবণতা কমে আসতে পারে।

শনিবার (২ মে) সন্ধ্যায় দেওয়া সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে এ তথ্য জানান আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক। তিনি বলেন, দেশের ভেতরে গঠিত মেঘমালার কারণে সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক স্থানে ভারি বর্ষণ হতে পারে। একই সঙ্গে সারা দেশে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।

তিনি আরও জানান, সোম, মঙ্গল ও বুধবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এরপর বৃহস্পতিবার থেকে ধীরে ধীরে কমে আসবে বৃষ্টি।

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে মাঝারি থেকে ভারি এবং হাওর অববাহিকায় অতিভারি বৃষ্টির কারণে তিন জেলার পাঁচটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

গত শুক্রবারের তুলনায় সুনামগঞ্জের নালজুর নদী ও নেত্রকোনার মগর নদীর পানি প্রায় শূন্য দশমিক ৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এছাড়া নেত্রকোনার ভুসাই-কংস নদী, সোমেশ্বরী নদী এবং হবিগঞ্জের সুতাল নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড আরও জানিয়েছে, তাদের ৪৬টি বন্যা পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ১৯টিতে পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুর রহমান বলেন, প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টির কারণে নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে এবং নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় এসব অঞ্চলের নদীগুলোর পানি আরও বাড়তে পারে।

img

চায়ের স্বর্গে বৃষ্টির দাপট: লাউয়াছড়ায় গাছধসে ৬ ছয় ঘণ্টা সড়ক যোগাযোগ বন্ধ , বিপর্যস্ত জনজীবন

প্রকাশিত :  ১৮:০৯, ০২ মে ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল—সবুজ চা-বাগান আর শান্ত প্রকৃতির জন্য পরিচিত এই জনপদে টানা বর্ষণ যেন ভিন্ন এক চিত্র এঁকেছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলজুড়ে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দিনভর থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ডও উঠে এসেছে এই অঞ্চল থেকে—মাত্র ৩০ ঘণ্টায় ১৬০ দশমিক ৬ মিলিমিটার।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান শনিবার (২ মে) দুপুরে জানান, শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই বিপুল বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আগামী কয়েক দিন এই অঞ্চলে বৃষ্টির ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।

এই অবিরাম বর্ষণের মধ্যেই শনিবার সকালে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ‘গাড়িভাঙা’ এলাকায় টিলা ধসে বড় গাছ সড়কের ওপর ভেঙে পড়ে। এতে কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল আঞ্চলিক সড়কে প্রায় ৩ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে বনবিভাগ ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে গাছ অপসারণ করা হলে যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।

তবে পরিস্থিতি এখানেই থেমে থাকেনি। দুপুরের দিকে কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে একই এলাকায় আবারও একাধিক বড় গাছ উপড়ে পড়ে। এতে টানা প্রায় ৬ ঘণ্টা সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উভয় পাশে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন—দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত গাড়ি—সবকিছুই থমকে যায় প্রকৃতির কাছে।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের শ্রীমঙ্গল রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নামজুল হক গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, আকস্মিক ঝড়ো বৃষ্টিতে বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বড় গাছ উপড়ে পড়ে। ফলে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। উদ্ধারকাজে বনবিভাগ, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ একযোগে কাজ করলেও বড় আকারের গাছ এবং দুর্গম অবস্থানের কারণে কাজ ধীরগতিতে এগোয়।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়ক থেকে গাছ সরিয়ে যোগাযোগ স্বাভাবিক করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে, টানা বৃষ্টিতে শুধু সড়ক যোগাযোগই নয়, পুরো জনজীবনেই নেমে এসেছে বিপর্যয়। উপজেলার বিভিন্ন বাজারে পানি জমে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, অনেক নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সকাল থেকে বাজারে মানুষের উপস্থিতি প্রায় নেই, ফলে বেচাকেনা একপ্রকার বন্ধ।

কৃষিখাতেও পড়েছে এর সরাসরি প্রভাব। কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, উপজেলায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে আকস্মিক পানিতে ৭০ হেক্টর সম্পূর্ণ এবং ৩৫০ হেক্টর আংশিক তলিয়ে গেছে। ধলাই নদীর পানি এখনও বিপদসীমার নিচে থাকলেও পাহাড়ি ছড়াগুলোর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চলে ঢুকে পড়ছে।

এদিকে, অব্যাহত বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন টিলায় ধসের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া অফিস ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে।

সবুজে ঘেরা লাউয়াছড়ার এই সড়কটি সাধারণত পর্যটকদের কাছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। কিন্তু টানা বর্ষণ আর ঝড়ের তাণ্ডবে সেই পথই এখন দুর্ভোগের প্রতীক। প্রকৃতির রূপ যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি তার রুদ্ররূপও যে কতটা কঠিন—এই কয়েক ঘণ্টার ঘটনাই যেন তার স্পষ্ট প্রমাণ।



সিলেটের খবর এর আরও খবর