img

শ্রীমঙ্গলে বাঁশঝোপ থেকে অজগর সাপ উদ্ধার

প্রকাশিত :  ০৬:০১, ০৯ মে ২০২৬

শ্রীমঙ্গলে বাঁশঝোপ থেকে অজগর সাপ উদ্ধার

সংগ্রাম দত্ত: শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা বাগানের শান্ত-নীরব পরিবেশ হঠাৎই কেঁপে ওঠে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায়। মেডিকেল সেন্টার সংলগ্ন এলাকার ঘন বাঁশঝোপে দেখা মেলে একটি বিশাল অজগর সাপের। মুহূর্তেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, নিরাপদ দূরত্বে সরে যান স্থানীয় বাসিন্দারা।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে ভাড়াউড়া চা বাগানের মেডিকেল সংলগ্ন এলাকায় বিক্রমজিতের বাসার পাশের বাঁশঝোপে সাপটি দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় উৎকণ্ঠা তৈরি হয়।

এ সময় বিক্রমজিতের ছেলে বিষয়টি জানালে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল, পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ও রিদন গৌড়।

ঘন বাঁশঝোপের ভেতরে দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান চালিয়ে অবশেষে অজগরটিকে নিরাপদে উদ্ধার করতে সক্ষম হন তারা। উদ্ধার অভিযান ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ছিল টানটান উত্তেজনা। পরে সাপটি উদ্ধার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় স্বস্তি ফিরে আসে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, সাম্প্রতিক বন্যা ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে অজগরটি তার স্বাভাবিক আবাসস্থল হারিয়ে লোকালয়ের কাছে চলে আসতে পারে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উদ্ধারকৃত অজগরটি শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “বন্যপ্রাণী কখনো মানুষের শত্রু নয়। আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসে। সচেতনতা বাড়লে মানুষ ও বন্যপ্রাণী—দু’পক্ষই নিরাপদ থাকবে।”

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন গত দুই দশকে প্রায় দুই হাজারের উপর বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বন বিভাগের মাধ্যমে অবমুক্ত করেছে।

প্রকৃতিপ্রধান শ্রীমঙ্গল উপজেলা চারদিকে পাহাড়, হাওর, বনাঞ্চল ও চা বাগানে ঘেরা। বিশেষ করে ভানুগাছ পাহাড় ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বনভূমি দখল, বসতি স্থাপন, রিসোর্ট নির্মাণ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনার বিস্তারের কারণে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাস ও খাদ্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

ফলে খাদ্যের সন্ধানে প্রায়ই বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে। অনেক সময় সড়কে যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারায় তারা, আবার কোথাও আতঙ্কিত মানুষ তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলে। তবে সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ এখন বন্যপ্রাণী দেখলে হত্যা না করে দ্রুত উদ্ধারকারী সংস্থাকে খবর দিচ্ছেন, যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

হারিয়ে যাচ্ছে শ্রীমঙ্গলের প্রাণরেখা গোপলা নদী, ভরাট আর অবহেলায় মৃতপ্রায় এক ঐতিহাসিক জলপথ

প্রকাশিত :  ১০:২৫, ০৯ মে ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: এক সময় যেখানে স্টিমার-জাহাজ চলত, আজ সেখানে জন্মেছে ধানক্ষেত। কোথাও কচুরিপানার স্তূপ, কোথাও শুকনো মাটি। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার একমাত্র নদী গোপলা এখন যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ লড়াই করছে।

চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন, ভূনবীর, মির্জাপুর ও সদর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত গোপলা নদী একসময় ছিল খরস্রোতা ও প্রাণচঞ্চল। বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা পানি এই নদী দিয়েই প্রবাহিত হয়ে হাইল হাওড়ে গিয়ে মিলত। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, মৎস্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ জনপদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপে আজ সেই নদী প্রায় মৃত।

ইতিহাস বলছে, বিলাশছড়া ও উদনাছড়া মতিগঞ্জ এলাকায় এসে মিলিত হওয়ার পর নদীটি ‘গোপলা’ নাম ধারণ করে। একসময় এ নদীপথে স্টিমার ও জাহাজ চলাচল করত। চা বাগানের মালামাল এবং ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন হতো এই নদীপথে। নদীর তীরে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য নির্মিত জেটির স্মৃতি এখনও বহন করছে সদর ইউনিয়নের ‘জেটি রোড’ নামের এলাকা।

কিন্তু সেই নদীর আজ করুণ দশা। সরেজমিনে জিলাদপুর ও উত্তর উত্তরসুর এলাকায় দেখা গেছে, রাবারড্যামের পর থেকে গোপলা নদী তার পুরোনো গতিপথ হারিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গরুরদ্বারা হয়ে সেই পানি হাইল হাওড়ে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নদীর মূল অংশ প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

কোথাও নদীর বুক শুকিয়ে ফেটে গেছে, কোথাও কচুরিপানায় ঢেকে আছে জলপথ। আবার কোথাও নদীর জমি দখল করে তৈরি হয়েছে মাছের খামার, বসতবাড়ি কিংবা ধানক্ষেত। এমনকি কোনো কোনো স্থানে নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে চলাচলের রাস্তা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদী দখল ও ভরাট চললেও তা রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একইভাবে নদী খনন করে পুরোনো গতিপথ ফিরিয়ে আনতেও নেওয়া হয়নি কোনো বড় প্রকল্প।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মানিক সরকার বলেন,

“প্রায় ত্রিশ বছর আগে নদীর গতিপথ বদলে যায়। এরপর থেকেই অনেক মানুষ জমি হারিয়েছেন। নদীর দুই পাশের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমি এখন অনাবাদি পড়ে থাকে।”

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা কবির মিয়া জানান,

“রাবারড্যাম থেকে কালেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নদী এখন মৃত। এর প্রভাব পড়েছে হাওড়ের বিলগুলোতে। দিঘালীয়াবিল, রাতারবিল, কুঞ্জবেরী, ঘোড়ামারা, আগুড়া, কুচবিল, চণ্ডীবিল, ছড়াডুবা, ধইলডুবাবিল, পাত্রবেরী ও নাইফতাডুবাবিল ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের পথে রয়েছে ডুমরবিল ও বাধাইবিল।”

তার মতে, নদীটি পুনঃখনন করে পুরোনো গতিপথ ফিরিয়ে আনা গেলে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরতে পারে হাওড়াঞ্চলে।

মতিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা বলাল আহম্মেদ বলেন,

“নদীর নতুন গতিপথের কারণে আমার প্রায় বারো বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। বর্তমানে নদীটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এর প্রশস্ততাও কমে গেছে। পুরোনো গতিপথ খনন করা গেলে নদী আবার নাব্য ফিরে পাবে।”

গোপলা নদী রক্ষার দাবি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সেই সভায় শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও রাজনীতিবিদ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী গোপলা নদী পুনঃখননের জোর দাবি তোলেন।

তিনি রাষ্ট্রপতির সামনে তুলে ধরেছিলেন নদীটির গুরুত্ব, এর ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে এর সম্ভাবনার কথা। একইসঙ্গে তিনি বালিশিরা পাহাড়কে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণার দাবিও জানান। জানা যায়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ মনোযোগ দিয়ে তার বক্তব্য শোনেন এবং বলেন, “নোট করে রাখা হলো।”

রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর সেই বক্তব্য তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশ, সিলেট কেন্দ্র থেকেও একাধিকবার প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু চার দশক পেরিয়ে গেলেও গোপলা নদী পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, “গোপলা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সমীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আমরা কাজ করব।”

প্রকৃতি, কৃষি, মৎস্য ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা গোপলা নদী এখন শুধুই এক মৃতপ্রায় জলধারা নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের পরিবেশগত সংকটেরও প্রতীক। দ্রুত পুনঃখনন ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ না নিলে একদিন হয়তো এই নদীর অস্তিত্ব থাকবে শুধু মানচিত্রে, স্মৃতিতে আর ইতিহাসের পাতায়।