img

হারিয়ে যাচ্ছে শ্রীমঙ্গলের প্রাণরেখা গোপলা নদী, ভরাট আর অবহেলায় মৃতপ্রায় এক ঐতিহাসিক জলপথ

প্রকাশিত :  ১০:২৫, ০৯ মে ২০২৬

হারিয়ে যাচ্ছে শ্রীমঙ্গলের প্রাণরেখা গোপলা নদী, ভরাট আর অবহেলায় মৃতপ্রায় এক ঐতিহাসিক জলপথ

সংগ্রাম দত্ত: এক সময় যেখানে স্টিমার-জাহাজ চলত, আজ সেখানে জন্মেছে ধানক্ষেত। কোথাও কচুরিপানার স্তূপ, কোথাও শুকনো মাটি। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার একমাত্র নদী গোপলা এখন যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ লড়াই করছে।

চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন, ভূনবীর, মির্জাপুর ও সদর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত গোপলা নদী একসময় ছিল খরস্রোতা ও প্রাণচঞ্চল। বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা পানি এই নদী দিয়েই প্রবাহিত হয়ে হাইল হাওড়ে গিয়ে মিলত। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, মৎস্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ জনপদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপে আজ সেই নদী প্রায় মৃত।

ইতিহাস বলছে, বিলাশছড়া ও উদনাছড়া মতিগঞ্জ এলাকায় এসে মিলিত হওয়ার পর নদীটি ‘গোপলা’ নাম ধারণ করে। একসময় এ নদীপথে স্টিমার ও জাহাজ চলাচল করত। চা বাগানের মালামাল এবং ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন হতো এই নদীপথে। নদীর তীরে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য নির্মিত জেটির স্মৃতি এখনও বহন করছে সদর ইউনিয়নের ‘জেটি রোড’ নামের এলাকা।

কিন্তু সেই নদীর আজ করুণ দশা। সরেজমিনে জিলাদপুর ও উত্তর উত্তরসুর এলাকায় দেখা গেছে, রাবারড্যামের পর থেকে গোপলা নদী তার পুরোনো গতিপথ হারিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গরুরদ্বারা হয়ে সেই পানি হাইল হাওড়ে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নদীর মূল অংশ প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

কোথাও নদীর বুক শুকিয়ে ফেটে গেছে, কোথাও কচুরিপানায় ঢেকে আছে জলপথ। আবার কোথাও নদীর জমি দখল করে তৈরি হয়েছে মাছের খামার, বসতবাড়ি কিংবা ধানক্ষেত। এমনকি কোনো কোনো স্থানে নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে চলাচলের রাস্তা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদী দখল ও ভরাট চললেও তা রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একইভাবে নদী খনন করে পুরোনো গতিপথ ফিরিয়ে আনতেও নেওয়া হয়নি কোনো বড় প্রকল্প।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মানিক সরকার বলেন,

“প্রায় ত্রিশ বছর আগে নদীর গতিপথ বদলে যায়। এরপর থেকেই অনেক মানুষ জমি হারিয়েছেন। নদীর দুই পাশের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমি এখন অনাবাদি পড়ে থাকে।”

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা কবির মিয়া জানান,

“রাবারড্যাম থেকে কালেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নদী এখন মৃত। এর প্রভাব পড়েছে হাওড়ের বিলগুলোতে। দিঘালীয়াবিল, রাতারবিল, কুঞ্জবেরী, ঘোড়ামারা, আগুড়া, কুচবিল, চণ্ডীবিল, ছড়াডুবা, ধইলডুবাবিল, পাত্রবেরী ও নাইফতাডুবাবিল ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের পথে রয়েছে ডুমরবিল ও বাধাইবিল।”

তার মতে, নদীটি পুনঃখনন করে পুরোনো গতিপথ ফিরিয়ে আনা গেলে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরতে পারে হাওড়াঞ্চলে।

মতিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা বলাল আহম্মেদ বলেন,

“নদীর নতুন গতিপথের কারণে আমার প্রায় বারো বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। বর্তমানে নদীটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এর প্রশস্ততাও কমে গেছে। পুরোনো গতিপথ খনন করা গেলে নদী আবার নাব্য ফিরে পাবে।”

গোপলা নদী রক্ষার দাবি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সেই সভায় শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও রাজনীতিবিদ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী গোপলা নদী পুনঃখননের জোর দাবি তোলেন।

তিনি রাষ্ট্রপতির সামনে তুলে ধরেছিলেন নদীটির গুরুত্ব, এর ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে এর সম্ভাবনার কথা। একইসঙ্গে তিনি বালিশিরা পাহাড়কে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণার দাবিও জানান। জানা যায়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ মনোযোগ দিয়ে তার বক্তব্য শোনেন এবং বলেন, “নোট করে রাখা হলো।”

রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর সেই বক্তব্য তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশ, সিলেট কেন্দ্র থেকেও একাধিকবার প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু চার দশক পেরিয়ে গেলেও গোপলা নদী পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, “গোপলা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সমীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আমরা কাজ করব।”

প্রকৃতি, কৃষি, মৎস্য ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা গোপলা নদী এখন শুধুই এক মৃতপ্রায় জলধারা নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের পরিবেশগত সংকটেরও প্রতীক। দ্রুত পুনঃখনন ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ না নিলে একদিন হয়তো এই নদীর অস্তিত্ব থাকবে শুধু মানচিত্রে, স্মৃতিতে আর ইতিহাসের পাতায়।


সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

ফুলে মোড়া ‘ক্যাসিয়া জাভানিকা’: শিক্ষক তারেক হাসানের হাত ধরে সবুজে নতুন রূপে শ্রীমঙ্গল

প্রকাশিত :  ১০:২৩, ০৯ মে ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: প্রকৃতিকে ভালোবাসা অনেকেই প্রকাশ করেন কথায়, কেউবা ছবিতে। তবে শ্রীমঙ্গলের শিক্ষক ও আলোকচিত্রপ্রেমী তারেক হাসান সেই ভালোবাসাকে রূপ দিয়েছেন বাস্তব উদ্যোগে। ক্যামেরার ফ্রেমে প্রকৃতির সৌন্দর্য তুলে ধরার পাশাপাশি নিজের হাতে গাছ লাগিয়ে তিনি সবুজে সাজিয়ে তুলছেন পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলকে।

শ্রীমঙ্গল কলেজ রোডের কবরস্থানের পাশে তার লাগানো দুর্লভ ‘ক্যাসিয়া জাভানিকা’ গাছটি এখন ফুলে ফুলে সুশোভিত। গোলাপি আভায় মোড়া গাছটির মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ছে প্রতিনিয়ত। কেউ গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলছেন, কেউ আবার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই অনিন্দ্য রূপ।

স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগেও সড়কের পাশের স্থানটি ছিল একেবারেই সাধারণ। কিন্তু তারেক হাসানের পরিচর্যায় গাছটি আজ যেন পুরো এলাকাকে নতুন সৌন্দর্যে ভরিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে ফুল ফোটার মৌসুমে জায়গাটি ছোট্ট এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকেন্দ্রে পরিণত হয়।

তারেক হাসান মনে করেন, একটি গাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে না, মানুষের মনেও ছড়িয়ে দেয় প্রশান্তি ও সৌন্দর্যের অনুভূতি। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজ উদ্যোগে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় শতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শোভাবর্ধনকারী, ফলজ ও বনজ নানা প্রজাতির গাছ।

বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন নগরী ও চায়ের রাজ্যখ্যাত শ্রীমঙ্গলে প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। শহরের বিভিন্ন সড়কের পাশে ফুটে থাকা এমন দৃষ্টিনন্দন গাছপালা পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে নতুনভাবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দর্শনার্থীরাও এই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন।

অনেকেই বলছেন, পরিকল্পিতভাবে এমন বৃক্ষরোপণ অব্যাহত থাকলে শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা ও নগর সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রকৃতিপ্রেমী শিক্ষক তারেক হাসানের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু একটি গাছ লাগানোর গল্প নয়; এটি মানুষ ও প্রকৃতির বন্ধনের এক নীরব বার্তা। যেখানে সৌন্দর্য, পরিবেশ সচেতনতা ও মানবিক ভালোবাসা একসঙ্গে ফুটে উঠেছে ফুলে মোড়া একটি ‘ক্যাসিয়া জাভানিকা’ গাছের রঙিন ছায়ায়।