নবায়ন নয়, গঙ্গার পানিবণ্টনে ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি চায় বাংলাদেশ: পানিসম্পদমন্ত্রী
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেছেন, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন নয়, বরং গ্যারান্টি ক্লজসহ ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি চায় বাংলাদেশ। নতুন চুক্তিতে পানির প্রাপ্যতার ভিত্তিতে সমানভাবে পানিবণ্টন নিশ্চিত করার কথাও জানান তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশান-তেজগাঁও লিঙ্ক রোডের আলোকি কনভেনশন সেন্টারে ‘কল্লোলিনী: এ রিভার ডায়ালগ ২০২৬’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সংলাপের উদ্বোধনী অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে টিম ইউরোপ ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট অ্যান্ড এনার্জি এই জাতীয় সংলাপের আয়োজন করেছে। এর আয়োজক হিসেবে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এজেন্স ফ্রঁসেজ দ্য ডেভেলপমেন্ট (এএফডি), নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, জিআইজেড এবং বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস। আর সমন্বয়ে রয়েছে রেড অরেঞ্জ লিমিটেড ও ডেল্টারেস।
গঙ্গার পানিবণ্টন প্রসঙ্গে পানিসম্পদমন্ত্রী আরও বলেন, ‘শীত বা শুকনা মৌসুম বা বর্ষা মৌসুমে কি ধরনের হবে, সেখানে কোন সময় কতটা পানির প্রয়োজন, সেটার একটা হিসাব রয়েছে। সে হিসাব অনুযায়ী এখানে একটা গ্যারান্টি ক্লজ ইনক্লুড করা হয়। প্রাপ্যতার ভিত্তিতে আমি যেন সঠিক সময়ে সঠিক পানিটা পাই সেটা হল আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকলে এবং গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত না হলে অনেক সাফার করতে হবে। এটা একটা মরুভূমি হয়ে যাবে। কৃষিকাজ ও মাছের উৎপাদন ব্যাহত হবে। সর্বোপরি একটা অর্থনৈতিক যে রূপান্তর সেই রূপান্তর থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ব এবং সাধারণ মানুষ সুবিধা পাবে না। যেটা দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হবে। বর্ষা মৌসুমে পানির ঢলে বন্যা বা অতি প্লাবনেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব।
তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নের জবাবে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি অনেকগুলা ফিজিবিলিটি স্টাডি হাতে নিয়েছে। যার মধ্যে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্টেন্স রয়েছে, আমরা তাদের সেই সাপোর্ট নিচ্ছি। খুব শিগগিরই ম্যারেজ করার জন্য আমাদের যে স্টাডি কমপ্লিট করে দৃশ্যমান করা দরকার সেই দিকে আমরা নজর দিয়েছি। সে কাজটা দ্রুত আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, আমরা দ্রুত করার জন্য কাজ শুরু করেছি।
তিনি বলেন, আমরা এই প্রজেক্টটা এখন পর্যন্ত জিওজিতে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে ইন্টারন্যাশনাল হবে অথবা জিওজিও হতে পারে। ফিজিবিলিটি স্টাডি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এর আগের সংলাপের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, নদী আমাদের জন্য অর্থনীতির মেরুদণ্ড। পরিবর্তন এবং প্রাণের কারণে নদীর উপর অনেক চাপ পড়ছে। দেশের নদনদীগুলোকে রক্ষার জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। নদীর দূষণ রোধসহ নদী রক্ষায় পলিসি বের করতে হবে।
তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত রাখা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের নদ-নদীর ভবিষ্যৎ, বিশেষ করে শহরের নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা ও সুরক্ষায় করণীয় নিয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপের এবারের প্রতিপাদ্য ‘নদীকে জানি, সিদ্ধান্ত নিই একসঙ্গে’। যেখানে জাতীয় সংলাপে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত, নদী-নির্ভর জনগোষ্ঠী ও তরুণদের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। দিনব্যাপী আয়োজনে নদী ব্যবস্থাপনা ও আইনি সুরক্ষা, বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ ও জবাবদিহি, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তরুণদের অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক সংলাপ, জ্ঞান বিনিময় ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ—এই চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘কোথায় আছি, কোথায় যেতে চাই’ শীর্ষক উদ্বোধনী অধিবেশনে ‘BURIGANGA: Forgotten River Mother’ চলচ্চিত্রের ট্রেলার প্রদর্শন করা হয়। নদী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং রেড অরেঞ্জের সিনিয়র উপদেষ্টা মালিক ফিদা এ. খান সংলাপের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
রেড অরেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অর্ণব চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অধিবেশনে আরও বক্তব্য রাখেন এএফডি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সিনথিয়া মেলা, বাংলাদেশে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ডেলিগেশনের হেড অব ডেভেলপমেন্ট ড. মিশাল ক্রেইজা, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শার্লে, নেদারল্যান্ডসের মহামান্য রাষ্ট্রদূত ইয়োরিস ভ্যান বোমেল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিংফেং ঝাং, দৃকের পরিচালক তাপস পাল, রিভারাইন পিপলের প্রতিনিধি মাহবুবা রহমান প্রমুখ।
পরে ‘বিনিয়োগ থেকে প্রভাব: নদীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধিবেশনে বিদ্যমান নীতি, পরিকল্পনা ও উদ্যোগকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলে রূপ দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
নদী নিয়ে নীতিগত আলোচনার পাশাপাশি সৃজনশীল ও অংশগ্রহণমূলক বিভিন্ন আয়োজন থাকছে কল্লোলিনীতে। এতে পুরস্কারপ্রাপ্ত আলোকচিত্রী আবির আবদুল্লাহর নদীবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, দৃক গ্যালারি ও শূন্য আর্ট স্পেসের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী, পোস্টার উপস্থাপনা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টল এবং ফ্রেন্ডশিপ এনজিওর পরিবেশনায় বিষয়ভিত্তিক নাটক থাকবে।
বিকেলে যে সংলাপের সমাপনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।



















