এবার ক্যানসার রোগীর মুখের ছবি বা সেলফি বিশ্লেষণ করে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে পূর্বাভাস দিতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা।
ম্যাসাচুসেটসের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ম্যাস জেনারেল ব্রিগহ্যামের গবেষকরা এ প্রযুক্তি তৈরি করেছেন। এর লক্ষ্য রোগীর জৈবিক বয়স নির্ধারণ এবং মৃত্যুঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন বয়স ও জাতিগোষ্ঠীর চার কোটির বেশি মুখের ছবি দিয়ে এআই মডেলটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট ডিজিটাল হেলথে।
গবেষকরা দুটি টুল তৈরি করেছেন। এগুলোর নাম ‘এফএএইচআর-ফেইসএইজ’ ও ‘এফএএইচআর-ফেইসসারভাইভাল’।
প্রথম টুলটি মুখের ছবি বিশ্লেষণ করে রোগীর জৈবিক বয়স নির্ধারণ করে। এরপর সেই বয়সের ভিত্তিতে বেঁচে থাকার ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়। দ্বিতীয় টুলটি জৈবিক বয়স নির্ধারণের মধ্যবর্তী ধাপ ছাড়াই সরাসরি মুখের ছবি থেকে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনুমান করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, রোগীকে প্রকৃত বয়সের চেয়ে অন্তত পাঁচ বছর বেশি বয়স্ক দেখালে তার মৃত্যুঝুঁকি বেশি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে রেডিওথেরাপি নেওয়া ক্যানসার রোগীদের ওপর চালানো গবেষণায়, গড়ে চার বছরের পর্যবেক্ষণে তাদের মৃত্যুঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, যেসব রোগীকে প্রকৃত বয়সের চেয়ে অন্তত পাঁচ বছর কম বয়স্ক দেখিয়েছে এআই, তাদের মৃত্যুঝুঁকি ১৭ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, মুখের বিভিন্ন অংশ বিশ্লেষণ করে এআই বয়স ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান ও মাদক সেবনের মতো অভ্যাসের সঙ্গেও মুখে বয়সের ছাপ পড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
চিকিৎসকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি রোগীর শারীরিক সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং উপযুক্ত চিকিৎসা বেছে নিতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি বা অন্যান্য জটিল চিকিৎসার ঝুঁকি নির্ধারণে এটি কাজে আসতে পারে।
তবে শুধু মুখের ছবি দেখে ব্যক্তির আয়ু নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিটি চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের সতর্কতা: বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ ১৮% না কমালে বাড়বে বিপর্যয়
প্রকাশিত :
০৬:৫৩, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সারা বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ কমানোর গতি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘ। আগামী চার বছরের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ১৮ শতাংশ কমাতে হবে। আর ২০৩৫ সালের মধ্যে কমাতে হবে ৪৫ শতাংশ। তা না হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বাড়বে। বাড়বে তীব্র তাপপ্রবাহসহ নানা জলবায়ু বিপর্যয়ের ঝুঁকি।
জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির এক প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্য অর্জন এখন অত্যন্ত কঠিন। তবে তাপমাত্রা এই সীমা ছাড়িয়ে গেলেও অতিরিক্ত উষ্ণতা যতটা সম্ভব কম রাখা সম্ভব।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সেই অনুযায়ী কাজ করছে না। ফলে জলবায়ু সুরক্ষার লক্ষ্য ও দেশগুলোর নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
নিঃসরণ কমানোর গতি বাড়ানোর তাগিদ: প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ আগের বছরের কাছাকাছি ছিল। তবে গবেষকরা বলছেন, এক বছরের তথ্য দেখে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না যে, বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ বাড়া বন্ধ হয়েছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার কারণে নিঃসরণ আবারও বাড়তে পারে।
কারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও বিশ্বের অনেক দেশ এখনো কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানিনীতির পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ইউএনইপির হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমানো গেলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার ভালো সম্ভাবনা থাকবে। তবে এর পরও পৃথিবী আরও উষ্ণ হবে। তীব্র তাপপ্রবাহের মতো ঘটনাও ঘন ঘন ঘটতে পারে। কিন্তু নিঃসরণ দ্রুত কমানো গেলে ভবিষ্যতের বিপর্যয় আরও ভয়াবহ হওয়া ঠেকানো সম্ভব।
১.৫ ডিগ্রির লক্ষ্য অর্জন কঠিন: জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসন বলেছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার সুযোগ এখন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিশ্ব অনেক দেরি করেছে।
তবে তিনি দেশগুলোকে লক্ষ্যটি পুরোপুরি ছেড়ে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, তাপমাত্রা নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলেও সেই অতিরিক্ত উষ্ণতার সময়কাল ও মাত্রা কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। যত দ্রুত নিঃসরণ কমানো যাবে, ততই ভবিষ্যতের ক্ষতি সীমিত রাখার সুযোগ বাড়বে।
শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে না দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে। বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
প্রতিশ্রুতি থাকলেও কাজ কম: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশগুলোকে নতুন করে নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা ছিল। গত বছরের নভেম্বরে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু দেশগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি প্রয়োজনের তুলনায় দুর্বল ছিল বলে ইউএনইপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস বলছে, দেশগুলো তাদের হালনাগাদ প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলেও শতাব্দীর শেষ দিকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। আর বর্তমানে যেসব নীতি কার্যকর রয়েছে, সেগুলো অপরিবর্তিত থাকলে তাপমাত্রা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতি বিশ্বের বহু অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য বড় হুমকি তৈরি করতে পারে। তাপমাত্রা যত বেশি বাড়বে, ততই চরম আবহাওয়া ও জলবায়ুর বড় পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়বে।
জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর আহ্বান: জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেছেন, সব দেশেরই নিঃসরণ কমানোর দায়িত্ব রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মতো বড় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তার মতে, এসব দেশকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এসে জলবায়ুবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে, পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহাম্মদ আদো বলেছেন, সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারগুলো যথেষ্ট দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
এখনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে: জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমানোর একটি কার্যকর উপায় হলো মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমানো। ইউএনইপির মতে, স্বল্প সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে মিথেন নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় মিথেন অনেক বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সমাধান অনেকটাই মানুষের নাগালের মধ্যে রয়েছে। সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দ্রুত নিঃসরণ হ্রাসের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—বিশ্বকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে থেমে থাকলে চলবে না। আগামী কয়েক বছরের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের উষ্ণতা ও জলবায়ু বিপর্যয়ের মাত্রা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।