img

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস: মনোযোগ দিয়ে শোনার শক্তি: কীভাবে সহমর্মিতা মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে

প্রকাশিত :  ১০:১৬, ১০ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪৯, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস: মনোযোগ দিয়ে শোনার শক্তি: কীভাবে সহমর্মিতা মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে
॥ হুসনা খান হাসি॥

প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন করা হয়। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং মানুষকে তাদের মানসিক ও আবেগীয় সুস্থতার প্রতি যত্নশীল হতে উৎসাহিত করা। বর্তমানের দ্রুতগতির পৃথিবীতে মানুষ প্রায়ই মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও আবেগীয় অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই করে। শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হলেও মানসিক স্বাস্থ্য অনেক সময় অবহেলিত হয় অথবা ভুলভাবে বোঝা হয়। একটি সুস্থ মন ভারসাম্যপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ ও অর্থবহ জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য। এই দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানসিক স্বাস্থ্য সামগ্রিক সুস্থতার একটি মৌলিক অংশ এবং প্রত্যেক মানুষ যত্ন, সম্মান ও বোঝাপড়া পাওয়ার অধিকারী। সহমর্মিতা, সদয় আচরণ এবং মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনার মতো সহজ কাজের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক স্বাস্থ্য বলতে মানুষের আবেগীয়, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সুস্থতাকে বোঝায়। আমরা কীভাবে চিন্তা করি, অনুভব করি, আচরণ করি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি, তা মানসিক স্বাস্থ্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ সব সময় সুখী থাকবেন অথবা জীবনে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হবেন না। বরং সুস্থ মানসিক অবস্থা মানুষকে জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে, সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং প্রতিকূলতা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। বয়স, লিঙ্গ, পেশা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা আর্থিক অবস্থা যা-ই হোক না কেন, যে কেউ মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারলে আমরা সংকটে থাকা মানুষের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হতে পারি। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ব্যক্তি ও সমাজকে মানবজীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে মানসিক স্বাস্থ্যকে মূল্যায়ন করতে উৎসাহিত করে।

সহমর্মিতা হলো অন্য মানুষের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার ক্ষমতা। এটি আমাদের বাহ্যিক আচরণের আড়ালে থাকা অনুভূতিগুলো উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। যে মানুষটিকে বাইরে থেকে হাসিখুশি মনে হয়, তিনি হয়তো ভেতরে ভেতরে গভীর দুঃখে ভুগছেন। আবার কারও অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে ব্যক্তিগত কোনো সংকট কাজ করতে পারে। সহমর্মিতা আমাদের সমালোচনা করার পরিবর্তে বোঝার চেষ্টা করতে শেখায়। মানুষ যখন অনুভব করে যে তার আবেগকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে এবং সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, তখন সে নিজেকে নিরাপদ, মূল্যবান ও সমর্থিত মনে করে। এ ধরনের আবেগীয় সংযোগ একাকিত্ব কমাতে পারে এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে মানুষ নিজের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উদ্বেগের কথা স্বাচ্ছন্দ্যে প্রকাশ করতে পারে।

সহমর্মিতা প্রকাশের পাশাপাশি, মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা সহমর্মিতা প্রকাশের সবচেয়ে সহজ অথচ অর্থবহ উপায়গুলোর একটি। অনেক সময় কথোপকথনের সময় মানুষ অন্যের বক্তব্য সত্যিকার অর্থে বোঝার পরিবর্তে নিজের উত্তর দেওয়ার প্রস্তুতিতে বেশি মনোযোগ দেয়। সক্রিয়ভাবে শোনার জন্য ধৈর্য, মনোযোগ এবং অন্যের অনুভূতি বোঝার আন্তরিক ইচ্ছা প্রয়োজন। এর অর্থ হলো কাউকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া, অপ্রয়োজনীয়ভাবে কথার মাঝখানে বাধা না দেওয়া এবং চিন্তাভাবনা করে প্রতিক্রিয়া জানানো। কখনো কখনো একজন মানুষের উপদেশ বা সমস্যার সমাধান প্রয়োজন হয় না, বরং তিনি চান কেউ তাঁর কথা মন দিয়ে শুনুক। কয়েক মিনিটের নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগও কাউকে একাকিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে এবং কঠিন অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে। তাই মনোযোগ দিয়ে শোনা মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।

তবে মনোযোগ দিয়ে শোনার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,
খোলামেলা ও আন্তরিক যোগাযোগের অন্যতম বড় বাধা হলো অন্যের বিচারের শিকার হওয়ার ভয়। মানুষ অনেক সময় নিজের সমস্যার কথা বলতে দ্বিধা করে, কারণ সে আশঙ্কা করে যে অন্যরা তাকে দুর্বল, দায়িত্বজ্ঞানহীন অথবা অযোগ্য মনে করবে। ‘তুমি বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করছ’ কিংবা ‘অন্যদের সমস্যা তো আরও বেশি’ এমন মন্তব্য কাউকে ভুল বোঝা হয়েছে বলে অনুভব করাতে পারে এবং তার মধ্যে লজ্জা সৃষ্টি করতে পারে। এর পরিবর্তে আমাদের এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা উচিত, যেখানে মানুষ সমালোচনার ভয় ছাড়াই নিজের কথা বলতে পারে। বিচার না করে শোনার অর্থ এই নয় যে অন্যের প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে হবে। এর অর্থ হলো তার অনুভূতিকে সম্মান করা এবং তার অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করা। এ ধরনের আচরণ পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলে এবং প্রয়োজনের সময় মানুষকে সাহায্য চাইতে উৎসাহিত করে।

এই বিচারহীন মনোভাবের সঙ্গে সদয় আচরণও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সদয় আচরণ মানুষের দিনকে আনন্দময় করে তুলতে পারে এবং তার মধ্যে আপনত্বের অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে। একটি কোমল কথা, আন্তরিক প্রশংসা, যত্নভরা বার্তা কিংবা সাহায্যের প্রস্তাবকে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের ছোট উদ্যোগ মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক চাপ বা দুঃখে থাকা মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে কেউ তার প্রতি যত্নশীল, তখন সে সান্ত্বনা ও মানসিক শক্তি খুঁজে পায়। সদয় আচরণ যিনি করেন, তিনিও এর মাধ্যমে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং সহায়ক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে আমাদের মনে রাখা উচিত যে সদয় হতে সব সময় বড় কোনো উদ্যোগ বা আর্থিক সামর্থ্যের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় যত্ন, ধৈর্য ও বিবেচনাপূর্ণ আচরণের সাধারণ প্রকাশই সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে।

তবে সদয় আচরণকে কার্যকর করতে হলে অন্যের অপ্রকাশিত কষ্টও উপলব্ধি করা জরুরি। সব মানুষ নিজের মানসিক কষ্ট প্রকাশ্যে প্রকাশ করতে পারেন না। কেউ হাসির আড়ালে দুঃখ লুকিয়ে রাখেন, কেউ নিজের উদ্বেগের কথা নীরবে সহ্য করেন, আবার কেউ প্রচণ্ড মানসিক চাপে থেকেও দায়িত্ব পালন করে যান। তাঁরা হয়তো পরিবারকে হতাশ করার, সহকর্মীদের সম্মান হারানোর কিংবা অন্যের বোঝা হয়ে ওঠার ভয়ে নিজের কষ্ট প্রকাশ করেন না। ফলে তাঁদের সংগ্রাম দীর্ঘ সময় ধরে অন্যদের চোখের আড়ালে থেকে যেতে পারে। তাই কাউকে শক্তিশালী বা সফল দেখালেই ধরে নেওয়া উচিত নয় যে তিনি ভালো আছেন। আন্তরিকভাবে তাঁর খোঁজ নেওয়া, আচরণের পরিবর্তন লক্ষ করা এবং মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শোনার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব যে তাঁর সহায়তার প্রয়োজন আছে কি না। অন্যের এই নীরব সংগ্রামগুলো বুঝতে পারলে আমরা উদাসীনতার পরিবর্তে সংবেদনশীলতা ও সহমর্মিতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি।

এই নীরব সংগ্রামগুলো যথাযথভাবে বুঝতে হলে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা দূর করা প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লেও অনেক সমাজে এ-সংক্রান্ত সমস্যা এখনো নেতিবাচক সামাজিক ধারণা ও কলঙ্কের সঙ্গে যুক্ত। বিষণ্নতা, উদ্বেগ কিংবা অন্যান্য মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষকে অনেক সময় অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা হয় অথবা নানা নেতিবাচক তকমা দেওয়া হয়। এ ধরনের মনোভাব তাঁদের নিজেদের সমস্যার কথা বলা কিংবা পেশাদার সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে হলে আমাদের বুঝতে হবে যে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার লক্ষণ নয়। মানুষ যেমন শারীরিক অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়, তেমনি মানসিক ও আবেগীয় সমস্যার ক্ষেত্রেও স্বাচ্ছন্দ্যে সাহায্য নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। খোলামেলা আলোচনা, সম্মানজনক ভাষার ব্যবহার এবং সঠিক জ্ঞান ক্ষতিকর প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস লজ্জা ও নীরবতার পরিবর্তে গ্রহণযোগ্যতা, সহমর্মিতা এবং আশার পরিবেশ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করে।

এক্ষেত্রে পরিবার ও বন্ধুবান্ধদে ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের বোঝাপড়া, ভালোবাসা ও উৎসাহ মানুষকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যে অভিভাবক ধৈর্য ধরে সন্তানের কথা শোনেন, যে বন্ধু কঠিন সময়ে খোঁজ নেন কিংবা যে জীবনসঙ্গী সহমর্মিতার সঙ্গে সাড়া দেন, তাঁরা একজন মানুষের জীবনে অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারেন। তবে কাউকে সহায়তা করার অর্থ এই নয় যে তাঁকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে বাধ্য করতে হবে অথবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও উপদেশ দিতে হবে। বরং তাঁর ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করা, ধৈর্য ধারণ করা এবং তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে তিনি একা নন। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবার ও বন্ধুদের উচিত পেশাদার সহায়তা নিতে উৎসাহিত করা। দৃঢ় ব্যক্তিগত সম্পর্ক মানসিক স্থিতিস্থাপকতা অর্জন এবং সংকট কাটিয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও মানসিক সুস্থতার প্রতি যত্নশীল হওয়া জরুরি। কর্মক্ষেত্র এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ, যেখানে সহমর্মিতা ও মনোযোগ দিয়ে শোনার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো সম্ভব। অতিরিক্ত কাজের চাপ, কঠোর সময়সীমা, চাকরির অনিশ্চয়তা কিংবা পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার অসুবিধার কারণে কর্মীরা মানসিক চাপে ভুগতে পারেন। ব্যবস্থাপক ও সহকর্মীরা এসব উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিলে কর্মক্ষেত্রের চাপ সামলানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, সম্মানজনক যোগাযোগ, বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা এবং সহযোগিতাপূর্ণ নেতৃত্ব একটি স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কর্মীদের এমনভাবে নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে তাঁদের অপমানিত হওয়া বা অন্যায় আচরণের শিকার হওয়ার ভয় না থাকে। সংক্ষিপ্ত অথচ আন্তরিক একটি কথোপকথনও সহকর্মীকে স্বীকৃত ও সম্মানিত বোধ করাতে পারে। মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেয় এমন কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক বিশ্বাস, সহযোগিতা, উৎপাদনশীলতা এবং আপনত্বের অনুভূতি বৃদ্ধি পায়।

একইভাবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বৃহত্তর সমাজেরও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজেরও সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার উদ্বেগ, বুলিং বা সহপাঠীদের দ্বারা হয়রানি, পারিবারিক সমস্যা কিংবা অবাস্তব প্রত্যাশা পূরণের চাপে ভুগতে পারে। যেসব শিক্ষক ধৈর্য ধরে শিক্ষার্থীদের কথা শোনেন এবং বোঝাপড়ার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানান, তাঁরা শিক্ষার্থীদের নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও সচেতনতামূলক কর্মসূচি, আলোচনা সভা এবং পারস্পরিক সহযোগিতাকে উৎসাহিত করে এমন কার্যক্রমের আয়োজন করতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁরা একাকিত্বে ভোগেন বা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তাঁদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যত্নশীল পরিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ মানসিক সমস্যাগুলোকে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই মোকাবিলা করতে এবং প্রয়োজনে সাহায্য নিতে মানুষকে উৎসাহিত করতে পারে।

এই দায়িত্ব পালনের সূচনা হতে পারে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে।মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন সব সময় বড় ধরনের সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে শুরু হয় না। অন্যের প্রতি আন্তরিক যত্ন প্রকাশ করে এমন ছোট ছোট দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমেও এর সূচনা হতে পারে। কথোপকথনের সময় আমরা মুঠোফোন সরিয়ে রেখে অন্যের প্রতি মনোযোগ দিতে পারি, কেউ কেমন আছেন তা আন্তরিকভাবে জানতে চাইতে পারি, তিনি আগে যে উদ্বেগের কথা বলেছিলেন তা মনে রাখতে পারি কিংবা কঠিন সময়ে তাঁর সঙ্গী হতে পারি। একই সঙ্গে গুজব ছড়ানো, কষ্টদায়ক মন্তব্য করা কিংবা একজনের দুঃখের সঙ্গে অন্যজনের দুঃখের তুলনা করা থেকে বিরত থাকতে পারি। এই সাধারণ অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে বোঝাপড়া ও পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। মানুষ যখন দৈনন্দিন জীবনে সহমর্মিতা অনুভব করে, তখন তারাও অন্যের প্রতি একই রকম সহমর্মিতা প্রদর্শনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এভাবেই ব্যক্তিগত পর্যায়ের ছোট ছোট সহমর্মিতামূলক উদ্যোগ পুরো সমাজে বৃহত্তর ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পেশাদার সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও অপরিহার্য।
সহমর্মিতা, সদয় আচরণ এবং মনোযোগ দিয়ে শোনার গুরুত্ব অপরিসীম হলেও প্রয়োজনের সময় এগুলো পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প হতে পারে না। দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ, মানসিক যন্ত্রণা কিংবা দৈনন্দিন কাজ পরিচালনায় অসুবিধা দেখা দিলে যোগ্য পেশাজীবীদের সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। মানুষ যেন লজ্জা বা হীনম্মন্যতায় না ভোগে, সেদিকে খেয়াল রেখে তাদের উপযুক্ত সহায়তা নিতে উৎসাহিত করা উচিত। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে সরকার, স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিয়োগকর্তা এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে মানসিক সমস্যার সতর্কসংকেত চেনা এবং নির্ভরযোগ্য সহায়তা কোথায় পাওয়া যায়, সে সম্পর্কেও মানুষকে জানাতে হবে। সহমর্মিতাপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পেশাদার চিকিৎসাসেবা এবং কার্যকর জননীতি একত্রে বাস্তবায়ন করতে পারলে সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার আরও শক্তিশালী ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানসিক সুস্থতা একটি সম্মিলিত দায়িত্ব এবং প্রত্যেক মানুষ শোনা, বোঝা ও সম্মান পাওয়ার অধিকারী। মনোযোগ দিয়ে শোনার প্রকৃত শক্তি নিখুঁত শব্দ খুঁজে পাওয়ার মধ্যে নয়, বরং আন্তরিক মনোযোগ, ধৈর্য ও সহমর্মিতা প্রদানের মধ্যে নিহিত। সহমর্মিতা আমাদের অন্যের সংগ্রাম বুঝতে সাহায্য করে, সদয় আচরণ মানসিক সান্ত্বনা দেয় এবং বিচারহীন কথোপকথন পারস্পরিক বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করে। এসব গুণ সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে, একাকিত্ব কমাতে এবং মানুষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে। এই দিবসের চেতনাকে শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর আমাদের ঘর, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মনোযোগ দিয়ে শোনার একটি সাধারণ কাজও মানবিকতার শক্তিশালী প্রকাশ হয়ে উঠতে পারে। হৃদয় দিয়ে অন্যের কথা শুনে এবং সদয় আচরণের মাধ্যমে সাড়া দিয়ে আমরা এমন একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য যথাযথ গুরুত্ব পাবে, মানুষের কষ্ট সহমর্মিতার সঙ্গে উপলব্ধি করা হবে এবং কেউ নিজের সংগ্রামে একাকী বোধ করবে না।

হুসনা খান হাসি
লন্ডন, ইউকে
১০/১০/২০২৬

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর

img

স্টারলিংক নিয়ে মুখোমুখি মাস্ক-ভারত, পালটাপালটি বার্তা

প্রকাশিত :  ০৭:০৯, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

ভারতে স্টারলিংকের বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর পথে কারা বাধা দিচ্ছে, তা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন ইলন মাস্ক। বুধবার এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে স্পেসএক্সের কর্ণধার অভিযোগ করেন, কিছু ‘অলিগার্ক’ বা উগ্রপন্থী গোষ্ঠী নিজেদের একচেটিয়া ব্যবসায়িক আধিপত্য ধরে রাখতে ভারতে স্টারলিংকের প্রবেশ ঠেকিয়ে দিচ্ছে।

তবে মাস্কের অভিযোগের পরই বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভারত সরকার তা খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। দেশটির যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বলেছে, স্যাটেলাইট যোগাযোগ সেবার জন্য ভারতে একটি ‘ন্যায্য ও বৈষম্যহীন’ অনুমোদন কাঠামো রয়েছে।

সম্প্রতি ইলন মাস্ক অভিযোগ করেন, ভারতের কিছু ‘অলিগার্ক’ নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে স্টারলিংকের প্রবেশ আটকে দিচ্ছে।

তবে ভারতীয় যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটিতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ সেবার অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে না। লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকেই নির্ধারিত নিরাপত্তা শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে।

ভারতে ইতোমধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে জিএমপিসিএস—গ্লোবাল মোবাইল পার্সোনাল কমিউনিকেশন বাই স্যাটেলাইট—লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো ইলন মাস্কের স্টারলিংক, ভারতী গ্রুপ-সমর্থিত ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব এবং জিও প্ল্যাটফর্মসের মালিকানাধীন জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস। এ ছাড়া জেফ বেজোসের অ্যামাজন লিও-ও লাইসেন্সের অপেক্ষায় রয়েছে।

মন্ত্রণালয় বলেছে, লাইসেন্সধারী সব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা মূল্যায়ন বর্তমানে চলছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের এই প্রক্রিয়া শেষ হলে তারা পরবর্তী ধাপে স্পেকট্রাম বরাদ্দের জন্য আবেদন করতে পারবে।

স্টারলিংক এক বছরেরও বেশি আগে ভারতে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পেলেও এখনো দেশটিতে বাণিজ্যিক সেবা শুরুর চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। তবে ভারতের দাবি, লাইসেন্স পাওয়া তিন প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে প্রায় একই নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে স্টারলিংককে ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখার অভিযোগ ভিত্তিহীন।

এর আগে ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেস ২০২৬-এ স্পেসএক্সের স্টারলিংক বিজনেস অপারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন ড্রেয়ার বলেন, ভারতে সেবা চালুর জন্য প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করেছে।

তিনি জানান, ভারতের জন্য ২০টি গেটওয়ে সাইট স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে শত শত অ্যান্টেনা রয়েছে। ভারতীয় নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত মেনে ব্যবহারকারীদের তথ্য দেশটির ভেতরেই রাখার ব্যবস্থাও করেছে স্টারলিংক।

ফলে স্টারলিংকের বাণিজ্যিক সেবা চালুর ক্ষেত্রে এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের নিরাপত্তা যাচাই ও স্পেকট্রাম বরাদ্দের পরবর্তী প্রক্রিয়া।