img

প্রথম ইউনিটের ফিজিক্স টেস্ট সম্পন্ন, রূপপুরে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি

প্রকাশিত :  ০৬:৫৫, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

প্রথম ইউনিটের ফিজিক্স টেস্ট সম্পন্ন, রূপপুরে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা ও কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদন মিললেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক পর্যায় ‘সি স্টেজ’ বা পাওয়ার স্টার্টআপে প্রবেশ করবে ইউনিটটি।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৫ অক্টোবরের দিকে পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি চলছে। তবে এ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।

এদিকে, রূপপুর প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় বাংলাদেশ সফররত উচ্চপর্যায়ের রুশ প্রতিনিধিদল বৃহস্পতিবার রাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকীর মাহবুব আনামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এসময় প্রতিনিধিদল মন্ত্রীকে প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের ক্রিটিক্যাল পর্যায়সহ সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাশিয়ার দূতাবাসের এক বিজ্ঞপ্তি ও ফেসবুক পোস্টে এ তথ্য জানানো হয়।

দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রোসাটমের প্রথম উপমহাপরিচালক এবং অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের (এএসই) প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেই পেত্রোভের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ২০-২৩ অক্টোবর পর্যন্ত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনে বাংলাদেশ সফর করে। এসময় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

ঢাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও প্রকল্পের পরিচালনাকারী সংস্থা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।

দূতাবাসের পোস্টে বলা হয়, বৈঠকে উভয়পক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ ও প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করে। পাশাপাশি অদূর ভবিষ্যতে যৌথভাবে বাস্তবায়নযোগ্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও মতবিনিময় হয়।

এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান বলেন, প্রথম ইউনিটের বি-২ ধাপের সব পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হয়েছে। এ ধাপের ফিজিক্স টেস্টও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার পরীক্ষার প্রতিবেদন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, উচ্চপর্যায়ের রুশ প্রতিনিধিদল বৈঠকে ইউনিট-১-এর ক্রিটিক্যাল পর্যায়ের অগ্রগতি সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলে ইউনিটটি সি স্টেজে প্রবেশ করবে এবং এরপর পাওয়ার স্টার্টআপের কার্যক্রম শুরু হবে।

জাহেদুল হাসান আরও বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। পরবর্তী কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মাসের শেষ দিকে, সম্ভাব্য ২৫ অক্টোবর, পাওয়ার স্টার্টআপ শুরুর প্রস্তুতি রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে এ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, উৎপাদনক্ষমতা ৩০-৩৫ শতাংশে পৌঁছালে কেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সে অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর আশা করা হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি নির্ভর করবে পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার ওপর।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর

img

জাতিসংঘের সতর্কতা: বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ ১৮% না কমালে বাড়বে বিপর্যয়

প্রকাশিত :  ০৬:৫৩, ২২ অক্টোবর ২০২৬

সারা বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ কমানোর গতি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘ। আগামী চার বছরের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ১৮ শতাংশ কমাতে হবে। আর ২০৩৫ সালের মধ্যে কমাতে হবে ৪৫ শতাংশ। তা না হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বাড়বে। বাড়বে তীব্র তাপপ্রবাহসহ নানা জলবায়ু বিপর্যয়ের ঝুঁকি।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির এক প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্য অর্জন এখন অত্যন্ত কঠিন। তবে তাপমাত্রা এই সীমা ছাড়িয়ে গেলেও অতিরিক্ত উষ্ণতা যতটা সম্ভব কম রাখা সম্ভব।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সেই অনুযায়ী কাজ করছে না। ফলে জলবায়ু সুরক্ষার লক্ষ্য ও দেশগুলোর নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

নিঃসরণ কমানোর গতি বাড়ানোর তাগিদ: প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ আগের বছরের কাছাকাছি ছিল। তবে গবেষকরা বলছেন, এক বছরের তথ্য দেখে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না যে, বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ বাড়া বন্ধ হয়েছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার কারণে নিঃসরণ আবারও বাড়তে পারে।

কারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও বিশ্বের অনেক দেশ এখনো কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানিনীতির পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

ইউএনইপির হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমানো গেলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার ভালো সম্ভাবনা থাকবে। তবে এর পরও পৃথিবী আরও উষ্ণ হবে। তীব্র তাপপ্রবাহের মতো ঘটনাও ঘন ঘন ঘটতে পারে। কিন্তু নিঃসরণ দ্রুত কমানো গেলে ভবিষ্যতের বিপর্যয় আরও ভয়াবহ হওয়া ঠেকানো সম্ভব।

১.৫ ডিগ্রির লক্ষ্য অর্জন কঠিন: জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসন বলেছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার সুযোগ এখন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিশ্ব অনেক দেরি করেছে।

তবে তিনি দেশগুলোকে লক্ষ্যটি পুরোপুরি ছেড়ে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, তাপমাত্রা নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলেও সেই অতিরিক্ত উষ্ণতার সময়কাল ও মাত্রা কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। যত দ্রুত নিঃসরণ কমানো যাবে, ততই ভবিষ্যতের ক্ষতি সীমিত রাখার সুযোগ বাড়বে।

শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে না দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে। বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

প্রতিশ্রুতি থাকলেও কাজ কম: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশগুলোকে নতুন করে নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা ছিল। গত বছরের নভেম্বরে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু দেশগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি প্রয়োজনের তুলনায় দুর্বল ছিল বলে ইউএনইপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংস্থাটির পূর্বাভাস বলছে, দেশগুলো তাদের হালনাগাদ প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলেও শতাব্দীর শেষ দিকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। আর বর্তমানে যেসব নীতি কার্যকর রয়েছে, সেগুলো অপরিবর্তিত থাকলে তাপমাত্রা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতি বিশ্বের বহু অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য বড় হুমকি তৈরি করতে পারে। তাপমাত্রা যত বেশি বাড়বে, ততই চরম আবহাওয়া ও জলবায়ুর বড় পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়বে।

জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর আহ্বান: জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেছেন, সব দেশেরই নিঃসরণ কমানোর দায়িত্ব রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মতো বড় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তার মতে, এসব দেশকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এসে জলবায়ুবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে।

অন্যদিকে, পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহাম্মদ আদো বলেছেন, সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারগুলো যথেষ্ট দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

এখনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে: জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমানোর একটি কার্যকর উপায় হলো মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমানো। ইউএনইপির মতে, স্বল্প সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে মিথেন নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় মিথেন অনেক বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস।

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সমাধান অনেকটাই মানুষের নাগালের মধ্যে রয়েছে। সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দ্রুত নিঃসরণ হ্রাসের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—বিশ্বকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে থেমে থাকলে চলবে না। আগামী কয়েক বছরের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের উষ্ণতা ও জলবায়ু বিপর্যয়ের মাত্রা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর