img

মেঘালয়ের ডাউকির সেতুর সাথে জড়িয়ে আছে সিলেটের দুই কৃতি সন্তানের নাম

প্রকাশিত :  ১২:৩০, ১১ জুলাই ২০২৫

মেঘালয়ের ডাউকির সেতুর সাথে জড়িয়ে আছে সিলেটের দুই কৃতি সন্তানের নাম
সংগ্রাম দত্ত: বর্তমানে অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের যুগে  বাংলাদেশ পর্যটন শিল্প অনেক এগিয়ে গেছে। ছোঁয়া লেগেছে বাংলাদেশের সর্বত্রই। প্রতিদিন শত শত পর্যটক সিলেট জেলার জাফলং পর্যটনে দাঁড়িয়ে ভারতের বর্তমান মেঘালয় রাজ্যের উমগট নদীর উপর ডাউকির দৃষ্টিনন্দন ঝুলন্ত ব্রিজ সকলেই উপভোগ করেন। কিন্তু অনেকেরই কাছে এখনো অজানা যে এই ব্রিজটি কারা বানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন, ডিজাইন ও নির্দেশনায়  শত বছর পূর্বে সেতু তৈরিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।  ঐ সময় বসন্ত কুমার দাস মন্ত্রী থাকার সুবাদে বাজেট পাস করিয়েছিলেন ও শ্রীহট্টের প্রখ্যাত প্রকৌশলী আবিদ রেজার ডিজাইন ও নির্দেশনায় ১৯৩২ সালে পূর্ণতা পায় ডাউকির উমগট নদীর উপর নির্মিত দর্শনীয় ঝুলন্ত সেতু। তারা উভয়ই তৎকালীন সিলেট জেলার  বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। 

আজ হতে শতবর্ষ পূর্বে ১৯১৯ সাল অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতবর্ষ । কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেড়াতে আসলেন উত্তর-পূর্ব ভারতের শৈলশহর শিলং\'এ । শ্রীহট্টে এই খবর শুনে শুরু হলো গুরুদেবকে নিয়ে আসার তোড়জোর । বাঁধা হয়ে আসলো শিলং-শ্রীহট্ট সড়ক । এদিকে গুরুদেব মানুষের পিঠে থাবায় চড়ে আসতে অপরাগ । অবশেষে গুয়াহাটি-বদরপুর-লাতু-কুলাউড়া আন্তঃসংযোগ আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েতে কবিগুরু শ্রীহট্টে পদার্পণ করলেন । 

বিষয়টি প্রথমে সবার দৃষ্টিতে নিয়ে আসেন সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতা ও আসাম প্রাদেশিক শিক্ষা ও অর্থমন্ত্রী দক্ষিণ শ্রীহট্ট (বর্তমানে মৌলবীবাজার) এর সন্তান আইন কৌশলী খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ ওরফে কাপ্তান মিয়া । কিছুদিন পর কাপ্তান মিয়া প্রয়াত হন । তখন থেকেই রাজ্যের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠে শিলং-ডাউকি-তামাবিল-শ্রীহট্ট সড়ক নিয়ে । যদিও জয়ন্তিয়া মহকুমার জোয়াই হয়ে বেশ খানিকটা সময় ঘুরে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি ভঙ্গুর মেঠোপথের একটি চিহ্ন ছিলো । 

বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশক । বিষয়টি যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলে তৎকালীন কংগ্রেস নেতা ও আসাম প্রাদেশিক সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী (প্রথমে পার্লামেন্ট স্পীকার, পরবর্তীতে মন্ত্রী) শ্রীহট্টের দক্ষিণ সুরমার রেঙ্গা গ্রামের সন্তান বসন্ত কুমার দাসকে  । তিনি উদ্যোগ নেন রাস্তাটি নির্মাণের । মন্ত্রী বসন্ত কুমার দাসের অকৃত্রিম প্রচেষ্টায় অর্থবাজেটে সেটি বরাদ্দও হয়ে যায় । এগিয়ে আসে ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সরকার । কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় খাসি ও জৈন্তিয়া পাহাড়কে বিভক্তকারী খরস্রোতা \'উমগট নদী\'। মন্ত্রী বসন্ত দাস প্রমাদ গুনলেন । এদিকে আসামের কাছাড় জেলার হাইলাকান্দি মহকুমার রাঙাউটি গ্রামের (পরবর্তীতে শ্রীহট্ট শহরের জিন্দাবাজারের কাজী ইলিয়াস পাড়ায় বসবাস) তরুণ ছেলে আবিদ রেজা চৌধুরী তখন \'বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ\' শিবপুর পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকৌশল শিক্ষা নিয়ে সবেমাত্র চাকুরীতে যোগ দিয়েছেন । সেটা ১৯২৯ সালের কথা। বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আবিদ রেজা চৌধুরীই খুব সম্ভবতঃ শ্রীহট্টের প্রথম মুসলিম প্রকৌশলী । আবিদ রেজার ডিজাইন ও নির্দেশনায় ১৯৩২ সালে নির্মিত হলে পূর্ণতা পায় ডাউকির দর্শনীয় ঝুলন্ত সেতু । 

উল্লেখ্য যে, শ্রীহট্টে সুরমা নদীর উপর নির্মিত \'কীন্ ব্রিজ\' তৈরী হয়েছিল ১৯৩৬ সালে । ডাউকির উমগট্ নদীর উপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই সেতুকে তখন বলা হতো Gateway of Shillong. সংযোগ স্থাপিত হলো খাসি ও জৈন্তিয়া পর্বতমালার । উন্মোচিত হলো শিলং-শ্রীহট্টের নুতন দ্বার । 

এই আবিদ রেজা চৌধুরীর সন্তানই বাংলাদেশের স্বনামধন্য প্রয়াত প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী । যাঁকে সবাই চেনেন জেআরসি (JRC) নামে । আজ ডাউকির ঝুলন্ত সেতুকে দেখতে হাজারো পর্যটকের ভীড়ে ক\'জনই মনে রাখছে তৎকালীন মন্ত্রী বসন্ত কুমার দাস যিনি বাজেটে অর্থ পাস করিয়াছিলেন ও  প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরীর নাম । আবিদ রেজা চৌধুরীর মামাবাড়িও ছিলো তৎকালীন শ্রীহট্টের করিমগঞ্জ মহকুমার জফরগড় পরগণার পাথারকান্দিতে । রেডক্লিফ লাইনের সুবাদে যা\' এখন ভারতে । আজ বাংলাদেশের পর্যটনতীর্থ জাফলং এ দাঁড়িয়ে ডাউকির ঝুলন্ত সেতু দেখলে কি ভাবতেন আবিদ রেজা কিংবা বসন্ত কুমার দাস ? ব্রিটিশদের দেয়া স্বাধীনতার নামে দেশভাগ আমাদের সকলকে কোথায় নিয়ে গেছে!


সংগ্রাম দত্ত. লেখক

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

দেওড়াছড়া চা বাগানে ৩ সপ্তাহ ধরে মজুরি বন্ধ, আন্দোলনে শ্রমিকরা

প্রকাশিত :  ১৩:২১, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলাস্থ রহিমপুর ইউনিয়নের বাংলাদেশ টি বোর্ডের নিয়ন্ত্রাধীন দেওড়াছড়া চা বাগানে ৩ সপ্তাহ ধরে চা শ্রমিকদের তলব বা মজুরী প্রদান না করায় বাগানের শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও আন্দোলন করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা অফিসের মেইন গেইটে তালা ঝুলিয়ে দেন।

এরপর বৃহস্পতিবার বিকেলে বকেয়া পাওয়া শুরু হলে শ্রমিকরা আন্দোলন থেকে সরে আসে।

জানা যায়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া চা বাগানে গত ৩ সপ্তাহ ধরে শ্রমিকদের মজুরী প্রদান করতে পারছেন না। এতে করে বিপাকে পড়েছেন কয়েক শতাধিক চা শ্রমিক। চা শ্রমিকরা মজুরী প্রদানের দাবি জানালেও বাগান কৃতর্পক্ষ নিশ্চুপ রয়েছে। দেওড়াছড়া চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির পক্ষ হতে গত ১২ এপ্রিল শ্রম অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বরাবর একটি লিখিত আবেদন জানিয়ে ছিল। কিন্তু ৪/৫ দিন অতিবাহিত হলেও কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে চা বাগানের বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা বাগানের অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে অফিসের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দেয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চা শ্রমিকরা অফিসের সামনে অবস্থান করছেন।

দেওড়াছড়া চা বাগান সূত্রে জানা যায়, এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে বাগানের একজন অনিয়মিত নারী শ্রমিক চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান। বাগানের পক্ষ থেকে ঐ নারীকে প্রায় ১১ হাজার টাকা চিকিৎসা বাবত দেওয়া হয়। এঘটনার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন শ্রমিক আন্দোলন করে। ভারপ্রাপ্ত বাগান ব্যবস্থাপকের অপসারণ চান। এঘটনার পর নিরাপত্তা জনিত কারণে ভারপ্রাপ্ত বাগান ব্যবস্থাপক কোম্পানী বরাবরে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে চলে যান। যেহেতু বাগানে ব্যবস্থাপক নেই এজন্য শ্রমিকদের মজুরি আটকা পড়েছে।

দেওড়াছড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সুবুধ কর্মী জানান, ৩ সপ্তাহ ধরে তলব বন্ধ। কয়েক শতাধিক চা শ্রমিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আমরা লিখিত আবেদন করেছে মজুরী দিতে, তারপরও দেয়া হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই চা শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমেছেন। বর্তমানে চা বাগান কাজ বন্ধ রেখেছে চা শ্রমিকরা।

রহিমপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিতাংশু কর্মকার দেওড়াছড়া চা বাগানের শ্রমিক আন্দোলনের কথা স্বীকার করে বলেন, মজুরীর দাবীতে অফিস তালা দিয়েছে বিক্ষুদ্ধ চা শ্রমিকরা। কিছু দিন পূর্বে এক চা শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার জের ধরে বাগান ম্যানেজমেন্ট ৩ সপ্তাহ ধরে তলব বন্ধ রেখেছে। অবশেষে কোম্পানীর নির্দেশে বৃহস্পতিবার বিকেলে পেমেন্ট দিলে শ্রমিকরা আন্দোলন থেকে সরে যায়।

এ ব্যাপারে দেওড়াছড়া চা বাগানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক জহিরুল ইসলাম বলেন, নারী চা শ্রমিক মারা যাওয়ার পর কয়েকজন মিলে ঘটনার দায় আমার উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে আমাকে শারিরীক লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করছে। এ ঘটনার পর আমি নিরাপত্তা নিরাপত্তাহীনতায় ছিলাম। এর পর ছুটি নিয়ে আমি চলে আসি। আগামী শনিবার পর্যন্ত আমার ছুটি আছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম সমকালকে জানান, নিরাপত্তার কারণে দেওড়াছড়া চা বাগানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক কিছুদিন পূর্বে পদত্যাগ পত্র কোম্পানীর কাছে জমা দিয়েছে। নতুন ব্যবস্থাপক দ্রুত সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রদানের চেষ্টা চলছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে দেওড়াছড়া চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরী প্রদান করা হচ্ছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর