img

মাকসুদ কমিশনে ডুবছে পুঁজিবাজার, দেখার কেউ নেই

প্রকাশিত :  ০৬:০৪, ২৭ অক্টোবর ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:৪৮, ২৭ অক্টোবর ২০২৫

মাকসুদ কমিশনে ডুবছে পুঁজিবাজার, দেখার কেউ নেই

রক্তক্ষয়ী জলাই বিপ্লবে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও ব্যতিক্রম শুধু পুঁজিবাজার। গত ১৩ মাসে পুঁজিবাজারের বৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক ও বাজার মূলধন। ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিললেও পুঁজিবাজার চলছে সেই পুরানো উল্টো পথে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ মাস পুঁজিবাজারের কোন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।

মাকসুদ হটাও পুঁজিবাজার বাঁচাও এই রবে রাজপথ ও নেট জগতে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও রহস্যময় নীরব অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীরা মনে করে বিএসইসির অদক্ষ্য ও অযোগ্য কমিশনের কারণে বেহাল দশা দেশের পুঁজিবাজারের। এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল না করে বাজার সংস্কারের নামে অস্থিতিশীল করছেন।

এদিকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। গত বছরের ১৮ আগস্ট চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ৬৫৯ পয়েন্ট। মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৫৭৭৮.৬৩ পয়েন্ট। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক এসে দাঁড়িয়েছে ৫১১৯.১৬ পয়েন্ট।

আর দৈনিক লেনদেনের ধীর গতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া কমিশন সংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারীদের মনে তৈরি করেছে আস্থার সংকট। অন্যদিকে কোন বিনিয়োগকারী বেশী পরিমাণ শেয়ার কিনলেই বিএসইসি থেকে ফোন দিয়ে কারণ জানতে চাওয়া হয়।

এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ মাস পুঁজিবাজারে কোনো নতুন কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদন হয়নি। অনেক আশা নিয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) নতুন কমিশন নিয়োগ করলেও সেই আশায় গুড়েবালি। আস্থার বদলে বিএসইসি বিনিয়োগকারীদের অনাস্থাই কুড়িয়েছে এ সময়টা ধরে। বাজারের লেনদেন তলানিতে নামা, বড় অঙ্কের সূচকের পতন ঘটা থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারীদের জন্য হতাশার সময় কাটছে।

এর মধ্যে নতুন করে কোম্পানি পুঁজিবাজারে না আসা যোগ করেছে হতাশার নতুন মাত্রা। লে দেশের পুঁজিবাজার যেন ধীরে ধীরে এর পথ হারাচ্ছে। এক সময় এই বাজার ছিল স্বপ্ন বুননের ক্ষেত্র হাজারো সাধারণ বিনিয়োগকারী আশায় বুক বাঁধতেন, শেয়ার কিনে জীবনের উন্নতির গল্প লিখতেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের টানা মন্দাভাব, আস্থাহীনতা আর অস্থিরতায় সেই স্বপ্নের জায়গায় এখন ভর করছে হতাশা।

এর ফলে গত ৯ মাসেই ৬২ হাজার বিনিয়োগকারী নিস্কিয় হয়ে পড়েছেন। কেউ পুরোপুরি বাজার ছেড়েছেন, আবার অনেকেই শেয়ারহীন হয়ে অনিশ্চয়তার দোলাচলে সময় পার করছেন। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) সর্বশেষ তথ্যে এ চিত্রই উঠে এসেছে।

ফলে টানা দরপতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশের পুঁজিবাজার। কারণ গত ১৩ মাস ধরে পুঁজিবাজারে এক দিন সূচক বাড়ে তো তিন দিনই পতন। বলতে গেলে বাজারটি একেবারেই সরকারের মনোযোগের বাইরে। এছাড়া দীর্ঘদিনের জঞ্জাল সরিয়ে একটি স্থিতিশীল ও আস্থার বাজারে পরিণত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা অর্থমন্ত্রণালয়ের মধ্যে দেখা যায়নি। যার ফলে গত এক মাস পুঁজিবাজারে ৫২৭ পয়েন্ট সূচকের দরপতন হয়েছে। তবে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পতন কিছুটা থামলেও আতঙ্ক কাটছে না বিনিয়োগকারীদের।

একাধিক বিনিয়োগকারীদের মতে, সংকটের মূল কারণ হলো দুর্বল ও তারল্য সংকটে ভোগা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত এবং ৯টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধের প্রক্রিয়া। এছাড়া মার্জিন ঋণ বিধিমালা সংশোধনের গুঞ্জনে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে শেয়ার বিক্রির চাপে অস্থির হয়ে পড়ছে পুঁজিবাজার। এছাড়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত এবং ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রক্রিয়ার ফলে ক্ষুদ্র ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পুঁজির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এ অবস্থায় বাজারে বিক্রয় চাপ বেড়েছে এবং মূলধন আশঙ্কাজনক হারে কমছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুঁজিবাজারে সূচকের টানা দরপতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকটি নেমে এসেছে গত তিন মাস আগের অবস্থানে। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ২ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ১১৯ পয়েন্টে স্থির হয়। চলতি বছরের ১৭ জুলাইয়ের পর ডিএসইর প্রধান সূচক আর এত নিচে নামেনি। এই দরপতনের ফলে আবারও নতুন করে সর্বস্বান্ত হতে চলেছেন বিনিয়োগকারীরা। এর আগে গত মে মাসে পুঁজিবাজারে ব্যাপক দরপতনের ফলে ডিএসই প্রধান সূচকটি সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনিম্ন ৪ হাজার ৬১৫ পয়েন্টে নেমে আসতে দেখা যায়।

পরবর্তীতে নতুন অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য কিছু প্রণোদনা যোগ করলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করে। জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বাজার পরিস্থিতি ভালোর দিকে রূপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় জুলাই ও আগস্ট দুই মাস পুঁজিবাজারের বেশ ভালোই কাটে। এরই ফলে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে সূচকটি পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৬৩৬ পয়েন্টে। তিন মাসের মাথায় সূচকের উন্নতি ঘটেছিল হাজার পয়েন্টের বেশি।

সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ফের নেতিবাচক প্রবণতার দিকে যেতে থাকে পুঁজিবাজার।

একটা দেশের পুঁজিবাজারের এমন অব্যাহত পতন ঠেকাতে সরকারের কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেই, এটা ভাবতেই ভয়, ক্রোধ, আতঙ্কে বিনিয়োগকারীদের মানসিক দৃঢ়তা ভেঙে যায়; ফলে নেতিবাচক আচরণ আরো প্রকট হয়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে শুরু হয় বাজারের অনিবার্য পতন।

সরকারের ফলপ্রসূ পদক্ষেপ ছাড়া এই পতন রোধ করা অসম্ভব। তাই এই অন্তর্বর্তী সরকার যদি গণদুশমন না হয় তাহলে বিনিয়োগকারীদের প্রাণের দাবি মাকসুদকে সরিয়ে সুদক্ষ চেয়ারম্যান নিয়োগের মাধ্যমে পুঁজিবাজার পুনর্গঠন করা উচিত।

img

ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা

প্রকাশিত :  ০৬:১২, ২২ অক্টোবর ২০২৬

বিনিয়োগের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ক্রমাগত বাড়ছে। গত আগস্ট শেষে এর পরিমাণ বেড়ে প্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গত জুনে প্রথমবারের মতো চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। উদ্বৃত্ত এই অর্থের বড় অংশ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকারকে ঋণ দিতে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে ব্যাংকগুলো।

উদ্বৃত্ত তারল্য মানেই অলস অর্থ নয়। আমানত থেকে কোনো ব্যাংকের বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) সংরক্ষণের পর বাকি অর্থ উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংকের মোট আমানতের ১৩ শতাংশ এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের ৪ শতাংশ  এসএলআর রাখতে হয়। বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে যা রাখার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দুই ধরনের ব্যাংকের নগদ জমা অনুপাত (সিআরআর) রাখতে হয় আরও ৪ শতাংশ।

ব্যাংকাররা জানান, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এখন আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না। আবার খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপের কারণে ঋণ বিতরণে সতর্কতা দেখাচ্ছে ভালো ব্যাংকগুলো। যে কারণে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণপ্রবৃদ্ধি  ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমেছে, যা  আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে কম। এ সময়ে ঝুঁকিমুক্ত বিবেচনায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ঋণ দেওয়ায় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে ব্যাংকগুলো। যে কারণে দীর্ঘদিন দুই অঙ্কে থাকা বিল ও বন্ডের সুদহার অনেক কমেছে।

ব্যাংকাররা আরও জানিয়েছেন, কয়েকটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরত দিতে না পারায় মানুষের হাতে টাকা রাখার প্রবণতা ব্যাপক বেড়ে যায়। এখন আবার ঘরের টাকা ব্যাংকে ফিরছে। তবে এই অর্থ আসছে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংকে। ভালো ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম সুদ দিলেও যথাসময়ে টাকা ফেরতের প্রত্যাশা থেকে সেখানেই রাখছে বেশির ভাগ মানুষ। তবে গ্রাহকের স্বর্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি ঋণ ও আমানতে মধ্যেকার সুদহারের সর্বোচ্চ ব্যবধান (স্প্রেড) ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। যদিও অনেক ব্যাংক এই নির্দেশনা পালন করছে না। তারা এ ক্ষেত্রে প্রচলিত হিসাব পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে  আলোচনা করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। আগের মাস জুলাই শেষে যা ছিল চার লাখ ২৩ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। গত জুনে ছিল চার লাখ ১৪ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল তিন লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল এক লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। 

পরিসংখ্যান বলছে, কম সুদের ঋণেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যাংকাররা। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে কম সুদে ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এ তহবিল থেকে গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। এই প্যাকেজের আওতায় বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাজে গতিশীলতা আনা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, সবুজ কারখানা রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি এবং হিমায়িত চিংড়ি এসব খাতের ১০ হাজার টাকার তহবিল থেকে এক টাকাও বিতরণ হয়নি।


অর্থনীতি এর আরও খবর