img

ঈদ শুধু ব্যক্তিগত উৎসব নয়: সামাজিক সম্প্রীতি

প্রকাশিত :  ০৯:৪০, ১২ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৫৯, ১২ মার্চ ২০২৬

ঈদ শুধু ব্যক্তিগত উৎসব নয়: সামাজিক সম্প্রীতি

ম. আমিনুল হক চুন্নু

ঈদ ইসলামে শুধু ব্যক্তিগত উৎসব নয় বরং একটি সামাজিক সম্প্রীতি, মানবতা ও ভাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার এক অনন্য সুযোগ। ইসলামে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে এটি একক ভোগের বিষয় নয়, বরং সমষ্টিগত কল্যাণের জন্য উৎসর্গিত একটি বিশেষ সময়। এই নিবন্ধে ঈদের ইতিহাস, স্মৃতি, বিদেশের ঈদ, সেই দিন-এই দিনের পার্থক্য, কেমন কাটলো ফিলিস্তিন গাজার মুসলমানদের ঈদ এবং আত্মীয় প্রতিবেশীর হক এবং সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করব।

ঈদ মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব। ঈদের আগাম বার্তা নিয়ে উর্ধ্ব আকাশে যখন চাঁদ দেখা যায়, তখন এই চাঁদ মুসলমানদের ঘরে ঘরে কতটা খুশির বার্তা নিয়ে আসে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঈদ মানুষকে দ্বন্দ্ব, সংঘাতও হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার শিক্ষা দিয়ে থাকে। আরবি ঈদ শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘আউদ’। বাংলা অর্থ ‘বারবার ফিরে আসা’। ফিতর শব্দের অর্থ ‘ভেঙে দেওয়া’। ঈদ আসে মানুষের শত্রুতা ও বৈরিতার প্রাচীর ভেঙে মিত্রতার বন্ধন সুদৃঢ় করতে। ঈদ আসে মানুষের হৃদয়ে ও মনে পরিতৃপ্তির ছোঁয়া লাগাতে।

৬২৪ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর জীবদ্দশায় আরব জাহানে প্রথম ঈদ উদযাপনের রেওয়াজ চালু হয়। আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের বহুধা বিভক্ত আরব জাতিতে উৎসবের নামে অশ্লীলতা চলছিল। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর সেসব অশ্লীলতা পরিত্যাগ করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা নামে দুটি উৎসব পালন করার আদেশ দেন। সেই থেকে সমগ্র মুসলিম জাহানে এই ঈদ উদযাপনের রেওয়াজ চালু হয়।

এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে প্রকাশিত একটি পোস্টকার্ডে দেখা যায়, সতেরো শতকের শুরুতে নায়েব নাজিমদের ঈদ উদযাপন, ঈদ মিছিলের দৃশ্য। সেখানে তৎকালীন ঢাকার প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র চকবাজার, বড় কাটরার ফটক ও মীর জুমলার কামান, ‘বিবি মরিয়ম’ দৃশ্যমান এবং ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হেকিম হাবিবুর রহমানের ‘টাকা পাচাস বারাস পাহে’ গ্রন্থে তিনি বলেছেন, অতি সৌখিন লোকেরা নৌকার সাহায্যে পদ্মা নদীতে গিয়ে চাঁদ দেখতেন। কিশোর ও যুবক সবাই যেত। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে লোকেরা ও নিজেদের দৃষ্টি শক্তি পরীক্ষা করার জন্য অবশ্যই যেতেন অবশেষে চাঁদ দেখা গেল। বন্দুকের গুলি ছোড়া হলো। তোপধ্বনি করা হলো, এমন সরব হলো বধিরও জানতে পারল যে চাঁদ উঠেছে।

মোগল রীতির প্রভাবের একটি বড় উদাহরণ স্থাপত্য, যার সাক্ষী হয়ে আছে এই অঞ্চলের কয়েকটি শাহী ঈদগাহ। সেখানে ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়াই ঈদের সকালের প্রথম আনুষ্ঠানিকতা। মোগল ইতিহাসের বর্ণনায় দেখা যায়, ঢাকার প্রথম শাহী ঈদগাহ নির্মাণের সময় বহু আগের। বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে আসার ৪৪ বছর অর্থাৎ ১৬৪০ সালে। সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহ সুজার প্রধান আমত্য মীর কাশিম নির্মাণ করেছিলেন।  বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত পরবর্তী ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহটি। এখানে এক সময় অনুষ্ঠিত ঈদের প্রধান জামাতে আসতেন সুবা বাংলার সুবাদার, নায়েবে নাজিম ও তাঁদের পরিষদেরা। সাধারণ মানুষ এই মসজিদে নামাজ আদায়ের সুযোগ পেয়েছেন অনেক পরে। তাছাড়া ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেটের শাহী ঈদগাহটি মোগল আমলের। সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে এই ঈদগাহ নির্মিত হয়েছিল। ওই সময় সিলেটের ফৌজদার ছিলেন ফরহাদ খাঁ। তাঁরই তত্ত্বাবধানে ঈদগাহ নির্মিত হয় বলে জানা যায়।

ঢাকা উর্দু রোডের বাসিন্দা লেখক হুমায়রা হুমা প্রথম আলোকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সুপারি কাটার সরতা দিয়ে চিকন করে কেটে রাখা হতো খুরমা। তা ভিজিয়ে রাখা হতো দুধের মধ্যে। বাড়ির মা-খালা কাজটি আগের রাতে করে রাখতেন। পুরুষরা সেই খাবার মুখে দিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যেতেন। এই প্রচলন বহুকালের।’ কিন্তু ঈদ উৎসবের মোগল ঐতিহ্যের অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে কালের বিবর্তনে।

একসময় প্রযুক্তি যখন এতটা উন্নত ছিল না, ছিল না গণমাধ্যম, টেলিভিশন বা সংবাদপত্র তখন বিভিন্ন জায়গায় ঢোল পিটিয়ে ঈদের আগমন বার্তা ঘোষণা দেওয়া হতো। ফলে একই দিনে ঈদ উদযাপনে দেখা দিত বিপত্তি। এখন অবশ্য প্রযুক্তির সমৃদ্ধে প্রায় গোটা বিশ্বে একই দিনে ঈদ উদযাপিত হয়ে থাকে। ঈদ ধনী-গরীব সব মানুষের মনে আনন্দের দোলা দিয়ে যায়। ঈদের খুশিতে আত্মহারা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম একটি গান লিখে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন, “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”। এই গানটি আজও প্রতিটি মানুষকে আলোকিত করে। কালের পরিক্রমায় বাঙালির জন্য এটি এখন ঈদের থিম সং হয়ে উঠেছে। ঈদ এলে রেডিও, টেলিভিশন কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে গানটি বেশ গুরুত্ব পেয়ে থাকে।

ঈদ এলে মনে পড়ে শৈশবের ঈদ উদযাপনের স্মৃতি। প্রকৌশলী আলতাফ হোসেন চৌধুরী (ইসবা) বলেন, ছোটবেলা ২০ রোজার পর থেকে ঈদের কাপড় কিনে দেয়ার জন্য মা-বাবাকে ব্যস্ত করে তুলতাম। রমজানের শেষের দিন মাগরিবের নামাজের পর খোলা মাঠে চাঁদ উঠেছে কিনা দলবেঁধে দেখতাম এবং আগামীকাল ঈদ বলে চিৎকার দিয়ে সবাইকে আনন্দের বার্তা দিতাম। ঈদের দিন সকালে পুকুরে দল বেঁধে গোসল করে নতুন কাপড় পরিধান করে মিষ্টি খাবার (সন্দেশ) খেয়ে নামাজ পড়তে যেতাম। নামাজ শেষে সারাদিন বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি ঘুরে বেড়াতাম। ছোট বেলার সে ঈদ এখন খুব মিস করি। এখন ঈদ মানে আমার কাছে সকালবেলা নতুন পাঞ্জাবি পাজামা পড়ে খোলা মাঠে ঈদের নামাজ পড়া ও নামাজ শেষে সবার সঙ্গে ঈদের কোলাকুলি করে ঘরে ফিরে লম্বা একটা ঘুম দেওয়া।

সময়ের সঙ্গেঁ পাল্লা দিয়ে ঈদ উদযাপনে এখন এসেছে বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন। এখন ঈদের আগের রাতে দেশ-বিদেশে সর্বত্র জমে উঠে চাঁদ রাত উৎসব। এই রাতে মহিলা ও শিশু-কিশোররা মেহেদী দিয়ে রঙিন করে তুলে তাদের হাত। বিভিন্ন জায়গায় বসে মেলা। এসব মেলায় থাকে খাবার ও পোষাক-পরিচ্ছদের স্টল। গভীর রাত অব্দি শিল্পীদের কন্ঠে পরিবেশিত হয় ঈদের গান। এসব অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষের সবার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। ছোটবেলা দেখেছি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ ঈদের আনন্দ উপভোগ করতো সিনেমা হলে ছবি দেখে। ঈদে তখন নির্মাতারা তৈরি করত নতুন নতুন ছবি। তখনকার বাংলা ছবিগুলো রুচিশীল ছিল এবং ঈদের দিনে লোকজন দুপুর থেকেই দল বেধে ছুটে যেত সিনেমা হলের দিকে। গ্রাম অঞ্চলের শিশু কিশোর বা যুবকরা বিকেলে ফুটবল, কাবাডি খেলায় মেতে উঠতো। সেদিন নেই, নেই মাঠ, নেই ফুটবল, নেই সিনেমা হলের রমরমা ব্যবসা। সময়ের পরিবর্তে সব বিলীন হচ্ছে দিন দিন। এখন বড় লোকেরা ঈদের অনুষ্ঠান উদযাপন করে ফাইভ স্টার হোটেলে নাচ গান ও বিশাল ভুরিভোজের আয়োজনে অতিবাহিত করে ঈদের দিন। দেশে ঈদের দিনের আনন্দমুখর দিনগুলো এখন খুব অনুভব করি। কিন্তু প্রবাসের চিত্র ভিন্ন। প্রবাসে ঈদের দিনেও বেশিরভাগ মানুষকে কাজে যেতে হয়।

এছাড়া প্রবাসের ঈদের বাস্তবতা তুলে ধরেন নিউইয়র্কের হেলথ ডিপার্টমেন্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পারভিন হান্নান। তিনি বলেন, ঈদের আনন্দ ছোটবেলার মতো হয় না, কিংবা ছোটবেলার মত তেমন একটা গুরুত্ব বহন করে না ঠিকই। তারপরও একটা বয়সে সব কিছুর আলাদা গুরুত্ব বহন করে। আমি যখন আমেরিকা এলাম, তখন ইৎড়হী- এ ডিকেটরে থাকতাম। এখানে বাঙালি ছিল না তেমন একটা। বাঙালিপাড়া বলতে জ্যাকশন হাইটকে বুঝাত। নিউইয়র্কে কোন মসজিদ ছিল না। কেউ মৃত্যুবরণ করলে দাফন করা অত্যন্ত কষ্ট হত। বাঙালি হাতে গোনা ক’জন ছিলেন। তাছাড়া রোজা বা ঈদ কখন নির্দিষ্ট করে বলা যেত না। অনেকজন কাজ শেষ করে এসে জানতো আজ ঈদ ছিল। এই ছিল তখনকার বাস্তবতা।

যাক, আমি ঈদের দিন বাসার সামনে বসে থাকতাম একজন বাঙ্গালী দেখবো বলে, কিন্তু কখনোই দেখতে পেতাম না। তখন হাতেগোনা কয়েকটি দোকান ছিল। তাও বাঙালিরা তেমন একটা কেনাকাটা করতে পারত না, দাম বেশি হওয়ার কারণে। বেশিরভাগ বাঙালি দেশ থেকে কাপড় বানিয়ে আনত বা নিয়ে আসত। আর এখন এত বাঙালি, যাকে বলে মিনি বাংলাদেশ। এখন বাংলাদেশী কাপড়ের দোকানের সমারোহ। যারা প্রবাসী বাঙালি, ঈদে এখানে কেউ বাজার করেনি খুব কমই হবে। কি নেই এসব দোকানেÑ মেহেদী থেকে শুরু করে প্রসাধনী, জুয়েলারি, শাড়ি, ব্লাউজ, সেলোয়ার কামিজ, ছেলেদের বিভিন্ন ধরনের পাঞ্জাবি, ব্যাগ, জুতা, শাল ইত্যাদি। এখন প্রতি এলাকায় এবং এভিনিউতে বাঙালির বাড়ি। সে সুবাদে এখন ঈদ এলে মনে হয় বাঙালি মুসলমানদের ঈদ এসেছে। বিদেশের ঈদ এখন অনেক বেশি ভোগবাদী উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রবাসের ঈদ এখন দেশের ইমেজ অনুভবে নয়, সম্পূর্ণ বাস্তবে প্রতিফলিত হয়।

তবে ঈদ আসে, কিন্তু গাজায় আনন্দ আসে না। ঘোষণা আসবে ঈদুল ফিতর উদযাপনের, তখন ফিলিস্তিনিদের উৎসবে মেতে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ আর ধ্বংসের মধ্যে দাঁড়িয়ে গাজার মুসলমানদের ঈদের আয়োজন বাদ দিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যেই আনন্দ খুঁজতে হচ্ছে। “অলৌকিক কিছু না ঘটলে হয়তো এই শহরে আর কোনদিন আনন্দ দেখা যাবে না”, হতাশ কণ্ঠে বললেন গাজার বাসিন্দা মোহাম্মদ আল সারকা। প্রায় দুই বছর ধরে চলা ইসরাইলের হামলায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজা এখন ধ্বংসস্তূপের এক নগরী। মাঝে যুদ্ধবিরতি হলেও ১৮ মার্চ, ২০২৫ থেকে আবার চলছে হামলা। ইসরাইলের অবরোধের কারণে গাজায় খাদ্য সামগ্রীর দাম এতটাই বেড়েছে যে কিছু কেনার উপায় নেই সাধারণ মানুষের। গাজায় এখন বেদনা বিধুর এক পরিবেশ। এছাড়া যুদ্ধ কি, তা গাজার শিশুরা এতদিনে বুঝে গেছে। তারপরই ঈদের সময় কিছু না পাওয়ার বেদনা ভারি করে তাদের ছোট মন।

সাত বছরের হানিন কাঁদছিল অঝোরে। তার কারণ, ইসরাইলের হামলায় তাদের ঘরতো গেছেই, সঙ্গে তার জামা, পুতুলগুলো পুড়ে গেছে। এখন পড়ার মতো সুন্দর কোন জামা নেই। “আমি ঈদ পছন্দ করি না”, বলছিল হানিন। নতুন পোশাকের চেয়ে এখন পানির গ্যালন ভর্তি করাতেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের। তাই শিশুদের জন্য খাবারের ন্যূনতম কিছু আয়োজনের মধ্য দিয়ে এভাবেই ঈদ সারতে চাইছে তারা। শুনেছি, আমাদের বাংলাদেশে ছোট ছোট স্কুলের শিশুরাও তাদের টিফিনের টাকা থেকে বাঁচিয়ে ওদের সাহায্যে দান করেছে। আহা, শিশুদের জন্য শিশুদের কি মায়া, কি উদারতা! এটাই বুঝি প্রকৃত ঈদ। তবে ঈদের দিন সকালে গাজার মুসলমানরা নামাজ পড়ে ভেবেছে, আমি আর কতদিন বাঁচবো? আমার পরিবারকে কি আমি আর কোনদিন দেখতে পাবো? ইতিহাস কি বদলে দেবে তার বিবরণ? সময় কি পাল্টে দেবে ফলাফল? কিন্তু ওদের ঈদ কাটছে ক্ষুধা, গুলি আর বোমাকে সাথি করে।

ঈদের মূল শিক্ষা: সংহতি ও সহমর্মিতা। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা দুটি উৎসব ব্যক্তিগত আনন্দকে সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে সংযুক্ত করে। তবে ঈদের প্রকৃত আনন্দ তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন তা সমাজের সকল স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া সাদাকাতুল ফিতর ঈদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি মূলত সমাজের দরিদ্র শ্রেণীর জন্য নির্ধারিত, যাতে তারা ঈদের দিনে অভুক্ত না থাকে এবং তারাও আনন্দ উপভোগ করতে পারে। ঈদে উপহার বিনিময় করা সুন্নত। এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ঈদ শুধু নিজের পরিবারে সীমাবদ্ধ না রেখে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। ঈদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো, সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটানো। রাসূলুল্লাহ (সা:) সব সময় অভাবীদের পাশে দাঁড়াতেন এবং সাহাবীদেরও এই ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতেন। ঈদ শুধু ব্যক্তি বা পরিবার কেন্দ্রিক আনন্দ নয়; এটি এক বৃহৎ সামাজিক সম্প্রীতির মেলবন্ধন। ঈদের দিন আমরা যেন নিজেদের পাশাপাশি অন্যদের মুখেও হাসি ফোটাতে পারি, এটাই হোক আমাদের চাওয়া।

[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, নুরজাহান মেমোরিয়াল মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সিলেট। লোকসংস্কৃতি গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তক, সমাজবিজ্ঞানী ও প্রাবন্ধিক। পিএইচডি ফেলো, নিউইয়র্ক]


img

স্রষ্টার ধর্ম

প্রকাশিত :  ১১:৩৬, ৩০ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:২৫, ৩০ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

সিদ্ধেশ্বরী লেনের ঘিঞ্জি গলিটি যেখানে এসে শেষ হয়েছে, সেখানে এক নীরব ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির। আনুমানিক ১৪৪১ খ্রিস্টাব্দে চাঁদ রায় নামক এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরটি এ অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু। মন্দিরের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন রক্তচন্দন গাছটি যেন আবহমান কাল ধরে দেবীর প্রতীক হিসেবে বিরাজ করছে, যার নিচে কত শত সাধক তাদের জীবনের পরম সত্যের অন্বেষণ করেছেন। এই মন্দিরের ঠিক পাশেই অবস্থিত ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পুরোনো জীর্ণ ভবনটি। ধূলিধূসরিত ইটের এই ভবনের দ্বিতীয় তলায় ১৮৫০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাটে বাস করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রবীণ লেখক ও গবেষক ড. সলিমুল্লাহ চৌধুরী। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্রটিই হলো তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, দর্শন এবং বিভিন্ন সভ্যতার আত্মিক বিবর্তন। ড. সলিমুল্লাহর বয়স এখন জীবনের অন্তিম সীমানায় এসে পৌঁছেছে; জীবনের সায়াহ্নের এই শেষ দিনগুলোতে তাঁর মনের সঞ্চিত সমস্ত জ্ঞান যেন এক নতুন ঝড়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছিল।

ড. সলিমুল্লাহর এই বিশাল ফ্ল্যাটটি যেন একটি জীবন্ত জাদুঘর। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন কাঠের আলমারিগুলোয় ঠাঁই পেয়েছে চামড়ায় বাঁধানো শত বছরের পুরোনো বেদ, উপনিষদ, পবিত্র কুরআন, বাইবেল এবং ত্রিপিটকের বিভিন্ন সংস্করণ। ঘরের এক কোণে রাখা একটি মরচে পড়া টেবিল ল্যাম্পের নিচে বসেই তিনি বছরের পর বছর ধরে লিখে গেছেন তাঁর বিশ্বখ্যাত সব গবেষণাপত্র। কিন্তু এই পাণ্ডিত্য ও বৈশ্বিক খ্যাতির অন্তরালে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনটি ছিল চরম নিঃসঙ্গতা এবং এক নীরব শূন্যতায় ঘেরা। একসময় এই ফ্ল্যাটটি মুখরিত ছিল তাঁর সহধর্মিণী নাজমা বেগমের মৃদু পায়ের শব্দে। কিন্তু ২০২০ সালের সেই ভয়াবহ করোনাকাল ড. সলিমুল্লাহর সাজানো সংসারটিকে তছনছ করে দিয়েছিল। যখন ঢাকা শহরজুড়ে মৃত্যুর এক বিভীষিকাময় তাণ্ডব চলছিল, তখন নাজমা বেগম করোনায় আক্রান্ত হন। সেই দুঃসময়ে কোয়ারেন্টাইন এবং সামাজিক দূরত্বের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে কোনো আত্মীয়-স্বজন কিংবা প্রতিবেশী তাদের পাশে এসে দাঁড়াতে সাহস পায়নি। আল-মারকাজুল ইসলামীর পিপিই পরিহিত অচেনা স্বেচ্ছাসেবকদের কাঁপানো হাতে যখন নাজমা বেগমের দেহটি সাদা কাফনের কাপড়ে ঢেকে বডিব্যাগে ভরা হচ্ছিল, তখন ড. সলিমুল্লাহ বারান্দার গ্রিল ধরে অবশ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীর জানাজা কিংবা শেষ বিদায়ের আচারটুকুও তিনি পালন করতে পারেননি, যা তাঁর মনের গভীরে এক গভীর ট্রমা এবং তীব্র অস্তিত্ববাদী সংকটের জন্ম দিয়েছিল।

নাজমা বেগমের অকাল প্রয়াণের পর সলিমুল্লাহর জীবনে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র সন্তান নাসেদ চৌধুরী। নাসেদের বয়স এখন মাত্র ১৫ বছর। সলিমুল্লাহ তাঁর জীবনের শেষ ভাগে এসে বিবাহ করেছিলেন বলেই পিতা ও পুত্রের বয়সের মধ্যে এই সুবিশাল ব্যবধান। নাসেদ এবার ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আইডিয়াল স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে এবং একজন ছাত্র হিসেবে সে অত্যন্ত তুখোড় ও কৌতূহলী। যখনই সলিমুল্লাহ তাঁর এই কিশোর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী লেনের সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বের হন, পথচারীরা অবধারিতভাবেই নাসেদকে তাঁর নাতি বলে ভুল করে। বয়সের এই বিশাল ব্যবধান এবং সমাজের এই বিভ্রান্তিকর মন্তব্যগুলো ড. সলিমুল্লাহর মনে এক ধরনের নীরব সংকোচ তৈরি করলেও তিনি নাসেদকে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ বলে জ্ঞান করেন। তবে এই দীর্ঘ বয়সের ব্যবধানের কারণে পিতা ও পুত্রের মধ্যে এক অলিখিত মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বও কাজ করত। বয়োবৃদ্ধ পিতার অতিরিক্ত গম্ভীর ও জ্ঞানগর্ভ ব্যক্তিত্বের ছায়ায় বেড়ে ওঠা নাসেদ প্রায়শই তার মনের গভীরের প্রশ্নগুলো নিজের মধ্যেই চেপে রাখত, যা পরিণত বয়সে ছেলেদের মধ্যে এক ধরনের আবেগীয় দমন এবং আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করে।

এই তিনজনের ছোট পরিবারের আরেকটি স্তম্ভ হলেন তাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত গৃহকর্মী জমিলা খাতুন। জমিলা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত মমতায় ও যত্নে এই সংসারটি আগলে রেখেছেন। তাঁর সুনিপুণ রান্নাবান্না আর ঘর গুছিয়ে রাখার পরিপাটি শৈলী সলিমুল্লাহর যান্ত্রিক জীবনকে সচল রেখেছে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক ও রঙবিদ্বেষী সমাজে গায়ের রং অতিরিক্ত কালো হওয়ার কারণে জমিলার আর বিবাহ হয়নি; সমাজ তাকে একপ্রকার ব্রাত্য করে রেখেছিল। কিন্তু বাহ্যিক রূপের এই অভাব জমিলা পুষিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর অন্তরের অপার স্নেহ, বিশ্বস্ততা এবং মাতৃত্বসুলভ মমতা দিয়ে। মাতৃহীন নাসেদের কাছে জমিলাই ছিলেন একমাত্র আশ্রয়, যিনি মায়ের শূন্যতা অনেকাংশেই পূরণ করেছিলেন।

ড. সলিমুল্লাহ তাঁর বার্ধক্য সত্ত্বেও নিজের কিছু নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলতেন। প্রতিদিন ভোরে যখন রমনা পার্কের কুয়াশাচ্ছন্ন কৃষ্ণচূড়া ও পাইন গাছের ডাল বেয়ে সকালের সোনালি রোদ এসে পড়ত, তিনি সেখানে দীর্ঘক্ষণ হাঁটতেন। ফেরার পথে শান্তিনগর কিংবা সিদ্ধেশ্বরীর বাজার থেকে নিজেই তাজা শাকসবজি আর মাছ কিনে নিয়ে আসতেন। এই প্রাত্যহিক যাপনচিত্রের মধ্যেই একদিন এমন এক মানসিক ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হবে, যা তাঁর দীর্ঘদিনের লালিত জ্ঞান ও গবেষণার ভিত্তিকে চিরতরে কাঁপিয়ে দেবে, তা তিনি কখনো ভাবতেও পারেননি।

একটি মহাজাগতিক প্রশ্ন ও মেধার নীরবতা

সেদিনও সকালের আকাশটা ছিল মেঘলা, বাতাসে ছিল এক মৃদু আষাঢ়ে বৃষ্টির আভাস। রমনা পার্কে হাঁটা শেষ করে ড. সলিমুল্লাহ যখন বাজারে গিয়ে তরকারি আর মাছ কিনে ফ্ল্যাটে ফিরলেন, তখন নাসেদ খাবারের টেবিলে বসে স্কুলের শেষ মুহূর্তের কিছু নোট দেখছিল। জমিলা খাতুন রান্নাঘর থেকে তাজা চায়ের সুবাস ছড়ানো এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা ড. সলিমুল্লাহর পড়ার টেবিলে দিয়ে গেলেন। দুপুরে খাওয়ার পর লাইব্রেরি ঘরে যখন বইয়ের স্তূপের মাঝে সলিমুল্লাহ গভীর মনোযোগে একটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি অনুবাদ করছিলেন, ঠিক তখনই নাসেদ অত্যন্ত ধীর পায়ে এসে তাঁর পাশে দাঁড়াল। নাসেদের চোখে তখনও আইডিয়াল স্কুলের তুখোড় ছাত্রসুলভ সেই গভীর, অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি।

নাসেদ তার বাবার পাশে চেয়ারে বসে হঠাৎ এমন একটি প্রশ্ন করল, যা ড. সলিমুল্লাহর মতো একজন বিশ্বখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদকে এক মুহূর্তে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিল। নাসেদ জিজ্ঞেস করল:

"বাবা, আল্লাহর কোনো ধর্ম আছে? আল্লাহ কি মুসলিম?"

ড. সলিমুল্লাহ তাঁর চশমাটি নাক থেকে নামিয়ে নাসেদের সরল অথচ অতলান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর ডান হাতের তর্জনীটি একটি আরবি পাণ্ডুলিপির পাতায় স্থির হয়ে রইল। যিনি সারা জীবন বিভিন্ন সেমিনারে, আন্তর্জাতিক ফোরামে ধর্মের সূক্ষ্মতম ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তিনি নিজের সন্তানের এই একটি সরল প্রশ্নের সামনে থমকে গেলেন। তিনি কোনো তাত্ক্ষণিক উত্তর খুঁজে পেলেন না। তাঁর এই নীরবতা দেখে নাসেদ পুনরায় প্রশ্ন করল:

"বাবা, তাহলে আল্লাহ কি খ্রিস্টান, হিন্দু, নাকি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী?"

নাসেদের এই প্রশ্নটি ড. সলিমুল্লাহর প্রবীণ মস্তিষ্কের কোষে কোষে এক প্রবল ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি করল। নাসেদ যখন নিজের ঘরে পড়তে চলে গেল, সলিমুল্লাহ তখনো সেই লাইব্রেরি ঘরের বিশাল জানালার পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাইরে তখন সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের দিক থেকে সন্ধ্যার আরতির কাঁসর-ঘণ্টার সুমধুর শব্দ ভেসে আসছিল, আর একই সঙ্গে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল দূরের কোনো মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের পবিত্র সুর। এই দুই ভিন্ন আধ্যাত্মিক সুরের মেলবন্ধনের মাঝে সলিমুল্লাহর মনে হতে লাগল, আসলে ঈশ্বরের প্রকৃত পরিচয় কী। মানুষের তৈরি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম কি আসলেই সেই আদি ও অনন্ত সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, নাকি ধর্ম কেবল মানুষের সামাজিক ও নৈতিক বিধানের একটি বাহ্যিক রূপমাত্র? সৃষ্টিকর্তা তো এই পৃথিবীতে সবাইকে এক অভিন্ন মানুষ হিসেবেই পাঠিয়েছেন। তবে কি তাঁর প্রকৃত ধর্ম হলো 'মানবধর্ম'? এই জটিল ও গভীর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ড. সলিমুল্লাহ তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও শেষ গবেষণায় অবতীর্ণ হলেন।

ঐশ্বরিক প্রকাশের কাঠামো: ওহি বনাম প্রাকৃতিক যুক্তিবাদ

ড. সলিমুল্লাহ তাঁর পড়ার টেবিলের ওপর স্তূপীকৃত বইগুলোর ধুলো ঝেড়ে বসলেন। তিনি প্রথমে তাকাতে চাইলেন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলোর আদি উৎস এবং তাদের মধ্যকার তাত্ত্বিক পার্থক্যের দিকে। ধর্মতত্ত্বের জগতে প্রধানত দুটি পথ পরিলক্ষিত হয়—একটি হলো ওহিভিত্তিক বা প্রকাশিত ধর্মতত্ত্ব (Revealed Theology) এবং অন্যটি হলো প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব (Natural Theology)।

প্রকাশিত ধর্মতত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো, পরম ঈশ্বর নিজে মানুষের কাছে তাঁর ইচ্ছা, নিয়ম এবং স্বরূপ প্রকাশ করেছেন পবিত্র গ্রন্থ এবং নবীদের মাধ্যমে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে প্রকৃতির নিয়মাবলি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অন্বেষণ করে। ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম এবং ইহুদি ধর্মের মতো ইব্রাহিমীয় ধর্মসমূহ মূলত ওহি বা ঐশ্বরিক প্রকাশের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই ধর্মগুলোর মৌলিক দাবি হলো, তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থই ঈশ্বরের একমাত্র ও অভিন্ন সত্য বাণী ধারণ করে। যেমন, ইসলাম ধর্মে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর মনোনীত একমাত্র জীবনব্যবস্থা বা দ্বীন হলো ইসলাম। আল-কুরআনের সুরা আলে ইমরানের ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: "নিশ্চয়ই আল্লাহর মনোনীত ধর্ম হচ্ছে ইসলাম।" একই সুরাটির ৮৫ নম্বর আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন বা ধর্মীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তা পরলোকে কখনও গ্রহণ করা হবে না।

বিপরীতে, খ্রিষ্টধর্মের ঐতিহ্যগত বিশ্বাসেও এক ঈশ্বরের ধারণা বিদ্যমান, তবে তা পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার ট্রিনিটি বা ত্রিত্ববাদ ধারণার মাধ্যমে এক জটিল রূপ ধারণ করেছে। সেন্ট অগাস্টিন এবং থমাস অ্যাকুইনাসের মতো মধ্যযুগীয় খ্রিষ্টান দার্শনিকেরা ঈশ্বরকে বর্ণনা করেছিলেন 'ইপ্সুম এসে' (Ipsum Esse) বা "স্বয়ং অস্তিত্ব" হিসেবে। এর অর্থ হলো, ঈশ্বর কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা ব্যক্তি নন, বরং তিনি হলেন অস্তিত্বের সেই চরম উৎস যার কারণে যেকোনো সৃষ্টির টিকে থাকা সম্ভব হয়।

ড. সলিমুল্লাহর মনে প্রশ্ন জাগল, যদি ঈশ্বর স্বয়ং অস্তিত্ব হন, তবে তাঁর নিজের কোনো বিশেষ ধর্মীয় পরিচয় থাকা কি যৌক্তিকভাবে সম্ভব? তিনি যখন সেন্ট আনসেলমের অন্টোলজিক্যাল যুক্তি এবং থমাস অ্যাকুইনাসের কসমোলজিক্যাল যুক্তিগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করছিলেন, তখন তাঁর কাছে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠছিল—যুক্তির আলোকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করা গেলেও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের গণ্ডিতে তাঁকে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

সর্বেশ্বরবাদ, নিমিত্তবাদ ও সুফি অতিন্দ্রিয়বাদ

ড. সলিমুল্লাহ তাঁর গবেষণার পরিধিকে আরও প্রসারিত করতে চাইলেন। তিনি এবার আলোকপাত করলেন বারুখ স্পিনোজার সর্বেশ্বরবাদ (Pantheism) এবং সুফি দর্শনের সবচেয়ে গভীর ও বিতর্কিত তত্ত্ব 'ওয়াহদাত আল-ওজুদ' (Wahdat al-Wujud)-এর ওপর।

স্পিনোজার মতে, ঈশ্বর এবং এই মহাবিশ্ব মূলত একই সত্তার দুটি ভিন্ন দিকমাত্র। এখানে ঈশ্বর কোনো দূরবর্তী ব্যক্তি নন যিনি স্বর্গে বসে মানুষের পাপ-পুণ্যের বিচার করেন; বরং তিনি হলেন প্রকৃতির সামগ্রিক নিয়ম ও নিয়মতন্ত্র। এই ধারণায় ঈশ্বর এবং সৃষ্টির মাঝে কোনো দ্বৈততা বা ব্যবধান নেই।

কিন্তু সলিমুল্লাহর মনকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল ইবনে আরাবীর 'ওয়াহদাত আল-ওজুদ' বা "অস্তিত্বের একত্ব" তত্ত্বটি। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, পরম অস্তিত্ব বা সত্যিকারের সত্তা কেবল একজনই—তিনি হলেন আল্লাহ। এই মহাবিশ্বের দৃশ্যমান সমস্ত বস্তু মূলত অবাস্তব এবং তারা কেবল সেই পরম আলোর প্রতিচ্ছবি বা তাজাল্লি ধারণ করে অস্তিত্বশীল বলে প্রতিভাত হয়। যেমন ইবনে আরাবী তাঁর ফুতুহাত আল-মাক্কিয়া গ্রন্থের ৪৫৫তম অধ্যায়ে পবিত্র কুরআনের সুরা আল-হাদিদের ৩ নম্বর আয়াতের ("তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনিই প্রকাশ্য, তিনিই গোপন") ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, ঈশ্বরই হলেন সমগ্র অস্তিত্ব।

ইবনে আরাবী তাঁর একটি সুফি প্রার্থনায় আল্লাহর কাছে চেয়েছিলেন:

"আমি আপনার নিকট সেই গোপন রহস্যের মাধ্যমে প্রার্থনা করি যা বিপরীতমুখী বিষয়গুলোকে একত্রিত করে, যেন আপনি আমার অস্তিত্বের সমস্ত বিচ্ছিন্নতাকে এমনভাবে একীভূত করেন যাতে আমি আপনার অস্তিত্বের একত্ব প্রত্যক্ষ করতে পারি।"

এই মরমি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, যখন একজন মানুষ তাঁর অহং বা আত্মাকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে দেন (যাকে সুফি পরিভাষায় 'ফানা' বলা হয়), তখন তাঁর কাছে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যবর্তী কৃত্রিম দেয়ালটি ভেঙে পড়ে। সুফি সাধক মানসুর আল-হাল্লাজ যখন 'আনাল হক' (আমিই সত্য) বলে চিৎকার করেছিলেন, তখন তিনি মূলত নিজের আমিত্বকে বিলীন করে সেই পরম অস্তিত্বেরই ঘোষণা দিয়েছিলেন।

ড. সলিমুল্লাহ গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। যদি সমগ্র সৃষ্টিই ঈশ্বরের অস্তিত্বের একটি একটি প্রকাশ বা আয়না হয়, তবে মানুষের তৈরি বর্ণ, জাত এবং ধর্মের সীমানাগুলো অত্যন্ত তুচ্ছ হয়ে যায়। ঈশ্বর কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী হতে পারেন না, কারণ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রয়োজন কেবল মানুষের সামাজিক শৃঙ্খলা ও আত্মিক উত্তরণের জন্য, ঈশ্বরের নিজের অস্তিত্বের জন্য নয়।

উপনিষদের নির্গুণ ব্রহ্ম ও অদ্বৈত বেদান্ত

সলিমুল্লাহর চিন্তার দোলাচল তাঁকে এবার নিয়ে গেল ভারতীয় দর্শনের প্রাচীনতম আকর উপনিষদ এবং আদি শংকরাচার্যের অদ্বৈত বেদান্তের দিকে। উপনিষদের ঋষিগণ পরম সত্যকে 'ব্রহ্ম' নামে অভিহিত করেছেন। এই ব্রহ্ম কোনো সীমাবদ্ধ দেবতা নন, বরং তিনি মন ও বাণীর অতীত এক পরম চেতনা।

'কেন উপনিষদ'-এর প্রথম খণ্ডের ৩ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে:

"সেখানে চক্ষু পৌঁছায় না, বাক্য পৌঁছায় না, মনও পৌঁছায় না। আমরা তাঁহাকে জানি না, এবং কীভাবে তাঁহার উপদেশ দিতে হয় তাহাও বুঝি না। তিনি জ্ঞাত বস্তু হইতেও ভিন্ন এবং অজ্ঞাত বস্তু হইতেও ঊর্ধ্বে।"

উপনিষদের এই 'নেতি-নেতি' (এটি নয়, এটি নয়) দর্শন ড. সলিমুল্লাহকে বিস্মিত করল। পরম সত্তাকে কোনো ইতিবাচক বিশেষণে বা মানুষের তৈরি কোনো ধর্মের কাঠামোতে সংজ্ঞায়িত করা অসম্ভব। মানুষের বুদ্ধি যখন কোনো কিছুকে সংজ্ঞায়িত করতে যায়, তখনই সে দ্বৈততার সৃষ্টি করে। কিন্তু পরম সত্য অদ্বৈত বা অভিন্ন।

অদ্বৈত বেদান্তের মূল কথা হলো—'জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ' অর্থাৎ জীব এবং ব্রহ্মের মধ্যে কোনো তফাত নেই। আদি শংকরাচার্য উপনিষদের চারটি মহাবাক্য ব্যবহার করে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার অন্যতম হলো:

"অহং ব্রহ্মাস্মি" (আমিই ব্রহ্ম)

"তৎ ত্বম অসি" (তুমিই সেই পরম সত্তা)

সলিমুল্লাহ লক্ষ করলেন, উপনিষদের এই ব্রহ্মের ধারণা এবং ইবনে আরাবীর ওয়াহদাতুল ওজুদের দর্শনের মধ্যে এক অদ্ভুত আত্মিক মিল রয়েছে। দুটি দর্শনই মানুষের ক্ষুদ্র অহংকে বিসর্জন দিয়ে এক পরম সত্তার সঙ্গে বিলীন হওয়ার কথা বলে। যদি আত্মা ও ব্রহ্ম অভিন্ন হয়, তবে ধর্মের নামে যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও হানাহানি, তা মানুষের এক পরম অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

রবীন্দ্রনাথের 'মানুষের ধর্ম' ও লালনের 'মানবধর্ম'

গবেষণার এই পর্যায়ে এসে ড. সলিমুল্লাহর টেবিলে স্থান পেল বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বাউল সাধক লালন শাহের রচনা। এঁরা দুজনেই মানুষের পরিচয়কে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত 'মানুষের ধর্ম' গ্রন্থে মানুষের দুটি রূপের কথা বলেছেন—একটি তার নিতান্ত জৈবিক বা প্রাকৃতিক ধর্ম, যা কেবল শারীরিক প্রয়োজন মেটায়; অন্যটি হলো তার মনুষ্যত্ব বা মানুষের সত্য ধর্ম, যা তাকে স্বার্থপরতার গণ্ডি পেরিয়ে ত্যাগের দিকে, সর্বজনীনতার দিকে নিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে 'ধর্ম' শব্দটির অর্থ হলো 'স্বভাব'। যেমন অগ্নির ধর্ম দহন করা, তেমনি মানুষের প্রকৃত ধর্ম হলো নিজের অন্তরের সর্বজনীন মানবকে প্রকাশ করা।

রবীন্দ্রনাথ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চাননি। তিনি লিখেছিলেন:

"কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম আমার ধর্ম নয়। আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন, আমি পঙ্ক্তিহীন, আমি তোমাদেরই লোক।"

অনুরূপভাবে, কুষ্টিয়ার লালন ফকির তাঁর গানের মাধ্যমে জাত-পাত ও ধর্মের কৃত্রিম ভেদাভেদকে অত্যন্ত তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। ড. সলিমুল্লাহ লালনের সেই বিখ্যাত গানের পঙ্ক্তিগুলো মনে মনে আওড়ালেন:

"সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।

লালন কয় জাতের কী রূপ দেখলাম না এ নজরে।

কেউ মালা কেউ তসবি গলায়,

তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়,

যাওয়া কিংবা আসার বেলায়

জাতের চিহ্ন রয় কার রে।"

লালন শাহের এই দর্শনকে 'মানবধর্ম' বা মানবতাবাদ বলা হয়, যেখানে মানুষের জাত-ধর্মের চেয়ে তার মনুষ্যত্বের পরিচয়টিই সবচেয়ে বড়। জন্ম ও মৃত্যুর সময় মানুষের শরীরে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বাহ্যিক চিহ্ন থাকে না; সব মানুষই সমানভাবে এই পৃথিবীতে আসে এবং চলে যায়। লালন বিশ্বাস করতেন, মনের ভেতরের অচিন পাখিকে চেনা এবং মানুষের প্রতি প্রেমই হলো প্রকৃত সাধনা, যা কোনো নির্দিষ্ট শাস্ত্র বা আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

ড. সলিমুল্লাহ এই দুটি মহান চিন্তাধারার মেলবন্ধন ঘটিয়ে বুঝতে পারলেন যে, মানুষের আদি ও অন্তিম ধর্ম মূলত একটাই—তা হলো 'মানবধর্ম'। কিন্তু নাসেদের প্রশ্নটি ছিল আরও গভীর—ঈশ্বরের ধর্ম কী?

অন্তিম সত্যের উন্মোচন: ঈশ্বরের স্বধর্ম

কয়েক সপ্তাহের অবিরাম অধ্যয়ন, ধ্যান ও চিন্তার পর ড. সলিমুল্লাহর মনের কুয়াশা কেটে যেতে শুরু করল। তিনি তাঁর ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। তখন গভীর রাত। নিচের সিদ্ধেশ্বরী লেনের ব্যস্ততা এখন থিতিয়ে এসেছে। মন্দিরের শিবলিঙ্গের মাথার ওপর ঝুলন্ত প্রদীপের মৃদু আলো আর দূর থেকে ভেসে আসা বাতাসের শনশন শব্দে এক অপার্থিব নীরবতা বিরাজ করছে।

ড. সলিমুল্লাহ বুঝতে পারলেন, নাসেদের প্রথম প্রশ্নের উত্তর—"আল্লাহ কি মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান নাকি বৌদ্ধ?"—অত্যন্ত সহজ ও দ্ব্যর্থহীন: না, ঈশ্বর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুসারী নন।

ধর্ম হলো মানুষের তৈরি একটি বিধান বা পথ, যার মাধ্যমে মানুষ সেই অসীম পরম সত্তাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করে। সসীম মানুষ তার নিজের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার ভিত্তিতে ঈশ্বরের আরাধনার বিভিন্ন পদ্ধতি বা ধর্মের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ঈশ্বর তো নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ, অসীম এবং সর্বব্যাপী। তাঁর নিজের উপাসনা করার প্রয়োজন নেই, কোনো পথের সন্ধান করার প্রয়োজন নেই, কারণ তিনিই পরম পথ এবং পরম গন্তব্য। অতএব, ঈশ্বর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় পরিচিতির অধীন হতে পারেন না।

তাহলে ঈশ্বরের নিজের ধর্ম বা স্বভাব কী?

যেহেতু 'ধর্ম' শব্দের গভীরতম অর্থ হলো 'স্বভাব' বা 'অস্তিত্বের মূল গুণ', সেহেতু ঈশ্বরের ধর্ম হলো তাঁর সেই পরম গুণাবলি যা সৃষ্টিজগতের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ঈশ্বরের ধর্ম হলো—পরম ভালোবাসা (প্রেম), পরম করুণা (রহমত), পরম সৌন্দর্য এবং একত্ব (তাওহীদ বা অদ্বৈততা)।

ঈশ্বর যখন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি প্রতিটি জীবকে এক পরম ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে পাঠিয়েছেন। তিনি মানুষকে কোনো তসবি বা জপমালা পরিয়ে পৃথিবীতে পাঠাননি। তিনি সবাইকে পাঠিয়েছেন কেবল 'মানুষ' হিসেবে। অতএব, মানুষের মধ্যে যে প্রেম, সহানুভূতি, ত্যাগের আকুলতা এবং অন্যের দুঃখে কাতর হওয়ার স্বভাব—তা মূলত সেই ঐশ্বরিক ধর্মেরই প্রতিচ্ছবি যা মানুষের অন্তরে বিরাজ করে। এই অর্থে, ঈশ্বরের একমাত্র প্রতিফলিত ধর্ম হলো 'মানবধর্ম'। যখন মানুষ কোনো সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখনই সে ঈশ্বরের প্রকৃত ধর্মকে বাস্তবায়িত করে।

একটি নতুন সকাল ও পুত্রের প্রশ্নের উত্তর

পরদিন সকালে সূর্য যখন লাল হয়ে ঢাকার আকাশে উদিত হলো, রমনা পার্কের কুয়াশা ভেদ করে এক নতুন আলোর রেখা এসে পড়ল ড. সলিমুল্লাহর লাইব্রেরি ঘরে। তিনি চশমাটি টেবিলের ওপর রাখলেন। তাঁর মনে এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সারারাত জেগে থাকার ক্লান্তি তাঁর চোখে নেই, বরং আছে এক নতুন বোধের দীপ্তি।

তিনি নাসেদের ঘরে গেলেন। নাসেদ তখন সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে বই গুছাচ্ছিল। সলিমুল্লাহ নাসেদের মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর বয়সের বলিরেখা পড়া হাতটি যখন নাসেদের কপালে স্পর্শ করল, তখন সেই স্পর্শে কোনো দূরত্ব ছিল না—ছিল এক পরম পিতার স্নেহ ও আশীর্বাদ।

সলিমুল্লাহ নাসেদের পাশে বসলেন এবং অত্যন্ত শান্ত ও মমতাপূর্ণ কণ্ঠে বললেন:

"নাসেদ, তোমার সেই প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়েছি।"

নাসেদ কৌতূহলী চোখে তার বাবার দিকে তাকাল। সলিমুল্লাহ বলতে লাগলেন:

"নাসেদ, আল্লাহ কোনো মুসলিম নন, তিনি খ্রিস্টানও নন, হিন্দু বা বৌদ্ধও নন। এই ধর্মগুলো মানুষের তৈরি করা পথ, যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহকে খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু আল্লাহ নিজে এসব সীমানার অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি কোনো একটি দলের বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নন। নদী যেমন কেবল এক দেশের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য বয়ে যায় না, সূর্য যেমন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের ওপর আলো দেওয়ার জন্য উদিত হয় না, তেমনি আল্লাহর দয়া আর আলো এই পৃথিবীর সবার জন্য সমান।"

নাসেদ গভীরভাবে শুনছিল। সে জিজ্ঞেস করল:

"তাহলে আল্লাহর নিজের ধর্ম কী, বাবা?"

সলিমুল্লাহ মৃদু হেসে বারান্দার দিকে ইশারা করলেন, যেখান থেকে সকালের সোনাঝরা রোদ এসে তাদের ঘরটিকে আলোকিত করে তুলছিল। তিনি বললেন:

"আল্লাহর ধর্ম হলো ভালোবাসা, দয়া আর সৃষ্টিকে রক্ষা করা। আর এই পৃথিবীতে আল্লাহর সেই ধর্মের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি হলো 'মানবধর্ম'। যখন আমরা জাত-ধর্ম ভুলে একজন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিই, যখন আমরা অন্য মানুষের কষ্টে কেঁদে উঠি, যখন জমিলার মতো স্নেহময়ী নারী আমাদের পরম যত্নে আগলে রাখে—তখনই আমরা আল্লাহর সেই প্রকৃত ধর্মকে পালন করি। মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়া এবং মানুষের কল্যাণ করাই হলো আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ইবাদত। এটাই আল্লাহর ধর্ম, আর এটাই আমাদের সবার ধর্ম হওয়া উচিত।"

নাসেদের চোখের কোণে এক অদ্ভুত আনন্দের আভা ফুটে উঠল। তার কিশোর মনের সমস্ত সংশয় আর প্রশ্ন যেন এই একটি উত্তরে শান্ত হয়ে গেল। সে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

দূরে তখন সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের সকালের আরতির কাঁসর আর মসজিদের ভোরের আজানের প্রতিধ্বনি এক হয়ে মিশে যাচ্ছিল ঢাকার কোলাহলময় আকাশে। আর ড. সলিমুল্লাহ চৌধুরীর সেই পুরোনো ফ্ল্যাটটি, যা এতদিন কেবল এক প্রবীণ গবেষকের নিঃসঙ্গতার আশ্রয়স্থল ছিল, তা আজ এক অপার্থিব সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল—যেখানে মানুষ ও ঈশ্বরের মাঝে আর কোনো দূরত্বের প্রাচীর রইল না।

ধর্ম এর আরও খবর