img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা :মসজিদুল খুলে দেওয়া মুসলিম উম্মাহর জন্য কৃতজ্ঞতার একটি মুহূর্ত

প্রকাশিত :  ১১:২২, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা :মসজিদুল খুলে দেওয়া মুসলিম উম্মাহর জন্য কৃতজ্ঞতার একটি মুহূর্ত

শায়খ আনিসুল হক

আলহামদুলিল্লাহ । প্রায় চল্লিশ দিন বন্ধ থাকার পর মসজিদুল আকসা আবার জুমার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এটা পুরো উম্মাহর জন্য কৃতজ্ঞতার একটি মুহূর্ত। আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি যে তিনি আমাদের ভাই-বোনদের আবার সেই বরকতময় স্থানে একসাথে নামাজ পড়ার সুযোগ দিয়েছেন।

আমাদের ভাবা উচিত নয় যে, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে, বা কষ্ট শেষ হয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো—নিষেধাজ্ঞা এখনও আছে, নির্যাতন এখনও আছে, সংগ্রাম এখনও চলছে।

যখন আমি জেরুজালেমের কথা ভাবি, তখন আমি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর কথা মনে করি । জেরুজালেমে তাঁর প্রবেশের ঘটনা আমাদের উম্মাহর জন্য একটি বড় শিক্ষা। শহরটি আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছিল, কিন্তু শর্ত ছিল—চাবি সরাসরি আমিরুল মুমিনীন উমর (রাঃ)-এর হাতে দিতে হবে। তখন তিনি মদিনায় ছিলেন। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তিনি যাত্রা শুরু করেন।

তিনি কোনো বড় দল নিয়ে আসেননি। রাজাদের মতো পোশাক পরেননি। কাউকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেননি। তিনি একজন খাদেম এবং একটি উট নিয়ে এসেছিলেন, এবং তারা দু\'জন (ওমর ও খাদেম) পালা করে উটে চড়ছিলেন।

জেরুজালেমের কাছে পৌঁছানোর সময় তাঁর হাঁটার পালা ছিল। তাই উমর (রাঃ) শহরে প্রবেশ করেন হেঁটে, আর তাঁর খাদেম উটে বসে ছিল।

এই দৃশ্যটাই সবকিছু বলে দেয়। একজন মানুষ, যিনি বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। যার সামনে বড় বড় সাম্রাজ্য হার মেনেছে। তিনি চাইলে রাজকীয়ভাবে প্রবেশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এসেছিলেন বিনয় নিয়ে—একজন আল্লাহর বান্দা হিসেবে।

এটাই সেই প্রজন্মকে মহান করেছিল। তারা বুঝেছিল—সম্মান আসে না বাহ্যিক জিনিস, সম্পদ বা পদমর্যাদা থেকে। সম্মান আসে ইসলামের মাধ্যমে। আসে আল্লাহর আনুগত্য থেকে। আসে বিনয় থেকে।

নবী (সা.) বলেছেন: “যে আল্লাহর জন্য নিজেকে বিনয়ী করে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেন।” এটাই আমরা ওমর (রাঃ)-এর জীবনে দেখি।

আরেকটি ঘটনা এই বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে। একবার তিনি (হযরত ওমর) আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-এর সাথে সফরে ছিলেন। পথে একটি পানির ধারা পেয়ে উমর (রাঃ) তাঁর স্যান্ডেল খুলে কাঁধে রাখেন এবং উটকে পানির মধ্যে দিয়ে হাঁটাতে থাকেন।

আবু উবাইদাহ (রাঃ) বিষয়টি দেখে অস্বস্তি বোধ করেন এবং বলেন—মানুষ আপনার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করতে পারে। তখন ওমর (রাঃ) এমন কথা বলেন, যা আমাদের সবার মনে রাখা উচিত:

“আমরা ছিলাম সবচেয়ে অপমানিত জাতি, আল্লাহ আমাদের ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। যখনই আমরা ইসলামের বাইরে অন্য কিছু দিয়ে সম্মান খুঁজব, আল্লাহ আমাদের অপমানিত করবেন।” এটাই মূল কথা।

যদি আমরা ব্যক্তি হিসেবে, পরিবার হিসেবে বা উম্মাহ হিসেবে সম্মান চাই—তাহলে তা আমরা দুনিয়ার জিনিসে পাব না। না ধন-সম্পদে, না পদমর্যাদায়, না মানুষের প্রশংসায়। আমরা তা পাব শুধুমাত্র ইসলামের মাধ্যমে।

আর এর একটি বড় লক্ষণ হলো—বিনয়। বিনয় শুধু বাহ্যিক নয়। এটা গভীর বিষয়। আল্লাহ যদি আপনাকে জ্ঞান দেন—আপনি কি অন্যদের ছোট মনে করেন? আল্লাহ যদি সম্পদ দেন—আপনি কি অহংকারী হয়ে যান?

আল্লাহ যদি ভালো পদ দেন—আপনি কি অন্যদের নিচু চোখে দেখেন?

আল্লাহ যদি নেক সন্তান দেন—আপনি কি অন্যদের কষ্ট ভুলে যান?

আল্লাহ তাঁর নেক বান্দাদের সম্পর্কে বলেন: “রহমানের বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।” (সূরা ফুরকান ২৫:৬৩) তাই এই গুণটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এটা জেরুজালেমে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাহাবীদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক সময় আমরা উম্মাহর সমস্যার কথা বলি—রাজনীতি, শক্তি, সংখ্যা, নেতৃত্ব নিয়ে। কিন্তু জেরুজালেমের ঘটনা আমাদের শেখায়—প্রথম যুদ্ধটা নিজের অন্তরে।

আমি কি সত্যিই বিশ্বাস করি যে, সম্মান আল্লাহর কাছ থেকেই আসে?

আমি কি সে অনুযায়ী জীবনযাপন করি? নাকি আমি এখনও অন্য জিনিসে সম্মান খুঁজছি?

জেরুজালেম বিজয় অহংকার দিয়ে হয়নি। পদমর্যাদার লোভ দিয়ে হয়নি। হয়েছে এমন মানুষদের মাধ্যমে—যাদের হৃদয় আল্লাহর সামনে বিনয়ী ছিল। তারা জানত—বিজয় আল্লাহর দান, তাদের নিজের কিছু নয়।

এ কারণেই এই ঘটনা আজও গুরুত্বপূর্ণ। এটা শুধু ইতিহাস নয়—এটা আমাদের জন্য শিক্ষা। যদি আমরা চাই আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করুন, তাহলে আমাদের তাঁর সামনে বিনয়ী হতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের বিনয়ী বান্দা বানান। আমাদের অন্তরকে অহংকার থেকে রক্ষা করুন। আমাদেরকে শুধু ইসলামের মাধ্যমেই সম্মান খুঁজতে তাওফিক দিন। আর ফিলিস্তিনের আমাদের ভাই-বোনদের কষ্ট দূর করুন, মসজিদুল আকসা ও তার মানুষদের হেফাজত করুন, এবং সেই বরকতময় ভূমিতে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিন। আমীন।


শায়খ সৈয়দ আনিসুল হক : সিনিয়র ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার। জুমার খুতবা ১৭ এপ্রিল ২০২৬।
img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের উদ্যোগে আল কুরআনের প্রাচীনতম পান্ডুলিপি নিয়ে আলোচনা

প্রকাশিত :  ১৮:৫৬, ০৯ জুন ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের উদ্যোগে শিক্ষার্থী, গবেষক এবং কমিউনিটির বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে পবিত্র কুরআনের লিখিত ইতিহাস নিয়ে এক বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে । ইস্ট লন্ডন মসজিদের বিশেষ প্রজেক্ট \'ইএলএম কানেক্স-এর তত্তাবধানে ২ জুন মঙ্গলবার লন্ডন মুসলিম সেন্টারে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

\'এডুকেট অ্যান্ড ইন্সপায়ার\' শীর্ষক আলোচনায় কুরআন সংরক্ষণ ও প্রচারের ইতিহাস তুলে ধরা হয় । প্রথম দিকের সংরক্ষিত পান্ডুলিপি থেকে শুরু করে আজ বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত মুদ্রিত কপিগুলোও আলোচনায় স্থান পায়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ইএলএম কানেক্স-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়। এর লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিসর তৈরি করা, যেখানে আলেম, বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষ ধর্ম, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করতে পারেন।

এতে বক্তব্য রাখেন মার্কফিল্ড ইনস্টিটিউট অব হায়ার এডুকেশনে ইসলামিক স্টাডিজের প্রভাষক এবং বিএ ইসলামিক স্টাডিজ কোর্সের পরিচালক ড. এফ রেদোয়ান কারিম।  তিনি কুরআনের একজন হাফিজ এবং হাফস কিরাআতে ইজাযাপ্রাপ্ত । আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল তাঁর রচিত গ্রন্থ  \"হিস্টোরি অব দ্যা কুরআন : অ্যাপ্রোচ এন্ড এক্সপ্লোরেশন্স\" (কুরআনের সংরক্ষণ ও প্রচার)।

ড. করিম তাঁর আলোচনা শুরু করেন কুরআনের সংরক্ষণ ও প্রচারের সামগ্রিক ইতিহাস তুলে ধরে । তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, কুরআন একটি বহুমাত্রিক পাঠ্যগ্রন্থ। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই কুরআন তিলাওয়াতের একাধিক গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি ছিল, যেখানে উচ্চারণ ও শব্দ ব্যবহারে কিছু পার্থক্য বিদ্যমান ছিল । ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এই বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আসে তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান (রাঃ) এর যুগে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ইন্তেকালের প্রায় ২৫ বছর পরে । তিনি কুরআনের মূল কাঠামো একীভূত করেন এবং এর সরকারি কপিগুলো মক্কা, মদিনা, বসরা, কুফা ও দামেস্কসহ মুসলিম বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রগুলোতে পাঠান।

ড. করিম এরপর কুরআনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলকগুলো তুলে ধরেন । তিনি আলোচনা করেন ইবনে মোজাজিদ এর সাতটি কিরাত নির্বাচন, আল-দানি ও আল-সাথিবী-এর মাধ্যমে প্রতিটি কিরাআতের জন্য দুইজন রাবির গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ, এবং পরে ইবনে আল-জাজারি\'র আরও তিনটি কিরাআত সংযোজনের মাধ্যমে মোট দশটি কিরাআতের স্বীকৃতি।

তিনি উল্লেখ করেন, সর্বশেষ বড় মাইলফলকটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯২৪ সালে মিশরের রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় আল-আজহারের আলেমদের তত্ত্বাবধানে কায়রো সংস্করণ প্রস্তুত করা হয়, যা হাফস আন আসিমের কিরাআত অনুসরণ করে । বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলিম এই পাঠ অনুসারে কুরআন তিলাওয়াত করেন। তবে ড. করিম জোর দিয়ে বলেন, হাফস কিরাআতকে কুরআনের একমাত্র রূপ হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এটি বৃহত্তর ও সমৃদ্ধ কিরাআত ঐতিহ্যের একটি অংশ।

অনুষ্ঠানের শেষে সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উপস্থিত অতিথিরা সরাসরি ড. করিমের কাছে তাঁদের প্রশ্ন উপস্থাপনের সুযোগ পান । এর মধ্য দিয়ে একটি তথ্যবহুল ও চিন্তাশীল সন্ধ্যার সমাপ্তি ঘটে।