হজে যাচ্ছেন ৩০ হাজার ইরানি, সর্বোচ্চ আতিথেয়তার প্রস্তুতি সৌদির
প্রকাশিত :
০৮:৫৮, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
সৌদি আরব পবিত্র হজ মৌসুমকে সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এই ধর্মীয় আয়োজনে ইরানি হাজিদের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি ও আতিথেয়তা করার অধীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে সৌদি।
গতকাল শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) হজ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, হাজিদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়ভাবে হজ পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিনিধি জানান, ইরানের হজ সংক্রান্ত সংস্থার প্রতিনিধিদল এরই মধ্যে সৌদি আরব পৌঁছাছেন। হজ পালনে প্রথম দফায় ইরানি হাজিরা ২৫ এপ্রিল মদিনাতে পৌঁছাবেন বলে এই প্রতিনিধি দলটি নিশ্চিত করেছে। এরপর তারা পূর্ণ নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ত পরিবেশে মক্ক গিয়ে হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন।
তিনি আরও বলেন, মসজিদ আল-হারাম–এর অতিথিদের সর্বোচ্চ আতিথেয়তার সঙ্গে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত রয়েছে সৌদি আরব।
কর্তৃপক্ষ জানায়, ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত হাজিদের জন্য আবাসন, খাদ্য এবং স্থল, রেল ও আকাশপথে যাতায়াতের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে ইরান থেকে আগত হাজিদের উন্মুক্তভাবে স্বাগত জানানো হবে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রায় ৩০ হাজার ইরানি হজে অংশ নেবেন এবং আগামী সপ্তাহ থেকে তাদের যাত্রা শুরু হবে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল কাউন্সিলের অনুমোদনেই এই হজ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তাসনিম নিউজ এজেন্সি এবং সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) প্রকাশিত সংবাদের তথ্য মতে, ইরানি হাজিরা এক মাসের বেশি সময় সৌদি আরবে অবস্থান করবেন। যার মধ্যে ৬ রাত ৭ দিন তারা মদিনায় থাকবেন। তবে তারা স্থলপথে নাকি আকাশপথে সৌদি আরবে যাবেন এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা :মসজিদুল খুলে দেওয়া মুসলিম উম্মাহর জন্য কৃতজ্ঞতার একটি মুহূর্ত
প্রকাশিত :
১১:২২, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
শায়খ আনিসুল হক
আলহামদুলিল্লাহ । প্রায় চল্লিশ দিন বন্ধ থাকার পর মসজিদুল আকসা আবার জুমার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এটা পুরো উম্মাহর জন্য কৃতজ্ঞতার একটি মুহূর্ত। আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি যে তিনি আমাদের ভাই-বোনদের আবার সেই বরকতময় স্থানে একসাথে নামাজ পড়ার সুযোগ দিয়েছেন।
আমাদের ভাবা উচিত নয় যে, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে, বা কষ্ট শেষ হয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো—নিষেধাজ্ঞা এখনও আছে, নির্যাতন এখনও আছে, সংগ্রাম এখনও চলছে।
যখন আমি জেরুজালেমের কথা ভাবি, তখন আমি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর কথা মনে করি । জেরুজালেমে তাঁর প্রবেশের ঘটনা আমাদের উম্মাহর জন্য একটি বড় শিক্ষা। শহরটি আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছিল, কিন্তু শর্ত ছিল—চাবি সরাসরি আমিরুল মুমিনীন উমর (রাঃ)-এর হাতে দিতে হবে। তখন তিনি মদিনায় ছিলেন। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তিনি যাত্রা শুরু করেন।
তিনি কোনো বড় দল নিয়ে আসেননি। রাজাদের মতো পোশাক পরেননি। কাউকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেননি। তিনি একজন খাদেম এবং একটি উট নিয়ে এসেছিলেন, এবং তারা দু\'জন (ওমর ও খাদেম) পালা করে উটে চড়ছিলেন।
জেরুজালেমের কাছে পৌঁছানোর সময় তাঁর হাঁটার পালা ছিল। তাই উমর (রাঃ) শহরে প্রবেশ করেন হেঁটে, আর তাঁর খাদেম উটে বসে ছিল।
এই দৃশ্যটাই সবকিছু বলে দেয়। একজন মানুষ, যিনি বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। যার সামনে বড় বড় সাম্রাজ্য হার মেনেছে। তিনি চাইলে রাজকীয়ভাবে প্রবেশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এসেছিলেন বিনয় নিয়ে—একজন আল্লাহর বান্দা হিসেবে।
এটাই সেই প্রজন্মকে মহান করেছিল। তারা বুঝেছিল—সম্মান আসে না বাহ্যিক জিনিস, সম্পদ বা পদমর্যাদা থেকে। সম্মান আসে ইসলামের মাধ্যমে। আসে আল্লাহর আনুগত্য থেকে। আসে বিনয় থেকে।
নবী (সা.) বলেছেন: “যে আল্লাহর জন্য নিজেকে বিনয়ী করে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেন।” এটাই আমরা ওমর (রাঃ)-এর জীবনে দেখি।
আরেকটি ঘটনা এই বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে। একবার তিনি (হযরত ওমর) আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-এর সাথে সফরে ছিলেন। পথে একটি পানির ধারা পেয়ে উমর (রাঃ) তাঁর স্যান্ডেল খুলে কাঁধে রাখেন এবং উটকে পানির মধ্যে দিয়ে হাঁটাতে থাকেন।
আবু উবাইদাহ (রাঃ) বিষয়টি দেখে অস্বস্তি বোধ করেন এবং বলেন—মানুষ আপনার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করতে পারে। তখন ওমর (রাঃ) এমন কথা বলেন, যা আমাদের সবার মনে রাখা উচিত:
“আমরা ছিলাম সবচেয়ে অপমানিত জাতি, আল্লাহ আমাদের ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। যখনই আমরা ইসলামের বাইরে অন্য কিছু দিয়ে সম্মান খুঁজব, আল্লাহ আমাদের অপমানিত করবেন।” এটাই মূল কথা।
যদি আমরা ব্যক্তি হিসেবে, পরিবার হিসেবে বা উম্মাহ হিসেবে সম্মান চাই—তাহলে তা আমরা দুনিয়ার জিনিসে পাব না। না ধন-সম্পদে, না পদমর্যাদায়, না মানুষের প্রশংসায়। আমরা তা পাব শুধুমাত্র ইসলামের মাধ্যমে।
আর এর একটি বড় লক্ষণ হলো—বিনয়। বিনয় শুধু বাহ্যিক নয়। এটা গভীর বিষয়। আল্লাহ যদি আপনাকে জ্ঞান দেন—আপনি কি অন্যদের ছোট মনে করেন? আল্লাহ যদি সম্পদ দেন—আপনি কি অহংকারী হয়ে যান?
আল্লাহ যদি ভালো পদ দেন—আপনি কি অন্যদের নিচু চোখে দেখেন?
আল্লাহ যদি নেক সন্তান দেন—আপনি কি অন্যদের কষ্ট ভুলে যান?
আল্লাহ তাঁর নেক বান্দাদের সম্পর্কে বলেন: “রহমানের বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।” (সূরা ফুরকান ২৫:৬৩) তাই এই গুণটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এটা জেরুজালেমে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাহাবীদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় আমরা উম্মাহর সমস্যার কথা বলি—রাজনীতি, শক্তি, সংখ্যা, নেতৃত্ব নিয়ে। কিন্তু জেরুজালেমের ঘটনা আমাদের শেখায়—প্রথম যুদ্ধটা নিজের অন্তরে।
আমি কি সত্যিই বিশ্বাস করি যে, সম্মান আল্লাহর কাছ থেকেই আসে?
আমি কি সে অনুযায়ী জীবনযাপন করি? নাকি আমি এখনও অন্য জিনিসে সম্মান খুঁজছি?
জেরুজালেম বিজয় অহংকার দিয়ে হয়নি। পদমর্যাদার লোভ দিয়ে হয়নি। হয়েছে এমন মানুষদের মাধ্যমে—যাদের হৃদয় আল্লাহর সামনে বিনয়ী ছিল। তারা জানত—বিজয় আল্লাহর দান, তাদের নিজের কিছু নয়।
এ কারণেই এই ঘটনা আজও গুরুত্বপূর্ণ। এটা শুধু ইতিহাস নয়—এটা আমাদের জন্য শিক্ষা। যদি আমরা চাই আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করুন, তাহলে আমাদের তাঁর সামনে বিনয়ী হতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের বিনয়ী বান্দা বানান। আমাদের অন্তরকে অহংকার থেকে রক্ষা করুন। আমাদেরকে শুধু ইসলামের মাধ্যমেই সম্মান খুঁজতে তাওফিক দিন। আর ফিলিস্তিনের আমাদের ভাই-বোনদের কষ্ট দূর করুন, মসজিদুল আকসা ও তার মানুষদের হেফাজত করুন, এবং সেই বরকতময় ভূমিতে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিন। আমীন।
শায়খ সৈয়দ আনিসুল হক : সিনিয়র ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার। জুমার খুতবা ১৭ এপ্রিল ২০২৬।