img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : আল্লাহর পথে অটল থাকার উপায়

প্রকাশিত :  ০৭:৫৩, ০২ জুন ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : আল্লাহর পথে অটল থাকার উপায়

শায়খ আনিসুল হক

প্রতি বছরই একই প্রশ্ন আমাদের সামনে আসে । রামাদ্বান শেষ, জিলহজ্জের বরকতময় দিনগুলোও শেষ, এখন আমরা কী করব?

রামাদানে আমরা নামাজ পড়ি, কুরআন তিলাওয়াত করি, দোয়া করি এবং আল্লাহর খুব কাছাকাছি অনুভব করি । কিন্তু কিছুদিন পর অনেকেই আগের অবস্থায় ফিরে যাই। নামাজে শিথিলতা আসে, মসজিদে যাওয়া কমে যায়, কুরআন তিলাওয়াতও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। জিলহজ্জের দিনগুলোতেও আমরা ইবাদতে বেশি মনোযোগ দিই, কিন্তু সেগুলো শেষ হলে আবার একই অবস্থা দেখা দেয় ।

আসল কথা হলো, ইসলাম শুধু কিছু নির্দিষ্ট মাসে পালন করার ধর্ম নয় । আল্লাহ শুধু রামাদানের রব নন; তিনি বছরের প্রতিটি দিনের রব। তাই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইস্তিকামাত—অর্থাৎ সবসময় আল্লাহর পথে দৃঢ় ও অবিচল থাকা।

আমাদের অধিকাংশেরই ইবাদত করার ইচ্ছা আছে । সমস্যা হলো সেই ইবাদত নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া। অনেক সময় আমরা তাহাজ্জুদ পড়ে বা কুরআন তিলাওয়াত করে খুব অনুপ্রাণিত হই এবং মনে করি, “এখন থেকে প্রতিদিনই করব।” কিন্তু কয়েকদিন পর সেই উৎসাহ হারিয়ে যায়।

এ কারণেই সাহাবি সুফিয়ান ইবন আবদুল্লাহ আস-সাকাফি (রাঃ) রাসূল (সাঃ) এর কাছে এমন একটি উপদেশ চেয়েছিলেন, যা জানার পর আর কারো কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করতে হবে না। তখন রাসূল (সাঃ) বলেছিলেন: “বলো, আমি আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি; তারপর তার ওপর অটল থাকো।” শুধু ঈমান আনাই যথেষ্ট নয়; সেই ঈমানের ওপর দৃঢ়ভাবে টিকে থাকাও জরুরি।

১. আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও

ইস্তিকামাত শুধু নিজের শক্তিতে অর্জন করা যায় না। এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। তাই সবসময় তাঁর কাছে দোয়া করতে হবে। রাসূল (সাঃ) প্রায়ই এই দোয়া করতেন: “হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখুন।”

সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আমাদের ব্যাপারেও আশঙ্কা করেন?” জবাবে তিনি বলেন: \'হ্যাঁ । কারণ মানুষের হৃদয় পরম দয়াময়ের দুই আঙুলের মাঝে থাকে । তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন।তাই আমরা প্রতিদিন নামাজে বারবার বলি : আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করুন । (সূরা ফাতিহা: ৬)।

আমরা পথ চিনি, তবুও এই দোয়া করি, কারণ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সেই পথে টিকে থাকা সম্ভব নয়।

২. নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করো

সুফিয়ান (রাঃ) যখন রাসূলকে (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি আমার জন্য সবচেয়ে বেশি কী বিষয়ে ভয় করেন? তখন তিনি নিজের জিহ্বা ধরে বললেন,  এটি।

গীবত, মিথ্যা, ঝগড়া-বিবাদ, অন্যকে উপহাস করা—এসব মানুষের আত্মিক অবস্থাকে দুর্বল করে দেয় । একজন ব্যক্তি নিয়মিত নামাজ পড়লেও তার জিহ্বার কারণে হৃদয় কঠিন হয়ে যেতে পারে।

তাই ইবাদতে যেমন ইস্তিকামাত প্রয়োজন, কথাবার্তাতেও তেমনি ইস্তিকামাত প্রয়োজন।

৩. কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করা

ইস্তিকামাত মানে শুধু বেশি বেশি আমল করা নয়; বরং সঠিকভাবে আমল

করা। প্রখ্যাত তাবেঈ আলেম সুফিয়ান আস-সাওরি (রহ.) বলেছেন, কোনো কথা বা কাজ তখনই সঠিক হয়, যখন তা সুন্নাহর অনুসরণে করা হয়।”

একবার রাসূল (সাঃ) মাটিতে একটি সোজা রেখা এঁকে বললেন, এটাই আল্লাহর পথ । তারপর ডান ও বাম দিকে কয়েকটি রেখা এঁকে বললেন, \"এগুলো অন্য পথ, আর প্রত্যেক পথের ওপর একজন শয়তান মানুষকে আহ্বান করছে।\' সঠিক পথ একটি, কিন্তু বিভ্রান্তির পথ অনেক । তাই আমাদের কুরআন ও সুন্নাহর পথেই দৃঢ় থাকতে হবে।

আল্লাহ বলেন, এটাই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এ পথ অনুসরণ করো এবং অন্য পথগুলো অনুসরণ করো না।” (সূরা আন\'আম: ১৫৩)

৪. অল্প হলেও নিয়মিত আমল করা

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব শিক্ষা। ইসলাম আমাদেরকে একসঙ্গে অনেক কিছু করে ক্লান্ত হয়ে যেতে বলে না; বরং নিয়মিতভাবে আমল করতে শেখায়।

হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূল (সাঃ) এর ইবাদত সম্পর্কে বলেছেন- তাঁর আমলগুলো ছিল নিয়মিত । অর্থাৎ একদিন খুব বেশি, আরেকদিন একেবারে কিছুই নয়—এমন ছিল না।

সত্যিকারের ইস্তিকামাত হলো- নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, প্রতিদিন কিছু হলেও কুরআন তিলাওয়াত করা, সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করা।

অল্প আমল হলেও তা অব্যাহত রাখা।

রমাদান চলে গেছে, হজযাত্রীরা ফিরে আসছেন। এখন আসল পরীক্ষা হলো—ইবাদতের মৌসুম শেষ হওয়ার পর আমরা কতটা আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে পারি।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা শুধু বিশেষ সময়েই নয়, বরং জীবনের প্রতিটি দিন তাঁর পথে অটল থাকে।

হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমাদের হৃদয়কে আপনার দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখুন। আমিন।


শায়খ সৈয়দ আনিসুল হক: সিনিয়র ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ । ২৯ মে ২০২৬





1 attachment

ধর্ম এর আরও খবর

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : কুরআন হোক জীবন দেখার লেন্স

প্রকাশিত :  ০৬:০৫, ০৮ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:০৮, ০৮ আগষ্ট ২০২৬

শায়খ রাশিদ খান

কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; বরং একজন মুমিনের জীবন, সাফল্য, আনন্দ-বেদনা, বিশ্রাম ও আখিরাতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। কথাগুলো বলেছেন ইমাম শায়খ রাশিদ খান।

৩১ জুলাই শুক্রবার জুমার খুতবায় ‘কুরআনের আলোয় জীবনকে দেখার শিক্ষা’ শিরোনামে প্রদত্ত খুতবায় তিনি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর জীবন ছিল অসাধারণ ভারসাম্যের উদাহরণ । তিনি যেমন হাসতেন, শিশুদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতেন, তেমনি আল্লাহ ও আখিরাত সম্পর্কে ছিলেন গভীরভাবে সচেতন।

তিনি বলেন, অনেক সময় রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর ব্যক্তিত্বকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা হয় । কেউ তাঁকে সবসময় গম্ভীর হিসেবে দেখেন, আবার কেউ শুধু হাস্যোজ্জ্বল ও রসিক হিসেবে তুলে ধরেন । অথচ তাঁর চরিত্রে ছিল মমতা, হাস্যরস, গভীর চিন্তা ও আল্লাহভীতির অপূর্ব সমন্বয়।

ছোট সাহাবি আবু উমাইরের পোষা পাখি মারা যাওয়ার ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা:) তাঁর দুঃখকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আবার হযরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনাও মহানবীর (সা:) পারিবারিক জীবনের আনন্দময় দিক তুলে ধরে।

একই সঙ্গে রাসুল (সা:) বলেছেন, “তোমরা যদি তা জানতে যা আমি জানি, তাহলে কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে।”

শায়খ রাশিদ বলেন, তাঁর হাসি কখনো উদাসীনতার প্রকাশ ছিল না এবং আখিরাতের ভয়ও তাঁকে কঠোর করে তোলেনি। তাঁর সমস্ত আচরণ পরিচালিত হতো ওহির আলোকে।

হযরত আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, “তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।”

খতিব শায়খ রাশিদ বলেন, কুরআন ছিল মহানবী (সা:)-এর পৃথিবীকে দেখার ‘লেন্স’। রহমত, সাফল্য, দুঃখ-কষ্ট, জীবন-মৃত্যু—সবকিছুকে তিনি কুরআনের আলোকে বিচার করতেন।

তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষ পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও পরিবেশের প্রভাবে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনকে দেখে। কিন্তু একজন মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধনের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত কুরআন।

এ প্রসঙ্গে তিনি সূরা আল-আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন: “নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য।”

তিনি বলেন, ইসলাম জীবনকে ইবাদত ও দুনিয়াবি কাজ—এভাবে আলাদা করে না। একজন মুসলমানের নামাজ যেমন আল্লাহর জন্য, তেমনি তার কর্মজীবন, পরিবার, সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত, বিশ্রাম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত।

রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর সামনে এক মা তার হারিয়ে যাওয়া শিশুকে ফিরে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ সেখানে কেবল মাতৃস্নেহ দেখেছিল। কিন্তু রাসুল (সা:) সেখানে আল্লাহর রহমতের নিদর্শন দেখেছিলেন। তিনি সাহাবিদের বলেছিলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এই মায়ের সন্তানের প্রতি দয়ার চেয়েও অধিক দয়ালু।”

দুনিয়ার সৌন্দর্য ও আকর্ষণ সম্পর্কে শায়খ রাশিদ বলেন, ইসলাম দুনিয়ার নিয়ামত উপভোগ করতে নিষেধ করে না। তবে সাময়িক জীবনকে চূড়ান্ত গন্তব্য মনে করা যাবে না। ফুল যেমন একসময় শুকিয়ে যায়, তেমনি দুনিয়ার সৌন্দর্য ও অর্জনও একদিন শেষ হয়ে যাবে।

সাফল্যের কুরআনিক সংজ্ঞা তুলে ধরে তিনি সূরা আলে ইমরানের আয়াত উল্লেখ করেন: “যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই প্রকৃতপক্ষে সফল।”

তিনি বলেন, অনেকের কাছে সম্পদ, পদমর্যাদা, প্রভাব ও পরিচিতি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে, কিন্তু একজন মুমিনের চূড়ান্ত সাফল্য হলো আল্লাহর রহমত লাভ এবং জান্নাতে প্রবেশ ।

বিশ্রাম ও অবসর নিয়েও তিনি বলেন ঘুম, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং বিরতি নেওয়া আল্লাহর নিয়ামত। তবে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে স্ক্রল করাকে প্রকৃত বিশ্রাম মনে করা ঠিক নয়। এতে অনেক সময় মানুষ আরও ক্লান্ত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে।

খুতবার শেষদিকে শায়খ রাশিদ খান বলেন, জীবনের সবকিছু একসঙ্গে পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। সন্তানদের সঙ্গে আচরণ, অনলাইন ব্যবহার, অবসর সময় কিংবা নিজের চিন্তাধারা—যেকোনো একটি ক্ষেত্র দিয়ে কুরআনের আলোকে পরিবর্তন শুরু করা যেতে পারে।

তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন কুরআনকে আমাদের পৃথিবী দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বানিয়ে দেন, আমাদের অগ্রাধিকার সংশোধন করেন এবং দুনিয়ার নিয়ামত উপভোগ করেও আখিরাতের প্রস্তুতি থেকে যেন আমরা গাফিল না হই।


শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ এন্ড লন্ডন মুসিলম সেন্টার। জুমার খুতবা ৩১ জুলাই ২০২৬।