img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা: সামার হলিডে শুধু বিনোদন নয়, পরিবার গড়ারও সময়

প্রকাশিত :  ১৭:১০, ১৫ আগষ্ট ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা: সামার হলিডে শুধু বিনোদন নয়, পরিবার গড়ারও সময়
শায়খ আব্দুল কাইয়ুম

সামার হলিডেকে শুধু ভ্রমণ, বিশ্রাম ও বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবার ও সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতীব শায়খ আব্দুল কাইয়ুম। তিনি গত ৭ আগস্ট শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় এ আহবান জানান।  

তিনি বলেন, ছুটির এই সময় বাবা-মায়ের জন্য সন্তানদের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানো, তাদের ইসলামী চরিত্র গড়ে তোলা এবং বর্তমান সময়ের নানা বিভ্রান্তি ও ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াত উদৃত করেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।” [সূরা আত-তাহরিম: ৬]

তিনি বলেন, সন্তানের খাদ্য, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করাই শুধু বাবা-মায়ের দায়িত্ব নয়; বরং তাদের আল্লাহর পথে পরিচালিত করা, ঈমান ও উত্তম চরিত্রের সঙ্গে বড় হতে সহায়তা করাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

রাসুলুল্লাহ (সা:)এর হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রাখাল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।” [বুখারি, মুসলিম]

শায়খ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, সন্তানকে ভালোবাসার অর্থ তার সব দাবি মেনে নেওয়া নয়। প্রয়োজনের সময় ‘না’ বলতে জানা এবং তার ঈমান ও চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর বিষয় থেকে তাকে রক্ষা করাও প্রকৃত ভালোবাসার অংশ।

হযরত লুকমান (আ.)-এর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি স্নেহের সঙ্গে সন্তানকে উপদেশ দিয়েছিলেন, “হে আমার প্রিয় পুত্র, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না।” [সূরা লুকমান: ১৩] এতে সন্তানকে ভালোবাসা ও একই সঙ্গে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার একটি সুন্দর ভারসাম্য ফুটে ওঠে।

তিনি বলেন, আজকের শিশু-কিশোররা এমন এক ডিজিটাল পরিবেশে বেড়ে উঠছে, যেখানে সামাজিক সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তারা অনৈতিকতা ও ঈমান নিয়ে সংশয় এবং নানা ক্ষতিকর মতাদর্শের মুখোমুখি হতে পারে। তাই সন্তানদের পুরোপুরি মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

তবে তিনি বলেন, প্রতিটি কথোপকথনকে জিজ্ঞাসাবাদে পরিণত না করে বাবা-মাকে এমনভাবে সন্তানের জীবনে উপস্থিত থাকতে হবে, যাতে তারা (মা-বাবা) বুঝতে পারেন সন্তান কী করছে এবং সন্তানও যেন খোলামনে নিজের কথা বাবা-মায়ের সঙ্গে ভাগ করতে পারে।

গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে নামাজ আদায়, প্রতিদিন কিছু সময় কুরআন তিলাওয়াত বা আলোচনা, মোবাইল ফোন থেকে দূরে থেকে একসঙ্গে খাবার খাওয়া এবং সন্তানদের মসজিদ, ইসলামি ক্লাস ও যুব কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

একই সঙ্গে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, একসঙ্গে দান-সদকা করা, উপকারী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এবং পরিবার নিয়ে ভ্রমণের সময় আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা শেখানোর আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সন্তানরা একদিন বড় হয়ে স্বাধীন হয়ে যাবে। তাই তাদের সঙ্গে বর্তমানের সময়টি সচেতনভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

রাসুলুল্লাহ (সা:) এর হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আদমসন্তান যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তিনটি বিষয় ছাড়া তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তার একটি হলো নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।” [মুসলিম]

সবশেষে তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন আমাদের সন্তানদের সব ধরনের প্রকাশ্য ও গোপন ফিতনা থেকে রক্ষা করেন, তাদের কুরআন ও নামাজের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন, উত্তম সঙ্গ দান করেন এবং তাদেরকে বাবা-মায়ের জন্য দুনিয়ায় চোখের শীতলতা ও আখিরাতে অব্যাহত সওয়াবের কারণ বানান। আমিন।


শায়খ আব্দুল কাইয়ুম : প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লণ্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমার খুতবা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬।

ধর্ম এর আরও খবর

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : কুরআন হোক জীবন দেখার লেন্স

প্রকাশিত :  ০৬:০৫, ০৮ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:০৮, ০৮ আগষ্ট ২০২৬

শায়খ রাশিদ খান

কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; বরং একজন মুমিনের জীবন, সাফল্য, আনন্দ-বেদনা, বিশ্রাম ও আখিরাতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। কথাগুলো বলেছেন ইমাম শায়খ রাশিদ খান।

৩১ জুলাই শুক্রবার জুমার খুতবায় ‘কুরআনের আলোয় জীবনকে দেখার শিক্ষা’ শিরোনামে প্রদত্ত খুতবায় তিনি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর জীবন ছিল অসাধারণ ভারসাম্যের উদাহরণ । তিনি যেমন হাসতেন, শিশুদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতেন, তেমনি আল্লাহ ও আখিরাত সম্পর্কে ছিলেন গভীরভাবে সচেতন।

তিনি বলেন, অনেক সময় রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর ব্যক্তিত্বকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা হয় । কেউ তাঁকে সবসময় গম্ভীর হিসেবে দেখেন, আবার কেউ শুধু হাস্যোজ্জ্বল ও রসিক হিসেবে তুলে ধরেন । অথচ তাঁর চরিত্রে ছিল মমতা, হাস্যরস, গভীর চিন্তা ও আল্লাহভীতির অপূর্ব সমন্বয়।

ছোট সাহাবি আবু উমাইরের পোষা পাখি মারা যাওয়ার ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা:) তাঁর দুঃখকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আবার হযরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনাও মহানবীর (সা:) পারিবারিক জীবনের আনন্দময় দিক তুলে ধরে।

একই সঙ্গে রাসুল (সা:) বলেছেন, “তোমরা যদি তা জানতে যা আমি জানি, তাহলে কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে।”

শায়খ রাশিদ বলেন, তাঁর হাসি কখনো উদাসীনতার প্রকাশ ছিল না এবং আখিরাতের ভয়ও তাঁকে কঠোর করে তোলেনি। তাঁর সমস্ত আচরণ পরিচালিত হতো ওহির আলোকে।

হযরত আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, “তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।”

খতিব শায়খ রাশিদ বলেন, কুরআন ছিল মহানবী (সা:)-এর পৃথিবীকে দেখার ‘লেন্স’। রহমত, সাফল্য, দুঃখ-কষ্ট, জীবন-মৃত্যু—সবকিছুকে তিনি কুরআনের আলোকে বিচার করতেন।

তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষ পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও পরিবেশের প্রভাবে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনকে দেখে। কিন্তু একজন মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধনের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত কুরআন।

এ প্রসঙ্গে তিনি সূরা আল-আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন: “নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য।”

তিনি বলেন, ইসলাম জীবনকে ইবাদত ও দুনিয়াবি কাজ—এভাবে আলাদা করে না। একজন মুসলমানের নামাজ যেমন আল্লাহর জন্য, তেমনি তার কর্মজীবন, পরিবার, সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত, বিশ্রাম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত।

রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর সামনে এক মা তার হারিয়ে যাওয়া শিশুকে ফিরে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ সেখানে কেবল মাতৃস্নেহ দেখেছিল। কিন্তু রাসুল (সা:) সেখানে আল্লাহর রহমতের নিদর্শন দেখেছিলেন। তিনি সাহাবিদের বলেছিলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এই মায়ের সন্তানের প্রতি দয়ার চেয়েও অধিক দয়ালু।”

দুনিয়ার সৌন্দর্য ও আকর্ষণ সম্পর্কে শায়খ রাশিদ বলেন, ইসলাম দুনিয়ার নিয়ামত উপভোগ করতে নিষেধ করে না। তবে সাময়িক জীবনকে চূড়ান্ত গন্তব্য মনে করা যাবে না। ফুল যেমন একসময় শুকিয়ে যায়, তেমনি দুনিয়ার সৌন্দর্য ও অর্জনও একদিন শেষ হয়ে যাবে।

সাফল্যের কুরআনিক সংজ্ঞা তুলে ধরে তিনি সূরা আলে ইমরানের আয়াত উল্লেখ করেন: “যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই প্রকৃতপক্ষে সফল।”

তিনি বলেন, অনেকের কাছে সম্পদ, পদমর্যাদা, প্রভাব ও পরিচিতি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে, কিন্তু একজন মুমিনের চূড়ান্ত সাফল্য হলো আল্লাহর রহমত লাভ এবং জান্নাতে প্রবেশ ।

বিশ্রাম ও অবসর নিয়েও তিনি বলেন ঘুম, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং বিরতি নেওয়া আল্লাহর নিয়ামত। তবে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে স্ক্রল করাকে প্রকৃত বিশ্রাম মনে করা ঠিক নয়। এতে অনেক সময় মানুষ আরও ক্লান্ত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে।

খুতবার শেষদিকে শায়খ রাশিদ খান বলেন, জীবনের সবকিছু একসঙ্গে পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। সন্তানদের সঙ্গে আচরণ, অনলাইন ব্যবহার, অবসর সময় কিংবা নিজের চিন্তাধারা—যেকোনো একটি ক্ষেত্র দিয়ে কুরআনের আলোকে পরিবর্তন শুরু করা যেতে পারে।

তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন কুরআনকে আমাদের পৃথিবী দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বানিয়ে দেন, আমাদের অগ্রাধিকার সংশোধন করেন এবং দুনিয়ার নিয়ামত উপভোগ করেও আখিরাতের প্রস্তুতি থেকে যেন আমরা গাফিল না হই।


শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ এন্ড লন্ডন মুসিলম সেন্টার। জুমার খুতবা ৩১ জুলাই ২০২৬।