img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : কুরআন হোক জীবন দেখার লেন্স

প্রকাশিত :  ০৬:০৫, ০৮ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:০৮, ০৮ আগষ্ট ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : কুরআন হোক জীবন দেখার লেন্স

শায়খ রাশিদ খান

কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; বরং একজন মুমিনের জীবন, সাফল্য, আনন্দ-বেদনা, বিশ্রাম ও আখিরাতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। কথাগুলো বলেছেন ইমাম শায়খ রাশিদ খান।

৩১ জুলাই শুক্রবার জুমার খুতবায় ‘কুরআনের আলোয় জীবনকে দেখার শিক্ষা’ শিরোনামে প্রদত্ত খুতবায় তিনি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর জীবন ছিল অসাধারণ ভারসাম্যের উদাহরণ । তিনি যেমন হাসতেন, শিশুদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতেন, তেমনি আল্লাহ ও আখিরাত সম্পর্কে ছিলেন গভীরভাবে সচেতন।

তিনি বলেন, অনেক সময় রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর ব্যক্তিত্বকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা হয় । কেউ তাঁকে সবসময় গম্ভীর হিসেবে দেখেন, আবার কেউ শুধু হাস্যোজ্জ্বল ও রসিক হিসেবে তুলে ধরেন । অথচ তাঁর চরিত্রে ছিল মমতা, হাস্যরস, গভীর চিন্তা ও আল্লাহভীতির অপূর্ব সমন্বয়।

ছোট সাহাবি আবু উমাইরের পোষা পাখি মারা যাওয়ার ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা:) তাঁর দুঃখকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আবার হযরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনাও মহানবীর (সা:) পারিবারিক জীবনের আনন্দময় দিক তুলে ধরে।

একই সঙ্গে রাসুল (সা:) বলেছেন, “তোমরা যদি তা জানতে যা আমি জানি, তাহলে কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে।”

শায়খ রাশিদ বলেন, তাঁর হাসি কখনো উদাসীনতার প্রকাশ ছিল না এবং আখিরাতের ভয়ও তাঁকে কঠোর করে তোলেনি। তাঁর সমস্ত আচরণ পরিচালিত হতো ওহির আলোকে।

হযরত আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, “তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।”

খতিব শায়খ রাশিদ বলেন, কুরআন ছিল মহানবী (সা:)-এর পৃথিবীকে দেখার ‘লেন্স’। রহমত, সাফল্য, দুঃখ-কষ্ট, জীবন-মৃত্যু—সবকিছুকে তিনি কুরআনের আলোকে বিচার করতেন।

তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষ পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও পরিবেশের প্রভাবে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনকে দেখে। কিন্তু একজন মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধনের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত কুরআন।

এ প্রসঙ্গে তিনি সূরা আল-আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন: “নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য।”

তিনি বলেন, ইসলাম জীবনকে ইবাদত ও দুনিয়াবি কাজ—এভাবে আলাদা করে না। একজন মুসলমানের নামাজ যেমন আল্লাহর জন্য, তেমনি তার কর্মজীবন, পরিবার, সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত, বিশ্রাম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত।

রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর সামনে এক মা তার হারিয়ে যাওয়া শিশুকে ফিরে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ সেখানে কেবল মাতৃস্নেহ দেখেছিল। কিন্তু রাসুল (সা:) সেখানে আল্লাহর রহমতের নিদর্শন দেখেছিলেন। তিনি সাহাবিদের বলেছিলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এই মায়ের সন্তানের প্রতি দয়ার চেয়েও অধিক দয়ালু।”

দুনিয়ার সৌন্দর্য ও আকর্ষণ সম্পর্কে শায়খ রাশিদ বলেন, ইসলাম দুনিয়ার নিয়ামত উপভোগ করতে নিষেধ করে না। তবে সাময়িক জীবনকে চূড়ান্ত গন্তব্য মনে করা যাবে না। ফুল যেমন একসময় শুকিয়ে যায়, তেমনি দুনিয়ার সৌন্দর্য ও অর্জনও একদিন শেষ হয়ে যাবে।

সাফল্যের কুরআনিক সংজ্ঞা তুলে ধরে তিনি সূরা আলে ইমরানের আয়াত উল্লেখ করেন: “যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই প্রকৃতপক্ষে সফল।”

তিনি বলেন, অনেকের কাছে সম্পদ, পদমর্যাদা, প্রভাব ও পরিচিতি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে, কিন্তু একজন মুমিনের চূড়ান্ত সাফল্য হলো আল্লাহর রহমত লাভ এবং জান্নাতে প্রবেশ ।

বিশ্রাম ও অবসর নিয়েও তিনি বলেন ঘুম, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং বিরতি নেওয়া আল্লাহর নিয়ামত। তবে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে স্ক্রল করাকে প্রকৃত বিশ্রাম মনে করা ঠিক নয়। এতে অনেক সময় মানুষ আরও ক্লান্ত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে।

খুতবার শেষদিকে শায়খ রাশিদ খান বলেন, জীবনের সবকিছু একসঙ্গে পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। সন্তানদের সঙ্গে আচরণ, অনলাইন ব্যবহার, অবসর সময় কিংবা নিজের চিন্তাধারা—যেকোনো একটি ক্ষেত্র দিয়ে কুরআনের আলোকে পরিবর্তন শুরু করা যেতে পারে।

তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন কুরআনকে আমাদের পৃথিবী দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বানিয়ে দেন, আমাদের অগ্রাধিকার সংশোধন করেন এবং দুনিয়ার নিয়ামত উপভোগ করেও আখিরাতের প্রস্তুতি থেকে যেন আমরা গাফিল না হই।


শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ এন্ড লন্ডন মুসিলম সেন্টার। জুমার খুতবা ৩১ জুলাই ২০২৬।

ধর্ম এর আরও খবর

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : আসুন, হৃদয়ের সুস্থতার জন্য আল্লাহর দিকে ফিরে আসি

প্রকাশিত :  ০৬:৫৫, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:৫৭, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শায়খ মুস্তাফা আবদুল্লাহ

মানুষ প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে এমনভাবে জীবনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যেন এই পৃথিবীই তার স্থায়ী ঠিকানা । কর্মস্থল, যাতায়াত, বিল, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিড়ে মানুষ প্রায়ই ভুলে যায়—একদিন কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই তার রূহ এই দুর্বল শরীর থেকে নিয়ে নেওয়া হবে।

১৮ সেপ্টেম্বর ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় কথাগুলো বলেছেন শায়খ মোস্তাফা আবদুল্লাহ। তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াত উদৃত করে বলেন, “হে মানুষ! তোমাকে কোন জিনিসটি তোমার মহানুভব রব সম্পর্কে প্রতারিত (গাফেল) করেছে?” —সুরা আল-ইনফিতার, ৮২:৬।

শায়খ মোস্তাফা বলেন, একজন আলেম এই আয়াত শুনে বলেছিলেন, মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রতারিত করে তার অজ্ঞতা। কারণ অজ্ঞতাই মানুষকে গাফেল ও উদাসীন করে তোলে।

তিনি বলেন, আয়াতটিতে আল্লাহ নিজেকে ‘আল-কারিম’ বা মহানুভব ও পরম উদার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উদারতা শুধু সম্পদ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং হৃদয়ের প্রশস্ততাও এর অংশ । একজন মানুষ অন্যের ভুল ক্ষমা করতে পারে কি না, অতীতকে পেছনে ফেলতে পারে কি না এবং মানুষের ত্রুটির পাশাপাশি তার ভালো দিকও দেখতে পারে কি না—এসবও উদারতার অংশ।

তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “পার্থিব জীবন তো প্রতারণার ভোগসামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।” সুরা আলে ইমরান। তাই যে দুনিয়াকে আল্লাহ নিজেই প্রতারণার সামগ্রী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, সেই দুনিয়ার মোহে মানুষের অতিরিক্ত আসক্ত হওয়া উচিত নয়।

শায়খ মুস্তাফা আবদুল্লাহ বলেন, প্রথম যুগের এক ইমাম তাঁর এক ভাইকে উপদেশ দিয়েছিলেন—এই পৃথিবীতে যা নির্মিত হয়, একদিন তা ধ্বংস হবে; যা একত্রিত হয়, তা বিচ্ছিন্ন হবে; আর মানুষ শেষ পর্যন্ত কবরের যাত্রী হবে। তাই আল্লাহর দিকে দ্রুত ফিরে যাওয়া, তাঁর দেওয়া রিজিকে সন্তুষ্ট থাকা, আমল বাড়ানো এবং দুনিয়াবি আশা-আকাঙ্ক্ষা সীমিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, এখান থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, মানুষের আকাঙ্ক্ষা সীমিত করা দরকার। প্রতি বছর নতুন ফোন, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও নতুন গাড়ি কিংবা আরও বড় বাড়ির পেছনে ছোটা সবসময় হারাম নয়। তবে মানুষকে নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হবে—এসব কি প্রকৃত প্রয়োজন, নাকি শুধু আকাঙ্ক্ষা? আখিরাতের জন্য সে কী প্রস্তুতি নিয়েছি?

দ্বিতীয়ত, প্রত্যেকের উচিত নিজের হিসাব নিজেই নেওয়া। তিনি আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর উক্তি উল্লেখ করে বলেন, “আজ আমলের সময়, হিসাব নেই; আর আগামীকাল হিসাব হবে, কিন্তু আমলের সুযোগ থাকবে না।”
অর্থাত, দুনিয়ার জীবন হচ্ছে কাজ করার সময়, আর আখিরাত হচ্ছে সেই কাজের হিসাব দেওয়ার সময়।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা:) জানিয়েছেন, বান্দার প্রাণ কণ্ঠে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। তাই তওবা ও সংশোধনের সময় এখনই।

তৃতীয়ত, ভালো কাজ করার তাওফিক আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে । তিনি নবী শু‘আইব (আ.)-এর কথা উদৃত করে বলেন, “আমার তাওফিক কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই । তাঁরই ওপর আমি ভরসা করি এবং তাঁরই দিকে ফিরে যাই।” —সুরা হুদ, ১১:৮৮।

শায়খ মুস্তাফা বলেন, মানুষ মোবাইল ফোন ও গাড়ি চার্জ করতে ভুলে না, কিন্তু হৃদয়কে আধ্যাত্মিকভাবে সচল রাখার কথা প্রায়ই ভুলে যায়। সালাতের সময় হয়ে যাওয়ার পরও নামাজে দাঁড়াতে অনীহা কিংবা রমজানে রোজার প্রতি অনাগ্রহ—এসব আত্মিক অসুস্থতার লক্ষণ।

তিনি বলেন, শরীরের মতো হৃদয়েরও সুস্থতা প্রয়োজন, আর সেই সুস্থতার জন্য আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া জরুরি।

সবশেষে তিনি দোয়া করেন, “হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়কে গাফেলতা থেকে জাগিয়ে দিন, অন্তরকে সংশোধন করুন, দুনিয়ার দীর্ঘ আশা কমিয়ে দিন এবং আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের দিন আমাদের একটি নির্মল হৃদয় দান করুন। আমিন।”

শায়খ মুস্তাফা আবদুল্লাহ : অতিথি খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমার খুতবা, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।