পবিত্র রমজান শুরুর সম্ভাব্য তারিখ জানালেন আমিরাতের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা
প্রকাশিত :
০৮:২১, ১১ অক্টোবর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ০৮:২৩, ১১ অক্টোবর ২০২৬
পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে আর মাত্র ১২১ দিন বাকি। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সোমবার থেকে রোজা শুরু হতে পারে। আগামী ১২ অক্টোবর সোমবার হিজরি জমাদিউল আউয়াল মাস শুরু হলে রমজানের আগে বাকি থাকবে আর মাত্র চারটি চন্দ্র মাস।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষস্থানীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বরাত দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যম গালফ নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।
আমিরাত অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং আরব ইউনিয়ন ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড স্পেস সায়েন্সেসের সদস্য ইব্রাহিম আল জারওয়ান জানান, শনিবার সূর্যাস্তের পর সংযুক্ত আরব আমিরাত সময় আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে নতুন চাঁদের জন্ম হয়েছে। রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় খালি চোখে নতুন চাঁদ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে ১২ অক্টোবর সোমবার জমাদিউল আউয়াল মাসের প্রথম দিন হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই রমজান শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের পবিত্র রমজান মাস ২৯ অথবা ৩০ দিনের হতে পারে। সেই হিসেবে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে পারে আগামী বছরের ৯ মার্চ মঙ্গলবার অথবা ১০ মার্চ বুধবার। আল জারওয়ান উল্লেখ করেন, ইসলামি হিজরি বর্ষপঞ্জির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো কোনো ধরনের বিশেষ যন্ত্রপাতি বা জটিল গাণিতিক হিসাব ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে চাঁদের রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে মাস গণনা করা যায়।
এদিকে জমাদিউল আউয়াল মাসের চাঁদ দেখার বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন বিশ্লেষণ দিয়েছে শারজাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শারজাহ স্পেস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনমি হাব। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রোববার সূর্যাস্তের পর সাধারণ টেলিস্কোপ কিংবা খালি চোখে চাঁদ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে সূর্যাস্তের পূর্বে উন্নত অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফি প্রযুক্তির সাহায্যে চাঁদের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
শারজাহ সেন্টারের তথ্যমতে, যেসব দেশ বা অঞ্চল ইসলামি মাস নির্ধারণে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনাকে প্রাধান্য দেয়, তারা ১২ অক্টোবর সোমবার থেকে নতুন মাস গণনা শুরু করবে। অন্যদিকে যেসব দেশ সূর্যাস্তের পর খালি চোখে বা সাধারণ অপটিক্যাল টেলিস্কোপে চাঁদ দেখাকে অপরিহার্য মনে করে, তাদের ক্ষেত্রে জমাদিউল আউয়াল মাস শুরু হতে পারে ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার থেকে। সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে যে, শনিবার রাতে স্থানীয় সময় ৮টা ৪৭ মিনিটে শারজাহ অঞ্চলে চাঁদের কেন্দ্রিক সংযোগ সম্পন্ন হয়েছে।
দুর্গাপূজার আদি পীঠভূমি কি চট্টগ্রামের মেধস মুনির আশ্রম?
প্রকাশিত :
১৩:১৪, ১১ অক্টোবর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ১৩:৪৩, ১১ অক্টোবর ২০২৬
পৌরাণিক কাহিনি, সাধক-সন্ন্যাসীর আবিষ্কার, শতবর্ষের ইতিহাস আর ভূমি দখলের অভিযোগ—সব মিলিয়ে বোয়ালখালীর করলডেঙ্গা পাহাড়ের এই তীর্থভূমি আজও বহন করছে দুর্গাপূজার আদি ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়।
সংগ্রাম দত্ত: শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। বাতাসে শিউলির গন্ধ। চারদিকে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আগমনী আবাহন। বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই উৎসব শক্তির আরাধনা, অশুভের বিরুদ্ধে শুভের বিজয় এবং মিলন-সম্প্রীতির এক অনন্য উপলক্ষ।
কিন্তু এই দুর্গাপূজার সূচনা কোথায়? প্রথম কে দুর্গার আরাধনা করেছিলেন? কীভাবে মর্ত্যলোকে শুরু হয়েছিল দশভূজা দেবীর পূজা?
বাংলার প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পৌরাণিক আখ্যানের অনুসারীদের বিশ্বাস, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেতে হবে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার করলডেঙ্গা পাহাড়ে। সেখানে পাহাড়ের চূড়ায়, ঘন সবুজ প্রকৃতির মধ্যে অবস্থিত শ্রীশ্রী চণ্ডীতীর্থ ও মেধস মুনির আশ্রম। জনশ্রুতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, ঋষি মেধসের এই আশ্রমেই রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি প্রথম মৃন্ময়ী দশভূজা দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণ করে দেবীর আরাধনা করেছিলেন।
তবে দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল হিসেবে মেধস আশ্রমের পরিচয় মূলত পৌরাণিক বর্ণনা, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও স্থানীয় জনশ্রুতিনির্ভর। ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে এ দাবির স্বতন্ত্র প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এবং দুর্গাপূজার সূচনার নির্দিষ্ট কাল নির্ধারণ এখনো প্রয়োজন। এই পার্থক্য মাথায় রেখেই মেধস আশ্রমের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বর্তমান বাস্তবতা অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
যে আশ্রম ঘিরে দুর্গাপূজার আদি কাহিনি
চট্টগ্রাম জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে করলডেঙ্গা পাহাড়ের প্রায় ৫০০ ফুট উঁচু শিখরে মেধস মুনির আশ্রম। স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, আশ্রমে যেতে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রায় ১৪০টি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। কোথাও ঘন গাছপালা, কোথাও পাহাড়ি পথ, কোথাও মন্দিরের চূড়া। প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সঙ্গে এখানে মিশে আছে প্রাচীন তীর্থের আবহ।
আশ্রমের পরিচিতি শুধু দুর্গাপূজার আদি কাহিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে চণ্ডী মন্দির, মেধস মুনির মন্দির, স্বামী বেদানন্দ মহারাজের সমাধি, কামাখ্যা মন্দির, শিব মন্দির, তারা কালী মন্দির, দক্ষিণা কালী মন্দির ও সীতা মন্দির। পাহাড়ের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকা এসব ধর্মীয় স্থাপনা মেধস আশ্রমকে একটি বিস্তৃত তীর্থকেন্দ্রে পরিণত করেছে।
আশ্রমের ইতিহাস নিয়ে প্রচলিত বিবরণে বলা হয়, প্রাচীনকালে এই অঞ্চল ছিল গভীর অরণ্যে ঘেরা। পাহাড়ি ঝরনা, দুর্গম পথ, বন্য প্রাণী আর নিবিড় সবুজে ঢাকা ছিল চারপাশ। লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন সেই অরণ্যে ঋষি মেধস গভীর সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন। তাঁর আশ্রমের অবস্থান সম্পর্কে প্রাচীন শাস্ত্রে উল্লেখ থাকলেও দীর্ঘকাল সাধারণ মানুষের কাছে তা পরিচিত ছিল না বলে স্থানীয় ঐতিহ্যে দাবি করা হয়।
এই আশ্রমের সঙ্গে দুর্গাপূজার সম্পর্ক বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় দেবী মহাত্ম্য বা চণ্ডীর কাহিনিতে।
রাজ্যহারা রাজা, প্রতারিত বৈশ্য ও ঋষি মেধস
দেবী মহাত্ম্য অনুসারে, রাজা সুরথ ছিলেন এক শক্তিশালী শাসক। শত্রুর আক্রমণে রাজ্য হারিয়ে তিনি একসময় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অন্যদিকে সমাধি নামে এক বৈশ্য আত্মীয়স্বজনের প্রতারণা ও বিতাড়নের শিকার হন। দুজনেই সংসার ও জীবনের সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে আশ্রয় নেন ঋষি মেধসের কাছে।
রাজ্য হারিয়েও সুরথের মনে রাজ্যের প্রতি টান ছিল। প্রতারিত হয়েও সমাধির মনে আত্মীয়দের প্রতি মমতা রয়ে গিয়েছিল। নিজেদের দুর্দশা বুঝতে না পেরে তাঁরা ঋষির কাছে জানতে চান, কেন মানুষ ক্ষতি ও দুঃখের অভিজ্ঞতার পরও সেই বিষয়গুলোর প্রতি আকৃষ্ট থাকে, যেগুলো তাকে কষ্ট দিয়েছে।
ঋষি মেধস তাঁদের বোঝান, জগতে মায়া এক গভীর শক্তি। জ্ঞানী মানুষও তার প্রভাব থেকে সহজে মুক্ত হতে পারেন না। এই মহামায়াই জীবকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখেন, আবার তাঁর কৃপায় সেই মোহ থেকে মুক্তিও সম্ভব।
এরপর ঋষি তাঁদের দেবীর মাহাত্ম্য, অসুরবিনাশ এবং জগতে শক্তির প্রকাশের কাহিনি শোনান। দেবী মহাত্ম্যের বর্ণনায়, মহিষাসুরের অত্যাচারে পরাজিত দেবতারা যখন স্বর্গচ্যুত হন, তখন তাঁদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূত হন মহাশক্তি। দেবতারা তাঁকে নিজেদের অস্ত্র দান করেন। সিংহবাহিনী, ত্রিনয়না, দশভুজা দেবী মহিষাসুরসহ অসুরদের পরাজিত করে দেবতাদের স্বর্গ ফিরিয়ে দেন।
এই আখ্যান কেবল দেবী ও অসুরের যুদ্ধের গল্প নয়। হিন্দু শাক্তধর্মে এটি অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সৃষ্টিজগতের অন্তর্নিহিত শক্তির প্রতীক।
ঋষি মেধসের পরামর্শে সুরথ ও সমাধি দেবীর আরাধনায় মনোনিবেশ করেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তাঁরা মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা, জপ ও তপস্যার মাধ্যমে দেবীর কৃপা লাভ করেন। সুরথ ফিরে পান তাঁর হারানো রাজ্য। সমাধি লাভ করেন আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও মোহমুক্তির পথ।
মেধস আশ্রমের ঐতিহ্যে এই ঘটনাই দুর্গাপূজার প্রথম আয়োজনের ভিত্তি। স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি এখানেই প্রথম মৃন্ময়ী দশভুজা প্রতিমা নির্মাণ করে দুর্গার পূজা করেছিলেন। তবে দেবী মহাত্ম্যের মূল আখ্যান, পরবর্তী ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং মেধস আশ্রমের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানের দাবিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। প্রথম পূজার সুনির্দিষ্ট স্থান ও কাল নির্ধারণে আরও ঐতিহাসিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
বসন্তের পূজা থেকে শরতের উৎসব
দুর্গাপূজার সঙ্গে বসন্ত ও শরৎ—দুই ঋতুরই সম্পর্ক রয়েছে। প্রচলিত পৌরাণিক ব্যাখ্যায় রাজা সুরথের পূজা ছিল বসন্তকালের। এ কারণে এই পূজা পরিচিত বাসন্তীপূজা নামে।
অন্যদিকে রামায়ণের জনপ্রিয় ধর্মীয় আখ্যান অনুসারে, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় এবং সীতাকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে শ্রীরাম শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাসে এই পূজা ছিল নির্ধারিত সময়ের আগের আরাধনা, যা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত। শরৎকালের এই পূজাই পরবর্তী সময়ে শারদীয়া দুর্গাপূজা হিসেবে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে।
তবে বাসন্তীপূজা ও শারদীয়া দুর্গাপূজার বিকাশকে শুধু একটি পৌরাণিক ঘটনার মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাংলায় দুর্গাপূজার বর্তমান রূপ গড়ে উঠেছে দীর্ঘকাল ধরে ধর্মীয় আচার, সামাজিক রীতি, জমিদারি পৃষ্ঠপোষকতা, নগরজীবন ও জনসমাগমের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
আজ দুর্গাপূজা আর কেবল মন্দিরকেন্দ্রিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি শিল্প, সংগীত, ভাস্কর্য, আলোকসজ্জা, লোকজ ঐতিহ্য ও সামাজিক মিলনেরও উৎসব। বাংলাদেশে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাঙালি হিন্দুদের কাছে এই উৎসব সাংস্কৃতিক পরিচয় ও শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের উপলক্ষ।
শাস্ত্রে মেধস আশ্রমের উল্লেখ
মেধস আশ্রমের প্রাচীনত্ব প্রতিষ্ঠায় এর অনুসারীরা কয়েকটি তান্ত্রিক ও ধর্মীয় গ্রন্থের উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে গৌরীতন্ত্রের কামাখ্যা পটল, কামাখ্যাতন্ত্র ও যোগিনীতন্ত্র।
গৌরীতন্ত্রের কামাখ্যা পটলে কর্ণফুলী নদী, গোপর্বত, দশমহাবিদ্যা, মার্কণ্ডেয় মুনি এবং মেধস মুনির আশ্রমের প্রসঙ্গ রয়েছে বলে আশ্রমের ইতিহাসসংক্রান্ত বিবরণে উল্লেখ করা হয়। কামাখ্যাতন্ত্রেও কর্ণফুলী থেকে দক্ষিণ সাগর পর্যন্ত অঞ্চলকে পুণ্যক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করে মেধস ঋষির আশ্রমের কথা বলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
যোগিনীতন্ত্রের বর্ণনায় মার্কণ্ডেয় আশ্রম, মার্কণ্ডেয় কুণ্ড ও ঋষির পদচিহ্নের উল্লেখও এই তীর্থের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
আশ্রমের অনুসারীদের মতে, পাহাড়ি কুণ্ড, ঝরনা, প্রাচীন বৃক্ষ ও বিভিন্ন ধর্মীয় নিদর্শন এসব শাস্ত্রীয় বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁদের বিশ্বাস, বহু শতাব্দী ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা তীর্থটি কলিযুগে পুনরায় প্রকাশিত হওয়ার কথা প্রাচীন গ্রন্থেই বলা হয়েছিল।
তবে এই শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতিগুলোর প্রামাণ্য সংস্করণ, রচনাকাল, পাঠভেদ এবং বর্তমান আশ্রমের সঙ্গে সেগুলোর ভৌগোলিক সম্পর্ক নিয়ে স্বাধীন গবেষণা জরুরি। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে কোনো তীর্থের উল্লেখ থাকা এবং সেই তীর্থের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা এক বিষয় নয়। মেধস আশ্রমের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণে এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
১৯০০ সালে স্বামী বেদানন্দের আবিষ্কার
মেধস আশ্রমের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম শ্রীমৎ বেদানন্দ স্বামী। আশ্রমের প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, তাঁর গৃহস্থ জীবনের নাম ছিল চন্দ্রশেখর। তিনি শীতলচন্দ্র নামেও পরিচিত ছিলেন। ১২৬৬ বঙ্গাব্দের ২৫ অগ্রহায়ণ পূর্ণিমা তিথিতে বরিশাল জেলার গৈলা গ্রামে তাঁর জন্ম।
তাঁর পিতা ছিলেন জগদ্বন্ধু পণ্ডিত। প্রপিতামহ রামকৃষ্ণ ন্যায়পঞ্চানন পূর্বাঞ্চলের একজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ও পৌরাণিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
শৈশব ছিল দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতায় ভরা। মাত্র দুই বছর বয়সে পিতাকে হারান চন্দ্রশেখর। তাঁর মা ভিক্ষা করে সন্তানদের লালন-পালন করতেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকলেও পরে তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণ, কাব্য ও দর্শনশাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। কেদার পদরত্ন, রামনারায়ণ তর্করত্ন, সুব্রহ্মণ্য শাস্ত্রী, দণ্ডী নারায়ণ শাস্ত্রী ও হরিনাথ বেদান্তবাগীশের মতো পণ্ডিতদের কাছে অধ্যয়নের কথা তাঁর জীবনীতে পাওয়া যায়।
ব্যাকরণ ও বেদান্তে পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বিদ্যাভূষণ’ ও ‘বেদান্তভূষণ’ উপাধি লাভ করেন। পরে মাদারীপুরে ‘জগদ্বন্ধু সংস্কৃত কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং অধ্যাপনা ও বেদান্ত প্রচারে যুক্ত হন।
কিন্তু জ্ঞানচর্চা ও অধ্যাপনার পাশাপাশি তাঁর মধ্যে ক্রমে বৈরাগ্যের প্রবণতা বাড়তে থাকে। জীবনীতে বলা হয়, একসময় একটি পুঁথির ছেঁড়া পাতা তাঁর হাতে আসে। সেটি পড়ে তিনি মর্ত্যলোকে দুর্গাপূজার আদি স্থান হিসেবে পরিচিত প্রাচীন মেধস আশ্রমের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন।
এরপর আশ্রমটির সন্ধানে তিনি ভারতবর্ষের নানা অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন। হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত বিস্তৃত ভ্রমণের পর পূর্ব ভারতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথধামে পৌঁছান। সেখানকার মোহন্ত কিশোরী বন মহারাজের কাছে প্রায় ৪০ বছর বয়সে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং বেদানন্দ স্বামী উপাধি লাভ করেন বলে আশ্রমের ইতিহাসে উল্লেখ আছে।
প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, চন্দ্রনাথধামে সাধনার সময় তিনি যোগবলে মেধস আশ্রমের অবস্থান সম্পর্কে নির্দেশনা পান। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের অগ্নিকোণ ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি বোয়ালখালীর করলডেঙ্গা পাহাড় অঞ্চলে উপস্থিত হন।
পুঁথির বর্ণনার সঙ্গে স্থানীয় পাহাড়, কুণ্ড, ঝরনা ও অন্যান্য নিদর্শন মিলিয়ে তিনি স্থানটিকে প্রাচীন মেধস আশ্রম হিসেবে শনাক্ত করেন। আশ্রমের ইতিহাসে আবিষ্কারের সাল ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ। এই অনুসন্ধানে তাঁর সঙ্গী ছিলেন কানুনগোপাড়া গ্রামের অন্নদাচরণ সর্ববিদ্যা।
সেই সময় আশ্রমের সামনের বর্তমান কৃষিজমি ও আশপাশের এলাকা ছিল অসংখ্য টিলা, ঢিবি, ঘন ঝোপঝাড় এবং বড় বড় গাছে আচ্ছাদিত বনভূমি। বর্তমান সীতা মন্দিরের স্থানও ছিল ঘন অরণ্যে ঢাকা। সূর্যের আলো খুব কমই মাটিতে পৌঁছাত। বানর, হনুমান, উল্লুক, হরিণসহ নানা প্রাণীর বিচরণ ছিল সেখানে। ছোট ছোট ঝরনার শব্দ ও পাখির ডাক মিলিয়ে জায়গাটি ছিল নির্জন ও দুর্গম।
বেদানন্দ স্বামীর আবিষ্কারের খবর ছড়িয়ে পড়লে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে আসতে শুরু করেন বলে আশ্রমের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, ঐতিহাসিক, সাংবাদিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা স্থানটি পরিদর্শন করেন এবং একে মেধস মুনির আশ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দেন বলে প্রচলিত বিবরণে দাবি করা হয়। তবে এসব পরিদর্শন, স্বীকৃতি ও গবেষণার নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
দান করা হয়েছিল ৬৮ একরের বেশি জমি
আশ্রমের ইতিহাসে জমিদান একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, আশ্রমসংলগ্ন ভূমির মালিক মহেন্দ্র ঘোষাল ও নীলকৃষ্ণ রায় দেবী দুর্গার নামে ৬৮ একরের বেশি জমি ও পাহাড় দানপত্র করে দেন। পরে ওই জমি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে পরিচিত হয়।
প্রথম দিকে পাহাড়ের চূড়ায় ছন, বাঁশ ও টিন দিয়ে ঘর তৈরি করে দেবীপূজা শুরু করা হয়। কানুনগোপাড়া গ্রামের গৌরীশঙ্কর স্মৃতিতীর্থকে প্রথম পূজারি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে আশ্রমের ইতিহাসে উল্লেখ আছে।
১৯০০ সালে আশ্রম আবিষ্কারের পর থেকে অন্নদাচরণ সর্ববিদ্যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, পঞ্চাশের দশকের শেষভাগ অবধি, আশ্রমের দায়িত্ব পালন করেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে বলা হয়। তাঁর সহযোগী ছিলেন বিজয়কৃষ্ণ চক্রবর্তী ও উত্তরভূর্ষি গ্রামের অন্নদাচরণ চৌধুরীসহ আরও অনেকে।
১৯২০ সালে যুক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর আর্থিক সহায়তায় শ্রীশ্রী চণ্ডীমাতা মন্দির নির্মিত হয়। পরে ব্রহ্মদেশ, বর্তমান মিয়ানমারের সর্বোচ্চ পুলিশ কর্মকর্তা যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সৌজন্যে প্রতিষ্ঠিত হয় সম্পূর্ণ পিতলের তৈরি একটি দশভুজা দুর্গাপ্রতিমা।
কিন্তু সেই প্রতিমা ও মন্দির দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনি। আশ্রমের বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দুর্বৃত্তরা গানপাউডার ব্যবহার করে মন্দিরের ব্যাপক ক্ষতি করে এবং অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে পিতলের দুর্গাপ্রতিমাটিও লুট করে নিয়ে যায়।
১৯৮৭ সালে কানুনগোপাড়া গ্রামের সমাজসেবক হরিপদ কানুনগোর উদ্যোগে হাওলা গ্রামের শিল্পী প্রফুল্ল কুমার আচার্যের হাতে নির্মিত পাথরের দশভুজা প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর থেকে এই প্রতিমার বার্ষিক পূজা চলে আসছে বলে আশ্রম কর্তৃপক্ষের দেওয়া ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্য পাহাড়চূড়ায় থাকা মার্কণ্ডেয় শিব ও তারা দেবীর ছোট মন্দির দুটিও ধ্বংস হয়ে যায় বলে স্থানীয় বিবরণে বলা হয়েছে।
দেশভাগের পর সংকট, পরে উন্নয়নের চেষ্টা
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর আশ্রমে বাইরে থেকে ভক্তদের অনুদান আসা বন্ধ হয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্ট ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। এতে আশ্রমের রক্ষণাবেক্ষণ ও পূজার আয়োজন কঠিন হয়ে পড়ে। এই সংকটে অন্নদাচরণ সর্ববিদ্যার সঙ্গে বিজয়কৃষ্ণ চক্রবর্তী ও অন্নদাচরণ চৌধুরী দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম শহরে এক সভার মাধ্যমে মেধস আশ্রমের উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য প্রথম জন-প্রতিনিধিত্বমূলক কমিটি গঠন করা হয়। আশ্রমের ইতিহাস অনুযায়ী, এ উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ভক্ত বিজয়কৃষ্ণ চক্রবর্তী ও শ্রীমৎ স্বামী নির্মলানন্দ গিরি মহারাজ।
কমিটির সাধারণ সম্পাদক অশ্বিনীকুমার বিশ্বাস শহরে ভক্তদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করতেন এবং নিজের অর্থও ব্যয় করতেন। সহসাধারণ সম্পাদক বিজয়কৃষ্ণ চক্রবর্তী ও স্বামী নির্মলানন্দ গিরি পাহাড়ে থেকে মন্দির ও আশ্রমের উন্নয়নে কাজ করেন।
তাঁদের উদ্যোগে পুরোনো মন্দির সংস্কার, দ্বিতল যাত্রীনিবাস, তিন কক্ষের পাকা ভোগঘর, গোয়ালঘর, পাঁচ কক্ষের শৌচাগার, দুটি প্রবেশতোরণ, সিঁড়ি, পানীয় জলের পাকা পুকুর ও নতুন শিবমন্দির নির্মাণ করা হয়। পাহাড় রক্ষার জন্য একটি সীমানাপ্রাচীরও তৈরি হয়েছিল, যা বর্তমানে বিধ্বস্ত বলে জানা যায়।
উত্তরভূর্ষি গ্রামের চিকিৎসক যামিনীরঞ্জন চৌধুরীর সৌজন্যে বেদানন্দ স্বামীর সমাধিগৃহ নির্মিত হয়। একসময় সমাধিস্থলে ঘটা করে উত্তরায়ণ সংক্রান্তি উৎসবও আয়োজন করা হতো।
আশ্রমের পানির সংকট দূর করতে সিলেটের এক ব্যক্তি ২০ হাজার টাকা দেন। শাকপুর গ্রামের অমিত হোড়ের সৌজন্যে একটি নলকূপ স্থাপন করা হয়। পরে বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে একটি দুই কিলোওয়াটের জেনারেটর দেওয়া হয়। সেটির সক্ষমতা অপর্যাপ্ত হওয়ায় ঢাকায় বসবাসকারী কেশিশহর গ্রামের সুজিত চৌধুরী পাঁচ কিলোওয়াটের একটি জেনারেটর এবং আশ্রমের সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য একটি মাইক কিনে দেন বলে সংশ্লিষ্ট ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
করলডেঙ্গা গ্রামের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সুধীর দাশ ও তাঁর ভাই আশ্রমের প্রবেশপথে দেড় লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে একটি তোরণ নির্মাণ করেন। অশ্বিনীকুমার বিশ্বাসের জীবদ্দশায় ঘাট থেকে মন্দির পর্যন্ত সিঁড়ি এবং পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মন্দিরের দিকে ওঠার পথের একাংশ নির্মিত হয়েছিল। পরে আরও অনেকের সহযোগিতায় সিঁড়ির কাজ প্রায় শেষ হয়।
হরিপদ কানুনগোর প্রতিষ্ঠিত দুর্গাপ্রতিমাটি দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে ছিল বলে স্থানীয় বিবরণে জানা যায়। পরে তাঁর ছেলে অজয় কানুনগো দেবীর বেদি নির্মাণ ও মন্দিরের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার উদ্যোগ নেন। দেড় লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের পাশাপাশি তাঁর প্রচেষ্টায় সীতা মন্দির নির্মাণের কাজও এগোয়।
জ্যৈষ্ঠপুরা গ্রামের অদুল চৌধুরীর সৌজন্যে ১৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে আশ্রম এলাকায় কামাখ্যা মন্দির নির্মিত হয়। ভাস্কর শ্যামল আচার্য এর প্রতিমা নির্মাণ করেন। আশ্রমের বর্ণনা অনুযায়ী, মন্দিরটি ধর্মীয় স্থাপনার বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের আকর্ষণও বৃদ্ধি করেছে।
পরবর্তী সময়ে সীতা মন্দির, কামাখ্যা মন্দির ও মেধস মুনির আশ্রম নির্মাণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রয়াত অশ্বিনীকুমার বিশ্বাসের ছেলেরা—বিশেষ করে চিকিৎসক ওম প্রকাশ, চিকিৎসক শ্রী প্রকাশ এবং প্রকৌশলী জয় প্রকাশ—আশ্রম প্রাঙ্গণে তাঁর স্মৃতিস্মারক নির্মাণ করেন। সেখানে নির্মিত হয় বড় নাটমন্দির। স্বামী নির্মলানন্দ গিরি মহারাজের সমাধির ওপরের স্থাপনাও গড়ে ওঠে। দ্বিতীয় তলায় যাত্রীনিবাস ও আধুনিক শৌচাগার নির্মাণের কাজেও তাঁদের অর্থায়ন ছিল বলে আশ্রমের ইতিহাসে উল্লেখ আছে।
পাহাড়ের পর পাহাড়, মন্দিরের পর মন্দির
মেধস আশ্রমে প্রবেশের মুখে রয়েছে গণেশ মন্দির। সিঁড়ি বেয়ে প্রায় ৫০০ ফুট উঁচুতে উঠলে দেখা যায় মেধস মুনির মন্দির। আরও কিছুটা এগোলেই মূল আশ্রম ও চণ্ডী মন্দির।
চণ্ডী মন্দিরের পাশে রয়েছে আশ্রমের আধুনিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি স্বামী বেদানন্দ মহারাজের সমাধিমন্দির। মূল আশ্রম থেকে ডান দিকের পাহাড়ি পথ ধরে এগোলে দেখা যায় কামাখ্যা মন্দির। এরপর উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় শিবমন্দির। সেখান থেকে আরও নিচে নেমে আবার অন্য একটি পাহাড়ে উঠতে হয়; তার শীর্ষে রয়েছে তারা কালী মন্দির। মূল আশ্রমের বাঁ পাশের পাহাড়ে রয়েছে মেধসেশ্বরী দক্ষিণা কালী মন্দির।
মূল আশ্রম, কামাখ্যা মন্দির, শিবমন্দির ও তারা কালী মন্দিরের মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে মানস সরোবর। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার পানি সেখানে জমে থাকে। মূল আশ্রম থেকে প্রায় ৩০০ ফুট নিচে অবস্থিত এই সরোবরের পাশেই সীতা মন্দির।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ত্রেতাযুগে সীতা এই সরোবরে স্নান করেছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাসে সরোবরটি তাই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
মূল চণ্ডী মন্দিরের পেছনে রয়েছে ভোগঘর, আশ্রম অধ্যক্ষের কার্যালয় ও যাত্রীনিবাস। ভোগঘরের সামনে একটি কাঁঠালগাছের গোড়ায় রয়েছে ১২টি কাছিম। আশ্রমের লোকজন এগুলোকে ঋষি কচ্ছপ নামে চেনেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাছিমগুলো ফুল, বেলপাতা ও ফলের খোসা খেয়ে বেঁচে থাকে। কথিত আছে, মেধস ঋষির অভিশাপে কোনো এক ঋষি কাছিমে পরিণত হয়েছিলেন।
এখানে দুটি গাভি ও একটি হরিণশাবকও রয়েছে বলে আশ্রমের বিবরণে উল্লেখ আছে। তবে কাছিমগুলোর প্রজাতি, সংরক্ষণগত অবস্থা এবং বন্য প্রাণীর পরিচর্যার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
মন্দিরের দায়িত্বে নিয়োজিত স্বরূপ চৌধুরীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৩০ জন মানুষ কাজ করেন। এই কর্মীদের মধ্যে পূজা, রক্ষণাবেক্ষণ, দর্শনার্থীদের ব্যবস্থাপনা ও আশ্রমের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন বলে ধারণা করা যায়; তবে তাঁদের দায়িত্ব ও কর্মসংস্থানের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া প্রয়োজন।
৬৮ একর জমির মধ্যে ৫৫ একর দখলের অভিযোগ
মেধস আশ্রমের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নটি জমি নিয়ে। আশ্রমের নামে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে ৬৮ দশমিক ১৯ একর ভূমি ছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেন। তাঁদের অভিযোগ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এর মধ্যে প্রায় ৫৫ একর জমি দখল করে নিয়েছেন।
শ্রীশ্রী চণ্ডীতীর্থ মেধস মুনি আশ্রমের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রীমৎ বুলবুল আনন্দ মহারাজও এ অভিযোগ করেছিলেন বলে আশ্রমের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এ অভিযোগের গুরুত্ব শুধু জমির পরিমাণে নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক তীর্থের অস্তিত্ব, ধর্মীয় সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্ন। তবে জমি দখলের অভিযোগের সত্যতা, আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরিধি, জমির বর্তমান মালিকানা ও দখলদারদের পরিচয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি, ভূমি রেকর্ড এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় ইতিহাসে আরও বলা হয়েছে, অন্নদাচরণ চৌধুরী দেবীপূজার জন্য ৩০ আড়ি উপস্বত্বের ধানিজমি দান করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৮ সালে গঠিত কমিটি ওই জমির কোনো হদিস পায়নি। এই তথ্যও ভূমির পুরোনো দলিল ও বর্তমান খতিয়ান মিলিয়ে অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
প্রাচীন তীর্থের পরিচয় ধরে রাখা শুধু মন্দির নির্মাণ বা পূজার আয়োজনের ওপর নির্ভর করে না। প্রয়োজন জমির সুরক্ষা, ঐতিহাসিক নথির সংরক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষা। মেধস আশ্রমের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গাপূজার বিশ্বজনীন স্বীকৃতি, কিন্তু আদি ইতিহাসের প্রশ্ন
দুর্গাপূজা আজ বাঙালি হিন্দু সমাজের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসব। বাংলাদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে দুর্গাপূজা উপলক্ষে মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা স্থাপন, পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সামাজিক আয়োজন হয়। প্রবাসী বাঙালিদের কাছেও এটি নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার বড় উপলক্ষ।
২০২১ সালে ইউনেসকো কলকাতার দুর্গাপূজাকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ বা মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এই স্বীকৃতি দুর্গাপূজার সামাজিক অংশগ্রহণ, শিল্পকলার বৈচিত্র্য, কারুশিল্প, সামষ্টিক আয়োজন এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরে।
তবে ইউনেসকোর স্বীকৃতি দুর্গাপূজার আদি স্থান হিসেবে মেধস আশ্রমকে স্বীকৃতি দেয়নি। কলকাতার দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং মেধস আশ্রমের পৌরাণিক উৎপত্তি-সংক্রান্ত দাবি দুটি আলাদা বিষয়।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং তার প্রাচীনতম ভৌগোলিক উৎস নির্ধারিত হওয়া একই ধরনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নয়।
মেধস আশ্রমের অনুসারীদের বিশ্বাস, এখানেই দুর্গাপূজার আদি আরাধনা হয়েছিল। সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে স্থানটি বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ মর্যাদার দাবিদার। এই ঐতিহ্যকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরতে হলে প্রয়োজন প্রাচীন পুঁথি ও শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য সংস্করণ সংগ্রহ, ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণ, প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এবং ধর্মতত্ত্ব ও ইতিহাসের গবেষকদের স্বাধীন মূল্যায়ন।
ইতিহাসের স্মৃতি বাঁচাতে যা প্রয়োজন
করলডেঙ্গা পাহাড়ের মেধস আশ্রমে একদিকে রয়েছে দেবী দুর্গার আদি পূজার সঙ্গে যুক্ত পৌরাণিক আখ্যান, অন্যদিকে রয়েছে স্বামী বেদানন্দের আবিষ্কার, শতবর্ষের মন্দির-ইতিহাস, দানপত্রের স্মৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহু মানুষের শ্রম, অর্থ ও ভক্তি।
পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে একের পর এক মন্দির চোখে পড়ে। ঝরনার পানি সরোবরে এসে পড়ে। প্রাচীন আশ্রমের স্মৃতিকে ঘিরে এখনও পূজা-অর্চনা হয়। কিন্তু মন্দিরের অস্তিত্ব থাকলেই যে তার ইতিহাস, জমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে, তা নয়।
আশ্রমের ভবিষ্যৎ রক্ষায় প্রথম প্রয়োজন জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত বিরোধের স্বচ্ছ নিষ্পত্তি। একই সঙ্গে প্রয়োজন দানপত্র, পুরোনো দলিল, মন্দির প্রতিষ্ঠার নথি, প্রতিমা নির্মাণের ইতিহাস এবং স্বামী বেদানন্দের অনুসন্ধানসংক্রান্ত বিবরণ সংগ্রহ করে একটি নির্ভরযোগ্য আর্কাইভ গড়ে তোলা। পাহাড়ি পরিবেশ, ঝরনা, সরোবর ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পৌরাণিক বিশ্বাস, স্থানীয় জনশ্রুতি এবং যাচাই করা ইতিহাসকে পৃথকভাবে নথিবদ্ধ করা। তাতে ধর্মীয় ঐতিহ্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় না; বরং তার ইতিহাস আরও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পায়।
দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল হিসেবে মেধস আশ্রমের দাবি স্বাধীন গবেষণায় কতটা প্রতিষ্ঠা পাবে, তা ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানই নির্ধারণ করবে। কিন্তু বাংলাদেশের ধর্মীয় ঐতিহ্য, স্থানীয় স্মৃতি ও শতবর্ষের সাধনাভিত্তিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে এই আশ্রমের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
করলডেঙ্গা পাহাড়ের এই তীর্থভূমি তাই শুধু অতীতের একটি কাহিনি নয়। এটি একই সঙ্গে বিশ্বাসের উত্তরাধিকার, ইতিহাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্র এবং বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক দায়িত্বের নাম। সেই দায়িত্ব হলো—দাবি ও প্রমাণকে পাশাপাশি রেখে, জমি ও পরিবেশ রক্ষা করে, মেধস আশ্রমের ইতিহাসকে বিস্মৃতির হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা।