ইস্ট লন্ডন মসজিদে জুমার খুতবা : প্রকৃত শক্তিশালী সেই ব্যক্তি, যিনি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন
শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ
মানুষের প্রকৃত মর্যাদা সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা বংশপরিচয়ে নয়; বরং আল্লাহভীতি বা তাকওয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। একইভাবে প্রকৃত সাহস মানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা কিংবা প্রতিশোধ নেওয়া নয়; বরং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে বিবেক ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। ইসলাম মানুষকে এই শিক্ষা দেয় যে, শক্তিশালী সেই ব্যক্তি, যিনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করতে পারেন এবং ক্রোধের মুহূর্তেও আত্মসংযম বজায় রাখেন।
৩০ অক্টোবর শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ কথাগুলো বলেন। খুতবায় তিনি ইসলামের আলোকে প্রকৃত সাহস, মানবিক মর্যাদা, আত্মসংযম ও তাকওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ বলেন, ইসলামপূর্ব আরব সমাজে দুটি গুণ বিশেষভাবে প্রশংসিত ছিল—বদান্যতা ও সাহসিকতা । অতিথিপরায়ণতায় আরবরা ছিলেন অনন্য। কিন্তু সাহসিকতার নামে তাঁরা অনেক সময় তুচ্ছ কারণে যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পড়তেন। এমনকি গোত্রীয় অহংকারে আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও অস্ত্র ধারণ করতেন। ইসলাম এসে মানুষের এসব বৈশিষ্ট পরিশুদ্ধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ (মুসনাদে আহমদ)
তিনি বলেন, প্রকৃত সাহসের আগে প্রয়োজন সঠিক বিচারবুদ্ধি । প্রসিদ্ধ আরবি কবি আল-মুতানাব্বি\'র একটি পঙ্ক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বীরের সাহসের আগে প্রয়োজন সঠিক বিচারবুদ্ধি। কারণ বিচারবুদ্ধি প্রথম, সাহস দ্বিতীয়।’
উহুদের যুদ্ধের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুসলমানরা যখন কঠিন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁদের হতাশ না হওয়ার নির্দেশ দেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরাই বিজয়ী হবে।’ (সুরা আলে ইমরান, ৩:১৩৯)
তিনি বলেন, যাঁরা ভুল করেছিলেন, তাঁদের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে রাসুলুল্লাহকে (সা:) ক্ষমা, ক্ষমা প্রার্থনা ও পরামর্শের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। (সুরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯)। এখানেই ইসলামের সৌন্দর্য। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করা এবং ভুলকারীর সংশোধনের সুযোগ দেওয়া প্রকৃত সাহসিকতার পরিচয়।
রাসুলুল্লাহ (সা:)এর একটি হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সেই ব্যক্তি, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ বলেন, বর্তমান সমাজে মানুষের আবেগকে নানাভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদনের প্রভাবে অনেক তরুণ সামান্য ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে পড়ছে। এমনকি ভিডিও গেমে হেরে গিয়ে কেউ কেউ রাগে জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে এবং মা-বাবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে। অথচ ইসলাম আবেগের পরিবর্তে বিবেক ও ঈমানের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়।
তিনি সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস-সাহমি (রা.)-এর সাহসিকতার একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা তুলে ধরেন। বাইজেন্টাইন শাসকের হাতে বন্দি হওয়ার পর তাঁকে ইসলাম ত্যাগের প্রলোভন ও ভয় দেখানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি ঈমানের ওপর অটল থাকেন। শেষ পর্যন্ত নিজের মুক্তির পাশাপাশি অন্য মুসলিম বন্দিদের মুক্তির শর্ত আদায় করেন। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, প্রকৃত সাহস শুধু নিজের জন্য নয়; অন্যের কল্যাণেও বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়া।
পারিবারিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জীবনে মতবিরোধ ও সংকট আসতেই পারে। কিন্তু প্রতিটি সমস্যার সমাধান সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। বরং ক্ষমা, ধৈর্য ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। জীবনের শেষ পর্যায়ে অনেক মানুষ বুঝতে পারেন, সমস্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই সমস্যার প্রতি তাঁদের প্রতিক্রিয়া।
খুতবায় তিনি পবিত্র কোরআনের সুরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক মর্যাদাবান, যে অধিক তাকওয়াবান।’
তিনি বলেন, তাকওয়া হলো আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা, অল্পে সন্তুষ্ট থাকা এবং পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। মানুষের অর্জিত সম্পদ মৃত্যুর পর সঙ্গে যাবে না। তাই সম্পদের অহংকার নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হওয়া উচিত জীবনের প্রধান লক্ষ্য।
খুতবার শেষাংশে শায়খ মুস্তফা আবদুল্লাহ বলেন, সন্তানদের শুধু শক্তিশালী হতে শেখালে চলবে না; তাদের বিবেকবান, সংযমী ও আল্লাহভীরু হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা, অহংকারের পরিবর্তে বিনয় এবং আবেগের পরিবর্তে প্রজ্ঞাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি তাকওয়া, আর প্রকৃত সাহসের পরিচয় আত্মসংযম ও সঠিক সিদ্ধান্তে।’
সবশেষে তিনি সবাইকে তাকওয়াবান, বিচক্ষণ ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দানের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।



















