img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এক মহান ইবাদত

প্রকাশিত :  ১৫:৩৬, ২১ আগষ্ট ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এক মহান ইবাদত

শায়খ আনিসুল হক

\'মানুষের সেবা করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মানুষের উপকারে এগিয়ে আসাও হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত\' । ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন ইমাম শায়খ আনিসুল হক । তিনি ১৪ আগস্ট শুক্রবার খুতবা উপস্থাপন করেন।

খুতবায় তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বর্ণিত একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। একবার সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা:) এর সঙ্গে সফরে ছিলেন । তাঁদের মধ্যে কেউ রোজা রেখেছিলেন, কেউ রাখেননি । প্রচণ্ড গরমের কারণে রোজাদার সাহাবিরা এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েন যে তাঁরা বিশ্রামে চলে যান । তখন যারা রোজা রাখেননি, তাঁরা উঠে তাঁবু তৈরি করেন, বাহনের দেখাশোনা করেন এবং সবার জন্য পানি সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করেন।

তাঁদের এই সেবা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা‍‍:) বললেন, “আজ যারা রোজা রাখেনি, তারাই সব সওয়াব নিয়ে গেল।”

শায়খ আনিসুল হক বলেন, এ ঘটনা আমাদেরকে ইবাদত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। আমরা অনেক সময় মনে করি নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত ও জিকিরই শুধু ইবাদত। অথচ আল্লাহর বান্দাদের উপকার করা, তাদের কষ্ট দূর করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বড় মাধ্যম।

তিনি বলেন, একজন মুমিন শুধু নিজের জন্য বাঁচে না। তার জীবন, পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের কল্যাণের সঙ্গেও যুক্ত।

খুতবায় রাসুলুল্লাহ (সা:) এর মদিনায় হিজরতের পর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ভ্রাতৃত্বের কথাও তুলে ধরা হয় । মক্কা থেকে আসা মুহাজিররা নিজেদের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও অনেক ক্ষেত্রে পরিবার-পরিজনও পেছনে রেখে এসেছিলেন । মদিনার আনসাররা তাঁদের শুধু স্বাগত জানাননি, বরং নিজেদের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা ভাগ করে নেওয়ার জন্যও প্রস্তুত ছিলেন।

বিশেষভাবে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা:) ও সা‘দ ইবনে রাবি‘ (রা.)-এর মধ্যকার ভ্রাতৃত্বের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আনসারদের সেবা শুধু মুখের সহানুভূতি ছিল না; তারা বাস্তবে ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন।

এ কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁদের প্রশংসা করে বলেন, “তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।” —সুরা হাশর, ৫৯:৯।

খুতবায় ক্ষুধার্ত এক অতিথির ঘটনাও তুলে ধরা হয় । রাসুলুল্লাহ (সা:) এর ঘরে তাঁকে খাওয়ানোর মতো খাবার না থাকায় এক সাহাবি তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান । কিন্তু সাহাবির ঘরেও ছিল খুব অল্প খাবার, যা মূলত সন্তানদের জন্য রাখা হয়েছিল । শেষ পর্যন্ত ওই সাহাবি ও তাঁর স্ত্রী সন্তানদের না খাইয়ে অতিথিকে খাবার খাওয়ান । এসময় ঘরের বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়, যাতে অতিথি মনে করেন সবাই একসঙ্গে খাচ্ছেন।

শায়খ আনিসুল হক আরো বলেন, এটাই প্রকৃত সেবা । শুধু “আমি তোমার পাশে আছি” বলাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনে নিজের সময়, শ্রম, আরাম কিংবা সম্পদের কিছু অংশ ত্যাগ করাও সেবার অংশ।

তিনি রাসুলুল্লাহ (সা:) এর একটি হাদিস উল্লেখ করে বলেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার কষ্ট দূর করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করবেন। আর আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেন, যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।

খুতবায় তরুণদের প্রতিও বিশেষ আহ্বান জানানো হয় । শায়খ আনিসুল হক বলেন, ছুটির দিনগুলো শুধু দেরি করে ঘুমানো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল স্ক্রল করা কিংবা গেম খেলায় কাটিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্রাম ও আনন্দের পাশাপাশি চারপাশে তাকিয়ে দেখতে হবে—কোথায় নিজেকে কাজে লাগাতে পারি?

তিনি বলেন, মা বাজার করলে ব্যাগ বহন করা, বাবার কোনো কাজে সাহায্য করা, মসজিদে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা, কোনো বয়স্ক আত্মীয়ের প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দেওয়া কিংবা তাদের ছোটখাটো কাজে সহযোগিতা করা—এসবও গুরুত্বপূর্ণ সেবা।

তিনি বলেন মানুষের উপকার করতে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যেতে হবে না। অনেক সময় বড় সাওয়াবের সুযোগ পাশের ঘরেই থাকে।

পরিবারের ভেতর সহযোগিতার গুরুত্বও তুলে ধরেন শায়খ আনিসুল হক । হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা:) নিজ ঘরে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। তিনি আল্লাহর রাসুল ও মুসলিম উম্মাহর নেতা হয়েও ঘরের কাজকে নিজের জন্য মর্যাদাহানিকর মনে করেননি।

তিনি বলেন, তাই ঘরের কাজ করা, বাসন ধোয়া, সন্তানদের দেখাশোনা করা কিংবা পরিবারের কাউকে সহযোগিতা করাও সুন্নাহর অনুসরণ হতে পারে, যদি তা আন্তরিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়।

ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) ও ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর বক্তব্য উল্লেখ করে শায়খ আনিসুল হক বলেন, অন্য মানুষের প্রয়োজন পূরণের সুযোগ পাওয়া আসলে একটি বড় নিয়ামত। কারণ সবাই সাহায্য করার অবস্থায় থাকে না; অনেকেই বরং সাহায্য পাওয়ার প্রয়োজনের মধ্যে থাকে।

তিনি বলেন, সেবাকে বোঝা মনে করবেন না; বরং আল্লাহর দেওয়া একটি সুযোগ ও অনুগ্রহ হিসেবে দেখুন।

খুতবার শেষাংশে তিনি উপস্থিত মুসল্লিদের স্মরণ করিয়ে দেন, একদিন সবাইকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু একজন মানুষের ভালো কাজ, উপকার এবং সেবার প্রভাব তাঁর মৃত্যুর পরও মানুষের জীবনে থেকে যেতে পারে।

তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন আমাদের এমন মানুষ হিসেবে কবুল করেন- যারা পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের জন্য উপকারী । মানুষের প্রয়োজন বুঝে পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করেন এবং মানুষের সেবার মাধ্যমে আল্লাহ\'র সাহায্য, করুণা ও সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ করে দেন। আমিন।


শায়খ সৈয়দ আনিসুল হক : ইস্ট লন্ডন মসজিদের সিনিয়র ইমাম । জুমার খুতবা, ১৪ আগস্ট ২০২৬।

ধর্ম এর আরও খবর

img

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনে জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা

প্রকাশিত :  ১৮:৪৬, ১৯ আগষ্ট ২০২৬

আগামী ২৬ আগস্ট পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে  পালনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। বুধবার (১৯ আগস্ট) ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দীকের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই জাতীয় কর্মসূচির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, গত ১৩ আগস্ট ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এসব কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়। ধর্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ এনডিসির সভাপতিত্বে ওই সভায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হজ) ড. আয়াতুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. ইমতিয়াজ হোসেনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

কর্মসূচির অংশ হিসেবে দিনটিতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দেবেন। পাশাপাশি সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ভবন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সব স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক আইল্যান্ড, লাইটপোস্ট ও প্রধান সড়কগুলো জাতীয় পতাকা, রঙিন পতাকা এবং ‘কালিমা তায়্যিবা’ খচিত ব্যানারে সজ্জিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ সচিবালয় মসজিদসহ দেশের প্রতিটি মসজিদে বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন থাকবে। একই সঙ্গে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ তাদের নিজ নিজ আওতাধীন এলাকায় আলোচনা সভা ও প্রার্থনার আয়োজন করবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ওয়াজ মাহফিল, সেমিনার ও টকশো সম্প্রচারের পাশাপাশি কিরাত, হামদ-নাত, স্বরচিত কবিতা পাঠ, শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং আরবি ভাষায় খুতবা রচনা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া বিশেষ স্মরণিকা ও ক্রোড়পত্র প্রকাশের পাশাপাশি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ইসলামিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে।

দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরতে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ অন্যান্য সম্প্রচারমাধ্যমকে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলোকে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ওয়াক্‌ফ প্রশাসকের কার্যালয় এবং ঢাকা ও জেদ্দা হজ অফিসসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ, ইসলামের শান্তি, প্রগতি, সৌহার্দ্য, সহনশীলতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব, মানবাধিকার ও নারীর মর্যাদা বিষয়ে আলোচনা সভা, দোয়া, হামদ-নাত, স্বরচিত কবিতা পাঠ এবং কুইজ প্রতিযোগিতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুদের জন্য বিশেষ হামদ-নাত, আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে। এছাড়া দেশের সকল সামরিক ও বেসামরিক হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু পরিবার, শিশু সদন, আবাসিক শিশু বিকাশ কেন্দ্র ও প্রবীণ নিবাসে পরিবেশন করা হবে উন্নতমানের খাবার। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোতেও উপযুক্ত মর্যাদায় দিবসটি উদযাপিত হবে।

সমগ্র দেশজুড়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পালনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।