img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : ঈমান নবায়ন করার উপায়

প্রকাশিত :  ০৭:৪৯, ১৬ জুন ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : ঈমান নবায়ন করার উপায়

শায়খ আবদুল কাইয়ুম

আমরা অনেক সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যাই—ঈমান সবসময় একই অবস্থায় থাকে না। কখনো তা শক্তিশালী হয়, কখনো দুর্বল হয়। কখনো হৃদয়ে ঈমানের শক্তি ও প্রশান্তি অনুভূত হয়, আবার কখনো তা অনেক কমে যায়।

রাসূল (সা:) বলেছেন, মানুষের ঈমানও কাপড়ের মতো ধীরে ধীরে পুরোনো হয়ে যায়। তাই আল্লাহর কাছে ঈমান নবায়নের জন্য দোয়া করতে হবে । কাপড় যেমন একদিনে পুরোনো হয়ে যায় না, ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়, তেমনি হৃদয়ের ঈমানও যত্ন না নিলে আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়ে।

তবে ঈমানের দুর্বলতা মানেই মুনাফিক হওয়া নয়। এটি মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ঈমানের প্রতি উদাসীনতা খুবই বিপজ্জনক।

এ বিষয়ে সাহাবি হানযালা (রা.)-এর একটি বিখ্যাত ঘটনা রয়েছে । তিনি একদিন চিন্তিত হয়ে বললেন, “আমি কি মুনাফিক হয়ে গেছি?” কারণ তিনি যখন রাসূল (সাঃ) এর কাছে থাকতেন এবং জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা শুনতেন, তখন তাঁর ঈমান অনেক বেড়ে যেত । কিন্তু ঘরে ফিরে স্ত্রী-সন্তান ও দুনিয়ার কাজকর্মে ব্যস্ত হলে সেই অনুভূতি আগের মতো থাকত না।

আবু বকর (রাঃ) বললেন, তিনিও একই অনুভূতি পান । তখন তাঁরা দু\'জন রাসূল (সাঃ) এর কাছে গেলেন । রাসুল (সাঃ) তাদেরকে বুঝিয়ে বললেন, এটা মুনাফিকি নয়। মানুষ হিসেবে আমাদের পরিবার, কাজ, জীবিকা ও অন্যান্য দায়িত্ব রয়েছে । ইসলাম আমাদের দুনিয়া ছেড়ে দিতে বলে না; বরং প্রতিটি বিষয়ের জন্য যথাযথ সময় দিতে শিক্ষা দেয়—ইবাদতের সময়, পরিবারের সময়, কাজের সময় এবং বিশ্রামের সময়।

কিন্তু বাস্তবে আমরা অনেক সময় এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি না। কাজ, ব্যবসা, পরিবার, মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নানা ব্যস্ততা আমাদের হৃদয়কে দখল করে নেয়। ফলে কুরআনের সাথে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়, আল্লাহর স্মরণ কমে যায়, এমনকি কখনো কখনো নামাজেও অবহেলা দেখা দেয়।

আল্লাহ তা\'আলা বলেন, “না, বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের হৃদয়ের ওপর মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।”

(সূরা আল-মুতাফফিফীন, ৮৩:১৪)। পাপ মানুষের হৃদয়কে কলুষিত করে । রাসূল (সাঃ) বলেছেন, কেউ পাপ করলে তার হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। বারবার পাপ করতে থাকলে সেই দাগ বাড়তে থাকে এবং হৃদয় কঠিন হয়ে যায় । ফলে ঈমান দুর্বল হতে থাকে।

ঈমান দুর্বল হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি । চাকরি, ব্যবসা, পড়াশোনা বা সংসারের দায়িত্ব খারাপ নয়। কিন্তু যখন এসব বিষয় পুরো হৃদয়কে দখল করে নেয়, তখন ঈমানের শক্তি কমে যায় ।

আমরা তাড়াহুড়ো করে নামাজ পড়ি, সুন্নাত নামাজ ছেড়ে দিই, সকাল-সন্ধ্যার যিকিরের সময় পাই না; অথচ ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল, হোয়াটসঅ্যাপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটিয়ে দিই। তখন আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত—আমার হৃদয়ের কী অবস্থা?

ঈমান নবায়ন করার উপায়

১. কুরআনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা। আল্লাহ তাআলা বলেন: “প্রকৃত মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হলে তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে, আর যখন তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।” (সূরা আল-আনফাল, ৮:২)

কুরআন হৃদয়কে জীবিত করে এবং আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও কুরআনের সাথে সম্পর্ক রাখা ঈমানকে শক্তিশালী করে।

২. নামাজের যত্ন নেওয়া। আল্লাহ বলেন: “আমার স্মরণের জন্য নামাজ প্রতিষ্ঠা করো।”

(সূরা ত্বা-হা, ২০:১৪)। নামাজ শুধু একটি ফরজ কর্তব্য নয়; এটি আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের মাধ্যম । নামাজ মানুষকে বারবার আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: “নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।”

(সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৪৫)। নিয়মিত ও মনোযোগী নামাজ মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং ঈমানকে শক্তিশালী করে ।

৩. ভালো মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম ও চরিত্রের অনুসারী হয় । তাই কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছি, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন । নেককার মানুষের সঙ্গ আমাদের ভালো কাজের দিকে উৎসাহিত করে।

৪. দ্বীনি জ্ঞান ও নসীহতের মজলিসে অংশ নেওয়া। আল্লাহ বলেন “উপদেশ দাও, কারণ উপদেশ মুমিনদের উপকার করে । (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৫)। মসজিদে যাওয়া, জামাতে নামাজ পড়া, দ্বীনি আলোচনা শোনা এবং আলেমদের সান্নিধ্যে থাকা ঈমানকে সতেজ রাখে।

৫. বেশি বেশি দোয়া করা: আমাদের উচিত আল্লাহর কাছে ঈমান দৃঢ় রাখার জন্য দোয়া করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা আমার পথে চেষ্টা করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথসমূহ দেখিয়ে দিই। (সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৬৯)। এ আয়াত আমাদের আশাবাদী করে। কেউ যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন ও সঠিক পথ দেখান।

আমাদের হৃদয় একেবারে কঠিন হয়ে যাওয়ার আগেই ঈমানের অবস্থা পরীক্ষা করা উচিত। কুরআন, নামাজ, যিকির, নেককার সঙ্গ, মসজিদের সাথে সম্পর্ক এবং একান্ত দোয়ার মাধ্যমে আমরা ঈমানকে নবায়ন করতে পারি।

হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়ের ঈমান নবায়ন করুন । আমাদের পাপগুলো ক্ষমা করুন। কুরআনকে আমাদের হৃদয়ের আলো, নামাজকে আমাদের চোখের শীতলতা এবং নেককার মানুষের সঙ্গকে আমাদের জন্য শক্তির উৎস বানিয়ে দিন । আমাদেরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন এবং এক মুহূর্তের জন্যও আমাদের নিজেদের ওপর ছেড়ে দেবেন না। আমীন। 

শায়খ আবদুল কাইয়ুম  : ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমার খুতবা ১২ জুন ২০২৬।

ধর্ম এর আরও খবর

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : কুরআন হোক জীবন দেখার লেন্স

প্রকাশিত :  ০৬:০৫, ০৮ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:০৮, ০৮ আগষ্ট ২০২৬

শায়খ রাশিদ খান

কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; বরং একজন মুমিনের জীবন, সাফল্য, আনন্দ-বেদনা, বিশ্রাম ও আখিরাতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। কথাগুলো বলেছেন ইমাম শায়খ রাশিদ খান।

৩১ জুলাই শুক্রবার জুমার খুতবায় ‘কুরআনের আলোয় জীবনকে দেখার শিক্ষা’ শিরোনামে প্রদত্ত খুতবায় তিনি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর জীবন ছিল অসাধারণ ভারসাম্যের উদাহরণ । তিনি যেমন হাসতেন, শিশুদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতেন, তেমনি আল্লাহ ও আখিরাত সম্পর্কে ছিলেন গভীরভাবে সচেতন।

তিনি বলেন, অনেক সময় রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর ব্যক্তিত্বকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা হয় । কেউ তাঁকে সবসময় গম্ভীর হিসেবে দেখেন, আবার কেউ শুধু হাস্যোজ্জ্বল ও রসিক হিসেবে তুলে ধরেন । অথচ তাঁর চরিত্রে ছিল মমতা, হাস্যরস, গভীর চিন্তা ও আল্লাহভীতির অপূর্ব সমন্বয়।

ছোট সাহাবি আবু উমাইরের পোষা পাখি মারা যাওয়ার ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা:) তাঁর দুঃখকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আবার হযরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনাও মহানবীর (সা:) পারিবারিক জীবনের আনন্দময় দিক তুলে ধরে।

একই সঙ্গে রাসুল (সা:) বলেছেন, “তোমরা যদি তা জানতে যা আমি জানি, তাহলে কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে।”

শায়খ রাশিদ বলেন, তাঁর হাসি কখনো উদাসীনতার প্রকাশ ছিল না এবং আখিরাতের ভয়ও তাঁকে কঠোর করে তোলেনি। তাঁর সমস্ত আচরণ পরিচালিত হতো ওহির আলোকে।

হযরত আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, “তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।”

খতিব শায়খ রাশিদ বলেন, কুরআন ছিল মহানবী (সা:)-এর পৃথিবীকে দেখার ‘লেন্স’। রহমত, সাফল্য, দুঃখ-কষ্ট, জীবন-মৃত্যু—সবকিছুকে তিনি কুরআনের আলোকে বিচার করতেন।

তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষ পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও পরিবেশের প্রভাবে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনকে দেখে। কিন্তু একজন মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধনের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত কুরআন।

এ প্রসঙ্গে তিনি সূরা আল-আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন: “নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য।”

তিনি বলেন, ইসলাম জীবনকে ইবাদত ও দুনিয়াবি কাজ—এভাবে আলাদা করে না। একজন মুসলমানের নামাজ যেমন আল্লাহর জন্য, তেমনি তার কর্মজীবন, পরিবার, সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত, বিশ্রাম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত।

রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর সামনে এক মা তার হারিয়ে যাওয়া শিশুকে ফিরে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ সেখানে কেবল মাতৃস্নেহ দেখেছিল। কিন্তু রাসুল (সা:) সেখানে আল্লাহর রহমতের নিদর্শন দেখেছিলেন। তিনি সাহাবিদের বলেছিলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এই মায়ের সন্তানের প্রতি দয়ার চেয়েও অধিক দয়ালু।”

দুনিয়ার সৌন্দর্য ও আকর্ষণ সম্পর্কে শায়খ রাশিদ বলেন, ইসলাম দুনিয়ার নিয়ামত উপভোগ করতে নিষেধ করে না। তবে সাময়িক জীবনকে চূড়ান্ত গন্তব্য মনে করা যাবে না। ফুল যেমন একসময় শুকিয়ে যায়, তেমনি দুনিয়ার সৌন্দর্য ও অর্জনও একদিন শেষ হয়ে যাবে।

সাফল্যের কুরআনিক সংজ্ঞা তুলে ধরে তিনি সূরা আলে ইমরানের আয়াত উল্লেখ করেন: “যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই প্রকৃতপক্ষে সফল।”

তিনি বলেন, অনেকের কাছে সম্পদ, পদমর্যাদা, প্রভাব ও পরিচিতি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে, কিন্তু একজন মুমিনের চূড়ান্ত সাফল্য হলো আল্লাহর রহমত লাভ এবং জান্নাতে প্রবেশ ।

বিশ্রাম ও অবসর নিয়েও তিনি বলেন ঘুম, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং বিরতি নেওয়া আল্লাহর নিয়ামত। তবে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে স্ক্রল করাকে প্রকৃত বিশ্রাম মনে করা ঠিক নয়। এতে অনেক সময় মানুষ আরও ক্লান্ত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে।

খুতবার শেষদিকে শায়খ রাশিদ খান বলেন, জীবনের সবকিছু একসঙ্গে পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। সন্তানদের সঙ্গে আচরণ, অনলাইন ব্যবহার, অবসর সময় কিংবা নিজের চিন্তাধারা—যেকোনো একটি ক্ষেত্র দিয়ে কুরআনের আলোকে পরিবর্তন শুরু করা যেতে পারে।

তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন কুরআনকে আমাদের পৃথিবী দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বানিয়ে দেন, আমাদের অগ্রাধিকার সংশোধন করেন এবং দুনিয়ার নিয়ামত উপভোগ করেও আখিরাতের প্রস্তুতি থেকে যেন আমরা গাফিল না হই।


শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ এন্ড লন্ডন মুসিলম সেন্টার। জুমার খুতবা ৩১ জুলাই ২০২৬।