আস্থাহীনতার বৃত্তে পুঁজিবাজার: ধীরগতি ও সতর্ক অপেক্ষার নেপথ্যে সংকটের গভীরতা
সম্পাদকীয় কলাম
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির অব্যাহত চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার প্রচেষ্টা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বাজারের গতিপ্রকৃতি এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। ২০২৬ সালের মে মাসের এই প্রারম্ভে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাজার একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘কনসোলিডেশন জোন’ বা স্থিতিশীলকরণ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক কার্যদিবসগুলোতে সূচকের মৃদু পতন এবং লেনদেনের ধীরগতি মূলত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিরাজমান ‘সতর্ক অপেক্ষা’ নীতিরই প্রতিফলন। ডিএসইএক্স (DSEX) সূচক ২১.৪৮ পয়েন্ট বা ০.৪১% কমে ৫,২৬৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা বাজারের গত কয়েক মাসের অস্থিরতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক চিত্রটি মূলত বিক্রেতাদের আধিপত্য এবং ক্রেতাদের নিষ্ক্রিয়তার এক সমন্বয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় হ্রাস পেয়ে ৮২৯ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার একটি স্পষ্ট সংকেত। লেনদেনের সংখ্যা ২ লাখ ১৯ হাজার অতিক্রম করলেও গড় লেনদেনের হার নির্দেশ করে যে, বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন। বাজারের এই সার্বিক দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, ১৬২টি কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়লেও বিপরীতে দর হারিয়েছে ১৭৫টি প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে বড় মূলধনী শেয়ারগুলোর দরপতন সূচককে নিচের দিকে টেনে নামানোর প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তবে পুঁজিবাজারকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই; এটি মূলত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৫০ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে, যা ঐতিহাসিক গড়ের চেয়ে কিছুটা কম। এর পাশাপাশি উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৮.৭১ শতাংশ, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বা ‘রিয়েল ইনকাম’ ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মজুরি সূচকের বৃদ্ধির তুলনায় মুদ্রাস্ফীতির হার বেশি ছিল, যার ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয় এবং বাজারে পুঁজি বিনিয়োগের সক্ষমতা সরাসরি সংকুচিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা অনুযায়ী, এই অর্থনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের খুচরা বিনিয়োগকারী বা ‘রিটেইল ইনভেস্টর’ বেসকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পুঁজিবাজারের জন্য আরেকটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ সুদের হার। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ১০.০০ শতাংশ রেপো রেট বজায় রেখেছে, যার ফলে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মুনাফার হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের মুনাফার হার যেখানে ১০.৭১ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, সেখানে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাতের চেয়ে নিশ্চিত মুনাফাকেই শ্রেয় মনে করছেন। এছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরাসরি তাদের নিট মুনাফা ও লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে।
ব্যাংক খাতের চলমান অস্থিরতাও বাজারের আস্থাহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ। উচ্চ খেলাপি ঋণের (NPL) হার—যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ৩৫.৭৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে—ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুর্বলতা বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার পথে বড় বাধা। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ বা মার্জার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তবে এর সুফল পেতে বাজারকে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।
অবশ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারকে স্থিতিশীল করতে বেশ কিছু আইনি সংস্কার হাতে নিয়েছে। চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে কমিশন ‘মার্জিন রুলস ২০২৫’ এবং ‘পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ রুলস ২০২৫’ চূড়ান্ত করেছে। আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং কারসাজির দায়ে কঠোর জরিমানা প্রদানের মাধ্যমে কমিশন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের ‘ফ্লোর প্রাইস’ বা সর্বনিম্ন সীমা তুলে নেওয়ার সাহসী পদক্ষেপ বাজারকে তার স্বাভাবিক গতিতে ফেরার সুযোগ করে দিয়েছে, যদিও এখনও হাতেগোনা কয়েকটি বড় কোম্পানির ক্ষেত্রে এই সীমা বজায় রাখা হয়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, টেক্সটাইল খাত সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ভালো পারফর্ম করছে; তবে ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার একটি চাপা আতঙ্ক এই খাতে রয়ে গেছে। অন্যদিকে, ব্যাংক খাতের শেয়ারগুলো বর্তমানে বেশ কম পি/ই (P/E) রেশিওতে লেনদেন হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সুযোগ হতে পারে। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ফার্মাসিউটিক্যালস খাতকে একটি ‘রক্ষণাত্মক’ বা ডিফেন্সিভ খাত হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যেখানে স্কয়ার ফার্মার মতো শক্তিশালী মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কম দায়ী নয়। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০১.৯৪ ডলারে পৌঁছেছে। এই জ্বালানি সংকটের ফলে সার ও কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়ে গেছে, যা শিল্প উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং নবনির্বাচিত সরকার যদি পুঁজিবাজার উন্নয়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়, তবেই বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইএক্স সূচক বর্তমানে ৫,২০০ থেকে ৫,৩০০ পয়েন্টের একটি মনস্তাত্ত্বিক সীমার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। সূচকটি ৫,৩৫০ পয়েন্টের ওপরে টেকসই না হওয়া পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো উত্থানের আশা করা কঠিন। বিনিয়োগকারীদের জন্য এই সময়ে ঢালাও বিনিয়োগ না করে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও বৈচিত্র্যকরণ নীতি অনুসরণ করা জরুরি। যে কোম্পানিগুলো নিয়মিত নগদ লভ্যাংশ প্রদান করে এবং যাদের ডিভিডেন্ড ইল্ড আকর্ষণীয়, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
পরিশেষে বলা যায়, পুঁজিবাজারের বর্তমান স্থবিরতা কাটানোর চাবিকাঠি কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে নয়, বরং এটি সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল। যদি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সুদের হার কমতে শুরু করে, তবেই পুঁজিবাজারে তারল্যের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। ততদিন পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ এবং গুজবে কান না দিয়ে মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ার নির্বাচন করাই হবে বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীর কাজ। পুঁজি রক্ষা করাই এখনকার সবচেয়ে বড় কৌশল, কারণ বাজার একবার ঘুরে দাঁড়ালে বিনিয়োগের পর্যাপ্ত সুযোগ আবারও ফিরে আসবে।



















