img

মৌলভীবাজারে শুক্লা সিনহার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে শোক, আতঙ্ক ও নানা প্রশ্ন

প্রকাশিত :  ১০:৩৫, ১৪ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৫০, ১৪ মে ২০২৬

মৌলভীবাজারে শুক্লা সিনহার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে শোক, আতঙ্ক ও নানা প্রশ্ন

সংগ্রাম দত্ত: দেশের অন্যতম পর্যটন জেলা শহর মৌলভীবাজারের ব্যস্ততার মাঝেও মুসলিম কোয়ার্টার এলাকার একটি বহুতল ভবন বুধবার (১৩ মে ) রাতের পর থেকে যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। ছয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে শুক্লা সিনহা (২৪) নামে এক তরুণীর মরদেহ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে শোক, আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য।

নিহত শুক্লা সিনহা কমলগঞ্জ উপজেলার তিলকপুর গ্রামের রঞ্জিত সিংহের মেয়ে। চাকরির সুবাদে দীর্ঘদিন ধরে তিনি মৌলভীবাজার শহরে একাই বসবাস করতেন। শহরের মুসলিম কোয়ার্টার এলাকার মোছাম্মদ ইয়াফা খানম চৌধুরী ভবনের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনি। পাশাপাশি শহরের একটি বেসরকারি চক্ষু হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১৩ মে ) দুপুরের পর থেকে শুক্লার সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি সাড়া দেননি। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরে শুক্লার মা পরিচিতজনদের মাধ্যমে মেয়ের খোঁজ নেওয়ার অনুরোধ জানান।

খোঁজ নিতে গিয়ে প্রতিবেশীরা দেখতে পান, ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে আটকানো। দীর্ঘ সময় ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়া না মেলায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরে জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে তারা দেখতে পান, ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গামছা পেঁচানো অবস্থায় ঝুলছে শুক্লা সিনহার নিথর দেহ। মুহূর্তেই চারপাশে নেমে আসে আতঙ্ক ও শোকের আবহ।

খবর পেয়ে মৌলভীবাজার মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

মৌলভীবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

শুক্লার সহকর্মীদের ভাষ্য, তিনি ছিলেন শান্ত, ভদ্র ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ। নিয়মিত কর্মস্থলে যেতেন এবং সবার সঙ্গে আন্তরিক আচরণ করতেন। হঠাৎ এমন মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছেন না কেউই।

এদিকে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই একাকী নগরজীবন, মানসিক চাপ ও তরুণ কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

সবুজ পাহাড় আর চা-বাগানের শান্ত পরিবেশে ঘেরা মৌলভীবাজারে এক তরুণীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এখন শুধু একটি ঘটনার নাম নয়—এটি হয়ে উঠেছে অসংখ্য প্রশ্ন, শোক আর অজানা রহস্যের প্রতিচ্ছবি।





সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

৭০ বছরের অপেক্ষা: একটি সেতুর স্বপ্নে বদলে যেতে পারে কমলগঞ্জ–রাজনগরের হাজারো মানুষের জীবন

প্রকাশিত :  ১১:১০, ১৮ জুন ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলার সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—লাঘাটা নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু। স্বাধীনতারও আগে থেকে নদীটি দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। প্রায় ৭০ বছর ধরে স্থায়ী সেতুর অভাবে এলাকার কয়েক হাজার মানুষকে এখনো একটি জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করে চলাচল করতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার যুগে দাঁড়িয়ে এখনো তারা মৌলিক অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই তাদের নানামুখী দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

একটি সাঁকো, হাজারো মানুষের ভরসা

লাঘাটা নদীর পশ্চিম তীরে কমলগঞ্জ উপজেলার রকিব বাজার-গোপিনগর, উত্তর শ্রীরামপুর, রাধাগোবিন্দপুর, বৃন্দাবনপুর, কান্দিগাঁও, মাঝগাঁও, নোয়াগাঁও, নন্দগ্রাম, কোনাগাঁও, বৈরাগীচক ও রাজদিঘিরপার এলাকার মানুষ বসবাস করেন। অপরদিকে পূর্ব তীরে রয়েছে রাজনগর উপজেলার মৌলভীচক, নোয়াগাঁও, মিলের বাজার, চানহারাবেলী, পালপুর, আপসলগতি, মরিচা ও বাঘুয়া গ্রামের জনপদ।

এই দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম একটি বাঁশের সাঁকো। বর্ষা মৌসুমে সাঁকোটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এটি ব্যবহার করেন।

স্বাস্থ্যসেবায় সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ

এলাকাবাসীর মতে, সেতু না থাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হতে হয় রোগীদের। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগী ও গর্ভবতী নারীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বিকল্প পথ ব্যবহার করে জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। স্থানীয়দের ধারণা, লাঘাটা নদীর ওপর ২৫ থেকে ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু নির্মিত হলে এই সময় কমে প্রায় ৩০ মিনিটে নেমে আসবে। এতে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অনেক মূল্যবান জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।

শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পথচলা

নদীর দুই পাড়ে রয়েছে একাধিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী বাঁশের সাঁকো পার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। বর্ষাকালে সাঁকো পিচ্ছিল ও নড়বড়ে হয়ে পড়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

অভিভাবকদের অভিযোগ, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ফলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে।

কৃষি ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত

কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত ফসল উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেতু না থাকায় কৃষকরা সহজে তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারেন না। এতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং ন্যায্য মূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের মতে, সেতু নির্মিত হলে রকিব বাজার, রাজদিঘিরপার বাজার ও মিলের বাজারসহ আশপাশের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো নতুন গতি পাবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

দীর্ঘদিনের দাবিতে এলাকাবাসী

এলাকাবাসীর পক্ষে মো. রকিব মিয়া জেলা প্রশাসকের কাছে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। আবেদনে লাঘাটা নদীর ওপর ২৫ থেকে ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে। তাদের বিশ্বাস, একটি সেতু শুধু দুই পাড়কে সংযুক্ত করবে না; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলায় পিছিয়ে থাকা একটি বিস্তীর্ণ জনপদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।

লাঘাটা নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু এখন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের দাবি নয়; এটি হাজারো মানুষের নিরাপদ জীবন, উন্নত যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে।


সিলেটের খবর এর আরও খবর