অর্থমন্ত্রী ব্যাংকে জমা উত্তোলনে কর ছাড় বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। তিন লাখ টাকার পরিবর্তে চার লাখ টাকা পর্যন্ত স্থিতির ওপর কোনো কর না নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে একটি ঋণের বিপরীতে একাধিক অ্যাকাউন্ট খোলা হলেও একবারই শুল্ক কাটার প্রস্তাব করেছেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের স্বস্তি দিতে শুল্ক অব্যাহতির সীমা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি ঋণ হিসাবের বিপরীতে একাধিক ডিল বা অ্যাকাউন্ট খোলা হলে প্রতিটির বিপরীতে আবগারি শুল্ক কাটা হয়। এখন একবারই কাটা হবে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের আগ পর্যন্ত জমা স্থিতির পরিমাণ এক লাখ টাকা পার হলেই আবগারি শুল্ক কাটা হতো। আর আমানতের ওপরই কেবল আবগারি শুল্ক কাটা হয় তেমন না। আমানত, ঋণ বা অন্য যে কোনো ধরনের জমার ভিত্তিতে বছরে একবার আবগারি শুল্ক বা এক্সাইজ ডিউটি কেটে সরকারি কোষাগারে জমা করে ব্যাংকগুলো।
আবগারি শুল্কের বাইরে আমানতে অর্জিত মুনাফার ওপর আলাদা কর নেয় সরকার। এক্ষেত্রে যাদের রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র রয়েছে তাদের ১০ শতাংশ এবং যাদের নেই তাদের ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হয়। এর বাইরে ব্যাংকগুলো সার্ভিস চার্জসহ বিভিন্ন ধরনের ফি নিয়ে থাকে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো (পে স্কেল) ঘোষণার প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে। আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশের যে প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল, তা আপাতত বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গতকাল রোববার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আরও পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে আইএমএফ আর্থিক চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অন্তত দুই বছর নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। সম্প্রতি আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরকালে অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে এ সুপারিশ করে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ পরামর্শ গ্রহণে আগ্রহী নন। তবে বেতন কাঠামো ঘোষণা করতে একটু দেরি হবে। আগামী অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভার আগে নতুন পে স্কেলের গেজেট জারি হবে।
গতকালের বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, পে স্কেল-সংক্রান্ত ফোকাল কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অর্থমন্ত্রী নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা, আর্থিক চাপ ও সীমাবদ্ধতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। পরে প্রধানমন্ত্রী সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রস্তাবটি আরও বিশদভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র সমকালকে জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটিকে আরও অন্তত দুই থেকে তিনটি বৈঠক করতে হবে। এ প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় তিন মাস সময় লাগতে পারে। তবে দ্রুত কাজ শেষ করারও চেষ্টা থাকবে। কমিটির সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের পর মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষে অর্থ বিভাগ গেজেট প্রকাশ করবে। সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন পে কমিশনের সুপারিশ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বৈঠকে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব, বাজেট ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি আইএমএফের আপত্তি ও পর্যবেক্ষণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা, দেশে গ্যাস সরবরাহের চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় কতটা যৌক্তিক হবে, সে বিষয়ও পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
জানা গেছে, আইএমএফ চাইছে বিষয়টি অন্তত অক্টোবর পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখা হোক। এতে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফের বার্ষিক সভায় নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনার সময় পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব হবে। পরে নভেম্বরে সংস্থাটির আরেকটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে নতুন ঋণ কর্মসূচি ও পে স্কেল বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করতে পারে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর মূল বেতনের ৫ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধি এবং কয়েক দফা বিশেষ ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি কর্মচারীরা।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ গঠন করে। কমিশন চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতার হার ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত যাতায়াত ভাতার কাঠামোয় পরিবর্তন আনা এবং অন্যান্য ভাতা পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করা হয়।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। তবে সচিব কমিটি কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে কিছু কাটছাঁটসহ একটি সংশোধিত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বেতন কমিশনের সুপারিশ, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। সচিব কমিটি তিনটি প্রতিবেদনের আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য সুপারিশ করবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এ জন্য ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে মূলত সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য। তাই গেজেট যখন প্রকাশ হোক, গত জুলাই থেকে নতুন বেতন পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা।