ইরান চুক্তি নিয়ে সমালোচকদের ‘শিক্ষিত’ হতে বললেন ট্রাম্প
প্রকাশিত :
০৫:৩৭, ২৪ জুন ২০২৬
তেহরানের সঙ্গে হওয়া নতুন দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা নিয়ে যারা সমালোচনা করছেন, তাদের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানা এবং বিষয়টি নিয়ে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গতকাল মঙ্গলবার (২৩ জুন) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নিজের দলের প্রভাবশালী সিনেটর টেড ক্রুজের তীব্র বিরোধিতার জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি বিরোধীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমার বন্ধু হলেও যারা এ চুক্তির সমালোচনা করছেন, তাদের বিষয়টি সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে হবে। কারণ ইরানকে আমরা এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছি, যেখানে আগে কোনো প্রশাসন যেতে পারেনি।’ তবে ট্রাম্পের এমন আত্মবিশ্বাসী মন্তব্যের মধ্যেই মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসে তার এই নীতি নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তীব্র হচ্ছে।
ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান ও বিরোধী ডেমোক্র্যাট উভয় পক্ষের আইনপ্রণেতারাই অভিযোগ তুলেছেন যে ইরানের সঙ্গে হওয়া এই সমঝোতা স্মারক সম্পর্কে কংগ্রেসকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং না দেওয়ায় ক্যাপিটাল হিলে অনেকেই প্রকাশ্য উদ্বেগ জানিয়েছেন। বিশেষ করে রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ শুরু থেকেই ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়া এবং স্বল্পমেয়াদে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মতো বিষয়গুলোর কঠোর বিরোধিতা করছেন।
হোয়াইট হাউসের এই নীতিকে ভুল আখ্যা দিয়ে এক কড়া বক্তব্যে সিনেটর টেড ক্রুজ বলেন যে, ‘ইতিহাস প্রমাণ করে, আমাদের ক্ষতি করতে চায় এমন ধর্মতান্ত্রিক উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেয়া অত্যন্ত খারাপ সিদ্ধান্ত।’
তিনি স্পষ্ট জানান, ‘আমি চাই না আয়াতুল্লাহ সরকারের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পয়সাও যাক।’ ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দাবি করলেও কংগ্রেসের সদস্যরা এখন চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশের দাবি তুলছেন।
নিউইয়র্কের রাজনৈতিক অঙ্গনে ডেমোক্রেটিক পার্টির দীর্ঘদিনের প্রচলিত সমীকরণ ও ক্ষমতার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে নতুন এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন জোহরান মামদানি।
মঙ্গলবারের (২৩ জুন) প্রাইমারি নির্বাচনে জোরালো জয়ের মাধ্যমে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরের প্রতিষ্ঠিত ধারাকে একরকম কোণঠাসা করে ফেলেছেন প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক ঘরানার এই রাজনৈতিক নেতা।
মাত্র এক বছর আগে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে হারিয়ে নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন মামদানি। আর এবার তার সরাসরি সমর্থনে ও নির্বাচনী প্রচারণায় তিনজন বামপন্থী প্রার্থী কংগ্রেসে জায়গা করে নেওয়ার পথ নিশ্চিত করেছেন।
নির্বাচনের রাতে বিজয়ী প্রার্থীদের ওয়াচ পার্টিতে উল্লাস প্রকাশ করে মেয়র জোহরান মামদানি বলেন, গত জুনের ঐতিহাসিক জয় কোনো আকস্মিক ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না। সেটি কোনো সমাপ্তি ছিল না, বরং সেটি ছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই অভাবনীয় নির্বাচনী ফল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে গভীর কম্পন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ব্রুকলিনভিত্তিক হাউসের ডেমোক্রেটিক নেতা হাকিম জেফরিস তার নিজের বলয়ের দুজন প্রভাবশালী সদস্যকে হারিয়েছেন এবং দলের ভেতর ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা একদল কট্টর প্রগতিশীল আন্দোলনকারীর মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে দশকের পর দশক ধরে যারা নিজেদের মূল ধারার শক্তিশালী পক্ষ ভাবতেন, তারা এখন মামদানির এই একচেটিয়া আধিপত্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
তবে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মামদানির সম্পর্কের এই টানাপোড়েন কোনো সহজ বিষয় নয়। প্রবীণ কংগ্রেস সদস্য আদ্রিয়ানো এসপাইলাত গত বছর কুওমোর বিরুদ্ধে মামদানীর জয়ের পর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, অথচ এবার মামদানি তার নিজের এক সাবেক নির্বাচনী স্বেচ্ছাসেবী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়েরকে এসপাইলাতের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে জয়ী করে এনেছেন।
এই জয়ে ক্ষুব্ধ অনেক সিটি কাউন্সিল সদস্য এবং ডেমোক্রেটিক নেতা আড়ালে বলছেন, মামদানি কেবল নিজের শর্তেই জোটে বিশ্বাসী। এমনকি নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিটিয়া জেমস, যিনি নিজেও একসময় মামদানির বড় সমর্থক ছিলেন, তিনিও তীব্র হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, মামদানি নিউইয়র্কের বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী শ্রেণী ও বর্ণের রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক ভিন্নতা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি মন্তব্য করেন, ডেমোক্রেটিক পার্টির ওপর সবারই কিছুটা ক্ষোভ থাকতে পারে, তবে তার মানে এই নয় যে পুরো ব্যবস্থাটাকে এভাবে ভেঙে চুরমার করে দিতে হবে, যা সাধারণত ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুসারীরা করে থাকে।
রাজনীতির পাশাপাশি মামদানির পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিভিন্ন কড়া অবস্থান, বিশেষ করে ইসরাইল-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি এবং অতি সম্প্রতি একটি প্রচারণায় মার্কিন-ইসরাইল লবিং গ্রুপ ‘আইপ্যাক’-কে ‘দানব’ হিসেবে অভিহিত করায় ইহুদি ভোটার ও নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
কংগ্রেস সদস্য ড্যান গোল্ডম্যান অভিযোগ করেছেন, মেয়র মামদানি নিউইয়র্ক শহর পরিচালনার চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বেশি আগ্রহী এবং তিনি ইহুদিদের জন্য একটি বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করছেন। বিদায়ী কংগ্রেস সদস্য নিদিয়া ভেলাজকুয়েজও মামদানির রাজনৈতিক কৌশলকে একটি বড় ভুল আখ্যা দিয়ে বলেন, যে শহর ফেডারেল ও রাষ্ট্রীয় ফান্ডের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে চলার পরিবর্তে মামদানি নিজের বলয় সংকুচিত করছেন।
প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতাদের এই ক্ষোভ ও প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকির মুখে অবশ্য জোহরান মামদানি ও তার সহযোগীরা কোনো ভ্রূক্ষেপ করছেন না। মেয়রের কমিউনিকেশন ডিরেক্টর আন্না বার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এক প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তাদের এই রাজনীতি কোনো ধনকুবের বা দামি কনসালট্যান্টদের দ্বারা চালিত নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই।
নিউইয়র্কের ঐতিহ্যবাহী প্রগতিশীল দল ‘ওয়ার্কিং ফ্যামিলিজ পার্টি’ এই লড়াইকে কিছুটা নোংরা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বললেও ডেমোক্রেটিক সোশালিস্টদের হাত ধরে মামদানির নেতৃত্বে যে নতুন এক রাজনৈতিক বিপ্লব শুরু হয়েছে, তা এখন নিউইয়র্কের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।