img

হরমুজ থেকে বছরে ৪ হাজার কোটি ডলার টোল আদায় করবে ইরান

প্রকাশিত :  ১৫:১৩, ২৬ জুন ২০২৬

হরমুজ থেকে বছরে ৪ হাজার কোটি ডলার টোল আদায় করবে ইরান

গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে প্রতি বছর ৪০ বিলিয়ন ডলার টোল আদায়ের পরিকল্পনা করছে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার। এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালl, যা বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের পরিকল্পনা হলো গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা বিদেশি জাহাজগুলো যেন ‘নিজেদের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করতে’ ইরানের সরকারকে টোল প্রদান করে। প্রতিবেশী উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয় দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও এ বিষয়ে সম্প্রতি একাধিকার বার আলোচনা করেছেন ইরানের কর্মকর্তারা এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে এই টোলের হিস্যা এই ৬ দেশকেও প্রদান করা হবে।

উল্লেখ্য, পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযোগকারী ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সংকীর্ণ প্রণালী হরমুজ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য জলপথগুলোর মধ্যে একটি। বিশ্বের মোট জ্বালানি পণ্যের ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয় এই জলপথ দিয়ে।

এতদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে মুক্তভাবে জাহাজ চলাচল করতে পারলেও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র অভিযান শুরুর পর হরমুজে বিদেশি জাহাজ চলাচলে অবরোধ জারি করে ইরান। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে এবং দেশে দেশে বাড়তে থাকে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম।

হরমুজে অবরোধ জারির সময়েই ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার জানিয়েছিল যে যেহেতু এই জলপথ ইরানের মানচিত্রের আওতায় পড়েছে, তাই বিদেশি জাহাজগুলোকে এই প্রণালি ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই টোল দিতে হবে। এ সংক্রান্ত একটি আইনও গত মার্চ মাসে পাস হয়েছে ইরানের পার্লামেন্টে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এ সিদ্ধান্তে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল এবং এর পাল্টায় ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ জারি করেছিল।

সম্প্রতি ওমান সফরে গিয়েছিলেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং দেশটির শীর্ষ মুখপাত্র মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ। সেখানে হরমুজ থেকে টোল আদায় নিয়ে ঘালিবাফ বলেছেন, “সবারই এটা জানা থাকা উচিত যে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা আর কখনও যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় অবস্থায় ফিরবে না।”

এদিকে বাঘের ঘালিবাফের এই বক্তব্য সম্প্রচারিত হওয়ার পর ইরানের ইসলামপন্থি সরকারকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। হরমুজে বিদেশি জাহাজগুলো থেকে টোল আদায় করা হলে তা সর্বাত্মক বিশৃঙ্খলা এবং বিপজ্জনক বৈশ্বিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে।

বর্তমানে বাহরাইনে সফররত মার্কো রুবিও গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, “বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহারের বাবদ টোল আরোপ করার অধিকার এই পৃথিবীতে কোনো দেশের নেই। ইরানের সঙ্গে যে চুক্তিই হোক না কেন- কোনো চুক্তিতেই হরমুজ থেকে টোল আদায় সংক্রান্ত শর্ত থাকলে তা যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করবে না।

যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের এই টোলনীতি মেনে নেয়, তাহলে বিশ্বের অন্যান্য দেশও তাদের সীমানভুক্ত আন্তর্জাতিক জলসীমায় টোল আরোপ শুরু করবে উল্লেখ করে রুবিও বলেন, “আন্তর্জাতিক জলপথ কোনো জাতি-রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়। এটি আজকের বিশ্বের একটি মৌলিক নীতি, যা ছাড়া বিশ্ব চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়বে।”

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে হরমুজে জাহাজ চলাচল বাড়ছে। বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টায় ৭০টি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানা গেছে।

সূত্র: ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, এনডিটিভি


img

পুঁজিবাজার নিয়ে হিসেব-নিকেশ: নতুন বাজেট, নতুন সম্ভাবনা, পুরোনো চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত :  ১৯:১০, ২৫ জুন ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপথ যেন বদলে গেছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া নতুন সরকার যেমন বড় সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে এসেছে, তেমনি অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পেশ করেছেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট—৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা। এই বাজেটের মূল বার্তাটা স্পষ্ট: ঋণের বদলে উৎপাদনে বিনিয়োগ করো, আর বাজারকে কাজে লাগাও। তবে পাশাপাশি সতর্ক করে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী, আগামী দুই বছর সহজ হবে না। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে গেলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে, আর সেটা মোকাবিলার জন্য বিনিয়োগকারীদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

বাজেটের অঙ্ক আর বাস্তবতা

প্রস্তাবিত বাজেটটি আসলে পাঁচ বছরের একটি রূপরেখা—যার লক্ষ্য অর্থনীতিকে পুনর্গঠিত করা, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, আর প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো। বাজেটের ঘাটতি ধরা হয়েছে ২.৫১ লাখ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ৩.৬ শতাংশ। সরকার চায় ব্যাংকের ওপর ঋণের চাপ না বাড়ুক, তাই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১.৩৫ লাখ কোটি টাকা আর বিদেশি উৎস থেকে ১.১৬ লাখ কোটি টাকা ধার করার পরিকল্পনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১.২০ লাখ কোটি টাকা আর সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে এনবিআরকে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে ৬.০৪ লাখ কোটি টাকা, যা ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার মূল অংশ। কিন্তু এখানেই বড় প্রতিবন্ধকতা—সরকারকে এই অর্থবছরে প্রায় ১.২৫ ট্রিলিয়ন টাকা ঋণ শোধ করতে হবে, যা উন্নয়ন বাজেটকে কিছুটা চেপে ধরছে।

তবে আশার কথা হলো, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সংস্কার কর্মসূচিতে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা এবং আরও ১.৪ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই বৈদেশিক তারল্য কিছুটা স্বস্তি দেবে। বাজেটের নীতিমালায় সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো ও নিয়মকানুন শিথিলকরণ। ব্যবসা সহজীকরণ, দ্রুত লাইসেন্স প্রদান, আইপিও প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কাজের অনুমতি সহজ করা—এসব পদক্ষেপ বেসরকারি খাতে গতি ফিরিয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থায় বড় ধাক্কা

পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে গত ৪ জুন। বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং চার কমিশনার—মোহসীন চৌধুরী, আলী আকবর, ফারজানা লারুখ ও সাইফুল ইসলাম—একযোগে পদত্যাগ করেন। ঠিক তার আগের দিন অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারদের হাতে দেওয়া হবে। পদত্যাগের পর সরকার আইন সংশোধন করে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে ৭০ বছরের বেশি বয়সী অভিজ্ঞ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মাসুদ খান নতুন চেয়ারম্যান হন। বহুজাতিক কোম্পানির সাবেক সিএফও এই কর্মকর্তার ৪৫ বছরের অভিজ্ঞতা বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।

লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের করা সম্প্রতি এক জরিপ বলছে, বাজার অংশীজনদের মধ্যে নীতি ও সুশাসন নিয়ে মিশ্র কিন্তু সতর্ক আশাবাদ রয়েছে। ৬১.৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে বাজার আরও স্বচ্ছ হবে। তবে ৪১.৬ শতাংশ মানুষ এখনও কারসাজি ও জালিয়াতিকে প্রধান নৈতিক সংকট হিসেবে দেখেন। আস্থা ফেরাতে ৩১.৭ শতাংশ স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, আর ২৮.৭ শতাংশ কঠোর আইন প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন। বিদেশি বিনিয়োগ আসতে বাধা হিসেবে ৪৩.৬ শতাংশ রাজনৈতিক ঝুঁকিকে দায়ী করেছেন, আর ২৩.৮ শতাংশ সুশাসনের অভাবকে। নতুন পণ্যের প্রসঙ্গে ৪৬.৫ শতাংশ মনে করেন ইটিএফ, গ্রিন বন্ড ও রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (আরইআইটি) আনা জরুরি।

খাতভিত্তিক চিত্রটা কী বলছে?

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেনের হিসাব ধরলে বোঝা যায়, খাতভিত্তিক পারফরম্যান্সে বৈচিত্র্য এসেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং খাত মোট টার্নওভারের ১৪ শতাংশ, ওষুধ ও রসায়ন ১৩.৮ শতাংশ, আর সাধারণ বিমা খাত ১১.৪ শতাংশ দখল করে আছে। ওষুধ খাতের শক্তিশালী মৌলিক ভিত্তি ও ধারাবাহিক লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রেখেছে। স্কয়ার ফার্মা বা বেক্সিমকো ফার্মার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাত নিয়ে অবশ্য মতভেদ আছে। একদিকে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট, অন্যদিকে জরিপে ৪৬.৫ শতাংশ অংশীজন মনে করছেন এই খাতই আগামীতে সবচেয়ে ভালো করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালে ২১.৬৮ লাখ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে এবং বাজেটে ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য ৩৬৭.০৬ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে—এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদে আস্থা বাড়াচ্ছে। তবে বিনিয়োগকারীদের বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে—শুধু সুশাসনসম্পন্ন ‘এ’ ক্যাটাগরির ব্যাংকগুলোর দিকে নজর রাখতে।

অ-ব্যাংক আর্থিক খাতের মধ্যে আইপিডিসি ফাইন্যান্সের শেয়ার ২ জুন ১৮.৯০ টাকা থেকে ২৩ জুন ২৯.৪০ টাকায় উন্নীত হয়েছে—৬১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি, যা এই খাতের কিছু ভালো প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার ক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।

মিউচুয়াল ফান্ড খাতে বড় পরিবর্তন এসেছে মে ২০২৬-এর বিএসইসি নিয়মে। যেসব ক্লোজড-এন্ড ফান্ড তাদের নিট সম্পদমূল্যের (এনএভি) চেয়ে ২৫ শতাংশ বা বেশি ডিসকাউন্টে লেনদেন করছিল, তাদের ওপেন-এন্ডে রূপান্তর বা বিলুপ্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। উচ্চ আদালত আইনি বাধা দূর করার পর ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও ফার্স্ট প্রাইম ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দর ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে সার্কিট ব্রেকার স্পর্শ করেছে। বিনিয়োগকারীরা অবমূল্যায়িত এই ফান্ডগুলো থেকে ন্যায্য মূল্য ফেরত পাওয়ার আশায় আছেন।

সাধারণ বিমা খাত টার্নওভারে ভালো অবদান রাখলেও এখানে বিনিয়োগ স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদি—দিনের ব্যবসার জন্য উপযোগী, দীর্ঘমেয়াদি নয়।

সূচকের ওঠানামা আর ভবিষ্যৎ পথ

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ৭,৩২৯ পয়েন্টে উঠেছিল। তারপর ধারাবাহিক পতনে মে ২০২৬ সালে তা ৫,৩৩৫.৯ পয়েন্টে নেমে আসে। বাজেট ঘোষণার পর নীতিনির্ধারণী স্পষ্টতা ও প্রাতিষ্ঠানিক তারল্য বেড়ে ২৪ জুন সূচক ৫,৬১৭ পয়েন্টে বন্ধ হয়। কিন্তু এই পথ সহজ ছিল না। ২০ জুনের পর টানা দুই সপ্তাহ ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর বিনিয়োগকারীরা লাভ তুলে নিতে বিক্রি শুরু করলে ২২ জুন ডিএসইএক্স ৮৫ পয়েন্ট হারায় এবং লেনদেন ১৪ কার্যদিবস পর ১,০০০ কোটি টাকার নিচে নেমে যায়। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ তখন একে ‘স্বাভাবিক সুস্থ সংশোধন’ বলে মন্তব্য করেন। তাদের কথা সত্য প্রমাণিত হয়—২৩ ও ২৪ জুন বাজার ঘুরে দাঁড়ায় এবং ২৫ জুন ৫,৬৫২ পয়েন্টে স্থির হয়, লেনদেন পুনরায় ১,০০০ কোটি টাকা অতিক্রম করে।

আগামী দিনের জন্য তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে—যদি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না আসে ও ব্যাংক সংস্কার থমকে যায়—সূচক ৫,০০০ থেকে ৫,৩০০ পয়েন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, লেনদেন ৩০০-৪০০ কোটি টাকায় নেমে আসতে পারে, বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার হতে পারে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নীতি ধারাবাহিকতা ও সুশাসন বজায় থাকলে সূচক ৫,৫০০-৬,০০০ পয়েন্টের মধ্যে ঘোরাফেরা করবে এবং লেনদেন ৪০০-৬০০ কোটি টাকায় স্থিতিশীল হবে। আর যদি এডিবি-সহ আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যকর হয় এবং জেপি মর্গানের মতো বড় তহবিল বিনিয়োগ আসে, তাহলে সূচক ৬,২০০ থেকে ৬,৮০০ পয়েন্ট স্পর্শ করতে পারে, লেনদেন ১,৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি বাজারের গভীরতা বাড়াবে।

বিনিয়োগকারীদের কী করা উচিত?

বর্তমান বাজারে গুজবের পেছনে না ছুটে মৌলিক বিশ্লেষণে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। জরিপ বলছে, ৪১.৬ শতাংশ মানুষ এখনও শেয়ারকেই সেরা বিনিয়োগ মনে করেন, কিন্তু ২৬.৭ শতাংশ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় স্বর্ণকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। এই মিশ্র মনোভাব বোঝায়, পুঁজি সুরক্ষার বিষয়টি এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ভ্যালু ইনভেস্টিং—অবমূল্যায়িত শেয়ার খুঁজে বের করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ—বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নিরাপদ পথ। বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অডিটর সনদের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ায় বৈদেশিক তারল্য বাড়তে পারে। এছাড়া করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ডের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ইটিএফ ও রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্টের মতো নতুন পণ্যগুলোর দিকে নজর রাখা উচিত বলে মনে করছেন ৪৬.৫ শতাংশ বাজার পেশাজীবী।

ডিজিটালাইজেশনও এগোচ্ছে—৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত তাত্ক্ষণিক মাইক্রো-লোন ‘ই-লোন’ চালু হওয়ার উদ্যোগ এবং দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা পুঁজিবাজারের ইকোসিস্টেমকে আরও সহজ করবে।

সবশেষে, বিশেষজ্ঞদের একমত—বাজারের প্রতিটি সংশোধনকে ভালো মৌলিক শেয়ার সংগ্রহের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ভালোভাবে পরীক্ষা না করে কোনো গুজবে কান দেওয়া যাবে না। সুশাসন ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে আগামী দুই বছরের কঠিন সময় পেরিয়ে ২০২৮ সাল নাগাদ যখন বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন-ডলার অর্থনীতির দিকে যাত্রা করবে, তখন আজকের সচেতন বিনিয়োগই প্রকৃত মুনাফা এনে দেবে।

অর্থনীতি এর আরও খবর