বঙ্গোপসাগরে জ্বালানি আছে নিশ্চিত, উত্তোলনের সিদ্ধান্ত সরকারের
প্রকাশিত :
১৩:৩৭, ২২ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বিপুল জ্বালানি সম্পদের অস্তিত্ব রয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, সমুদ্রের গভীর অঞ্চলে অনুসন্ধান কূপ খনন, খনিজ সম্পদের অবস্থান শনাক্তকরণ এবং পরবর্তীতে সেসব সম্পদ উত্তোলনের বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
আজ সোমবার (২২ জুন) বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নৌমন্ত্রী বলেন, দেশের সমুদ্রসীমায় জ্বালানি সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা নয়, বরং এর উপস্থিতি নিশ্চিত। তবে অতীতের নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিস্তীর্ণ সমুদ্রাঞ্চলের অধিকার লাভ করলেও সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার নিজ নিজ সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান চালিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করেছে, কিন্তু বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
শেখ রবিউল আলম আরও বলেন, দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। নেভিগেশন ও নিরাপদ জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে থাকলেও সক্ষমতা অনুযায়ী এ খাতে উন্নয়নের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, দেশের প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ নৌপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব নৌপথ সচল, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আকর্ষণীয় করে তুলতে হাইড্রোগ্রাফি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং ভবিষ্যতেও এর প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়বে।
মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস দেশের সামুদ্রিক ও নৌসম্পদ চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করবে।
পুঁজিবাজারের এই পতন কী কেবল সাময়িক, নাকি গভীর সংকটের পূর্বাভাস?
প্রকাশিত :
১০:২৭, ২২ জুন ২০২৬
✍️ নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আবারও একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি। সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স একদিনেই ৮৫.৭১ পয়েন্ট হারিয়েছে। সংখ্যার বিচারে এটি হয়তো আরেকটি সাধারণ দরপতন; কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বার্তা অনেক গভীর। কারণ সূচকের পতনের চেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আস্থাহীনতা, কমে যাওয়া লেনদেন এবং অধিকাংশ শেয়ারের একযোগে মূল্যহ্রাস।
পুঁজিবাজার মূলত প্রত্যাশার বাজার। এখানে বিনিয়োগকারীরা বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎকে মূল্যায়ন করেন। যখন তারা অর্থনীতি, নীতি বা বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন, তখন তার প্রতিফলন প্রথমেই দেখা যায় শেয়ারবাজারে। সোমবারের বাজারচিত্রও ঠিক সেই সংকেতই দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি ঝুঁকি। বিনিয়োগকারীরা জানেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, উৎপাদন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি কমাতে চান। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বৈশ্বিক উদ্বেগ কি একাই এই পতনের জন্য দায়ী?
সম্ভবত নয়।
দেশের পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তারল্যের সংকট। ব্যাংকিং খাত যখন নিজেই তহবিল ব্যবস্থাপনায় চাপে থাকে, তখন শেয়ারবাজারে নতুন অর্থ প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সুকুক নিলামে বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে যাওয়ায় বাজারে নগদ প্রবাহ আরও সংকুচিত হয়েছে। ফলে বিক্রেতা বেড়েছে, কিন্তু ক্রেতার সংখ্যা প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা। বাজার কারসাজি দমনে কঠোর নজরদারি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। একটি সুস্থ পুঁজিবাজার কখনোই জল্পনা-কল্পনা বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে বাজারের একটি অংশ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও জল্পনা-কল্পনার ওপর ভিত্তি করে লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। ফলে নজরদারি বাড়তেই সেই অর্থ দ্রুত বাজার ছাড়তে শুরু করেছে। এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে সূচকে।
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা অনেক শেয়ারের প্রকৃত মূল্য এখন বাজার নির্ধারণ করছে। এতে স্বল্পমেয়াদে চাপ সৃষ্টি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারকে আরও বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর করে তুলবে। প্রকৃতপক্ষে, একটি বাজার তখনই পরিণত হয় যখন দাম প্রশাসনিকভাবে নয়, চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগকারীদের মানসিকতা। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এখনও অনেক বিনিয়োগকারী স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় বিনিয়োগ করেন। ফলে সামান্য নেতিবাচক সংবাদও প্রায়শই অতিরিক্ত বিক্রিচাপ সৃষ্টি করে। অথচ ইতিহাস বলছে, আতঙ্কের মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তই অধিকাংশ সময় সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান পরিস্থিতিকে তাই কেবল সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি বাজারের জন্য একটি পরীক্ষার সময়। এই সময়ে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো নিজেদের শক্তি প্রমাণ করবে, দুর্বল ও জল্পনানির্ভর শেয়ারগুলো প্রকৃত অবস্থানে ফিরে যাবে এবং বিনিয়োগকারীরাও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন।
পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং বাজার-অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। কারণ একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার শুধু বিনিয়োগকারীর মুনাফার ক্ষেত্র নয়; এটি দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি।
সোমবারের ৮৫.৭১ পয়েন্টের পতন তাই শুধু একটি দিনের পরিসংখ্যান নয়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—পুঁজিবাজারকে টেকসই ও শক্তিশালী করতে হলে স্বল্পমেয়াদি উত্থান-পতনের বাইরে গিয়ে আস্থা, সুশাসন, তারল্য এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার ভিত্তি আরও মজবুত করতে হবে। অন্যথায় সূচকের সাময়িক পুনরুদ্ধার হলেও বাজারের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা থেকেই যাবে।