img

করের পাঁচ বছরের পথরেখা: স্বস্তির বার্তা, নাকি নতুন উদ্বেগের সূচনা?

প্রকাশিত :  ০৫:৫৪, ১৫ জুন ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:৫৮, ১৫ জুন ২০২৬

করের পাঁচ বছরের পথরেখা: স্বস্তির বার্তা, নাকি নতুন উদ্বেগের সূচনা?
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

বাংলাদেশের করব্যবস্থা নিয়ে করদাতাদের দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগ হলো নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব। প্রায় প্রতি বাজেটেই করহার, করমুক্ত আয়সীমা কিংবা কর কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়। ফলে ব্যক্তি করদাতা থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারী—সবার জন্যই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের একটি কর পথরেখা ঘোষণা করেছে। দেশের কর ইতিহাসে এমন উদ্যোগ এই প্রথম।
নীতিগতভাবে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ এর মাধ্যমে করদাতারা অন্তত আগামী কয়েক বছরে তাঁদের করের দায় কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, সে সম্পর্কে আগাম ধারণা পাবেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পূর্বানুমানযোগ্যতা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি পর্যায়ের সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং পারিবারিক ব্যয় পরিকল্পনায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগের মন্থর গতির মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
কর পথরেখার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে নারী, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বিশেষ শ্রেণির নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত করসুবিধা রাখা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
তবে এখানেই আলোচনার শেষ নয়।
করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলেও নতুন কর কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ করস্ল্যাবটি বাতিল করেছে। ফলে করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পর প্রথম করযোগ্য আয়ের ওপর এখন থেকে সরাসরি ১০ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে। বিষয়টি কাগজে-কলমে খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও বাস্তবে এর প্রভাব পড়তে পারে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত করদাতাদের ওপর।
যাঁদের আয় করমুক্ত সীমার সামান্য ওপরে, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই করের পরিমাণ আগের তুলনায় কমবে না; বরং বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির মাধ্যমে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার একটি অংশ উচ্চতর প্রাথমিক করহারের কারণে আবার ফিরে নেওয়া হচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। মূল্যস্ফীতির চাপে যখন পরিবারের ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, তখন অতিরিক্ত করের বোঝা মধ্যবিত্তের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
করব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু রাজস্ব সংগ্রহ নয়; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি কার্যকর কর কাঠামো এমন হওয়া উচিত, যা নতুন করদাতাদের উৎসাহিত করবে এবং বিদ্যমান করদাতাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করবে। কিন্তু করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পরপরই তুলনামূলক উচ্চ করহার আরোপ করা হলে অনেকের কাছেই করব্যবস্থাকে নিরুৎসাহব্যঞ্জক মনে হতে পারে।
অবশ্য সরকারের অবস্থানও পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও উদ্বেগজনকভাবে কম। সীমিতসংখ্যক করদাতার ওপরই রাজস্ব আহরণের বড় অংশ নির্ভরশীল। করফাঁকি, অপ্রদর্শিত আয় এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তার কর প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর চাপ সরকারের ওপর রয়েছে—এ কথাও সত্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজস্ব বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনটি? বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা, নাকি করের আওতা সম্প্রসারণ করে নতুন করদাতাদের অন্তর্ভুক্ত করা?
এই প্রশ্নের উত্তর অর্থনীতিবিদেরা বহুবার দিয়েছেন। করহার বৃদ্ধি বা স্ল্যাব পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বরং প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন, তথ্যভিত্তিক নজরদারি, করফাঁকি প্রতিরোধ এবং নতুন করদাতাদের করের আওতায় আনার উদ্যোগই হতে পারে আরও টেকসই সমাধান।
পাঁচ বছরের কর পথরেখা একদিকে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তের জন্য কিছু নতুন উদ্বেগও সামনে নিয়ে এসেছে। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ করস্ল্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিও একেবারে অযৌক্তিক নয়।
রাজস্ব সংগ্রহ রাষ্ট্রের প্রয়োজন। তবে সেই রাজস্ব আহরণের পদ্ধতি ও ভারসাম্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি করব্যবস্থার সাফল্য শুধু কত টাকা আদায় হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং করদাতারা সেটিকে কতটা ন্যায়সংগত, যুক্তিসংগত এবং গ্রহণযোগ্য মনে করছেন, সেটিও সমানভাবে বিবেচ্য।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

জামানত ছাড়াই ১০ লাখ টাকা ঋণ পাবেন নতুন উদ্যোক্তারা : অর্থমন্ত্রী

প্রকাশিত :  ১৪:৩৬, ১২ জুলাই ২০২৬

রবিবার (১২ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। এছাড়া জামানত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধাও গ্রহণ করতে পারবেন।

সদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৩তম দিন কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুল আলমের লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। এদিন বিকেল ৩টায় সংসদের বৈঠক শুরু হয় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীরবিক্রম) সভাপতিত্বে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তরুণদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতে নতুন উদ্যোক্তা পুনরর্থায়ন স্কিমের তহবিলের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

এ তহবিল হতে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং জামানত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন।

অর্থমন্ত্রী জানান, স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তি সহজীকরণের লক্ষ্যে স্টার্টআপ ফান্ড নামে ৫০০ কোটি টাকার একটি পুনরর্থায়ন তহবিল প্রবর্তন করা হয়েছে। এ তহবিল হতে উদ্যোক্তাগণ মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। এ ছাড়া স্টার্টআপ খাতের অনুকূলে ঋণ সুবিধার পাশাপাশি ইক্যুইটি সহায়তার সুযোগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকেরর উদ্যোগে ৩৯টি তফসিলি ব্যাংকের অংশীদারিতে ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কম্পানি, পিএলসি’ নামক ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট কম্পানি গঠন করা হয়েছে।

স্টার্টআপ উদ্যোগসমূহ উক্ত কম্পানি হতে ইক্যুইটি সহায়তা গ্রহণ করতে পারবে।

অর্থনীতি এর আরও খবর