img

একনেকে ৭ হাজার কোটি টাকার পাঁচ প্রকল্প অনুমোদন

প্রকাশিত :  ১০:৫৫, ১৬ জুন ২০২৬

একনেকে ৭ হাজার কোটি টাকার পাঁচ প্রকল্প অনুমোদন

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় মোট ৭ হাজার ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়সংবলিত পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৪ হাজার ৫৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা অর্থায়ন করা হবে।

আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। সভায় মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে নতুন তিনটি এবং সংশোধিত দুটি প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পগুলো বিভিন্ন খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে গৃহীত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ‘Supporting Infrastructure Project for Chinese Economic and Industrial Zone’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এই প্রকল্পটি দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবকাঠামোগত সহায়তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিনটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেনী জেলার মুহুরী-কহুয়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়। একই সঙ্গে করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প এবং পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর ও কুমারখালী উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রক্ষায় একটি সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীভাঙন প্রতিরোধ, কৃষি সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বন্যা ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘১০০টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন’ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধিত প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এই প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এছাড়া ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সম্বলিত চারটি প্রকল্প সম্পর্কে একনেক সভায় অবহিত করা হয়, যেগুলো পূর্বে পরিকল্পনা মন্ত্রীর অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারে বিমান বাহিনী ঘাঁটিতে ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ, সাভারে নৌবাহিনী স্কুল ও কলেজ স্থাপন, শমসেরনগরে বিমান বাহিনী শাহীন কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্যাগোডাভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক ও নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রমের চতুর্থ পর্যায়।

সভায় উপস্থিত মন্ত্রীরা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, ব্যয় কাঠামো এবং বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন এবং দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারে ফিরছে প্রাণ, নাকি এটি আরেকটি ক্ষণস্থায়ী উচ্ছ্বাস?

প্রকাশিত :  ১১:০০, ১৬ জুন ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন পর আবার আশার আলো দেখা যাচ্ছে। সূচক বাড়ছে, লেনদেন বাড়ছে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে। কয়েক মাস আগেও যে বাজারকে অনেকেই কার্যত মৃতপ্রায় বলে মনে করতেন, সেই বাজারই এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উত্থান কি একটি সুস্থ ও টেকসই পুনরুদ্ধারের সূচনা, নাকি অতীতের মতো আরেকটি সাময়িক উচ্ছ্বাস?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সূচকের কয়েক দিনের উত্থান নয়, বরং বাজারের ভেতরের বাস্তবতা দেখতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষয় করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সেই চাপ সামলাতে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। ফলে ব্যাংক ঋণের খরচ বেড়েছে, ব্যবসার সম্প্রসারণ ব্যয়বহুল হয়েছে এবং বিনিয়োগ পরিবেশও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়।

এই বাস্তবতার মধ্যেও শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক উত্থান নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। ডিএসইএক্স দীর্ঘদিন পর ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করেছে। লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাধারণত বাজারে আস্থা ফিরতে শুরু করলে সূচকের আগে লেনদেন বাড়ে। সেই বিবেচনায় সাম্প্রতিক প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের নতুন প্রত্যাশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে অভিজ্ঞতা বলে, শুধু আস্থা দিয়ে বাজার টেকে না; আস্থার পেছনে শক্ত ভিত্তি থাকতে হয়।

সাম্প্রতিক উত্থানের অন্যতম কারণ নতুন বাজেট। সরকার পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করার যে বার্তা দিয়েছে, তা ইতিবাচক। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য তুলনামূলক কম করহার, নতুন বিনিয়োগ পণ্যের সুযোগ এবং বাজারভিত্তিক অর্থায়নের ওপর জোর—এসব পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে।

কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সমস্যা কখনোই শুধু করহারে সীমাবদ্ধ ছিল না। মূল সমস্যা ছিল সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং মানসম্পন্ন কোম্পানির সংকট।

এই কারণেই বিএসইসির নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে বাজারে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। আইপিও প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং দ্রুত নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা অনেকটাই কমতে পারে।

বিশেষ করে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে বাজার অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়। দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে দাম আটকে রাখার ফলে বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছিল এবং প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। মুক্ত বাজারে মূল্য নির্ধারণের সুযোগ ফিরে আসা বাজারের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।

তবে আশাবাদের পাশাপাশি উদ্বেগের কারণও কম নয়।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্রমাগত বাজার ছেড়ে যাওয়া। একটি দেশের পুঁজিবাজারের স্বাস্থ্য বিচার করতে হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিনিয়োগ করে এবং ঝুঁকি মূল্যায়নে তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক থাকে। গত কয়েক বছরে তাদের বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া আমাদের জন্য সতর্কবার্তা।

এর পেছনে শুধু বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা নয়, দেশের করপোরেট সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং মুদ্রাবাজারের অস্থিরতাও বড় কারণ।

আরেকটি বাস্তবতা হলো, আমাদের পুঁজিবাজার এখনও অতিমাত্রায় খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর। উন্নত বাজারে পেনশন ফান্ড, বীমা তহবিল, মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারকে স্থিতিশীল রাখে। বাংলাদেশে সেই ভিত্তি এখনও দুর্বল। ফলে গুজব, আবেগ এবং স্বল্পমেয়াদি জল্পনার প্রভাব অনেক বেশি দেখা যায়।

সুতরাং, বর্তমান উত্থানকে স্বাগত জানালেও এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাজারের সামনে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সূচক বাড়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাজারের গভীরতা বাড়া, মানসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা স্থায়ী হওয়া।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে—সুশাসন নিশ্চিত করা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, বড় ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের আপস না করা।

শেয়ারবাজারকে কেবল সূচকের উত্থান দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। একটি সুস্থ পুঁজিবাজার হলো অর্থনীতির আয়না। সেই আয়নায় যদি প্রকৃত অর্থনীতির শক্তি, স্বচ্ছতা এবং আস্থা প্রতিফলিত হয়, তবেই বর্তমান উত্থানকে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলা যাবে। অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি ক্ষণস্থায়ী উচ্ছ্বাস হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।