img

পুঁজিবাজারে ফিরছে প্রাণ, নাকি এটি আরেকটি ক্ষণস্থায়ী উচ্ছ্বাস?

প্রকাশিত :  ১১:০০, ১৬ জুন ২০২৬

পুঁজিবাজারে ফিরছে প্রাণ, নাকি এটি আরেকটি ক্ষণস্থায়ী উচ্ছ্বাস?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন পর আবার আশার আলো দেখা যাচ্ছে। সূচক বাড়ছে, লেনদেন বাড়ছে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে। কয়েক মাস আগেও যে বাজারকে অনেকেই কার্যত মৃতপ্রায় বলে মনে করতেন, সেই বাজারই এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উত্থান কি একটি সুস্থ ও টেকসই পুনরুদ্ধারের সূচনা, নাকি অতীতের মতো আরেকটি সাময়িক উচ্ছ্বাস?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সূচকের কয়েক দিনের উত্থান নয়, বরং বাজারের ভেতরের বাস্তবতা দেখতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষয় করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সেই চাপ সামলাতে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। ফলে ব্যাংক ঋণের খরচ বেড়েছে, ব্যবসার সম্প্রসারণ ব্যয়বহুল হয়েছে এবং বিনিয়োগ পরিবেশও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়।

এই বাস্তবতার মধ্যেও শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক উত্থান নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। ডিএসইএক্স দীর্ঘদিন পর ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করেছে। লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাধারণত বাজারে আস্থা ফিরতে শুরু করলে সূচকের আগে লেনদেন বাড়ে। সেই বিবেচনায় সাম্প্রতিক প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের নতুন প্রত্যাশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে অভিজ্ঞতা বলে, শুধু আস্থা দিয়ে বাজার টেকে না; আস্থার পেছনে শক্ত ভিত্তি থাকতে হয়।

সাম্প্রতিক উত্থানের অন্যতম কারণ নতুন বাজেট। সরকার পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করার যে বার্তা দিয়েছে, তা ইতিবাচক। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য তুলনামূলক কম করহার, নতুন বিনিয়োগ পণ্যের সুযোগ এবং বাজারভিত্তিক অর্থায়নের ওপর জোর—এসব পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে।

কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সমস্যা কখনোই শুধু করহারে সীমাবদ্ধ ছিল না। মূল সমস্যা ছিল সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং মানসম্পন্ন কোম্পানির সংকট।

এই কারণেই বিএসইসির নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে বাজারে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। আইপিও প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং দ্রুত নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা অনেকটাই কমতে পারে।

বিশেষ করে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে বাজার অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়। দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে দাম আটকে রাখার ফলে বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছিল এবং প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। মুক্ত বাজারে মূল্য নির্ধারণের সুযোগ ফিরে আসা বাজারের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।

তবে আশাবাদের পাশাপাশি উদ্বেগের কারণও কম নয়।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্রমাগত বাজার ছেড়ে যাওয়া। একটি দেশের পুঁজিবাজারের স্বাস্থ্য বিচার করতে হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিনিয়োগ করে এবং ঝুঁকি মূল্যায়নে তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক থাকে। গত কয়েক বছরে তাদের বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া আমাদের জন্য সতর্কবার্তা।

এর পেছনে শুধু বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা নয়, দেশের করপোরেট সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং মুদ্রাবাজারের অস্থিরতাও বড় কারণ।

আরেকটি বাস্তবতা হলো, আমাদের পুঁজিবাজার এখনও অতিমাত্রায় খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর। উন্নত বাজারে পেনশন ফান্ড, বীমা তহবিল, মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারকে স্থিতিশীল রাখে। বাংলাদেশে সেই ভিত্তি এখনও দুর্বল। ফলে গুজব, আবেগ এবং স্বল্পমেয়াদি জল্পনার প্রভাব অনেক বেশি দেখা যায়।

সুতরাং, বর্তমান উত্থানকে স্বাগত জানালেও এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাজারের সামনে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সূচক বাড়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাজারের গভীরতা বাড়া, মানসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা স্থায়ী হওয়া।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে—সুশাসন নিশ্চিত করা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, বড় ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের আপস না করা।

শেয়ারবাজারকে কেবল সূচকের উত্থান দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। একটি সুস্থ পুঁজিবাজার হলো অর্থনীতির আয়না। সেই আয়নায় যদি প্রকৃত অর্থনীতির শক্তি, স্বচ্ছতা এবং আস্থা প্রতিফলিত হয়, তবেই বর্তমান উত্থানকে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলা যাবে। অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি ক্ষণস্থায়ী উচ্ছ্বাস হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

জামানত ছাড়াই ১০ লাখ টাকা ঋণ পাবেন নতুন উদ্যোক্তারা : অর্থমন্ত্রী

প্রকাশিত :  ১৪:৩৬, ১২ জুলাই ২০২৬

রবিবার (১২ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। এছাড়া জামানত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধাও গ্রহণ করতে পারবেন।

সদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৩তম দিন কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুল আলমের লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। এদিন বিকেল ৩টায় সংসদের বৈঠক শুরু হয় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীরবিক্রম) সভাপতিত্বে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তরুণদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতে নতুন উদ্যোক্তা পুনরর্থায়ন স্কিমের তহবিলের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

এ তহবিল হতে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং জামানত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন।

অর্থমন্ত্রী জানান, স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তি সহজীকরণের লক্ষ্যে স্টার্টআপ ফান্ড নামে ৫০০ কোটি টাকার একটি পুনরর্থায়ন তহবিল প্রবর্তন করা হয়েছে। এ তহবিল হতে উদ্যোক্তাগণ মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। এ ছাড়া স্টার্টআপ খাতের অনুকূলে ঋণ সুবিধার পাশাপাশি ইক্যুইটি সহায়তার সুযোগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকেরর উদ্যোগে ৩৯টি তফসিলি ব্যাংকের অংশীদারিতে ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কম্পানি, পিএলসি’ নামক ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট কম্পানি গঠন করা হয়েছে।

স্টার্টআপ উদ্যোগসমূহ উক্ত কম্পানি হতে ইক্যুইটি সহায়তা গ্রহণ করতে পারবে।

অর্থনীতি এর আরও খবর