img

মার্জিন ঋণে বড় পরিবর্তন, একক শেয়ারে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অর্থায়ন

প্রকাশিত :  ১৮:৪৯, ১৬ আগষ্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: মার্জিন অর্থায়নের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন সংশোধিত বিধিমালায় মার্জিন অর্থায়নের জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব, গ্রাহকের ন্যূনতম ইক্যুইটি, অর্থায়নের সীমা, মার্জিন কল এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় একাধিক নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

বিএসইসি আইন, ১৯৯৩-এর ২৪(১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫ সংশোধন করে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে। কমিশনের আদেশে সংশোধিত বিধিমালার বিস্তারিত শর্ত তুলে ধরা হয়েছে।

নতুন বিধান অনুযায়ী, মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে নিজ নামে একটি পৃথক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করতে হবে। শুধু মার্জিন অর্থায়নসংক্রান্ত কার্যক্রমেই ওই হিসাব ব্যবহার করা যাবে। কোনো শাখা বা ডিজিটাল বুথের নামে এ ধরনের ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে না। আগে শাখা বা ডিজিটাল বুথের নামে পরিচালিত কোনো হিসাব থাকলে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির পর কমিশনের অনুমোদন ছাড়া তা পরিচালনা করা যাবে না।

সংশোধিত বিধিমালায় একজন গ্রাহক একই মার্জিন অর্থায়নকারীর কাছে একই সময়ে একটি নগদ হিসাব ও একটি মার্জিন হিসাব রাখতে বা খুলতে পারবেন।

মার্জিন চুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে এক বছর। কোনো পক্ষ চুক্তি বাতিল না করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ১৫ দিন আগে লিখিত নোটিশ দিয়ে মার্জিন অর্থায়নকারী বা সংশ্লিষ্ট গ্রাহক চুক্তি বাতিল করতে পারবেন।

মার্জিন অর্থায়নের পরিমাণের ক্ষেত্রেও সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো মার্জিন হিসাবে গ্রাহকের ইক্যুইটির চেয়ে বেশি অর্থায়ন করা যাবে না। অর্থাৎ, গ্রাহকের ইক্যুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত ১:১-এর বেশি হতে পারবে না।

এ ছাড়া কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার প্রকৃত মূলধন বা নিট সম্পদের চার গুণের বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না।

৫০ শতাংশ ইক্যুইটি না থাকলে মার্জিন কল

সংশোধিত বিধিমালায় গ্রাহকের ইক্যুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো মার্জিন হিসাবে গ্রাহকের ইক্যুইটি মার্জিন অর্থায়নের ৫০ শতাংশের নিচে নামতে পারবে না।

ইক্যুইটি নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে দ্রুত মার্জিন কল দিতে হবে। লিখিতভাবে অথবা গ্রাহকের ই-মেইল ও নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে এ বিষয়ে জানাতে হবে। প্রয়োজন হলে ফোনেও গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।

মার্জিন কল দেওয়ার তিন ট্রেডিং দিনের পরও গ্রাহক প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দিতে ব্যর্থ হলে ওই হিসাবে নতুন করে অর্থায়ন করা যাবে না। তবে ইক্যুইটি নির্ধারিত ৫০ শতাংশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিকিউরিটিজ বিক্রি করতে পারবে মার্জিন অর্থায়নকারী।

ইক্যুইটি যদি মার্জিন অর্থায়নের ২৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাহলে গ্রাহককে কোনো নোটিশ না দিয়েই সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজ বিক্রি করে হিসাব সমন্বয় করার ক্ষমতা থাকবে মার্জিন অর্থায়নকারীর।

সব শেয়ারে মার্জিন ঋণ নয়

সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত শেয়ার ছাড়া অন্য কোনো সিকিউরিটিতে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। একই সঙ্গে ‘G’, ‘N’ ও ‘Z’ শ্রেণির সিকিউরিটিজে মার্জিন অর্থায়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

স্টক এক্সচেঞ্জের এসএমই, এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্ম বা বোর্ডে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজও মার্জিন অর্থায়নের আওতার বাইরে থাকবে।

মার্জিন অর্থায়ন নেওয়ার সময় গ্রাহকের হিসাবে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে অন্তত ৩ লাখ টাকার বিনিয়োগ থাকতে হবে। এর কম বিনিয়োগ থাকলে ওই হিসাবে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না।

কোনো গ্রাহক মার্জিন অর্থায়নের অযোগ্য সিকিউরিটিজ কিনলে সেগুলোকে মার্জিন অর্থায়নের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ইক্যুইটি হিসেবে গণনা করা যাবে না।

পিই অনুপাত ৪০-এর বেশি হলে মার্জিন নয়

নতুন নিয়মে কোনো সিকিউরিটির মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও ৪০-এর বেশি হলে তাতে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। একইভাবে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ঋণাত্মক হলেও ওই সিকিউরিটিতে মার্জিন অর্থায়ন নিষিদ্ধ থাকবে।

তালিকাভুক্ত জীবনবীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিই রেশিওর পরিবর্তে মূল্য ও নিট সম্পদ অনুপাত বা পিবি রেশিও বিবেচনা করা হবে। পিবি রেশিও ৩-এর বেশি হলে অথবা নিট সম্পদ মূল্য ঋণাত্মক হলে সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিতে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না।

মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটি নির্ধারণে সর্বশেষ ট্রেডিং দিনের সমাপনী মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সর্বশেষ চার প্রান্তিকের ইপিএসের ভিত্তিতে ট্রেইলিং পিই রেশিও নির্ধারণ করা হবে। জীবনবীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে সর্বশেষ নিরীক্ষিত এনএভি বা শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য বিবেচনায় নেওয়া হবে।

মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটি নির্ধারণের সুবিধার্থে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে নিয়মিতভাবে তাদের ওয়েবসাইটে পিই রেশিও এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পিবি রেশিও প্রকাশ করতে হবে।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কমিটি বাধ্যতামূলক

নতুন নিয়মে মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে অন্তত দুই সদস্যের একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটি বছরে অন্তত চারটি সভা করবে। সভার কার্যবিবরণী পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করতে হবে।

মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কমিশনের বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের মার্জিন অর্থায়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে কমিশনের কোনো বিধান শিথিল করে নিজস্ব নীতিমালা তৈরি বা অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা যাবে না।

এক শেয়ারে ২০ শতাংশের বেশি নয়

সংশোধিত বিধিমালায় একক সিকিউরিটিতে মার্জিন অর্থায়নের ঝুঁকিও সীমিত করা হয়েছে। কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার মোট বকেয়া মার্জিন অর্থায়নের ২০ শতাংশের বেশি কোনো একটি সিকিউরিটিতে অর্থায়ন করতে পারবে না।

এ ছাড়া গবেষণা দলের সদস্যদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা সরাসরি মার্জিন অর্থায়নকারীর ট্রেডিং কমিশন আয়ের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না।

ইসলামিক শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়ন পদ্ধতি চালু করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট মার্জিন অর্থায়নকারীর শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড থাকতে হবে। ওই বোর্ড বা শরিয়াহ উপদেষ্টার সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

বিএসইসির সংশোধিত বিধিমালার ফলে মার্জিন অর্থায়নে গ্রাহকের ইক্যুইটি, অর্থায়নের সীমা, সিকিউরিটি নির্বাচন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আরও সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হলো। একই সঙ্গে কোনো একটি সিকিউরিটিতে অতিরিক্ত অর্থায়নের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারে ধস: বিনিয়োগকারীরা কি সরকারের কাছে অপ্রয়োজনীয়?

প্রকাশিত :  ১৪:২১, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯৭ পয়েন্টের পতন শুধু সূচকের হিসাব নয়, এটি আস্থার সংকেত। নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তনের, এখন সেই প্রত্যাশার জায়গায় জমছে হতাশা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দিকে তাকালে এখন একটি দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। সংখ্যাগুলো নিচের দিকে যাচ্ছে, আর মানুষের আস্থা তার চেয়েও দ্রুত কমছে।

ডিএসইএক্সের প্রায় ৯৭ পয়েন্ট পতন হয়তো বাজারের এক দিনের হিসাব। কিন্তু এই পতনের অভিঘাত কেবল একটি সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পোর্টফোলিও, লাখো মানুষের সঞ্চয় এবং বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

পুঁজিবাজারকে তাই শুধু শেয়ারের দামের ওঠানামার জায়গা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে যে অর্থ প্রবাহিত হয়, তার সঙ্গে মানুষের শ্রম, সঞ্চয়, স্বপ্ন এবং নিরাপত্তা জড়িয়ে থাকে।

এই জায়গাতেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে।

সরকার কি সত্যিই পুঁজিবাজারের সংকটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে?

প্রশ্নটি রাজনৈতিকও, অর্থনৈতিকও। কারণ বাজারের প্রতিটি দিনের পতনের জন্য সরকারকে দায়ী করা যায় না। শেয়ারের দাম বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ, কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাসহ বহু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

কিন্তু একটি বাজার দীর্ঘদিন দুর্বল থাকলে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়লে, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হলে রাষ্ট্র তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সূচক কৃত্রিমভাবে ওপরে তুলে রাখা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে নিয়ম কার্যকর, আইন সবার জন্য সমান এবং বিনিয়োগকারীরা জানেন যে তাঁদের অর্থের নিরাপত্তার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সংকট সবচেয়ে গভীর।

প্রত্যাশা ছিল, হতাশা কেন?

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ নতুন আশায় বুক বেঁধেছিলেন।

তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনীতিতে গতি আসবে। ব্যবসা বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং তার প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারেও।

এই প্রত্যাশা অমূলক ছিল না।

একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য কার্যকর পুঁজিবাজার প্রয়োজন। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে, সাধারণ মানুষ বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে, এটাই একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক কাঠামো।

কিন্তু বাস্তবতা এখন বিনিয়োগকারীদের অনেককে হতাশ করছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে পুঁজিবাজার রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

এই ধারণা সত্য কি না, সেটি সরকারেরই পরিষ্কার করা উচিত।

কারণ নীরবতা অনেক সময় সন্দেহকে আরও বড় করে তোলে।

৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের প্রশ্ন

বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ পুঁজিবাজারের সঙ্গে যুক্ত। এই সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যান দিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও পুঁজিবাজারের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই মানুষগুলো কেবল বিনিয়োগকারী নন। তাঁরা বাবা, মা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং তরুণ প্রজন্মের সদস্য।

কারও বিনিয়োগ সন্তানের শিক্ষার জন্য। কারও অবসর জীবনের নিরাপত্তার জন্য। কেউ ব্যবসার লাভের অর্থ বাজারে রেখেছেন। কেউ হয়তো চাকরির পাশাপাশি বছরের পর বছর সামান্য করে সঞ্চয় করেছেন।

একটি শেয়ারের দাম যখন ১০ টাকা কমে যায়, তখন বাজারের পর্দায় সেটি শুধু একটি সংখ্যা।

কিন্তু কোনো পরিবারের কাছে সেই ১০ টাকার পতন হয়তো কয়েক মাসের সঞ্চয়ের সমান।

এই পার্থক্যটি নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন

পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী চাইলে কি এই বাজারের জন্য একটি সমন্বিত সংস্কার উদ্যোগ নিতে পারেন না?

অবশ্যই পারেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়, বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে নিয়ে একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব। বাজার কারসাজি প্রতিরোধ, করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নত করা, মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারের জন্য আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব।

প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটিও গঠন করা যেতে পারে।

প্রশ্ন হলো, উদ্যোগটি কোথায়?

একটি নির্বাচিত সরকারকে প্রতিটি বাজার পতনের ব্যাখ্যা দিতে হবে না। কিন্তু বাজারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা এবং আস্থার সংকট নিয়ে একটি নীতিগত অবস্থান জানানো তার দায়িত্ব।

বিনিয়োগকারীরা অন্তত জানতে চান, সরকার সমস্যাটি দেখছে কি না এবং দেখলে কী করতে যাচ্ছে।

অর্থমন্ত্রীর সামনে বড় পরীক্ষা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুঁজিবাজারের সঙ্গে অপরিচিত নন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার ইতিহাস রয়েছে।

এই অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর প্রতি প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীর সামনে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির হিসাব নেই। রয়েছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও।

এখন প্রয়োজন একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ।

কোন সংস্কার আগে হবে? কোনটি পরে? বাজার কারসাজি ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? ভালো কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে কী প্রণোদনা থাকবে? সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে? প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তব্যে নয়, কার্যকর নীতির মাধ্যমে দিতে হবে।

অর্থনীতি পরিচালনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আস্থা। আর আস্থা তৈরি হয় কথায় নয়, ধারাবাহিক ফলাফলে।

বিএসইসির সাফল্যের মাপকাঠি কী?

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এর দায়িত্ব শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে অনিয়মের সুযোগই সীমিত হয়ে আসে।

বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন, বাজারের সুশাসন শক্তিশালী করা এবং মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এসব উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে।

কিন্তু বাজার শেষ পর্যন্ত বক্তব্যের মূল্যায়ন করে ফল দিয়ে।

তাহলে প্রশ্ন উঠবে, কারসাজি কি কমেছে? বিনিয়োগকারীদের অভিযোগের নিষ্পত্তি কি দ্রুত হচ্ছে? দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি দৃশ্যমান? তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসন কি উন্নত হচ্ছে? বাজারে তথ্যের স্বচ্ছতা কি বেড়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তরই বিএসইসির কার্যকারিতার প্রকৃত মাপকাঠি।

বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তনের দাবি উঠতে পারে। দক্ষ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু শুধু চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হবে না।

প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত বিচার এবং আইনের দৃশ্যমান প্রয়োগ।

সূচক নয়, আস্থা বাঁচাতে হবে

সরকারের একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন।

পুঁজিবাজারের সূচক কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখার দায়িত্ব সরকারের নয়।

সূচক কমবে, বাড়বে। বাজারে ঝুঁকি থাকবে। বিনিয়োগে লাভ যেমন থাকবে, ক্ষতিও থাকবে।

সরকারের দায়িত্ব হলো ন্যায্য খেলার মাঠ তৈরি করা।

কেউ বাজার কারসাজি করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে।

কোনো কোম্পানি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে তার পরিচালনা পর্ষদকে জবাবদিহি করতে হবে।

কেউ অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা নিলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কোনো দুর্বল কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে ফেললে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সময়মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো না থাকলে কোনো বাজার দীর্ঘদিন টেকসই হতে পারে না।

সরকার বিনিয়োগকারীদের লাভের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কিন্তু ন্যায্য বাজারের নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সংখ্যার পেছনের মানুষগুলো কোথায়?

বাজারের দৈনিক প্রতিবেদনে আমরা বলি, সূচক এত পয়েন্ট কমেছে। বাজার মূলধন এত কোটি টাকা কমেছে। লেনদেন হয়েছে এত টাকা।

কিন্তু সংখ্যার পেছনে থাকা মানুষটির গল্প কোথায়?

একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি হয়তো জীবনের শেষ সঞ্চয় নিয়ে বাজারে এসেছেন।

একজন তরুণ হয়তো ভেবেছেন, বেতনের সামান্য অংশ বিনিয়োগ করে ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হয়তো ব্যবসার মুনাফা বাজারে রেখেছেন।

তাঁদের প্রত্যেকের কাছে পুঁজিবাজারের অর্থ আলাদা।

কারও কাছে এটি স্বপ্ন। কারও কাছে নিরাপত্তা। কারও কাছে শেষ আশ্রয়।

তাই বাজারের পতনকে কেবল একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে অর্থনীতির মানবিক বাস্তবতাটি হারিয়ে যায়।

এখনই সংস্কারের সময়

সরকার চাইলে বর্তমান সংকটকে একটি সুযোগে পরিণত করতে পারে।

একটি সময়বদ্ধ পুঁজিবাজার সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করা যেতে পারে। বিএসইসির নজরদারি আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। স্টক এক্সচেঞ্জের প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ বাড়ানো যেতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট গভর্ন্যান্সে কঠোরতা আনা যেতে পারে।

বাজার কারসাজির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিচারব্যবস্থা কার্যকর করা দরকার।

ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার জন্য নীতিগত প্রণোদনা প্রয়োজন।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো দরকার।

আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ শুরু করা জরুরি।

কারণ যে বাজারে বিনিয়োগকারীরা কথা বলার সুযোগ পান না, সেই বাজারে আস্থা স্থায়ী হয় না।

দায় কার?

আজকের পুঁজিবাজারের সব সমস্যার দায় কোনো একজন ব্যক্তির নয়। বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের।

দুর্বল সুশাসন, নীতিগত অসঙ্গতি, বাজার কারসাজির অভিযোগ, মানসম্মত কোম্পানির ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বর্তমান সরকার দায়মুক্ত।

কারণ সরকার পুরোনো সমস্যার উত্তরাধিকার গ্রহণ করার পাশাপাশি সেগুলো সমাধানের দায়িত্বও গ্রহণ করে।

একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা তাই খুব বেশি কিছু নয়।

তাঁরা লাভের নিশ্চয়তা চান না।

তাঁরা শুধু চান, আইন যেন সবার জন্য সমান হয়।

তাঁরা চান, কারসাজি যেন শাস্তি পায়।

তাঁরা চান, ভালো কোম্পানি যেন বাজারে আসে।

তাঁরা চান, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান যেন কার্যকর হয়।

তাঁরা চান, তাঁদের সঞ্চয় যেন নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পায়।

এখন উত্তর দেওয়ার সময়

ডিএসইএক্সের ৯৭ পয়েন্ট পতন একটি দিনের ঘটনা হতে পারে।

কিন্তু আস্থার পতন এক দিনের নয়।

আস্থা তৈরি হতে সময় লাগে। ভাঙতে লাগে খুব অল্প সময়। একটি বাজারে মানুষ একবার বিশ্বাস হারালে তা ফিরিয়ে আনা শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয় থাকে না, এটি হয়ে ওঠে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সেই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সরকার চাইলে এখনো পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিষয়টিকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে আনতে পারেন। অর্থমন্ত্রী চাইলে একটি স্পষ্ট সংস্কার রোডম্যাপ দিতে পারেন। বিএসইসি চাইলে কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে।

কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্ত।

প্রয়োজন সমন্বয়।

প্রয়োজন জবাবদিহি।

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বিনিয়োগকারীরা এখন আর শুধু সূচকের দিকে তাকিয়ে নেই। তাঁরা তাকিয়ে আছেন রাষ্ট্রের দিকে।

তাঁদের প্রশ্ন, এই বাজার কি সরকারের কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?

তাঁদের আরেকটি প্রশ্ন, তাঁদের সঞ্চয়, তাঁদের উদ্বেগ, তাঁদের ক্ষতি এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ কি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে কোনো বাস্তব মূল্য বহন করে?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল একটি বিবৃতি দিয়ে দেওয়া যাবে না।

উত্তর দিতে হবে কার্যকর সংস্কারে।

উত্তর দিতে হবে আইনের প্রয়োগে।

উত্তর দিতে হবে দৃশ্যমান জবাবদিহিতে।

কারণ পুঁজিবাজারের সূচক আবার উঠবে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ভালো কোম্পানি নতুন করে বাজারে আসতে পারে।

কিন্তু মানুষের আস্থা যদি একবার পুরোপুরি হারিয়ে যায়, তখন শুধু সূচক বাড়িয়ে সেই ক্ষত পূরণ করা যায় না।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় লড়াই পতন ঠেকানোর নয়।

আস্থা ফিরিয়ে আনার লড়াই।

আর সেই লড়াইয়ে সরকার যদি নীরব থাকে, ইতিহাসের প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে উঠবে:

যখন বিনিয়োগকারীরা রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তখন রাষ্ট্র তাঁদের জন্য কী করেছিল?