img

শেয়ারবাজারের উত্থান-পতনের আড়ালে অর্থনীতির আসল সংকেত

প্রকাশিত :  ১৩:৩৭, ২২ আগষ্ট ২০২৬

শেয়ারবাজারের উত্থান-পতনের আড়ালে অর্থনীতির আসল সংকেত

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক ধরনের সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিছু সূচকে স্বস্তির খবর আছে, আবার কিছু জায়গায় উদ্বেগও কমছে না। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

অর্থনীতির এই মিশ্র চিত্রের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পুঁজিবাজারেও। কখনো সূচক বাড়ছে, লেনদেন বাড়ছে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হচ্ছে। আবার অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই আশাবাদ মিলিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাজার কি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, নাকি এটি সাময়িক উত্থান-পতনের মধ্যেই আটকে আছে?

জুলাইয়ে দেশে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। গত আট মাসের মধ্যে এটি ছিল সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে। নিঃসন্দেহে এটি স্বস্তির খবর। তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব কতটা পড়ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমে আসা। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এক মাসের পরিসংখ্যান দিয়ে দূর হওয়ার নয়।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থানও আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জুলাই শেষে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে তা ৩১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং চলতি হিসাবে উন্নতির কারণে রিজার্ভে এই স্বস্তি এসেছে।

তবে রিজার্ভ বাড়লেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায় না। রপ্তানি, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আহরণের ভিত শক্ত না হলে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়েও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ঝুঁকির কথা বলছে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় পুঁজিবাজারের দিকে একটু গভীরভাবে তাকানো দরকার।

গত কয়েক মাসে ঢাকার শেয়ারবাজারে যে চিত্র দেখা গেছে, তা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জুলাইয়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় দুই বছরের মধ্যে প্রথমবার ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ওপরে উঠেছিল। এক সপ্তাহে বাজার মূলধন বেড়েছিল প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। দৈনিক লেনদেনও ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ওপরে উঠেছিল। বাজার সংস্কার এবং তারল্য বাড়ার প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তখন বেশ আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু আগস্টে এসে সেই আশাবাদে ভাটা পড়ে। ২০ আগস্ট ছয় দিনের টানা পতনের পর ডিএসইএক্স কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও লেনদেন নেমে আসে ৬৭০ কোটি টাকায়, যা তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। সূচক সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা যে আগের জায়গায় ফিরে আসেনি, লেনদেনের পরিমাণই তার বড় প্রমাণ।

এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ভাবনার।

একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার কেবল সূচক বাড়ার ওপর নির্ভর করে না। সূচক বাড়লেই বাজার ভালো, এমন ধারণা যেমন ঠিক নয়, তেমনি লেনদেন বাড়লেই বাজার সুস্থ হয়ে গেছে, সেটিও বলা যায় না। বরং জানতে হবে, মানুষ কেন শেয়ার কিনছে। তারা কি ভালো কোম্পানির ব্যবসা ও ভবিষ্যৎ আয় বিবেচনা করে বিনিয়োগ করছে, নাকি কয়েক দিনের মুনাফার আশায় ছুটছে? কোম্পানির মৌলিক ভিত্তি কি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে, নাকি গুজব ও নীতিগত ঘোষণাই বাজারকে চালিত করছে?

সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে দ্বিতীয় প্রবণতাটিই বেশি চোখে পড়ছে।

মার্জিন ঋণ নীতির পরিবর্তন ঘিরে সাম্প্রতিক অস্থিরতা তার একটি উদাহরণ। একটি নীতিগত খবরের প্রতিক্রিয়ায় বাজার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বড় উত্থান দেখাতে পারে। আবার একই বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সেই উত্থান দ্রুতই মিলিয়ে যায়। ১৮ আগস্ট ডিএসইএক্স দিনের একপর্যায়ে ৫০ পয়েন্টের বেশি উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত সূচক ৪০ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৭৭৩ পয়েন্টে নামে। ওই দিনেই বাজার মূলধন কমে যায় প্রায় ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

এটি শুধু শেয়ারবাজারের ওঠানামার বিষয় নয়। এর সঙ্গে আস্থার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

বিনিয়োগকারীর মনে যদি এই ধারণা তৈরি হয় যে নীতিমালা আজ এক রকম, কাল অন্য রকম হতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয় না। ভালো কোম্পানি ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম যদি একইভাবে গুজবের প্রভাবে ওঠানামা করে, তাহলেও বাজারের ভিত্তি দুর্বল হয়। আর দ্রুত মুনাফার সংস্কৃতি যদি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে পুঁজিবাজার অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে না।

এখানে ব্যাংক খাতের কথাও আসবে। বাংলাদেশের বিনিয়োগব্যবস্থা এখনো অনেকটাই ব্যাংকনির্ভর। অথচ ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, সুশাসনের দুর্বলতা এবং আস্থার সংকট রয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ে শিল্প ও ব্যবসায়। ঋণের খরচ বাড়ে, নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায়।

অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও সেই অর্থ যদি দক্ষ ও উৎপাদনশীল খাতে না যায়, তাহলে শুধু সুদের হার কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন।

এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতির ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে চাহিদার দুর্বলতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সংকটও রয়েছে। এই বাস্তবতায় নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শুধু কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনীতিকে দীর্ঘ সময় ধরে টেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

তবে সুদের হার কমানো কোনো জাদুর কাঠি নয়।

একজন উদ্যোক্তা যদি নিশ্চিত না হন যে আগামী দিনে গ্যাসের সরবরাহ ঠিক থাকবে কি না, বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, করব্যবস্থা কতটা স্থিতিশীল থাকবে, ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পাওয়া যাবে কি না, তাহলে সুদের হার কিছুটা কমলেও তিনি নতুন কারখানায় বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করবেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু টাকার দাম কমানো নয়। বরং ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা কমানো। অর্থাৎ আস্থা ফিরিয়ে আনা।

পুঁজিবাজারের সংস্কারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষার মান বাড়াতে হবে। কারসাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বচ্ছ, ধারাবাহিক ও পূর্বানুমানযোগ্য।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরও বাস্তবতা বুঝতে হবে। শেয়ারবাজার দ্রুত টাকা বানানোর জায়গা নয়। এটি ঝুঁকিপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্র। কোম্পানির ব্যবসা, আয়, সম্পদ, ঋণ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা না বুঝে শুধু বাজারের গুঞ্জন শুনে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি থেকেই যাবে।

আজ ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৯০০, কাল ৫ হাজার ৭০০, এ নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস বা আতঙ্ক কোনোটিই যুক্তিযুক্ত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, আগামী পাঁচ বছরে দেশের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো কতটা উৎপাদন বাড়াবে, কতটা মুনাফা করবে, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং অর্থনীতিতে কতটা নতুন মূলধন জোগাবে।

অর্থনীতির ভিত্তি শক্ত হলে পুঁজিবাজারও তার প্রতিফলন দেখাবে। কিন্তু সূচককে কৃত্রিমভাবে ওপরে তুলে অর্থনীতির দুর্বলতা আড়াল করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের আস্থা ফেরানো যাবে না। মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে, রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে, ব্যাংক খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এর পাশাপাশি প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা।

উদ্যোক্তা যেন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখে বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগকারী যেন কোম্পানির আয় ও ব্যবসা দেখে শেয়ার কেনেন। সাধারণ মানুষ যেন অর্থনীতির দিকে তাকিয়ে মনে করেন, আগামী দিনটি আজকের চেয়ে একটু ভালো হবে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সূচক ডিএসইএক্স নয়। সবচেয়ে বড় সূচক হলো মানুষের আস্থা। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারে ধস: বিনিয়োগকারীরা কি সরকারের কাছে অপ্রয়োজনীয়?

প্রকাশিত :  ১৪:২১, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯৭ পয়েন্টের পতন শুধু সূচকের হিসাব নয়, এটি আস্থার সংকেত। নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তনের, এখন সেই প্রত্যাশার জায়গায় জমছে হতাশা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দিকে তাকালে এখন একটি দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। সংখ্যাগুলো নিচের দিকে যাচ্ছে, আর মানুষের আস্থা তার চেয়েও দ্রুত কমছে।

ডিএসইএক্সের প্রায় ৯৭ পয়েন্ট পতন হয়তো বাজারের এক দিনের হিসাব। কিন্তু এই পতনের অভিঘাত কেবল একটি সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পোর্টফোলিও, লাখো মানুষের সঞ্চয় এবং বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

পুঁজিবাজারকে তাই শুধু শেয়ারের দামের ওঠানামার জায়গা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে যে অর্থ প্রবাহিত হয়, তার সঙ্গে মানুষের শ্রম, সঞ্চয়, স্বপ্ন এবং নিরাপত্তা জড়িয়ে থাকে।

এই জায়গাতেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে।

সরকার কি সত্যিই পুঁজিবাজারের সংকটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে?

প্রশ্নটি রাজনৈতিকও, অর্থনৈতিকও। কারণ বাজারের প্রতিটি দিনের পতনের জন্য সরকারকে দায়ী করা যায় না। শেয়ারের দাম বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ, কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাসহ বহু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

কিন্তু একটি বাজার দীর্ঘদিন দুর্বল থাকলে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়লে, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হলে রাষ্ট্র তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সূচক কৃত্রিমভাবে ওপরে তুলে রাখা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে নিয়ম কার্যকর, আইন সবার জন্য সমান এবং বিনিয়োগকারীরা জানেন যে তাঁদের অর্থের নিরাপত্তার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সংকট সবচেয়ে গভীর।

প্রত্যাশা ছিল, হতাশা কেন?

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ নতুন আশায় বুক বেঁধেছিলেন।

তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনীতিতে গতি আসবে। ব্যবসা বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং তার প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারেও।

এই প্রত্যাশা অমূলক ছিল না।

একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য কার্যকর পুঁজিবাজার প্রয়োজন। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে, সাধারণ মানুষ বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে, এটাই একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক কাঠামো।

কিন্তু বাস্তবতা এখন বিনিয়োগকারীদের অনেককে হতাশ করছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে পুঁজিবাজার রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

এই ধারণা সত্য কি না, সেটি সরকারেরই পরিষ্কার করা উচিত।

কারণ নীরবতা অনেক সময় সন্দেহকে আরও বড় করে তোলে।

৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের প্রশ্ন

বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ পুঁজিবাজারের সঙ্গে যুক্ত। এই সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যান দিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও পুঁজিবাজারের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই মানুষগুলো কেবল বিনিয়োগকারী নন। তাঁরা বাবা, মা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং তরুণ প্রজন্মের সদস্য।

কারও বিনিয়োগ সন্তানের শিক্ষার জন্য। কারও অবসর জীবনের নিরাপত্তার জন্য। কেউ ব্যবসার লাভের অর্থ বাজারে রেখেছেন। কেউ হয়তো চাকরির পাশাপাশি বছরের পর বছর সামান্য করে সঞ্চয় করেছেন।

একটি শেয়ারের দাম যখন ১০ টাকা কমে যায়, তখন বাজারের পর্দায় সেটি শুধু একটি সংখ্যা।

কিন্তু কোনো পরিবারের কাছে সেই ১০ টাকার পতন হয়তো কয়েক মাসের সঞ্চয়ের সমান।

এই পার্থক্যটি নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন

পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী চাইলে কি এই বাজারের জন্য একটি সমন্বিত সংস্কার উদ্যোগ নিতে পারেন না?

অবশ্যই পারেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়, বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে নিয়ে একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব। বাজার কারসাজি প্রতিরোধ, করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নত করা, মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারের জন্য আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব।

প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটিও গঠন করা যেতে পারে।

প্রশ্ন হলো, উদ্যোগটি কোথায়?

একটি নির্বাচিত সরকারকে প্রতিটি বাজার পতনের ব্যাখ্যা দিতে হবে না। কিন্তু বাজারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা এবং আস্থার সংকট নিয়ে একটি নীতিগত অবস্থান জানানো তার দায়িত্ব।

বিনিয়োগকারীরা অন্তত জানতে চান, সরকার সমস্যাটি দেখছে কি না এবং দেখলে কী করতে যাচ্ছে।

অর্থমন্ত্রীর সামনে বড় পরীক্ষা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুঁজিবাজারের সঙ্গে অপরিচিত নন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার ইতিহাস রয়েছে।

এই অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর প্রতি প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীর সামনে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির হিসাব নেই। রয়েছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও।

এখন প্রয়োজন একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ।

কোন সংস্কার আগে হবে? কোনটি পরে? বাজার কারসাজি ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? ভালো কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে কী প্রণোদনা থাকবে? সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে? প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তব্যে নয়, কার্যকর নীতির মাধ্যমে দিতে হবে।

অর্থনীতি পরিচালনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আস্থা। আর আস্থা তৈরি হয় কথায় নয়, ধারাবাহিক ফলাফলে।

বিএসইসির সাফল্যের মাপকাঠি কী?

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এর দায়িত্ব শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে অনিয়মের সুযোগই সীমিত হয়ে আসে।

বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন, বাজারের সুশাসন শক্তিশালী করা এবং মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এসব উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে।

কিন্তু বাজার শেষ পর্যন্ত বক্তব্যের মূল্যায়ন করে ফল দিয়ে।

তাহলে প্রশ্ন উঠবে, কারসাজি কি কমেছে? বিনিয়োগকারীদের অভিযোগের নিষ্পত্তি কি দ্রুত হচ্ছে? দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি দৃশ্যমান? তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসন কি উন্নত হচ্ছে? বাজারে তথ্যের স্বচ্ছতা কি বেড়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তরই বিএসইসির কার্যকারিতার প্রকৃত মাপকাঠি।

বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তনের দাবি উঠতে পারে। দক্ষ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু শুধু চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হবে না।

প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত বিচার এবং আইনের দৃশ্যমান প্রয়োগ।

সূচক নয়, আস্থা বাঁচাতে হবে

সরকারের একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন।

পুঁজিবাজারের সূচক কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখার দায়িত্ব সরকারের নয়।

সূচক কমবে, বাড়বে। বাজারে ঝুঁকি থাকবে। বিনিয়োগে লাভ যেমন থাকবে, ক্ষতিও থাকবে।

সরকারের দায়িত্ব হলো ন্যায্য খেলার মাঠ তৈরি করা।

কেউ বাজার কারসাজি করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে।

কোনো কোম্পানি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে তার পরিচালনা পর্ষদকে জবাবদিহি করতে হবে।

কেউ অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা নিলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কোনো দুর্বল কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে ফেললে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সময়মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো না থাকলে কোনো বাজার দীর্ঘদিন টেকসই হতে পারে না।

সরকার বিনিয়োগকারীদের লাভের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কিন্তু ন্যায্য বাজারের নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সংখ্যার পেছনের মানুষগুলো কোথায়?

বাজারের দৈনিক প্রতিবেদনে আমরা বলি, সূচক এত পয়েন্ট কমেছে। বাজার মূলধন এত কোটি টাকা কমেছে। লেনদেন হয়েছে এত টাকা।

কিন্তু সংখ্যার পেছনে থাকা মানুষটির গল্প কোথায়?

একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি হয়তো জীবনের শেষ সঞ্চয় নিয়ে বাজারে এসেছেন।

একজন তরুণ হয়তো ভেবেছেন, বেতনের সামান্য অংশ বিনিয়োগ করে ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হয়তো ব্যবসার মুনাফা বাজারে রেখেছেন।

তাঁদের প্রত্যেকের কাছে পুঁজিবাজারের অর্থ আলাদা।

কারও কাছে এটি স্বপ্ন। কারও কাছে নিরাপত্তা। কারও কাছে শেষ আশ্রয়।

তাই বাজারের পতনকে কেবল একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে অর্থনীতির মানবিক বাস্তবতাটি হারিয়ে যায়।

এখনই সংস্কারের সময়

সরকার চাইলে বর্তমান সংকটকে একটি সুযোগে পরিণত করতে পারে।

একটি সময়বদ্ধ পুঁজিবাজার সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করা যেতে পারে। বিএসইসির নজরদারি আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। স্টক এক্সচেঞ্জের প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ বাড়ানো যেতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট গভর্ন্যান্সে কঠোরতা আনা যেতে পারে।

বাজার কারসাজির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিচারব্যবস্থা কার্যকর করা দরকার।

ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার জন্য নীতিগত প্রণোদনা প্রয়োজন।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো দরকার।

আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ শুরু করা জরুরি।

কারণ যে বাজারে বিনিয়োগকারীরা কথা বলার সুযোগ পান না, সেই বাজারে আস্থা স্থায়ী হয় না।

দায় কার?

আজকের পুঁজিবাজারের সব সমস্যার দায় কোনো একজন ব্যক্তির নয়। বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের।

দুর্বল সুশাসন, নীতিগত অসঙ্গতি, বাজার কারসাজির অভিযোগ, মানসম্মত কোম্পানির ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বর্তমান সরকার দায়মুক্ত।

কারণ সরকার পুরোনো সমস্যার উত্তরাধিকার গ্রহণ করার পাশাপাশি সেগুলো সমাধানের দায়িত্বও গ্রহণ করে।

একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা তাই খুব বেশি কিছু নয়।

তাঁরা লাভের নিশ্চয়তা চান না।

তাঁরা শুধু চান, আইন যেন সবার জন্য সমান হয়।

তাঁরা চান, কারসাজি যেন শাস্তি পায়।

তাঁরা চান, ভালো কোম্পানি যেন বাজারে আসে।

তাঁরা চান, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান যেন কার্যকর হয়।

তাঁরা চান, তাঁদের সঞ্চয় যেন নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পায়।

এখন উত্তর দেওয়ার সময়

ডিএসইএক্সের ৯৭ পয়েন্ট পতন একটি দিনের ঘটনা হতে পারে।

কিন্তু আস্থার পতন এক দিনের নয়।

আস্থা তৈরি হতে সময় লাগে। ভাঙতে লাগে খুব অল্প সময়। একটি বাজারে মানুষ একবার বিশ্বাস হারালে তা ফিরিয়ে আনা শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয় থাকে না, এটি হয়ে ওঠে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সেই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সরকার চাইলে এখনো পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিষয়টিকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে আনতে পারেন। অর্থমন্ত্রী চাইলে একটি স্পষ্ট সংস্কার রোডম্যাপ দিতে পারেন। বিএসইসি চাইলে কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে।

কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্ত।

প্রয়োজন সমন্বয়।

প্রয়োজন জবাবদিহি।

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বিনিয়োগকারীরা এখন আর শুধু সূচকের দিকে তাকিয়ে নেই। তাঁরা তাকিয়ে আছেন রাষ্ট্রের দিকে।

তাঁদের প্রশ্ন, এই বাজার কি সরকারের কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?

তাঁদের আরেকটি প্রশ্ন, তাঁদের সঞ্চয়, তাঁদের উদ্বেগ, তাঁদের ক্ষতি এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ কি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে কোনো বাস্তব মূল্য বহন করে?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল একটি বিবৃতি দিয়ে দেওয়া যাবে না।

উত্তর দিতে হবে কার্যকর সংস্কারে।

উত্তর দিতে হবে আইনের প্রয়োগে।

উত্তর দিতে হবে দৃশ্যমান জবাবদিহিতে।

কারণ পুঁজিবাজারের সূচক আবার উঠবে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ভালো কোম্পানি নতুন করে বাজারে আসতে পারে।

কিন্তু মানুষের আস্থা যদি একবার পুরোপুরি হারিয়ে যায়, তখন শুধু সূচক বাড়িয়ে সেই ক্ষত পূরণ করা যায় না।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় লড়াই পতন ঠেকানোর নয়।

আস্থা ফিরিয়ে আনার লড়াই।

আর সেই লড়াইয়ে সরকার যদি নীরব থাকে, ইতিহাসের প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে উঠবে:

যখন বিনিয়োগকারীরা রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তখন রাষ্ট্র তাঁদের জন্য কী করেছিল?