img

‘অতীতে তো স্পিকারকে পিটিয়ে মারা হয়েছে এই সংসদে’

প্রকাশিত :  ১০:০৯, ৩১ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:০৬, ৩১ আগষ্ট ২০২৬

‘অতীতে তো স্পিকারকে পিটিয়ে মারা হয়েছে এই সংসদে’

গত ২৭ আগস্ট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে বিরোধী দলের হইচইয়ের মধ্যে কথাটি বলেছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সেদিন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল সংসদ। বিরোধী দলের সদস্যরা অভিযোগ করছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। আপত্তি, হইচই ও হট্টগোলে একপর্যায়ে সংসদের কার্যক্রমে অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে স্পিকার টেনে আনেন সংসদের অতীতের একটি কালো অধ্যায়। কিন্তু তার সেই মন্তব্যের পরই সামনে আসে একটি প্রশ্ন- কোন স্পিকারকে হত্যা করা হয়েছিল?

গত রোববার (৩০ আগস্ট) সংসদে স্থায়ী কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও প্রসঙ্গটি তোলেন। তিনি বলেন, ‘অতীতে তো স্পিকারকে পিটিয়ে মারা হয়েছে, ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী সাহেবকে হত্যা করা হয়েছে, জুতা ছোড়াছুড়ি হয়েছে। আমরা সেই কালো ইতিহাসে ফিরে যেতে চাই না।’

তাহলে কী ঘটেছিল সেই সংসদে?

উত্তর খুঁজতে হলে ফিরতে হবে প্রায় ৬৮ বছর আগে, ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে। তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। যে ঘটনাটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবনে ঘটেনি। তখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন চলছিল। সেই পরিষদ ভবনও আজকের জাতীয় সংসদ ভবন নয়।

আর সেই রক্তাক্ত ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন স্পিকার আব্দুল হাকিম এবং ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী।

১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি ছিল তীব্র অস্থির। আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। অন্যদিকে প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার ছিলেন আব্দুল হাকিম। তিনি ছিলেন আইনজীবী, সাহিত্যিক এবং শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর তিনি প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হন।

স্পিকার হিসেবে আব্দুল হাকিমের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়ে উঠছিল। আওয়ামী লীগের অভিযোগ ছিল, তিনি নিরপেক্ষতার সীমা ছাড়িয়ে সরকারের বিরোধিতা করছেন। অন্যদিকে স্পিকারের অবস্থান ছিল, পরিষদের নিয়ম ও স্পিকারের ক্ষমতার প্রশ্নে তিনি আপস করবেন না।

এই টানাপোড়েন একপর্যায়ে সরাসরি স্পিকারকে অপসারণের উদ্যোগে গড়ায়।

১৯৫৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর স্পিকার আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ওঠে। প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর ২৩ সেপ্টেম্বর ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীর সভাপতিত্বে পরিষদের অধিবেশন বসে। এরপর যা ঘটেছিল, তা পাকিস্তান আমলের সংসদীয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা হয়ে আছে।

শাহেদ আলী যখন স্পিকারের চেয়ারে বসেন, বিরোধী সদস্যরা সেটি মেনে নেননি। উত্তপ্ত বিতর্ক দ্রুত হাতাহাতিতে গড়ায়। এরপর আর সংসদীয় বিতর্কের মধ্যে ঘটনাটি আটকে থাকেনি।

ছোড়া হতে থাকে কাগজপত্র, পেপারওয়েট, চেয়ার ও আসবাবের অংশ। মাইক্রোফোনের স্ট্যান্ডও ব্যবহৃত হয় অস্ত্র হিসেবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, একপর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী মাথায় গুরুতর আঘাত পান। তিনি রক্তাক্ত হয়ে পড়ে যান। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তৎকালীন ঘটনাবলি নিয়ে বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় আঘাতের ধরন ও সংঘর্ষের বিবরণে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে মূল ঘটনাটি নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে বড় ধরনের মতভেদ নেই: ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে ভয়াবহ সংঘর্ষে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী গুরুতর আহত হন এবং কয়েক দিন পর তার মৃত্যু হয়।

ঘটনাটি এতটাই নজিরবিহীন ছিল যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তা গুরুত্ব পায়।

তৎকালীন ‘Time’ ম্যাগাজিন ঘটনাটিকে ‘Death in the Chair’ শিরোনামে প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিষদে প্রথমে স্পিকার আব্দুল হাকিমকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী তার জায়গায় সভাপতিত্ব করতে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। তাকে মাথায় আঘাত করা হয় এবং তিনি গুরুতর আহত হন। দুই দিন পর তার মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে ‘বাংলাপিডিয়া’র তথ্য অনুযায়ী, শাহেদ আলীকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ঘটনার চতুর্থ দিন, ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ তিনি মারা যান।

প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী

আইনজীবী ও রাজনীতিক শাহেদ আলী ১৮৯৯ সালে চাঁদপুর জেলার মতলব থানার আশ্বিনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দর্শন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে তৎকালীন বঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

শাহেদ আলী ১৯২১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে দর্শনে বিএ (অনার্স) এবং ১৯২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯২৫ সালে তিনি বিএল ডিগ্রি লাভ করেন। পরের বছর, ১৯২৬ সালে, কুমিল্লা জেলা বারে আইনজীবী হিসেবে যোগ দেন।

১৯২৯ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক প্রজা পার্টিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে শাহেদ আলীর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এবং কুমিল্লা জেলা শাখার সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৫৩ সালে এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টি গঠিত হলে শাহেদ আলী তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনুসরণ করে দলটিতে যোগ দেন। তিনি কৃষক শ্রমিক পার্টির ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে শাহেদ আলী পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরের বছর, ১৯৫৫ সালে, তিনি পরিষদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে তিনি কৃষক শ্রমিক পার্টি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা শাহেদ আলী প্রায় তিন দশক ধরে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কৃষক প্রজা পার্টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল। বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য এবং পরবর্তীতে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

শেখ মুজিবের ভূমিকা নিয়ে যা বলা হয়েছিল?

শাহেদ আলীর মৃত্যুর পর তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিযোগ ওঠে, সংঘর্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভূমিকা ছিল। এসব অভিযোগের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের নামও আসে।

১৯৯৮ সালে এ বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হাশিমউদ্দিন আহমেদ (ময়মনসিংহ জেলার একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য) দাবি করেছিলেন, সংঘর্ষের সময় শেখ মুজিবের হাতে হান্টার ছিল এবং তিনি স্পিকারের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। পরে শাহেদ আলীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশ নিয়ে যায়।

তবে তার এই সাক্ষাৎকারটি ‘প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি ও পরবর্তী রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে’ উপস্থাপন করাই শ্রেয়। কেননা, ঘটনাটির দায় নির্ধারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের পরস্পরবিরোধী অভিযোগ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক সূত্রে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত বিষয় হলো, পরিষদে সংঘর্ষের মধ্যে শাহেদ আলী গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, কথাশিল্পী ও ভাষাসৈনিক অধ্যাপক শহীদ আলীর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই দিন পরিষদে উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে গ্যালারি থেকে ডেপুটি স্পিকার শহীদ আলীর দিকে খাতাপত্র ও ডাস্টার ছোড়া হয়। পরে পরিষদে ব্যাপক হট্টগোল ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন তাকে ধরে তার চেয়ারের দিকে নিয়ে যান। এরপর সশস্ত্র পুলিশ পরিষদকক্ষে প্রবেশ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। ঘটনার কয়েক দিন পর ডেপুটি স্পিকার শহীদ আলীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।

অধ্যাপক শহীদ আলীর দাবি, তিনি পুরো ঘটনাটি পরিষদকক্ষে উপস্থিত থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তার বর্ণনায়, ওই ঘটনার পর তৎকালীন শ্রমিক পার্টি সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে অভিযোগ তোলে। একই সঙ্গে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার কাছে পাঠানো এক টেলিগ্রামেও ঘটনার জন্য শেখ মুজিবকে দায়ী করা হয়েছিল।

তৎকালীন রাজনীতিতে অবশ্য শেখ মুজিবকে ঘিরে অভিযোগ থেমে থাকেনি। কৃষক শ্রমিক পার্টির পক্ষ থেকেও অভিযোগ তোলা হয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ আছে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের পক্ষ থেকেও অভিযোগের কথা পরবর্তী রাজনৈতিক লেখায় এসেছে।

আসল ইতিহাসটি কী?

ইতিহাসের দলিলগুলো অন্তত একটি বিষয়ে স্পষ্ট। ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে স্পিকার আব্দুল হাকিমকে ঘিরে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের সংঘাত চরমে পৌঁছেছিল। স্পিকারকে সরানোর রাজনৈতিক লড়াই, ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীর সভাপতিত্ব গ্রহণ এবং সেটিকে কেন্দ্র করে পরিষদে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। সেই সংঘর্ষে শাহেদ আলী গুরুতর আহত হন এবং ২৬ সেপ্টেম্বর মারা যান।

অর্থাৎ, সংসদে সম্প্রতি বলা ‘স্পিকারকে পিটিয়ে মারা হয়েছে’ কথাটির পেছনে রয়েছে একটি রক্তাক্ত ইতিহাস। ১৯৫৮ সালে আইনপ্রণেতাদের সংঘর্ষে সংসদকক্ষই পরিণত হয়েছিল সহিংসতার ময়দানে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনও জরুরি। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেছেন, ‘স্পিকারকে হত্যা করা হয়েছে’; এ তথ্য সত্য নয়। ১৯৫৮ সালে নিহত ব্যক্তি ছিলেন ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী। স্পিকার আব্দুল হাকিমের মৃত্যু হয়েছিল ১৯৬৮ সালে।

তাছাড়া, বর্তমান সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের বক্তব্যে ‘স্পিকার হত্যা’ বলা হলেও, ইতিহাসের নির্দিষ্ট ঘটনাটি ছিল ‘ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীর মৃত্যু’।


জাতীয় এর আরও খবর

img

অভিজাত এলাকায় বহুতল ভবনে ১৭০ ডিভাইস নিয়ে যা করতেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক

প্রকাশিত :  ১৫:৪৮, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:৫১, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে ছিল একটি বিদেশি চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির সদস্যরা আন্তর্জাতিক অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে তারা সংঘবদ্ধভাবে অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল প্রতারণা চালাত। পাশাপাশি মাদক কারবার, এটিএম জালিয়াতি, অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনা, স্বর্ণ চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িত ছিল চক্রটির সদস্যরা।

চট্টগ্রামের অভিজাত খুলশী এলাকার একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে এমন অপরাধী চক্রের ৬৩ জনকে গ্রেফতার করেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ১৭০টি ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।

এর মধ্যে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি অ্যাপল ট্যাব, একটি সিপিইউ, একটি স্যামসাং মনিটর, একটি কি-বোর্ড, একটি মাউস ও একটি প্রিন্টার উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি পেনড্রাইভ, চারটি সিমকার্ড, তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান এমপ্লয়মেন্ট কার্ডও উদ্ধার করা হয়।

বৃহস্পতিবার রাত ১১টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খুলশীর জালালাবাদের কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের ওই ভবনের অষ্টম তলায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও পুলিশের যৌথ অভিযানে তাদের আটক করা হয়।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, চীনের ৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শুক্রবার বিকালে দামপাড়া পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ। তবে চক্রটির মূলহোতাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশ এখন তাকে খুঁজছে।

পুলিশ জানায়, অপরাধী চক্রের কাছ থেকে ডিজিটাল প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত আসামিরা প্রায় দেড় মাস আগে খুলশী থানাধীন কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নাম্বার রোডের জনৈক দুবাই প্রবাসীর ১ নাম্বার বাড়িটি ভাড়া নিয়ে প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে আসছিল।

চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় অবস্থান করে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা ও অন্যান্য অনলাইন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। এছাড়াও বাংলাদেশে তাদের সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সহায়তা প্রদানকারী দেশীয় ও বিদেশি সহযোগী রয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পেরেছে। পুলিশ তাদের গ্রেফতারে মাঠে নেমেছে।

এছাড়া চক্রটি স্ক্যামিংয়ে জড়িত। স্ক্যামিং বলতে সাধারণ ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক বা অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল। প্রতারকরা ভুয়া পরিচয় ও মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলেন। কখনো লোভনীয় অফার, চাকরির প্রস্তাব, বিনিয়োগে অতিরিক্ত লাভের আশ্বাস কিংবা জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে অর্থ বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, মোবাইল ফোন, ভুয়া ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এসব প্রতারণার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

খুলশী এলাকার বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান, গত এক মাস ধরে আটতলা ওই ভবনে বিদেশি নাগরিকদের আনাগোনা ছিল। অবস্থান করা বিদেশিরা অনেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে পরিচয় দিতেন। পরে জানা যাচ্ছিল সেখানে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেনের পাশাপাশি ক্যাসিনোসদৃশ কার্যক্রম করছে। এসব তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ছিল। ডিভাইসগুলোতে আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগ কিংবা অনলাইন কার্যক্রমের কোনো তথ্য রয়েছে।

সিএমপির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, বৈধভাবে দেশে প্রবেশ করে অনেক বিদেশি নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তারা নানাভাবে ডিজিটাল প্রতারণা করছে। এসব প্রতারণার নেপথ্যে কিছু বিদেশি নাগরিক মূল পরিকল্পনাকারী হলেও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনে সহায়তা করছে স্থানীয় কিছু সহযোগী। বিদেশি চক্রগুলো হেরোইন, কোকেনসহ বিভিন্ন অপ্রচলিত মাদকের কারবার, জাল ডলার ব্যবসা, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইন ক্যাসিনো এবং মানবপাচারের মতো অপরাধেও বিদেশিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অনেককে গ্রেফতার করা হলেও পরে কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চীন, ভারত, নাইজেরিয়া, কেনিয়াসহ, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রবেশের পর কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের পাসপোর্ট নষ্ট করে ফেলে, যাতে তাদের প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বাসা কিংবা হোটেল ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলে অপরাধের ঘাঁটি।

সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানান, সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা যৌথ অভিযানে অনলাইন প্রতারণার বিভিন্ন ডিভাইসসহ ৬৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে জব্দকৃত ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।


জাতীয় এর আরও খবর