সাগর-রুনী হত্যার দুই দিন আগে রোকেয়া প্রাচীর কাছ থেকে নেওয়া হয় দুটি সিডি, কী ছিল এতে?
প্রকাশিত :
০৬:৩২, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন করে সামনে এসেছে দুটি সিডির তথ্য। তদন্তে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই দিন আগে সামরিক এক কর্মকর্তার নির্দেশে তাঁর এক সহকারী সাংস্কৃতিক কর্মী রোকেয়া প্রাচীর কাছ থেকে সিডি দুটি সংগ্রহ করেছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ওই সামরিক কর্মকর্তার নির্দেশে একজন সার্জেন্ট রোকেয়া প্রাচীর কাছ থেকে দুটি সিডি নিয়ে যান। এর দুই দিন পর, ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনী।
তবে ওই দুটি সিডিতে ঠিক কী ধরনের তথ্য বা নথি ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তকারীদের ধারণা, সিডিগুলোতে তৎকালীন বিডিআর হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, ডকুমেন্টারি বা নথি থাকতে পারে। সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওই সিডির কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও এখন যাচাই করা হচ্ছে।
সম্প্রতি অন্য একটি মামলার তদন্তে কল ডিটেইল রেকর্ড পর্যালোচনা করতে গিয়ে সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রোকেয়া প্রাচীর যোগাযোগের সম্ভাব্য তথ্য পাওয়ার কথা জানান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা।
তিনি জানান, পাওয়া তথ্য ও প্রমাণ সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর সাগর-রুনী হত্যা মামলার তদন্তকারীরা বিষয়টি যাচাই করবেন।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ওই সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং রোকেয়া প্রাচীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাঁদের যোগাযোগের সঙ্গে সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর সাগর ও রুনীর দুটি ল্যাপটপ এবং সাগরের মোবাইল ফোন নিখোঁজ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব ডিভাইস এখনো উদ্ধার হয়নি। অন্যদিকে রুনীর মোবাইল ফোন ও বাসায় থাকা মূল্যবান স্বর্ণালংকার অক্ষত ছিল। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে এসব বিষয়ও নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্পর্কের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যোগাযোগ, সিডি এবং নিখোঁজ ডিভাইসসহ প্রতিটি বিষয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা হবে।
সাগর-রুনী হত্যা মামলা বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তাধীন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন জানিয়েছে, অন্য মামলার তদন্তে পাওয়া সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য পিবিআইকে দেওয়া হবে।
অভিজাত এলাকায় বহুতল ভবনে ১৭০ ডিভাইস নিয়ে যা করতেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক
প্রকাশিত :
১৫:৪৮, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ১৫:৫১, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে ছিল একটি বিদেশি চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির সদস্যরা আন্তর্জাতিক অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে তারা সংঘবদ্ধভাবে অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল প্রতারণা চালাত। পাশাপাশি মাদক কারবার, এটিএম জালিয়াতি, অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনা, স্বর্ণ চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িত ছিল চক্রটির সদস্যরা।
চট্টগ্রামের অভিজাত খুলশী এলাকার একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে এমন অপরাধী চক্রের ৬৩ জনকে গ্রেফতার করেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ১৭০টি ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।
এর মধ্যে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি অ্যাপল ট্যাব, একটি সিপিইউ, একটি স্যামসাং মনিটর, একটি কি-বোর্ড, একটি মাউস ও একটি প্রিন্টার উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি পেনড্রাইভ, চারটি সিমকার্ড, তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান এমপ্লয়মেন্ট কার্ডও উদ্ধার করা হয়।
বৃহস্পতিবার রাত ১১টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খুলশীর জালালাবাদের কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের ওই ভবনের অষ্টম তলায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও পুলিশের যৌথ অভিযানে তাদের আটক করা হয়।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, চীনের ৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার বিকালে দামপাড়া পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ। তবে চক্রটির মূলহোতাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশ এখন তাকে খুঁজছে।
পুলিশ জানায়, অপরাধী চক্রের কাছ থেকে ডিজিটাল প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত আসামিরা প্রায় দেড় মাস আগে খুলশী থানাধীন কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নাম্বার রোডের জনৈক দুবাই প্রবাসীর ১ নাম্বার বাড়িটি ভাড়া নিয়ে প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে আসছিল।
চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় অবস্থান করে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা ও অন্যান্য অনলাইন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। এছাড়াও বাংলাদেশে তাদের সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সহায়তা প্রদানকারী দেশীয় ও বিদেশি সহযোগী রয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পেরেছে। পুলিশ তাদের গ্রেফতারে মাঠে নেমেছে।
এছাড়া চক্রটি স্ক্যামিংয়ে জড়িত। স্ক্যামিং বলতে সাধারণ ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক বা অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল। প্রতারকরা ভুয়া পরিচয় ও মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলেন। কখনো লোভনীয় অফার, চাকরির প্রস্তাব, বিনিয়োগে অতিরিক্ত লাভের আশ্বাস কিংবা জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে অর্থ বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, মোবাইল ফোন, ভুয়া ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এসব প্রতারণার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
খুলশী এলাকার বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান, গত এক মাস ধরে আটতলা ওই ভবনে বিদেশি নাগরিকদের আনাগোনা ছিল। অবস্থান করা বিদেশিরা অনেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে পরিচয় দিতেন। পরে জানা যাচ্ছিল সেখানে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেনের পাশাপাশি ক্যাসিনোসদৃশ কার্যক্রম করছে। এসব তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ছিল। ডিভাইসগুলোতে আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগ কিংবা অনলাইন কার্যক্রমের কোনো তথ্য রয়েছে।
সিএমপির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, বৈধভাবে দেশে প্রবেশ করে অনেক বিদেশি নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তারা নানাভাবে ডিজিটাল প্রতারণা করছে। এসব প্রতারণার নেপথ্যে কিছু বিদেশি নাগরিক মূল পরিকল্পনাকারী হলেও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনে সহায়তা করছে স্থানীয় কিছু সহযোগী। বিদেশি চক্রগুলো হেরোইন, কোকেনসহ বিভিন্ন অপ্রচলিত মাদকের কারবার, জাল ডলার ব্যবসা, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইন ক্যাসিনো এবং মানবপাচারের মতো অপরাধেও বিদেশিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অনেককে গ্রেফতার করা হলেও পরে কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চীন, ভারত, নাইজেরিয়া, কেনিয়াসহ, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রবেশের পর কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের পাসপোর্ট নষ্ট করে ফেলে, যাতে তাদের প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বাসা কিংবা হোটেল ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলে অপরাধের ঘাঁটি।
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানান, সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা যৌথ অভিযানে অনলাইন প্রতারণার বিভিন্ন ডিভাইসসহ ৬৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে জব্দকৃত ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।