img

ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা

প্রকাশিত :  ০৬:১২, ২২ অক্টোবর ২০২৬

ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা

বিনিয়োগের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ক্রমাগত বাড়ছে। গত আগস্ট শেষে এর পরিমাণ বেড়ে প্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গত জুনে প্রথমবারের মতো চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। উদ্বৃত্ত এই অর্থের বড় অংশ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকারকে ঋণ দিতে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে ব্যাংকগুলো।

উদ্বৃত্ত তারল্য মানেই অলস অর্থ নয়। আমানত থেকে কোনো ব্যাংকের বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) সংরক্ষণের পর বাকি অর্থ উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংকের মোট আমানতের ১৩ শতাংশ এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের ৪ শতাংশ  এসএলআর রাখতে হয়। বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে যা রাখার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দুই ধরনের ব্যাংকের নগদ জমা অনুপাত (সিআরআর) রাখতে হয় আরও ৪ শতাংশ।

ব্যাংকাররা জানান, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এখন আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না। আবার খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপের কারণে ঋণ বিতরণে সতর্কতা দেখাচ্ছে ভালো ব্যাংকগুলো। যে কারণে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণপ্রবৃদ্ধি  ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমেছে, যা  আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে কম। এ সময়ে ঝুঁকিমুক্ত বিবেচনায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ঋণ দেওয়ায় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে ব্যাংকগুলো। যে কারণে দীর্ঘদিন দুই অঙ্কে থাকা বিল ও বন্ডের সুদহার অনেক কমেছে।

ব্যাংকাররা আরও জানিয়েছেন, কয়েকটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরত দিতে না পারায় মানুষের হাতে টাকা রাখার প্রবণতা ব্যাপক বেড়ে যায়। এখন আবার ঘরের টাকা ব্যাংকে ফিরছে। তবে এই অর্থ আসছে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংকে। ভালো ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম সুদ দিলেও যথাসময়ে টাকা ফেরতের প্রত্যাশা থেকে সেখানেই রাখছে বেশির ভাগ মানুষ। তবে গ্রাহকের স্বর্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি ঋণ ও আমানতে মধ্যেকার সুদহারের সর্বোচ্চ ব্যবধান (স্প্রেড) ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। যদিও অনেক ব্যাংক এই নির্দেশনা পালন করছে না। তারা এ ক্ষেত্রে প্রচলিত হিসাব পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে  আলোচনা করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। আগের মাস জুলাই শেষে যা ছিল চার লাখ ২৩ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। গত জুনে ছিল চার লাখ ১৪ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল তিন লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল এক লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। 

পরিসংখ্যান বলছে, কম সুদের ঋণেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যাংকাররা। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে কম সুদে ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এ তহবিল থেকে গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। এই প্যাকেজের আওতায় বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাজে গতিশীলতা আনা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, সবুজ কারখানা রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি এবং হিমায়িত চিংড়ি এসব খাতের ১০ হাজার টাকার তহবিল থেকে এক টাকাও বিতরণ হয়নি।


img

ছয় গ্রুপের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকারের নতুন উদ্যোগ

প্রকাশিত :  ০৮:২১, ২১ অক্টোবর ২০২৬

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারে ফৌজদারি তদন্তের পাশাপাশি দেওয়ানি আইনি কার্যক্রম জোরদার করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাথমিকভাবে ছয়টি বড় ঋণগ্রহীতা গ্রুপের বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো। এ ক্ষেত্রে সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হলেই পারিশ্রমিক দেওয়ার ‘নো রিকভারি, নো ফি’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ব্যাংক খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা ও অনুসন্ধানে যৌথ তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়। নতুন দুদক কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ উদ্ধার কার্যক্রমে গতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অপরাধের তদন্তের পাশাপাশি বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, সংরক্ষণ ও ফেরত আনার উদ্যোগ চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স (এআরটিএফ) এই কার্যক্রম সমন্বয় করছে। বিএফআইইউ টাস্কফোর্সকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে। এতে দুদক, সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল এবং কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে এস আলম, বেক্সিমকো, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপকে দেওয়ানি কার্যক্রমের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এসব গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ১২ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪২টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি তথ্য অনুযায়ী, ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ পর্যায়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।বাংলাদেশ অর্থনীতি

ব্যাংকগুলো ছয়টি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। আটটি ব্যাংক এসব কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই পর্যন্ত ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। সম্পদ অনুসন্ধান ও আইনি কার্যক্রমে গ্র্যান্ট থর্নটন, বেকার ম্যাকেঞ্জি, পিডব্লিউসি, ডিএল পাইপার, ক্রোল, ইওয়াই ও ডেন্টনসের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এ উদ্যোগে আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট পর্যন্ত আদালতের আদেশে দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ সংযুক্ত, জব্দ বা অবরুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশে স্থাবর সম্পদ ১০ হাজার ৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। বিদেশে স্থাবর সম্পদ ১৫ হাজার ১২৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

এসব সম্পদের মধ্যে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, ট্রাস্ট ও বিনিয়োগ তহবিল রয়েছে। তবে সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া মানেই অর্থ দেশে ফেরত এসেছে—এমন নয়। সম্পদের অবস্থান শনাক্ত, মালিকানা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সম্পদ পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগে ১৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টিতে অভিযোগপত্র দাখিল এবং ছয়টিতে আদালতের রায় হয়েছে। মামলাগুলোতে ৭৬২ জনের বেশি সাক্ষী অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশে পালানো বা সম্পদ সরিয়ে নেওয়া ঠেকাতে ১৫৮ জনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ১০ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির জন্য আদালতের আদেশও নেওয়া হয়েছে।

বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও ফেরত আনতে ১৬টি বিচারব্যবস্থার কাছে ৩০টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া, হংকং ও চীনের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সম্ভাব্য সম্পদ অনুসন্ধানের গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ডসহ ১২টি দেশকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, আন্তর্জাতিক তদন্তকারী ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন ও মূল্য শনাক্ত করছে। সম্পদ শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী তা জব্দ বা অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে আদালতের নির্দেশে সম্পদ বিক্রি বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে অর্থ দেশে ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।বাংলাদেশ অর্থনীতি

দুদকের পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, যৌথ তদন্ত দলের কার্যক্রম তদারক করা হচ্ছে এবং কোনো মামলা বা অনুসন্ধান বন্ধ নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরত আনা দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। সম্পদ শনাক্তকরণ, মালিকানা যাচাই এবং বিদেশি বিচারব্যবস্থার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।

অর্থনীতি এর আরও খবর