img

ভরা মৌসুমেও উৎপাদন কম খাসিয়া পানের, বিপাকে চাষিরা

প্রকাশিত :  ০৭:২৭, ১৫ আগষ্ট ২০২৩

 ভরা মৌসুমেও উৎপাদন কম খাসিয়া পানের, বিপাকে চাষিরা

বর্ষাকাল হচ্ছে খাসিয়া পান উৎপাদনের ভরা মৌসুম। সাধারণত একটি পানগাছ থেকে অন্য সময়ে যে পরিমাণ পান তোলা হয়, বর্ষা মৌসুমে সে গাছ থেকেই অন্য সময়ের তুলনায় দেড় থেকে দুই গুণ বেশি পান পাওয়া যায়। কিন্তু এ বছর খরার প্রভাবে পান উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। যে পান পাওয়া যাচ্ছে তাও আকারে অনেক ছোট।

জানা যায়, অনাবৃষ্টির কারণে পানের উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের মতো বাড়েনি। এতে পান চাষের ওপর নির্ভরশীল খাসিয়া পানপুঞ্জির (আদিবাসী গ্রাম) বাসিন্দারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

আদিবাসী সংগঠন খাসি সোশ্যাল কাউন্সিল ও পুঞ্জি সূত্রে জানা গেছে, অন্য সময় একটি পানজুম থেকে প্রতিদিন তিন কুড়ি পান তোলা গেলেও, জুন থেকে আগস্ট—এই ভরা মৌসুমে পাঁচ কুড়ি পান তোলা যায়। ২০ কান্তায় এক কুড়ি। এক কান্তায় ১৪৪টি পান থাকে। এবার ভরা মৌসুমে পানের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এদিকে এবার এক কুড়ি পানের (২৮৮০টি পান) দাম অন্য বছরের মতোই ৮০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা। কিন্তু দাম থাকলেও পান উৎপাদন কম হওয়ায় চাষিদের লাভ হচ্ছে না।

মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ছোট-বড় ৭৩টি পুঞ্জি আছে। এসব পুঞ্জিতে আদিবাসী খাসি (খাসিয়া) লোকজন বসবাস করেন। বৃহত্তর সিলেটে আছে মোট ৮৩টি পুঞ্জি। ৮৩টি পুঞ্জিতে প্রায় ৩০ হাজার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লোকজনের বাস। খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান উৎসই হচ্ছে খাসিয়া পানচাষ।

খাসিয়া পানচাষিরা বলেন, পাহাড়ি টিলাভূমিতে পর্যাপ্ত সেচসুবিধা নেই। এই পান চাষ পুরোটাই প্রকৃতি-নির্ভর। মৌসুমি বৃষ্টির ওপর চাষিদের নির্ভর করতে হয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না তাঁদের। বৃষ্টি না হলে পান উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়ে। এ বছর খাসিয়া পান উৎপাদন অনাবৃষ্টির কবলে পড়েছে। দীর্ঘ খরার কারণে সময়মতো পানগাছের পরিচর্যা করা সম্ভব হয়নি। পানগাছ পরিচর্যার সময় হচ্ছে জুন থেকে আগস্ট মাস। এই সময় পান উৎপাদনেরও ভরা মৌসুম। অনেক দেরিতে বৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পান উৎপাদনে। চক্রাকারে একটি পান গাছ থেকে এক থেকে দেড় মাস পরপর একবার পান তোলা হয়ে থাকে। এবার সেটা সম্ভব হচ্ছে না। একটি পানগাছ থেকে পান তুলতে দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত বিরতি দিতে হবে। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় পানের উৎপাদন কম হচ্ছে। পানচাষিরা আরও বলেন, শুধু পান উৎপাদনই কমেনি, পানপাতার আকারও ছোট হচ্ছে। পানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটছে না। বাজারে বড় পানের চাহিদা বেশি। বড় পান হলে যে দাম পাওয়া যেত, ছোট পানে সেই দাম পাওয়া যায় না।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির পানচাষি শামিম পামথেত বলেন, খরার কারণে সঠিক সময়ে গাছে পান আসেনি। এখন পানের ভরা মৌসুম। এখনো বৃষ্টি খুবই কম হচ্ছে। বৃষ্টি না হলে পুরোপুরি পান তোলা যায় না, পরিচর্যা করা যায় না।

আরেক পানচাষি জেসি পতমী বলেন, পানগাছ থেকে নতুন চারা কাটাকে বলা হয় ‘বুট টাং’। এবার খুব কমই চারা কাটা হচ্ছে। এখন গাছ পরিচর্যার মৌসুম। এ মৌসুমে একটি পানজুমে (পানখেত) প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমিকের খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়ছে। যেসব গাছ রোগাক্রান্ত হয় বা মরে যায়, সেগুলো পাল্টে পুনরায় চারা লাগানো হয়। এবার অনেক জুমেই চারা রোপণ করা হচ্ছে না। এতে আগামী মৌসুমেও পান উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। গত বছর ভরা মৌসুমে খাসিয়া পানের বৃহৎ বাজার সিলেট ও সুনামগঞ্জে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হয়েছিল। বন্যার কারণে পানের চাহিদা কমে যায়। পানের প্রকৃত দাম পাননি পানচাষিরা। এবার খরায় পান উৎপাদন কমেছে। ধারাবাহিক আর্থিক লোকসানে রয়েছেন খাসিয়া পানচাষিরা। এ ক্ষেত্রে সরকার থেকে খাসিয়া পানচাষিদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এই চাষি।

খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সভাপতি ও মাগুরছড়া পুঞ্জির মান্ত্রী (সমাজপ্রধান) জিডিশন প্রধান সুছিয়াং বলেন, পানচাষ খুব সতর্কভাবে ও যত্ন নিয়ে করতে হয়। অনাবৃষ্টিতে পান পরিচর্যায় দেরি হয়ে গেছে। এতে পানের উৎপাদন কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। খাসিয়ারা পানের ওপরই নির্ভর করে থাকেন। পান উৎপাদন কম হওয়ায় কমবেশি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

ভারতে ভারী বৃষ্টি, সিলেটে বন্যার শঙ্কা

প্রকাশিত :  ০৬:১৫, ২৭ মে ২০২৬

সিলেটে কদিন ধরেই টানা বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ভারী বৃষ্টি হচ্ছে সিলেটের উজানের ভারতের মেঘালয় রাজ্যেও। ফলে ঢল নেমে বাড়ছে সিলেটের নদ-নদীর পানি। এ অবস্থায় সিলেটে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে বন্যা হলেও এটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

মেঘালয়ের দৈনিক আবহাওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যটির বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে সোহরা (চেরাপুঞ্জি) এলাকায় ৭২ দশমিক ২ মিলিমিটার। শিলংয়ে ২১ দশমিক ৬ মিলিমিটার এবং বারাপানিতে ১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

ভৌগলিকভাবে মেঘালয়ের সোহরা ও খাসি পাহাড়ি অঞ্চলের টানা বৃষ্টি সিলেটের নদ-নদী ব্যবস্থার জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উজান থেকে নেমে আসা পানি সুরমা, কুশিয়ারা ও অন্যান্য পাহাড়ি নদীর প্রবাহ দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা স্বল্প সময়ে আকস্মিক বন্যার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

সেখানের আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৬ ও ২৭ মে মেঘালয়ের অধিকাংশ এলাকায় মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়াসহ বজ্রপাত এবং ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ২৮ ও ২৯ মে পর্যন্তও বিভিন্ন এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

অন্যদিকে গেল ২৪ ঘণ্টায় সিলেট জেলায় সর্বোচ্চ ১১১ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। তাছাড়া জেলা ভিত্তিক পাউবোর দেয়া তথ্যানুযায়ী, হবিগঞ্জে ৮২ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জে ৬৫ মিলিমিটার এবং মৌলভীবাজারে ৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

এদিকে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুর ৩টার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সিলেট জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ক্রমাগত বেড়েই চলতেছে। সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি ১১ দশমিক শূন্য মিটার রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৭৫ মিটার। একই নদীর সিলেট পয়েন্টে পানি ৮ দশমিক ৪৭ মিটার, বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮০ মিটার। কুশিয়ারা নদীর অমলশীদ পয়েন্টে পানি ১২ দশমিক ৬৪ মিটার, বিপৎসীমা ১৫ দশমিক ৮০ মিটার। শেওলা পয়েন্টে পানি ১০ দশমিক ৪৩ মিটার, বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ০৫ মিটার। ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি ৮ দশমিক ৬১ মিটার, বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮৫ মিটার। শেরপুর পয়েন্টে পানি ৭ দশমিক ৪৮ মিটার, বিপৎসীমা ৮ দশমিক ৫৫ মিটার। সারিগোয়াইন নদীর সারিঘাট পয়েন্টে পানি ৮ দশমিক ৯০ মিটার, বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৩৫ মিটার। পিয়াইন নদীর জাফলং পয়েন্টে পানি ৮ দশমিক ১০ মিটার, বিপৎসীমা ১৩ দশমিক শূন্য মিটার। গোয়াইনঘাট পয়েন্টে পানি ৭ দশমিক ৮৬ মিটার, বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮২ মিটার। লোভাছড়া নদীর লোভাছড়া পয়েন্টে পানি ১১ দশমিক ৪২ মিটার এবং ধলা নদীর ইসলামপুর পয়েন্টে পানি ৭ দশমিক ২৯ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও আবহাওয়া কর্মকর্তারা বলছেন, উজানের মেঘালয় থেকে নেমে আসা ঢল এবং সিলেটের অভ্যন্তরীণ ভারি বৃষ্টি একসঙ্গে মিলিত হলে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে সিলেটের সীমান্তবর্তী নিচু এলাকা, হাওরাঞ্চল এবং নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল মুঈদ বলেন, সিলেটে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকবে এবং উজানের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পানির কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২৬ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টির পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বজ্রপাত ও দমকা হাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।

এছাড়া সিলেট পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ দাস বলেন, ভারতের উজানের ভারি বৃষ্টিপাতের জন্য পাহাড়ি ঢল সিলেট অঞ্চলের নদীগুলোতে এসে পড়ছে, তাছাড়া সিলেটেও টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এতে করে যদি ‍উজানে ঢল আর বৃষ্টিপাত চলমান থাকে তাহলে সিলেটে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা রয়েছে।

তিনি জানান, আকস্মিক বন্যা হলেও এটি হবে স্বল্পমেয়াদি, পানি নেমে যাবে খুব দ্রুতই।

সিলেটের খবর এর আরও খবর