সংগ্রাম দত্ত: নিঝুম রাত। সবাই যখন ঘুমের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই শ্রীমঙ্গলের একটি চারতলা ভবনের বাসায় দেখা মিলল অদ্ভুত এক অতিথির। প্রথমে কেউ বুঝতে পারেননি প্রাণীটি কী। পরে ভালোভাবে দেখে চমকে ওঠেন পরিবারের সদস্যরা— সেটি ছিল বিরল প্রজাতির একটি লজ্জাবতী বানর।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও চৌমুহনা এলাকার বাসিন্দা সফেদ মিয়ার ভবন থেকে প্রাণীটিকে উদ্ধার করা হয়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাসার ভেতরে হঠাৎ অস্বাভাবিক নড়াচড়া টের পান তারা। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর চোখে পড়ে বড় বড় চোখের শান্ত স্বভাবের একটি প্রাণী। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেটি একটি লজ্জাবতী বানর।
ঘটনার বিষয়টি স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী কাজী গোলাম কিবরিয়া জুয়েলকে জানানো হলে তিনি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে মঙ্গলবার সকালে সংগঠনটির পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সতর্কতার সঙ্গে প্রাণীটিকে উদ্ধার করেন।
উদ্ধারকারীদের ধারণা, রাতের আঁধারে ভবনের সেনেটারি পাইপ বেয়ে উপরে উঠে বাসার ভেতরে ঢুকে পড়ে প্রাণীটি। পরে সেটিকে শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা জানান, লজ্জাবতী বানর অত্যন্ত শান্ত ও নিশাচর প্রাণী। বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং খাদ্য সংকটের কারণে এসব প্রাণী এখন মাঝেমধ্যে লোকালয়ে চলে আসছে। সাধারণত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হবিগঞ্জের সাতছড়ি ও রেমা-কেলেঙ্গা বনাঞ্চলে এদের বিচরণ দেখা যায়।
প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলে এমন বিরল প্রাণীর উপস্থিতি যেমন কৌতূহল তৈরি করেছে, তেমনি বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আবার সামনে এনে দিয়েছে।
২০ মে ১৯২১: “মুল্লুকে চল” — চা শ্রমিকদের রক্তে লেখা এক বিস্মৃত ইতিহাস
প্রকাশিত :
০৯:১৪, ২০ মে ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ০৯:১৬, ২০ মে ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: বাংলার ইতিহাসে অনেক আন্দোলনের কথা উচ্চারিত হয়, কিন্তু চা শ্রমিকদের “মুল্লুকে চল” আন্দোলন আজও প্রাপ্য গুরুত্ব পায়নি। ১৯২১ সালের ২০ মে চাঁদপুরে সংঘটিত চা শ্রমিক হত্যাকাণ্ড শুধু একটি গণহত্যাই ছিল না, এটি ছিল উপনিবেশিক শোষণ ও শ্রমিক নির্যাতনের নির্মম প্রতিচ্ছবি। শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও সেই ইতিহাস এখনো অনেকাংশে বিস্মৃত, অথচ চা শিল্পের ভিত গড়ে উঠেছিল যাদের রক্ত-ঘামে, তাদের কাহিনি আজও অসমাপ্ত।
পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে চীন ছাড়া পৃথিবীর কোথাও চায়ের প্রচলন ছিল না। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে চা চাষ শুরু করে ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালিনীছড়া চা বাগানে। এরপর বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে একের পর এক চা বাগান গড়ে ওঠে। শ্রমিকের চাহিদা পূরণে উড়িষ্যা, বিহার, উত্তর প্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দরিদ্র মানুষদের আনা হয় নানা প্রলোভন দেখিয়ে। বলা হয়েছিল— “গাছ হিলেগা, রুপিয়া মিলেগা”। কিন্তু বাস্তবে অপেক্ষা করছিল অমানবিক শ্রম, নির্যাতন ও দাসত্বের জীবন।
ঘন জঙ্গল পরিষ্কার, পাহাড় কেটে বাগান তৈরি এবং দিনের পর দিন অমানুষিক পরিশ্রমে অসংখ্য শ্রমিক প্রাণ হারান। চা বাগানগুলো হয়ে ওঠে একেকটি বন্দিশালা। শ্রমিকদের উপর চলে শারীরিক নির্যাতন, মজুরি বঞ্চনা এবং স্বাধীন চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা।
এই শোষণের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে ক্ষোভ জমতে থাকে শ্রমিকদের মধ্যে। চা শ্রমিক নেতা পণ্ডিত গঙ্গাচরণ দীক্ষিত ও পণ্ডিত দেওসরনের নেতৃত্বে শুরু হয় “মুল্লুকে চল” আন্দোলন। অর্থাৎ— “নিজ দেশে ফিরে চল”।
১৯২১ সালের ১ মে আদমপুরে অনুষ্ঠিত এক গোপন সভায় শ্রমিকরা সংগঠিত হতে শুরু করেন। সেখানে পুরুষ শ্রমিকদের দৈনিক আট আনা এবং নারী শ্রমিকদের ছয় আনা মজুরির দাবি ওঠে। একই সঙ্গে দানা বাঁধতে থাকে বাগান ছাড়ার সিদ্ধান্ত।
এরপর ৩ মার্চ আনিপুর চা বাগান থেকে প্রায় ৭৫০ শ্রমিক পরিবার-পরিজন নিয়ে “গান্ধী কা জয়” ধ্বনি তুলে স্বদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। দ্রুত এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন বাগানে। হাজার হাজার শ্রমিক দলে দলে বাগান ছাড়তে শুরু করেন। প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৪৪ ধারা জারি করে, পথে পথে পুলিশ ও সর্দার মোতায়েন করা হয়। তবুও শ্রমিকদের স্রোত থামানো যায়নি।
প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে চা বাগান ত্যাগ করেন। তারা করিমগঞ্জ হয়ে সিলেটে এসে জড়ো হন। উদ্দেশ্য ছিল রেলপথে চাঁদপুর হয়ে নিজ নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসনের নির্দেশে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে শ্রমিকদের পরিবহন করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এই দুর্দিনে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান কংগ্রেস নেতা শ্রীশ চন্দ্র দত্ত, এডভোকেট কামিনী কুমার চন্দসহ বহু রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব। মানুষের কাছ থেকে চাল ও অর্থ সংগ্রহ করে অভুক্ত শ্রমিকদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। জাতীয় বিদ্যালয়ে তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়। রেললাইনভিত্তিক বিভিন্ন সাহায্য কমিটি গঠন করে শ্রমিকদের যাত্রা সহায়তা করা হয়।
অবশেষে হাজার হাজার শ্রমিক রেললাইন ধরে হেঁটে চাঁদপুরে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে অপেক্ষা করছিল ইতিহাসের এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।
১৯২১ সালের ২০ মে রাতে চাঁদপুর রেলওয়ে ইয়ার্ডে তিন থেকে চার হাজার শ্রমিক অবস্থান করছিলেন। গভীর রাতে গুর্খা রেজিমেন্টের সৈন্যরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। ক্লান্ত-অবসন্ন শ্রমিকরা তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। কমিশনার কেসি দে’র নির্দেশে হঠাৎ ঘুমন্ত শ্রমিকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ওঠে আর্তচিৎকারে। অসংখ্য শ্রমিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। অনেক লাশ গোপনে মেঘনা নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে জানা যায়। ইতিহাসের পাতায় এটি চাঁদপুর চা শ্রমিক গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে আজও যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।
যারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, তারা বাধ্য হয়ে আবার ফিরে যান সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও করিমগঞ্জের চা বাগানে। তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে শ্রমিকদের গলায় বাগানের নাম লেখা ট্যাগ ঝুলিয়ে দেওয়া হতো, যাতে ট্রেনে উঠলেই সহজে শনাক্ত করে নামিয়ে দেওয়া যায়।
ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে, পাকিস্তান পর্ব পেরিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু চা শ্রমিকদের ভাগ্যের খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। এখনো তারা ভূমির অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক জীবনযাত্রা থেকে বঞ্চিত। শতবর্ষ আগে যে বঞ্চনার বিরুদ্ধে তারা “মুল্লুকে চল” আন্দোলনে নেমেছিলেন, তার অনেক দাবিই আজও অপূর্ণ।
২০ মে’র এই গণহত্যা কেবল অতীতের কোনো ঘটনা নয়; এটি আমাদের শ্রমিক ইতিহাসের রক্তাক্ত দলিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটির স্বীকৃতি, শহীদ শ্রমিকদের স্মরণ এবং চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।