প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা দুর্গম ও সীমান্তবর্তী পাহাড়ে এলাকা বড়লেখা উপজেলার বোবারথল
প্রকাশিত :
০৫:২৭, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪
সংগ্রাম দত্ত: বোবারথল- প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা আর লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা সীমান্ত ঘেষা এক দুর্গম নিরিবিলি পাহাড়ি জনপদের নাম। দুর্গম এই পাহাড়ি জনপদ এখনও আধুনিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী একটি পাহাড়ি জনপদ \'বোবারথল\'।
১০টি পাহাড়ি গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত দুর্গম বোবারথল জনপদের বাসিন্দাদের মনে যুগ যুগ ধরে শান্তির কোন সুবাতাস নেই। নেই আধুনিক জীবনযাত্রার লেশমাত্র।
বর্তমান আধুনিক জীবন ব্যবস্থা থেকে পিছিয়ে রয়েছে পাহাড়ি এ জনপদের বাসিন্দারা।
বড়লেখা উপজেলা সদর থেকে বোবারথল গ্রামে যেতে হলে ৮ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়। আর এ পথে পেরোতে হবে ১২টি সুউচ্চ টিলা। যার প্রত্যেকটির উচ্চতা সমতল ভূমি থেকে ৩শ\' থেকে ৪শ\' ফুট।
কোন কোন টিলা আবার একেবারে খাড়া। টিলার চুড়ায় ওঠতে একটু বেখেয়াল হলে ঘটতে পারে মারাত্মক দূর্ঘটনা। মাঝে-মধ্যে রয়েছে ঘন ঝোপ। এর ওপর রয়েছে বিষধর সাপ, বন বিড়াল, পাহাড়ি কুকুর, ভাল্কুক-উল্লকসহ নানা জাতের হিংস্র বন্যপ্রাণীর উৎপাত।এসব ঝক্কি-ঝামেলা নিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বোবারথল গ্রামের বাসিন্দারা পারতপক্ষে শহরের পথ মাড়ান না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে বোবারথল দুর্গম পাহাড়ে মানুষের বসবাস সম্ভব তা ছিল কল্পনারও অতীত।
ঘন জঙ্গলে পা পড়েনি কোন জনমানুষের। বোবারথল ও এর আশপাশের এলাকা ছিল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল।এ পাহাড়ে যাতায়াতের কোন পথ নেই। সেটি ছিল সমতল ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বিপ।
উঁচুনিচু টিলা,আঁকাবাকা রাস্তা আর পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে গ্রামটিতে যেতে হয়। এখানে আছে ছবির মত সাজানো গোছানো গান্দাই খাসিয়া পুঞ্জি। যা ভ্রমণপিপাসুদের নজর কাড়ে । গান্দাই খাসিয়া পুঞ্জির সবাই খুবই আন্তরিক। তাদের আথিতেয়তা মুগ্ধ হবার মতো।
বড়লেখা উপজেলা শহর থেকে সিএনজি করে ছোটলেখা বাজার ও পরে ছোটলেখা বাজার থেকে বোবারথল পাহাড়ে এলাকায় পৌঁছতে হয়।
হারিয়ে যাচ্ছে শ্রীমঙ্গলের প্রাণরেখা গোপলা নদী, ভরাট আর অবহেলায় মৃতপ্রায় এক ঐতিহাসিক জলপথ
প্রকাশিত :
১০:২৫, ০৯ মে ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: এক সময় যেখানে স্টিমার-জাহাজ চলত, আজ সেখানে জন্মেছে ধানক্ষেত। কোথাও কচুরিপানার স্তূপ, কোথাও শুকনো মাটি। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার একমাত্র নদী গোপলা এখন যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ লড়াই করছে।
চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন, ভূনবীর, মির্জাপুর ও সদর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত গোপলা নদী একসময় ছিল খরস্রোতা ও প্রাণচঞ্চল। বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা পানি এই নদী দিয়েই প্রবাহিত হয়ে হাইল হাওড়ে গিয়ে মিলত। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কৃষি, মৎস্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ জনপদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপে আজ সেই নদী প্রায় মৃত।
ইতিহাস বলছে, বিলাশছড়া ও উদনাছড়া মতিগঞ্জ এলাকায় এসে মিলিত হওয়ার পর নদীটি ‘গোপলা’ নাম ধারণ করে। একসময় এ নদীপথে স্টিমার ও জাহাজ চলাচল করত। চা বাগানের মালামাল এবং ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন হতো এই নদীপথে। নদীর তীরে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য নির্মিত জেটির স্মৃতি এখনও বহন করছে সদর ইউনিয়নের ‘জেটি রোড’ নামের এলাকা।
কিন্তু সেই নদীর আজ করুণ দশা। সরেজমিনে জিলাদপুর ও উত্তর উত্তরসুর এলাকায় দেখা গেছে, রাবারড্যামের পর থেকে গোপলা নদী তার পুরোনো গতিপথ হারিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গরুরদ্বারা হয়ে সেই পানি হাইল হাওড়ে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নদীর মূল অংশ প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
কোথাও নদীর বুক শুকিয়ে ফেটে গেছে, কোথাও কচুরিপানায় ঢেকে আছে জলপথ। আবার কোথাও নদীর জমি দখল করে তৈরি হয়েছে মাছের খামার, বসতবাড়ি কিংবা ধানক্ষেত। এমনকি কোনো কোনো স্থানে নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে চলাচলের রাস্তা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদী দখল ও ভরাট চললেও তা রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একইভাবে নদী খনন করে পুরোনো গতিপথ ফিরিয়ে আনতেও নেওয়া হয়নি কোনো বড় প্রকল্প।
এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মানিক সরকার বলেন,
“প্রায় ত্রিশ বছর আগে নদীর গতিপথ বদলে যায়। এরপর থেকেই অনেক মানুষ জমি হারিয়েছেন। নদীর দুই পাশের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমি এখন অনাবাদি পড়ে থাকে।”
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা কবির মিয়া জানান,
“রাবারড্যাম থেকে কালেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নদী এখন মৃত। এর প্রভাব পড়েছে হাওড়ের বিলগুলোতে। দিঘালীয়াবিল, রাতারবিল, কুঞ্জবেরী, ঘোড়ামারা, আগুড়া, কুচবিল, চণ্ডীবিল, ছড়াডুবা, ধইলডুবাবিল, পাত্রবেরী ও নাইফতাডুবাবিল ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের পথে রয়েছে ডুমরবিল ও বাধাইবিল।”
তার মতে, নদীটি পুনঃখনন করে পুরোনো গতিপথ ফিরিয়ে আনা গেলে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরতে পারে হাওড়াঞ্চলে।
মতিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা বলাল আহম্মেদ বলেন,
“নদীর নতুন গতিপথের কারণে আমার প্রায় বারো বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। বর্তমানে নদীটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এর প্রশস্ততাও কমে গেছে। পুরোনো গতিপথ খনন করা গেলে নদী আবার নাব্য ফিরে পাবে।”
গোপলা নদী রক্ষার দাবি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সেই সভায় শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও রাজনীতিবিদ রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী গোপলা নদী পুনঃখননের জোর দাবি তোলেন।
তিনি রাষ্ট্রপতির সামনে তুলে ধরেছিলেন নদীটির গুরুত্ব, এর ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে এর সম্ভাবনার কথা। একইসঙ্গে তিনি বালিশিরা পাহাড়কে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণার দাবিও জানান। জানা যায়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ মনোযোগ দিয়ে তার বক্তব্য শোনেন এবং বলেন, “নোট করে রাখা হলো।”
রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর সেই বক্তব্য তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশ, সিলেট কেন্দ্র থেকেও একাধিকবার প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু চার দশক পেরিয়ে গেলেও গোপলা নদী পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, “গোপলা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সমীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আমরা কাজ করব।”
প্রকৃতি, কৃষি, মৎস্য ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা গোপলা নদী এখন শুধুই এক মৃতপ্রায় জলধারা নয়; এটি শ্রীমঙ্গলের পরিবেশগত সংকটেরও প্রতীক। দ্রুত পুনঃখনন ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ না নিলে একদিন হয়তো এই নদীর অস্তিত্ব থাকবে শুধু মানচিত্রে, স্মৃতিতে আর ইতিহাসের পাতায়।