img

শনিবার থেকে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা প্রাথমিক শিক্ষকদের

প্রকাশিত :  ১০:১৩, ০৭ নভেম্বর ২০২৫

শনিবার থেকে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা প্রাথমিক শিক্ষকদের

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবিতে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন । শনিবার (৮ নভেম্বর) থেকে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ কর্মসূচি পালন করবে চারটি শিক্ষক সংগঠনের মোর্চা ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’। নবীন শিক্ষকরাও এতে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সহকারী শিক্ষকদের ৩ দফা দাবি হলো- ১০ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড সমস্যার সমাধান ও শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি। 

দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের এই আন্দোলনে আছে- বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কাশেম-শাহিন), বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (শাহিন-লিপি), সহকারী শিক্ষক ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদসহ অনেকগুলো প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠন। 

শুক্রবার দুপুরে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (শাহিন-লিপি) সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি বলেন, শনিবার শহীদ মিনারে ২০ হাজার শিক্ষক দশম গ্রেডে বেতন, উচ্চতর গ্রেড ও পদোন্নতির অধিকার আদায়ে অবস্থান নেবেন, যা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত চলবে।

তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে কর্মকর্তারা আলোচনা করতে চাচ্ছেন, বিভিন্ন দিক বোঝাচ্ছেন; কিন্তু আমরা চাই না। আমাদের কথা তো বহুবার তাদের বলেছি, কাজ তো হয়নি। এবার রাজপথেই দাবি আদায় করে আমরা ফিরবো।

খায়রুন নাহার লিপি বলেন, দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৩ লাখ ৮৪ হাজার শিক্ষক কর্মরত আছেন। গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ২৪ এপ্রিল এক আদেশে ১১তম গ্রেডে বেতন পাওয়া প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডে এবং ১৩তম গ্রেডে বেতন পাওয়া শিক্ষকদের বেতন ১২তম গ্রেডে উন্নীত করার কথা জানায়। তবে তাতে সন্তুষ্ট নন সহকারী শিক্ষকরা।

তিনি বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা স্নাতক ও সমমান ডিগ্রি নিয়ে দশম গ্রেড পান। নার্সরা এইচএসসি ও নার্সিং ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিয়ে দশম গ্রেড পাচ্ছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা এসএসসি ও কৃষি ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিয়ে দশম গ্রেড পাচ্ছেন। পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষকরাও স্নাতক ও সমমান ডিগ্রি নিয়ে দশম গ্রেড পান।

তিনি আরও বলেন, আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা স্নাতক ও সমমান ডিগ্রি এবং সিএনএড বিপিএড বা বিটিপিটি কোর্স করে ১৩তম গ্রেড পান। পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও দশম গ্রেডে বেতন পান। তাই আমরা দশম গ্রেডে বেতন দেওয়ার দাবি আদায়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করছি।

এ বিষয়ে নবীন শিক্ষকদের নেতা তালুকদার পিয়াস বলেন, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন যাবৎ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। শিক্ষার মূলভিত্তি প্রাথমিক স্তর। প্রাথমিক শিক্ষকরা দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক গঠনের প্রথম স্তরে কাজ করেন।

তিনি বলেন, এই স্তরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না হলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার মানও দুর্বল হয়। তাই শিক্ষার মূলভিত্তি যারা গড়ে দিচ্ছেন, তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও বেতন কাঠামো পাওয়া উচিত। সময়ের প্রেক্ষাপটে সহকারী শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবি।

এদিকে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের আরেকাংশ ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের’ ব্যানারে একাদশ গ্রেডে বেতন, উচ্চতর গ্রেড নিয়ে জটিলতা নিরসন ও শতভাগ পদোন্নতি নিশ্চিত করতে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারকে সময় বেঁধে দিয়েছেন৷ 

দাবি মানা না হলে ২৩ ও ২৪ নভেম্বর অর্ধদিবস কর্মবিরতি, ২৫ ও ২৬ নভেম্বর পূর্ণদিবস কর্মবিরতি এবং ২৭ নভেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এ সময়ের মধ্যে দাবি আদায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে পরীক্ষা বর্জনের পাশাপাশি ১১ ডিসেম্বর থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা।


img

অপ্রতিম হত্যার নেপথ্যে আইফোন, ৫ হাজার টাকার পাওনা ও ‘অসম বন্ধুত্ব’

প্রকাশিত :  ০৬:২১, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি আইফোন ছিনিয়ে নিতেই ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে, শুরুতে এমনই ভেবেছিল পুলিশ। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, সামনে এসেছে পাঁচ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে ক্ষোভ, বয়সে বড়দের সঙ্গে তার ‘অসম বন্ধুত্ব’ এবং টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের ঘটনা।

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য  পাওয়া গেছে। তাঁদের ভাষ্য, অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সটি কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আলাদা স্বার্থ ও ক্ষোভও কাজ করে থাকতে পারে।

গতকাল রোববার এ ঘটনা নিয়ে জেলা পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নেওয়া হয়। ফোন নিতে বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়।

এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবার করা হত্যা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ। তুহিন ছাড়া অন্য দুজন কিশোর। এদের বাইরে আরেক তরুণের সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা অপ্রতিমের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সম্পর্ককে বলছেন ‘অসম বন্ধুত্ব’। কারণ, সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অপ্রতিমের সঙ্গে যাঁদের ওঠাবসা ছিল, তাঁরা তার সহপাঠী নন; বয়সেও বড়। তদন্তে তাঁদের একসঙ্গে তোলা ছবি ও ভিডিও এবং টিকটকের জন্য তৈরি বিভিন্ন ভিডিওর তথ্যও পাওয়া গেছে।

আইফোনে টিকটক বানানোর বাহানা

ঘটনার দিন শুক্রবার অপ্রতিমকে বাসা থেকে বের করে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মুঠোফোনের খুদে বার্তার। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সেদিন অপ্রতিমের কাছে থাকা ফোনে বারবার বার্তা পাঠাচ্ছিলেন তুহিন। বাসা থেকে বের হতে বলছিলেন। একপর্যায়ে বলা হয়, অপ্রতিমের কাছে থাকা দামি আইফোনটি দিয়ে তাঁরা টিকটকের জন্য ভিডিও বানাবেন, ছবি তুলবেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অপ্রতিম শেষ পর্যন্ত রাজি হয়। শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। পরিবারও আগে জানিয়েছিল, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের ফোনটি নিয়ে বের হয়েছিল অপ্রতিম। পরে আর বাসায় ফেরেনি।

পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, বেলা ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকার অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরায় তাদের গতিবিধি ধরা পড়ে। ফুটেজগুলোতে দেখা যায়, অপ্রতিম ও তুহিন পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে, কথা বলছে। তাদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক। একটি ফুটেজে তাদের পেছনে আরও দুজনকে যেতে দেখা গেছে। অন্য একটি ফুটেজে চারজনকেই একসঙ্গে পাওয়া যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকার একটি সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে একজনকে দেখা গিয়েছিল। ওই ফুটেজই প্রথম সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে।

 নির্জন জঙ্গলে

অপ্রতিমকে হত্যা করা হয় লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে কাঁচা রাস্তা দিয়ে যেতে হয় সেখানে। একটি সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিম ও তুহিনকে হেঁটে পাহাড়ের দিকে যেতে দেখা গেছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, পরে সেখানে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও দুই কিশোর।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে অপ্রতিমের কাছ থেকে ফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সে বাধা দিলে শুরু হয় ধস্তাধস্তি। তুহিন প্রথমে বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন এবং পরে অন্যরাও আঘাত করে। অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তার ফোনটি নিয়ে তারা ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।

সিয়াম নামের আরেক তরুণ ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে ঘটনার সময় তিনি আশপাশে থেকে পাহারা দেওয়ার মতো কোনো ভূমিকা পালন করেছিলেন কি না, সেটি যাচাই করছে পুলিশ। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ জানতে পেরেছে, এলাকাটি বেশ নির্জন। এ কারণে বাইরে থেকে সহজে সেখানে কী ঘটছে, তা বোঝার সুযোগ কম।


অপ্রতিমের মরদেহে মাথার গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি আরও কিছু ক্ষত পাওয়া যায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এর কিছু ক্ষত মৃত্যুর পর তৈরি হয়ে থাকতে পারে। রাতে শিয়াল মরদেহ টানাটানি করেছিল। এ বিষয়ে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক তথ্যও পর্যালোচনা করছে পুলিশ।

তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আরেকটি বিরোধের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করত গ্রেপ্তার হওয়া এক কিশোর। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওই কিশোরকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল অপ্রতিম। সম্প্রতি সে টাকা ফেরত চাইছিল।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ নিয়ে অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিল ওই কিশোর। অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন চিন্তাও তার মধ্যে ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন।

একটি ফোনকল 

তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দেওয়া সময়রেখা অনুযায়ী, শনিবার সকাল নয়টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তখনো জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তারা জানতেন না যে অপ্রতিম মারা গেছে। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়ার খবর তাঁদের কাছে পৌঁছায়।

তদন্তকারীরা বলছেন, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করছিলেন। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর শনিবার রাত আটটার দিকে তিনি ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তখনো অন্যদের নাম বলতে চাইছিলেন না তুহিন। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য, অন্যদের নাম প্রকাশ না করতে তিনি ‘ওয়াদাবদ্ধ’।

কিন্তু তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর মুঠোফোনে বারবার ফোন আসছিল। ফোন করছিল অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ওই কিশোর। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে। পরে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, আটকের সময়ও তার গায়ে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। ওই কিশোরকে আটকের খবর পাওয়ার পর তুহিন আরেক কিশোরের নাম জানান। এরপর তাকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ।

নিজের ফোন নেয়নি কেন

ঘটনার আগে থেকেই নিজেদের অবস্থান আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ১৫ বছর বয়সী কিশোর মুঠোফোন ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা রাখত। ঘটনার দিন নিজের মুঠোফোন সঙ্গে নেয়নি সে। পরিবর্তে পরিবারের অন্য একজনের ফোন নিয়ে বের হয়েছিল।

তদন্তকারীদের ধারণা, পরে মুঠোফোনের অবস্থান যাচাই করা হলে যাতে ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি ধরা না পড়ে, সে জন্যই এমনটি করা হয়েছিল। তবে এর পক্ষে প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য আলামত আরও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ওই কিশোরের বাবাকে ঘটনার পর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর অনুপস্থিতির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত পুলিশ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

ফোন গেল তুহিনের বাড়িতে

হত্যার পর অপ্রতিমের আইফোনটি নিয়ে চলে যান তুহিন—এমনটাই বলছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও তুহিনের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ফোনটি পরে তাঁর বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়। শনিবার রাত আটটার দিকে পুলিশ সদর দক্ষিণ মডেল থানার সানন্দার বাড়িতে গেলে তুহিনের মা শিরিনা আক্তার বিছানার তোশকের নিচ থেকে ফোনটি বের করে দেন।

তুহিনের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যার আগেই তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন। তখন তাঁর ছোট ভাই তুষারকে ফোনটি সাবধানে লুকিয়ে রাখতে বলেন।

‘অসম বন্ধুত্ব’ 

অপ্রতিম ছিল বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে শান্ত, মিশুক ও পড়াশোনায় ভালো শিক্ষার্থী হিসেবে বর্ণনা করেছে। স্কুলে কোনো ঝামেলায় তাকে জড়াতে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী জাহান।

অন্যদিকে স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, তুহিন বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় বয়সে কম কয়েকজনকে নিয়ে চলাফেরা করতেন এবং একটি দল তৈরি করেছিলেন। একসময় অপ্রতিমকেও সেই দলে ভেড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন।

তবে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আগে কোনো পুলিশ রেকর্ড নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল সচিবালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অনেকটা কিশোর অপরাধীর মতো। তারা অনেকটা কিশোর অপরাধ চক্রের মতো। তাদের সঙ্গে এই ছেলের (অপ্রতিম) সম্পর্ক ছিল, ওঠাবসা ছিল, বন্ধুত্ব ছিল। তাদের বয়স নিহত শিশুটির চেয়ে ৫ থেকে ১০ বছর বেশি।

পুলিশের কাছে অবশ্য অপ্রতিম ও ওই ব্যক্তিদের একসঙ্গে চলাফেরা, ছবি তোলা এবং টিকটক ভিডিও তৈরির তথ্য রয়েছে। এই বয়স ও সামাজিক অবস্থানের ব্যবধানের সম্পর্ককেই তদন্তকারীরা বলছেন ‘অসম বন্ধুত্ব’।

অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার খবর থেকেই ঘটনাটি কুমিল্লার গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তার মা নাহিদা বেগম ফেসবুকে ছেলের সন্ধান চেয়েছিলেন। নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করতে কাজ করা সংগঠন ‘মুন অ্যালার্ট’ থেকেও অপ্রতিমের ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর অসংখ্য মানুষ ছবিটি শেয়ার করে তাকে খুঁজে পেতে সহযোগিতা চান।

পরদিন শনিবার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেই উদ্বেগ বদলে যায় শোক ও ক্ষোভে। অভিভাবক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রতিমের ছবি শেয়ার করেন। অনেকে সন্তানের নিরাপত্তা, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া এবং সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ জানান।

অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম ছেলের মরদেহ উদ্ধারের পর বলেছিলেন, ‘তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন?’

গতকাল সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজায় শত শত মানুষ অংশ নেন। পরে গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। ছেলেকে শেষবিদায় দেওয়ার সময় বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আর কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়।’

অপ্রতিমের মৃত্যু শুধু একটি হত্যা মামলার মধ্যে আটকে থাকেনি। ঘটনাটি সন্তানদের বন্ধুত্ব, মুঠোফোনকেন্দ্রিক সম্পর্ক এবং পরিবারের অগোচরে বয়সে বড়দের সঙ্গে মেলামেশার ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।