img

নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিই হবে, একদিন আগেও না পরেও না: প্রধান উপদেষ্টা

প্রকাশিত :  ০৮:২৬, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিই হবে, একদিন আগেও না পরেও না: প্রধান উপদেষ্টা

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই অনুষ্ঠিত হবে—এক দিন আগে নয়, পরেও নয়। একইসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে কোনো সংশয় বা পেছানোর সুযোগ নেই। 

আজ মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক দুই জ্যেষ্ঠ মার্কিন কূটনীতিক আলবার্ট গম্বিস ও মোর্স ট্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি এই ঘোষণা দেন। 

প্রধান উপদেষ্টা অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘কে কী বললো তাতে কিছু আসে-যায় না। ১২ ফেব্রুয়ারিই নির্বাচন হবে—একদিন আগেও না, একদিন পরেও না।’ বুধবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই আলোচনার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

বৈঠককালে ড. ইউনূস বিদেশি প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করে বলেন যে, আসন্ন নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। 

তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ও ভুয়া খবরের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। তবে এসব অপপ্রচার সত্ত্বেও সরকার নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন সম্পন্ন করবে এবং ফল ঘোষণার পর জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।

প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী পরিস্থিতি, জুলাই সনদ, রোহিঙ্গা সংকট এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক অপপ্রচার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা জানান যে, সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে, কারণ জনগণের সমর্থনে অনুমোদিত ‘জুলাই সনদ’ ভবিষ্যতে যেকোনো স্বৈরাশাসনের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে। 

তিনি উল্লেখ করেন, সাবেক স্বৈরাচারী শাসনের সমর্থকরা এআই-নির্মিত ভুয়া ভিডিও ও অপতথ্য ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেও সাধারণ মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং তারা এসব প্রোপাগান্ডা শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক আলবার্ট গম্বিসও এই বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন যে, ভুয়া খবর বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৈঠকে দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে বাংলাদেশে ‘সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন’ গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুললে প্রধান উপদেষ্টা জানান যে, বাংলাদেশে বর্তমানে এর জন্য উপযুক্ত সময় নয়। তিনি যুক্তি দেন যে, সত্য ও পুনর্মিলন তখনই সম্ভব যখন অপরাধীরা তাদের অপরাধ স্বীকার করে অনুশোচনা প্রকাশ করে। 

কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের বর্বর অপরাধের বিপুল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পতিত সরকারের সমর্থকরা এখনো নিহত তরুণদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে দাবি করছে এবং সম্পূর্ণ অস্বীকারের অবস্থানে রয়েছে। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার এসডিজি বিষয়ক সমন্বয়ক ও সিনিয়র সচিব লামিয়া মোর্শেদ উপস্থিত ছিলেন।


জাতীয় এর আরও খবর

img

সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠক: তত্ত্বাবধায়ক প্রধান উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের প্রস্তাব

প্রকাশিত :  ১৬:৫৮, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের প্রস্তাব উঠেছে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে। নিম্নকক্ষের সঙ্গে একই সময়ে উচ্চকক্ষের মেয়াদ শেষ না হলে সেখান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ও উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবও এসেছে।

আজ শনিবার সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বৈঠকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনের অধ্যাপক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা উপস্থিত থেকে সংবিধান সংশোধন বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন। দুপুরে এক ঘণ্টার বিরতি দিয়ে বেলা ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এই মতবিনিময় সভা চলে। 

বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমেদ আরও জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, কাঠামো ও কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে অনেকে বিভিন্ন ধারণা দিয়েছেন। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে এবং সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পরও উচ্চকক্ষ বহাল থাকলে সেখান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যায় কিনা, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উচ্চকক্ষে উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে। বিকল্প হিসেবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যায় কিনা, সেই ধারণাও দিয়েছেন কেউ কেউ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্য উপদেষ্টাদেরও দুদলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের বিধান রাখার প্রস্তাব এসেছে। 

তিনি বলেন, এসব প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এখনও সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়া ও কর্মপরিধির বিষয়ে সবাইকে লিখিত মতামত দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিচার বিভাগকে বাইরে রেখে এবং রাষ্ট্রপতির সর্বশেষ বিকল্পটি বাদ দিয়ে কীভাবে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যায়, সে বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে। কমিটি প্রত্যেকের মতামত পর্যালোচনা করবে।

আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে তিনি বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোতত্ত্ব, নির্বাহী বিভাগ ও আইন প্রণয়নবিষয়ক কার্যক্রমের ওপর বিচার বিভাগের পর্যালোচনার ক্ষমতা এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, নিম্নকক্ষের মেয়াদ চার বছর এবং উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাব এসেছে। এ ছাড়া ৬৪ জেলা ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া এবং মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রস্তাবিত সংশোধনে আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় নিরাপত্তা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি– এ চারটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।

সরকারি হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানবিষয়ক কমিটির মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির পাশাপাশি পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিষয়ক প্রশাসনিক দায়িত্ব বিচার বিভাগের হাতে দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে। 

বৈঠকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এর বদলে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা যায় কিনা, সে প্রস্তাবও এসেছে। উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধিত হয়ে যায় কিনা, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশের মত, সংসদকে সংশোধনীর মাধ্যমে আদালতের রায় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এ সময় আলোচকরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সঙ্গে ঐকমত্যে আসার তাগিদ দেন। জবাবে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা সব রকমের চেষ্টা করছেন। জবাবে আলোচকরা বলেন, এই চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। 

জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপির দেওয়া আপত্তির বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে কিনা– এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিরোধী দলকে কমিটির বৈঠকে এসে তাদের মতামত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপত্তি শিথিল করার প্রস্তাব দিলে কমিটি তা বিবেচনা করতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে বিভিন্ন ত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি। 

২০১১ সালের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার মতো এবারও প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ওই সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার বিষয়ে একমত হলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তা বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তখন একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও অবৈধভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা ছিল, যা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না। 

এর আগে বৈঠক থেকে বেরিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, বিরোধী দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ঠিক করা উচিত। তিনি নিজেসহ আরও কয়েকজন বিরোধী দলকে আলোচনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কথা বলেছেন। কমিটি জানিয়েছে, এ বিষয়ে তারা অনেক রকম চেষ্টা করেছে। 

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক, রাগীব রউফ চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ একরামুল হক, অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান, ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন প্রমুখ। 


জাতীয় এর আরও খবর