img

আজ পবিত্র শবে বরাত

প্রকাশিত :  ০৬:৪১, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আজ পবিত্র শবে বরাত

যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে আজ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে সারাদেশে পবিত্র শবে বরাত পালিত হবে। এ উপলক্ষে আগামীকাল বুধবার সরকারি ছুটি থাকবে। “লাইলাতুন নিছ্ফ মিন শাবান”(শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত)। আর “লাইলাতুন নিছ্ফ মিন শাবান”কে এই জন্য শবে বরাত বলা হয় যে, শব অর্থ হলো রাত আর বরাত অর্থ হলো নাজাত তথা মুক্তি। ফারসি ‘শব’ শব্দের অর্থ রাত আর ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি। আজ সেই মুক্তির রাত বা ‘লাইলাতুল বরাত’। 

মুসলমানের কাছে পরম কাঙ্ক্ষিত মহিমাময় রজনি—শবে বরাত। পাপ থেকে সর্বান্তকরণে ক্ষমা প্রার্থনা করে নিষ্কৃতি লাভের অপার সৌভাগ্যের রাত। শবে বরাত পালন নিয়ে আলেম-ওলামাদের মধ্যে দুস্তর মতভেদ বিদ্যমান। পালনের বিপক্ষের পাল্লা দিনে দিনে ভারী হচ্ছে। ইবনে মাজাহ ও বাইহাকীর একটি দুর্বল হাদিসে উল্লেখ আছে, হজরত আলি ইবনে আবি তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে সালাত আদায় করবে আর দিবসে সিয়াম পালন করবে। কেননা আল্লাহ তাআলা সূর্যাস্তের পর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বলেন :আছে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোনো রিয্‌ক প্রার্থনাকারী, আমি রিয্‌ক দান করব। আছে কি কোনো বিপদে নিপতিত ব্যক্তি আমি তাকে সুস্থতা দান করব। এভাবে ফজর পর্যন্ত বলা হয়ে থাকে।

যদিও সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বলেন, আমাকে ডাকার কেউ আছে কি? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। আমার কাছে চাওয়ার কেউ আছে কি? আমি তাকে তা প্রদান করব। আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কেউ আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব।’ 

বস্তুত উপমহাদেশের কিছু আলেম বলে থাকেন, শবে বরাত হলো আল্লাহ তায়ালার মহান দরবারে ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ সময়। আল্লাহ সুবানাহু তায়ালার নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের এক দুর্লভ সুযোগ এনে দেয় লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান। এই রাতে বিশেষ বরকত হাসিলের মানসে মুসলিম সম্প্রদায় নফল নামাজ আদায় ও কুরআন তেলাওয়াত, ইস্তেগফার, ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আসকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়ায় মশগুল থাকেন। শবে বরাতকে ‘লাইলাতুল বারাআত’ নামে অভিহিত করেছেন অনেকে। ‘শব’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ রাত। আর বরায়াত শব্দের অর্থ হলো—নাজাত, নিষ্কৃতি বা মুক্তি। শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতে পবিত্র শবে বরাত পালিত হয়। এ ব্যাপারে কুরআনুল করিমে সুস্পষ্টভাবে কোনো কিছু উল্লেখ না থাকলেও একটি ‘হাসান’ হাদিসে এটাকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বলা হয়েছে। বিজ্ঞ আলেম-উলামা ও ইসলামের বিশেষজ্ঞগণ এই রাতে বিশেষ কোনো ইবাদতের নির্দেশ নেই বলে মনে করেন। এর পক্ষকাল পরেই রহমত বরকত নাজাতের সওগাত নিয়ে আসবে মাহে রমজান। এ কারণে শবে বরাতকে বলা হয় রমজানের মুয়াজ্জিন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ইসলামী বিশ্বকোষ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, ইরান ও ভারতীয় উপমহাদেশে শাবান মাসের একটি রজনিকে ‘শব-ই-বরাত’ বলা হয়। তুরস্ক, ইরান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো কোনো দেশের কোনো কোনো এলাকায় শবে বরাত ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর কোথাও শবে বরাতের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই রাতে ইরানের সর্বত্র আলোক সাজসজ্জা করা হয় ও বিশেষ মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

শবে বরাতকে যে সব আলেম সমর্থন করেন তাদের মতে, এ রাতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নফল নামাজ পড়া, দীর্ঘ সেজদা করা, দুই রাকআত করে যত ইচ্ছা নামাজ পড়া, কুরআনুল করিম তেলওয়াত করা, বেশি বেশি দরুদ শরিফ পড়া, ইসেতগফার করা, দুআ করা, তাসবিহ তাহলিল, জিকির-আসকার করা আর সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই নিজের জন্য, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী ও সব মুসলমানদের জন্য বেশি বেশি দোয়া, তওবা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করা উচিত। সম্ভব হলে পুরুষের জন্য কবরস্থানে গিয়ে কবর জিয়ারত করা, কবরবাসীদের জন্য দোয়া করাও সওয়াবের কাজ। এ রাতের নফল আমলসমূহ একাকীভাবে করণীয়।

শবে বরাতের ইতিহাস সম্পর্কে ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর ৪০০ বছরের মধ্যে শবে বরাত বলে কিছু ছিল না। তাঁর দীর্ঘ ২৩ বছরের নবুওয়াতি জীবনে, এমনকি সাহাবিদের যুগেও এই ধরনের কোনো দিবস পালনের কথা ইসলামের ইতিহাসে নেই। ইবনে কাসিরের বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ত্বারতুসির হাওয়াদেস ও বিদ’আ এবং ইবনুল কাইয়ুমের আল-মানারুল মুনিফ ইতিহাস গ্রন্থে শবে বরাতের উদ্ভবের ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘শবে বরাতের নামাজ ও এবাদতের প্রথম প্রচলন হয় হিজরি ৪৪৮ সনে। ফিলিস্তিনের নাবলুস শহরের ইবনে আবিল হামরা নামীয় একলোক বায়তুল মুকাদ্দাস আসেন। তার তিলাওয়াত ছিল সুমধুর। তিনি শাবানের মধ্যরাত্রিতে নামাজে দাঁড়ালে তার পেছনে এক লোক এসে দাঁড়ায়, তারপর তার সঙ্গে তৃতীয় জন এসে যোগ দেয়, তারপর চতুর্থ জন। তিনি নামাজ শেষ করার আগেই বিরাট একদল লোক এসে তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী বছর এলে, তার সঙ্গে অনেকেই যোগ দেয় ও নামাজ আদায় করে। এতে করে মাসজিদুল আক্সাতে এ নামাজের প্রথা চালু হয়। কালক্রমে এ নামাজ এমনভাবে আদায় হতে লাগে যে অনেকেই তা সুন্নাত মনে করতে শুরু করে।’ পরবর্তী শাসকদের সময়ে এটা বন্ধ হয়ে গেলেও আবারও ইরান থেকে এই শবে বরাত পালনের রীতি আমাদের উপমহাদেশে নতুন বিস্তার লাভ করে। ফলে হকপন্থি আলেমরা এই শবে বরাতের বিশেষ ইবাদত-হালুয়া-রুটি ইত্যাদিকে বিদায়াত বলে অভিহিত করে আসছেন।

যথাযথ মর্যাদায় ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে আজ মঙ্গলবার পবিত্র শবে বরাত উদ্যাপিত হবে। এ উপলক্ষ্যে রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি মসজিদে ওয়াজ মাহফিল, জিকির-আসকারের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন আলোচনা এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। শবে বরাত উপলক্ষ্যে আগামীকাল সরকারি ছুটি। সংবাদপত্রের অফিস আজ বন্ধ থাকবে। এ রাতের তাত্পর্য তুলে ধরে রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করবে বিশেষ ক্রোড়পত্র।

জাতির কল্যাণে প্রার্থনার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

পবিত্র শবে বরাতকে আল্লাহর রহমত লাভের এক অসাধারণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনা এবং মানব কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল সোমবার এক বাণীতে পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা এ আহ্বান জানান। পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীতে উল্লেখ করা হয়, পবিত্র শবে বরাত আমাদের জীবনে রহমত, মাগফেরাত ও আত্মিক পরিশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। হাদিসে বর্ণিত আছে, এই রাতে আল্লাহ তার বান্দাদের বিশেষভাবে ক্ষমা করেন। তাই এ রাতকে সৌভাগ্যময় রজনি হিসেবে বিশ্বাস করা হয়।

ধর্ম এর আরও খবর

img

হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু

প্রকাশিত :  ১০:১৬, ২৭ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:২২, ২৭ জুলাই ২০২৬

আজ ২৭ জুলাই ২০২৭ সালের হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু হচ্ছে । এই কার্যক্রম চলবে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় ঘোষিত হজ কার্যক্রমের রোডম্যাপ অনুযায়ী এই সময়সূচি নির্ধারণ করেছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হজে যেতে আগ্রহীদের প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। ই-হজ সিস্টেমের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি দুই মাধ্যমেই নিবন্ধন করা যাবে। তবে প্রাথমিক নিবন্ধনের আগে প্রত্যেক হজযাত্রীকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে প্রাক-নিবন্ধন করতে হবে।

এরপর সাড়ে তিন লাখ টাকা জমা দিয়ে প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করা যাবে। প্রাথমিক নিবন্ধনকারীদের আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত হজ প্যাকেজের বাকি অর্থ পরিশোধ করে চূড়ান্ত নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যেতে আগ্রহীরা ই-হজ সিস্টেমে ইউজার তৈরি করে নিজেরাই নিবন্ধন করতে পারবেন। এ ছাড়া ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়, জেলা ও উপজেলা মডেল মসজিদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম কার্যালয় এবং ঢাকা হজ অফিস থেকেও নিবন্ধন করা যাবে।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীদের সোনালী ব্যাংকের যেকোনো শাখায় ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ জমা দিয়ে প্রাথমিক নিবন্ধন করতে হবে। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীদের সংশ্লিষ্ট এজেন্সির নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা দিতে হবে। এজেন্সির ব্যাংক হিসাবের তথ্য হজ পোর্টালে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির প্রোফাইলে পাওয়া যাবে।

হজে যেতে আগ্রহীদের নির্ধারিত মেয়াদের পাসপোর্ট থাকতে হবে। ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ রয়েছে— এমন পাসপোর্ট প্রয়োজন হবে।

প্রাথমিক নিবন্ধনের সময় হজযাত্রীদের প্রশিক্ষণ ও টিকা গ্রহণের জেলা, হজের ধরন এবং হজ প্যাকেজ নির্বাচন করতে হবে। তবে ১৫ বছরের কম বয়সী কেউ হজে যেতে পারবেন না। একইভাবে গুরুতর হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার বা কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, স্নায়বিক বা মানসিক রোগী এবং ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা হজে যেতে পারবেন না। কেমোথেরাপি, বায়োলজিক্যাল থেরাপি বা রেডিওথেরাপি নিচ্ছেন— এমন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীরাও হজে যেতে পারবেন না।

জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন সক্রিয় সংক্রামক রোগ, যেমন— যক্ষ্মা ও হেমোরেজিক ফিভারে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও হজে যেতে পারবেন না।